Bangla

গোয়েন্দা দাদু

Spread the love

মিত্রা বসু


পাঁচ নম্বর পাড়া—উত্তর কলকাতার এক পুরনো গলি ঘেঁষে থাকা, রোদে পুড়ে যাওয়া লাল বাড়ির সারি। ভাঙাচোরা রাস্তায় বাচ্চারা ফুটবল খেলে, দুপুরবেলায় বুড়োরা চায়ের দোকানে তাস খেলেন, আর সন্ধ্যায় ঘরে ঘরে কাকের ডাকের মতো বকবকানি শুরু হয়। এমনই এক শান্ত পাড়ায় হঠাৎ একদিন শোরগোল পড়ে গেল।

৭৫ বছরের হরিহর দত্ত, যাকে সবাই স্নেহ করে “হরি দাদু” বলে ডাকে, ঘোষণা দিলেন—তিনি এখন থেকে গোয়েন্দা হবেন।

—“গোয়েন্দা বলছো? দাদা, এ বয়সে?”—জিজ্ঞাসা করলেন রাধাকান্ত দা, চায়ের দোকানের মালিক, মুখে পানের গুল।

—“বয়স কি গোয়েন্দাগিরির বাধা? হ্যারকুল পোয়ারোও তো বৃদ্ধ!”—উত্তর দিলেন দাদু, গম্ভীর চোখে চশমা ঠিক করতে করতে।

—“আপনার তো গাঁটের ব্যথা, হাঁটুতেই উঠে পড়ে না… আর গোয়েন্দাগিরি!”

—“জ্ঞান আর যুক্তিবোধ থাকলে শরীরের শক্তি লাগে না। দেখিস, পাড়ার প্রথম রহস্য আমি ফাঁস করব!”

এভাবেই জন্ম হলো পাঁচ নম্বর পাড়ার “গোয়েন্দা দাদু”-র।

দাদুর কথা শুনে প্রথমে হেসে উড়িয়ে দিলেও, পাড়ার বাচ্চারা ব্যাপারটা নিয়ে রীতিমতো উত্তেজিত। সবার মধ্যে সবচেয়ে বেশি উৎসাহী ছিল পিয়ালি, রাহুল, ও ছোট্ট বাবাই।

পিয়ালি বলল, “দাদু, আমরা আপনার সহকারি হব!”

দাদু তৎক্ষণাৎ একটা ছাতার হ্যান্ডেল দিয়ে বানানো বাঁকা লাঠি হাতে নিলেন আর বললেন, “তবে আমাদের একটা অফিস চাই। চায়ের দোকানের পেছনে যে ফাঁকা ঘরটা আছে, সেটাই হবে ‘পাঁচ নম্বর গোয়েন্দা ব্যুরো’।”

দাদুর মাথায় ইতিমধ্যেই লাল টুপি, সাদা ধুতি, পকেটে ছোট খাতা, আর হাতে সেই বাঁকা লাঠি—গোয়েন্দাগিরির ফুল সাজ।

সপ্তাহ ঘুরতে না ঘুরতেই পাড়ায় প্রথম ‘রহস্য’ এলো। মিসেস সেন হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন গোয়েন্দা দাদুর অফিসে।

—“দাদু! দাদু! আমার কাতলা মাছটা চুরি হয়ে গেছে!”

—“কোথা থেকে?”

—“আজ সকালে বাজার থেকে এনে রান্নাঘরের জানালার পাশে রেখে দিই। একটু পর দেখি, মাছ নেই! শুধু একটা আঁশ পড়ে আছে মাটিতে।”

দাদু গম্ভীর হয়ে চোখ বন্ধ করলেন, যেন অন্তর্জ্ঞান করছেন।

—“খুন না হলেও চুরি তো বটেই! পিয়ালি, রাহুল, বাবাই—চলো, তদন্তে নামি!”

দাদু ছুটলেন ঘটনাস্থলে। রান্নাঘর দেখে বললেন, “দেখেছো জানালাটা খোলা ছিল। সম্ভবত বাইরের কেউ হাত ঢুকিয়ে মাছটা নিয়েছে।”

—“দাদু, বেড়ালও তো হতে পারে!”—বাবাই বলল।

দাদু চশমা নামিয়ে তাকালেন, “বেড়ালের দাঁতের দাগ থাকত মাছের বাকি অংশে। কিন্তু এখানে মাত্র আঁশ পড়ে আছে, আর জানালার নিচে কাদা—সেখানে হাওয়াই চপ্পলের ছাপ! বেড়াল তো হাওয়াই চপ্পল পরে না।”

সবাই হাঁ করে তাকিয়ে থাকল দাদুর দিকে। রাহুল বলল, “তাহলে কোনো মানুষই চুরি করেছে?”

—“হ্যাঁ। এবং আমার সন্দেহ পড়ছে তিন নম্বর বাড়ির দীনেশের দিকে। প্রতিদিন দুপুরে তার বাড়িতে মাছ রান্না হয় না, কিন্তু আজ কাতলার ঝোলের গন্ধ পেয়েছি।”

দীনেশ মুদির দোকানে কাজ করে। সারা জীবন অভাবের মধ্যে কেটেছে। পাড়ায় একটু কড়া ধাতের হলেও লোকটা মূলত নিরীহ।

—“আমরা এখনই তার বাড়িতে যাব, এবং প্রমাণ চাইব।” —দাদু বললেন।

দাদুর নেতৃত্বে সবাই গিয়ে হাজির হল দীনেশের বাড়িতে। পিয়ালি দরজায় টোকা দিল।

—“কে?”—দীনেশ কাঁপা গলায় দরজা খুললেন।

দাদু ঢুকে পড়লেন, “আপনার রান্নাঘর দেখব। সন্দেহজনক ঘটনা ঘটেছে।”

দীনেশ থতমত খেয়ে বললেন, “কিন্তু… কিন্তু… দাদু…”

রান্নাঘরে ঢুকে দেখা গেল, হাঁড়িতে কাতলার ঝোল ফুটছে। দাদু বিজয়ীর হাসি হেসে বললেন, “তোমার কাছে মাছ এল কোথা থেকে?”

—“আমি তো বাজার থেকে এনেছি… আমার স্ত্রীর ভাই এল আজ… একটু ভালো খাওয়ানোর জন্য…”

—“রসিদ আছে?”

দীনেশ কাঁদো কাঁদো মুখে প্লাস্টিকের ব্যাগ থেকে বের করল রসিদ। তাতে লেখা আছে—“মেছো দে, কাতলা মাছ – ৫০০ টাকা।”

পিয়ালি ফিসফিস করে বলল, “দাদু… এবার ভুল করে ফেললেন মনে হচ্ছে।”

দাদু কাশলেন, “হুঁ… তদন্তে ভুল হতেই পারে… স্যার শার্লক হোমসেরও একবার ভুল হয়েছিল।”

পিছন ফিরে দেখি, মিসেস সেন-এর বাড়ির বেড়াল জানালার পাশে বসে মাছের কাঁটা চেটে যাচ্ছে। সবার চোখ ছানাবড়া। “বেড়ালই চোর!”

কয়েকদিন চুপচাপ থাকার পর আবার একটা ঘটনা। নিচু তলার মিতা, ছোট্ট ক্লাস থ্রির মেয়ে, কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমার টুম্পা পুতুলটা হারিয়ে গেছে!”

পিয়ালি বলল, “এইটা আমরা তদন্ত করব!”

দাদু বললেন, “হ্যাঁ, এবার আর ভুল হবে না।”

মিতা বলল, “আমি বারান্দায় বসে খেলছিলাম, একটু চা আনতে গেছি, এসে দেখি পুতুল নেই।”

দাদু প্রথমে ফ্ল্যাটের বারান্দা ঘেঁষে খুঁজে দেখলেন। তারপর বললেন, “কোনও পুতুল নিজের পায়ে চলে যেতে পারে না। কিন্তু যদি কেউ নিয়ে যায়?”

রাহুল বলল, “পাশের বাড়ির কাকিমা তো বলছিলেন, তাঁর ছেলেও এমন পুতুল চেয়েছিল। ওদের বাড়ি দেখি?”

গোয়েন্দা দাদু, বাচ্চাদের নিয়ে হানা দিলেন তিনতলার সোমনাথদের বাড়িতে। সোমনাথ, একদম ছোট্ট, প্লে-গ্রুপে পড়ে। ওর মা বললেন, “কী বলছেন! ও তো সারাদিন ঘরেই থাকে!”

কিন্তু টিভির পাশে টুম্পা পুতুল বসে আছে!

—“এই তো প্রমাণ! দোষী প্রমাণিত!”—দাদু চেঁচিয়ে উঠলেন।

মা বললেন, “না না! এটা আমরা আগেই কিনেছিলাম, রশিদও আছে!”

দাদু আবারও ভুল করলেন। দিন কয়েকের মধ্যেই পাঁচ নম্বর পাড়ায় অভিযোগ উঠল—দাদু বারবার লোকজনকে সন্দেহ করছেন, অথচ সঠিক কিছু বের করতে পারছেন না।

কমিটি বসলো। রাধাকান্ত দা বললেন, “দাদা, এবার একটু থামুন। আপনার গোয়েন্দাগিরির ভুলে সবাই বিব্রত।”

দাদু গম্ভীর হয়ে বললেন, “আমি এখনও হাল ছাড়িনি! আমি প্রমাণ করব—আমি পারি!”

রাত্রিবেলা দাদু নিজেই পাড়ার ছাদে চড়ে পাহারা দিতে বেরোলেন। ভাবলেন, এবার নিজে হাতে অপরাধী ধরবেন। কিন্তু গলির মোড়ে ভুংভুং করে পুলিশ এসে হাজির! খবর পেয়েছে, এক বৃদ্ধ ছাদের ছাদে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করছে।

—“কে আপনি?”—পুলিশ জিজ্ঞাসা করল।

—“আমি গোয়েন্দা হরিহর দত্ত!”

—“ওফ…চলুন থানায়।”

সকালে পাড়ার লোকজন থানা থেকে দাদুকে নিয়ে এল। সবাই একসঙ্গে হেসে কুটিকুটি। পিয়ালি বলল, “দাদু! আপনি নিজেই তো নিজেকে ধরিয়ে দিলেন!”

দাদু একটু লজ্জা পেয়েও বললেন, “তদন্তে নিজেকে জড়ানোই হল আসল গোয়েন্দার সাহস।”

এরপর থেকে দাদু “তথাকথিত” গোয়েন্দাগিরি বন্ধ করলেন, কিন্তু বাচ্চাদের সঙ্গে গল্প করা আর গল্প বানানো চালিয়ে গেলেন।

পিয়ালি বলল, “দাদু, এবার চলুন আমরা একটা পত্রিকা বানাই—‘গোয়েন্দা দাদুর ভুল কেস ফাইল’। সবাই মিলে লিখব!”

দাদু হেসে বললেন, “সেই ভালো! এবার থেকে আমি পাকা লেখক, আর তোমরা আমার ছোট ছোট গোয়েন্দা!”

এভাবেই পাঁচ নম্বর পাড়ায় জন্ম নিল এক নতুন রকমের গোয়েন্দা—যিনি সবচেয়ে বড় রহস্য ভেদ করতে না পারলেও, সবাইকে হাসাতে পারেন!

1000022611.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *