Bangla - রহস্য গল্প

গোপন সিন্দুকের ছায়া

Spread the love

অরিন্দম ঘোষ


পর্ব ১ : প্রথম সূত্র

কলকাতার গরম বিকেলটা অস্বাভাবিকভাবে নিস্তব্ধ ছিল। কলেজ স্ট্রিটের বুকশপগুলোতে ভিড় কমে আসছিল, বই হাতে নিয়ে দু-চারজন ছাত্র পায়ে টেনে হাঁটছিল। রক্তিম সেনের চোখ তীক্ষ্ণ, তার হাতের পাতায় ধরা এক মলিন খাতা। বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো আর্কাইভ ঘেঁটে এইমাত্র সে খাতাটা পেয়েছে—ভুলে যাওয়া এক জমিদারবাড়ির দলিল। হলুদ হয়ে যাওয়া কাগজ, তার ভেতরে খসখসে অক্ষরে লেখা নাম—“রায়বাহাদুর শশাঙ্ক মুখার্জি, ১৮৬৪।”

রক্তিমের ভ্রু কুঁচকে গেল। ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে সে জানে, শশাঙ্ক মুখার্জি ছিলেন মুর্শিদাবাদের এক বিত্তশালী জমিদার, যিনি ইংরেজদের সঙ্গে মিলেমিশে চলতেন। কিন্তু তার মৃত্যুর পরে হঠাৎ করে পুরো বংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। কিংবদন্তি আছে, তার ভিটেবাড়ির ভেতর কোথাও অমূল্য গুপ্তধন লুকোনো আছে—সোনা, রত্ন, আর মুঘল আমলের হাতছোঁয়া এক সিন্দুক।

খাতার পাতাগুলো ওল্টাতে গিয়ে হঠাৎ রক্তিমের চোখ আটকে গেল। এক পাতার প্রান্তে ম্লান কালিতে আঁকা এক অদ্ভুত নকশা। যেন কোনো মানচিত্র, আবার যেন অলঙ্কারিক ফুলেল নকশা। খেয়াল করে দেখল, কোণের দিকটায় আঁকা আছে তিনটি অক্ষর—দ.ক.গ.”। সে বুঝতে পারল না এর মানে কী।

সেই রাতে হোস্টেলের ঘরে আলো নিভিয়ে রক্তিম একাই খাতা নিয়ে বসে রইল। ঘড়ির কাঁটা বারোটা ছুঁতেই মনে হল অক্ষরগুলো যেন হালকা জ্যোতির্ময় আলো ছড়াচ্ছে। বুকের ভেতর কাঁপুনি শুরু হলো। সে খাতার ওপর টর্চের আলো ফেলল। সত্যিই—আলো ফেলতেই নকশার ভেতরে সূক্ষ্ম দাগ দেখা দিল, যা দিনের আলোয় অদৃশ্য ছিল। এক বাঁকানো রেখা, যেটা একটা ভগ্ন প্রাচীরের ছবির মতো। নিচে ছোট করে লেখা—“যে প্রাচীর ভাঙবে না, সে-ই বলবে পথের কথা।”

রক্তিমের কানে যেন কারও ফিসফিসানি ভেসে এল। সে টের পেল, এই খাতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে প্রাচীন গুপ্তধনের প্রথম সূত্র।

পরদিন ভোরে সে ট্রেনে চেপে মুর্শিদাবাদের দিকে রওনা দিল। জানালার বাইরে ঝাপসা মাঠ আর নদীর স্রোত ভেসে যাচ্ছিল। ব্যাগে লুকোনো খাতা আর বুকের ভেতর ঝড়ো উত্তেজনা—কোথাও যেন অদৃশ্য চোখ তাকে অনুসরণ করছে।

মুর্শিদাবাদের সেই ভগ্ন জমিদারবাড়ি এখন ধ্বংসস্তূপ। কেবল ভাঙা খিলান আর ঝোপঝাড়ে ঢেকে থাকা আঙিনা। রক্তিম সাবধানে ভেতরে ঢুকল। একসময়ের ঝাড়বাতি ঝুলে আছে মরচে ধরা শিকলে, দেওয়ালের গায়ে শেওলা জমে সবুজ দাগ। সে নকশা মিলিয়ে দেখতে লাগল—খাতায় আঁকা বাঁকানো প্রাচীর কোথায় থাকতে পারে।

হঠাৎ পায়ের নিচে খসখসে আওয়াজ। রক্তিম নিচে তাকিয়ে দেখল, মাটিতে ছড়িয়ে আছে ভাঙা ইট। সেই ইটের ফাঁক দিয়ে একটা ম্লান খোদাই বেরিয়ে এসেছে। মুছে দেখে লেখা—দৃষ্টির আড়ালেই সত্য।”

তার নিশ্বাস আটকে এল। হঠাৎ পিছনে টের পেল কারও উপস্থিতি। ঘুরে তাকাতেই দেখল, কালো পাঞ্জাবি পরা এক অপরিচিত লোক, ঠোঁটে অদ্ভুত হাসি, হাতে ধরা লণ্ঠন।

লোকটা ধীর স্বরে বলল—
“তুমিও কি সিন্দুকের খোঁজে এসেছ?”

রক্তিমের বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ আরও জোরে বাজতে লাগল। এই ধ্বংসস্তূপ, এই অচেনা লোক, আর হাতে ধরা সেই রহস্যময় খাতা—সব মিলিয়ে খেলার প্রথম চাল পড়ে গেছে। গুপ্তধনের পথে তার যাত্রা শুরু হলো ঠিক এই মুহূর্তে।

পর্ব ২ : অদৃশ্য হাতের লেখা

লোকটির চোখে এক অদ্ভুত স্থিরতা। লণ্ঠনের হলদে আলোয় তার মুখটা আধো অন্ধকারে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে, কিন্তু ঠোঁটের কোণে অস্বস্তিকর হাসি রয়ে গেছে। রক্তিম খাতাটা শক্ত করে বুকের কাছে টেনে নিল। মুহূর্তের জন্য সে বুঝতে পারছিল না—এই লোকটা কি শত্রু, নাকি কোনো সহযাত্রী?

“আপনি কে?”—রক্তিমের গলায় সতর্কতা।

লোকটি ঠান্ডা স্বরে বলল, “আমার নাম অর্জুন দত্ত। আমি এই জমিদারবাড়ির ইতিহাস নিয়ে কাজ করি। অনেকে আমায় পাগল বলে, কিন্তু আমি জানি, শশাঙ্ক মুখার্জির ধনরত্ন কোথাও এখানেই চাপা পড়ে আছে। তুমি যে খাতাটা পেয়েছ, সেটার কথা আমি আগেই শুনেছিলাম।”

রক্তিম চমকে গেল। “কিন্তু আপনি জানলেন কীভাবে?”

অর্জুন চোখ ছোট করে তাকাল। “কিছু জিনিস জানার জন্য বইয়ের পাতাই যথেষ্ট নয়। মুর্শিদাবাদের বাতাসে, মাটির গন্ধে, এখনও সেই ইতিহাসের প্রতিধ্বনি লুকিয়ে আছে।”

কথাটা শেষ করে সে লণ্ঠনটা উঁচিয়ে ধরল। আলো এসে পড়ল প্রাচীরের গায়ে। রক্তিম টের পেল, ভাঙা ইটগুলোর ফাঁকে আরও কিছু আঁচড় আছে—যেন পুরোনো দিনের লেখা। চোখ কুঁচকে দেখা যায় না। অর্জুন ব্যাগ থেকে বের করল একটা ছোট শিশি। ভেতরে নীলচে তরল। সে তা তুলোয় ভিজিয়ে দেওয়ালের গায়ে আলতো ঘষে দিল। মুহূর্তের মধ্যে হালকা দাগগুলো ফুটে উঠল।

রক্তিমের বুক ধক করে উঠল। প্রাচীরের গায়ে যেন কারও লেখা ভেসে উঠল—কিন্তু সেগুলো ছিল অদ্ভুত, আধা-বাংলা, আধা-সংকেতময় অক্ষর। যেন এক অদৃশ্য হাত সময়ের গর্ভে গিয়ে এখন আবার লিখে দিয়েছে।

লেখাটা দাঁড়াল—
সূর্যের আলোয় ম্লান, চাঁদের আলোয় জ্বলে। সিন্দুকের দ্বার খোলে অদেখা কণ্ঠে।”

অর্জুন ঠোঁটে ফিসফিস করে পড়ল, আর রক্তিম কানে শুনে শিরশির করে উঠল। এ কেমন ধাঁধা?

রাত নামছিল দ্রুত। মন্দিরের ঘণ্টার শব্দ দূরে কোথাও মিলিয়ে যাচ্ছিল। ভগ্ন জমিদারবাড়ির মধ্যে অদ্ভুত এক চাপা ভয়। রক্তিম খাতার নকশার সঙ্গে প্রাচীরের লেখাটা মেলাতে লাগল। হঠাৎ তার মাথায় একটা চিন্তা এল—খাতার পাতায় যে নকশাটা ছিল, সেটা আসলে পূর্ণ হয়নি। হয়তো প্রাচীরের লেখাই সেই মানচিত্রের বাকি অংশ।

সে ব্যাগ থেকে নোটবুক বার করে নকশার কপি করতে লাগল। অর্জুন তার দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে বলল, “তুমি বুঝতে শুরু করেছ।”

ঠিক তখনই ভাঙা আঙিনার বাইরের ঝোপঝাড়ে খসখস আওয়াজ। দু’জনেই চমকে উঠল। অন্ধকারে যেন কারও ছায়া নড়ছে। রক্তিম তড়িঘড়ি লণ্ঠন ঘোরাল। আলোয় দেখা গেল—দূরে এক মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। মুখ ঢাকা, কেবল চোখের ঝিলিক। এক মুহূর্তের জন্যই সে চোখ মেলল, তারপর দ্রুত সরে গেল অন্ধকারে।

অর্জুন নিচু গলায় বলল, “ওরা জানে আমরা সূত্র খুঁজে পেয়েছি।”

“ওরা কারা?”—রক্তিম জিজ্ঞেস করল।

অর্জুন গম্ভীর মুখে বলল, “যারা চায় না ধনরত্ন কখনো প্রকাশ পাক। তারা বহু প্রজন্ম ধরে এই রহস্য পাহারা দিচ্ছে। আমরা যদি ভুল পথে পা বাড়াই, তাদের ছায়া আমাদের পিছু ছাড়বে না।”

চাঁদের আলো উঠতে শুরু করল। প্রাচীরের গায়ে সেই অদৃশ্য লেখাটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। মনে হচ্ছিল, প্রাচীন কোনো কণ্ঠস্বর এখনো সেখানে বেঁচে আছে।

রক্তিম নোটবুক বন্ধ করল, চোখে এক ঝলক দৃঢ়তা।
“যা-ই হোক, আমি এই পথ ছাড়ব না। গুপ্তধনের চাবি যদি সত্যিই থেকে থাকে, আমি সেটা খুঁজে বের করব।”

অর্জুন শান্ত স্বরে বলল, “তাহলে প্রস্তুত হও। আজ রাতেই আমরা যাত্রা শুরু করব। সামনে আছে আরও অদ্ভুত সংকেত—আরও অদৃশ্য হাতের লেখা।”

পর্ব ৩ : পাথরের চোখ

মুর্শিদাবাদের আকাশে তখন ভোরের আলো ফুঁটে উঠছে। পাখিদের কিচিরমিচিরে ভেঙে গেল রাতের স্তব্ধতা। রক্তিম আর অর্জুন দাঁড়িয়ে আছে ভগ্ন জমিদারবাড়ির আঙিনায়। রাতের সেই অদৃশ্য হাতের লেখার ধাঁধা তাদের পরবর্তী সূত্র দেখিয়েছে—একটি প্রাচীন মন্দির, যার ভেতরে দেবমূর্তির চোখে লুকোনো আছে চাবি।

রক্তিম কাগজে আঁকা নকশাটা বারবার দেখছে। অর্জুন শান্ত গলায় বলল, “এই মন্দিরের কথা শশাঙ্ক মুখার্জির বংশে গোপনে প্রচলিত ছিল। মন্দিরটা ভগবান শিবের নামে হলেও আসল রহস্য লুকিয়ে ছিল তার ভেতরের পাথরের চোখে।”

টোটো চড়ে তারা পৌঁছে গেল নদীর ধারের এক গ্রামে। পথের দু’ধারে তালগাছ, ধানের জমি, আর দূরে দাঁড়িয়ে আছে ভগ্ন মন্দির—শেওলায় ঢাকা দেয়াল, ভাঙা গম্বুজ। গ্রামবাসী প্রায় কেউই সেখানে যায় না। লোকমুখে প্রচলিত, মন্দিরে রাতে অদ্ভুত আলো জ্বলে আর কারও কারও কানেও শোনা যায় অচেনা মন্ত্রপাঠ।

ভেতরে ঢুকতেই রক্তিমের শরীর শিউরে উঠল। অন্ধকার গর্ভগৃহ, ছাদের শিকড় ঝুলে পড়েছে, বাতাসে গুমোট গন্ধ। মাঝখানে ভগ্ন শিবমূর্তি—তবু চোখ দুটো অস্বাভাবিক উজ্জ্বল। যেন পাথরের মধ্যে কাচের মতো ঝিলিক।

অর্জুন ফিসফিস করে বলল, “ওই চোখের ভেতরেই আছে গুপ্ত সংকেত।”

রক্তিম সতর্ক হয়ে কাছে গেল। মূর্তির চোখে হাত রাখতেই ঠান্ডা শিরশিরে স্পর্শ। হঠাৎ সে টের পেল, চোখের ভেতর ফাঁপা জায়গা। আঙুল ঢুকিয়ে টানতেই বেরিয়ে এল এক ক্ষুদ্র লোহার টুকরো—চাবির মতো, কিন্তু সম্পূর্ণ নয়। বরং অর্ধেক ভাঙা।

সে বিস্মিত হয়ে অর্জুনের দিকে তাকাল। অর্জুন বলল, “এটাই প্রথম চাবির অংশ। সিন্দুক খুলতে আমাদের পুরোটা দরকার। বাকিটা কোথাও লুকানো আছে।”

ঠিক তখনই মন্দিরের বাইরে পায়ের শব্দ। দু’জনেই সজাগ হল। দরজার ফাঁক দিয়ে দেখা গেল, কয়েকজন লোক কালো কাপড়ে মুখ ঢেকে এগিয়ে আসছে। হাতে লাঠি আর মশাল।

অর্জুন ফিসফিস করে বলল, “ওরা পাহারাদার। যারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই ধনরহস্য পাহারা দিয়ে আসছে।”

রক্তিম দ্রুত খাতাটা ব্যাগে ঢুকিয়ে বলল, “আমাদের এখনই বেরোতে হবে।”

দু’জনে পিছনের ভাঙা দেয়াল ভেঙে পালাল। আঁকাবাঁকা গলিপথ পেরিয়ে তারা নদীর ধারে পৌঁছাল। শ্বাসকষ্টে ভুগতে ভুগতে রক্তিম পকেট থেকে চাবির অর্ধেকটা বের করল। সূর্যের আলোয় সেটার গায়ে অদ্ভুত নকশা ফুটে উঠল।

চাবির গায়ে খোদাই ছিল কয়েকটি অক্ষর—উ.ক.গ.”

রক্তিম আঁতকে উঠল। আগের সূত্রে ছিল “দ.ক.গ.”। মানে, এগুলো আসলে দিকনির্দেশ! দক্ষিণ, উত্তর—আরও কিছু গোপন মানচিত্র তৈরি হচ্ছে।

অর্জুনের চোখে এক ঝলক আগুনের মতো ঝলকানি। “তাহলে বাকি চাবির অংশ পশ্চিম আর পূর্বে লুকোনো আছে। আমরা যদি চার দিকের সূত্র জুড়তে পারি, তবেই আসল সিন্দুকের অবস্থান খুঁজে পাব।”

কিন্তু তখনই তারা শুনল, দূর থেকে ভেসে আসছে বাঁশির আওয়াজ—একটানা, তীক্ষ্ণ, অস্বস্তিকর। অর্জুনের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
“ওরা আমাদের পথ চিনে ফেলেছে। এই বাঁশি মানে শিকার শুরু হয়েছে।”

রক্তিম আকাশের দিকে তাকাল। ভগ্ন মন্দিরের গম্বুজের ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো পড়ছে, আর সেই আলোয় মূর্তির চোখ যেন এখনো অদৃশ্য কোনো সত্যের দিকে তাকিয়ে আছে। গুপ্তধনের খেলা এখন আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠল।

পর্ব ৪ : নিষিদ্ধ দ্বার

নদীর ধারে দাঁড়িয়ে রক্তিম আর অর্জুন হাঁপাচ্ছিল। দূরে বাঁশির আওয়াজ একটানা বেজে চলেছে, যেন শিকারির ডাক। চারদিকের বাতাসে এক অস্বস্তি জমে উঠছিল। রক্তিম অর্ধেক চাবিটা শক্ত করে মুঠোয় ধরল। সূর্যের আলোয় তার গায়ে খোদাই করা অক্ষরগুলো—“উ.ক.গ.”—ঝিলমিল করে উঠছিল। দক্ষিণ আর উত্তর মিলেছে, কিন্তু এখনও পূর্ব ও পশ্চিম বাকি।

অর্জুন ধীরস্বরে বলল, “আমাদের এখনই এখানে থেকে সরে যেতে হবে। মন্দির পাহারা দেয় যারা, তারা একবার শিকার শুরু করলে পিছু ছাড়ে না।”

টোটো না পেয়ে তারা পায়ে হেঁটেই গ্রাম পেরোতে লাগল। আঁকাবাঁকা কাঁচা রাস্তা, ধানক্ষেতের ফাঁক দিয়ে হাওয়া বইছে। মাঝে মাঝে রক্তিম মনে করতে লাগল কেউ যেন তাদের পিছু নিচ্ছে। একবার ঘুরে তাকিয়ে সত্যিই দেখল, দূরে কালো কাপড়ে ঢাকা এক ছায়া ধীরে ধীরে তাদের অনুসরণ করছে।

“আরও দ্রুত চল,” অর্জুন চাপা স্বরে বলল।

তারা অবশেষে পৌঁছাল গ্রামের বাইরে এক ভগ্ন বটগাছের কাছে। অর্জুন বলল, “এখানেই লুকিয়ে আছি কিছুক্ষণ। তারপর রাতে যাব সেই জায়গায় যেটা নিয়ে আর্কাইভের খাতায় লেখা ছিল।”

রক্তিম অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কোন জায়গা?”

অর্জুন গভীর গলায় উত্তর দিল, “নিষিদ্ধ দ্বার।”

রক্তিম চমকে উঠল। এই নাম সে শুনেছে। কথিত আছে, জমিদার শশাঙ্ক মুখার্জির বাড়ির ভেতরে এক ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ আছে—যাকে গ্রামবাসী বলে “নিষিদ্ধ দ্বার।” বলা হয়, যে সেখানে প্রবেশ করেছে, সে আর ফেরেনি।

রাত নামতেই তারা মশাল হাতে বেরোল। চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়েছে, নদীর গায়ে ঝিলিক। ধ্বংসপ্রাপ্ত জমিদারবাড়ির এক ভগ্ন অঙ্গনে এসে দাঁড়াল তারা। ঘন ঝোপঝাড়ের আড়ালে লুকিয়ে আছে সেই গোপন ফটক। লোহার মোটা দরজা, মরচে পড়ে লালচে হয়ে গেছে, কিন্তু অদ্ভুতভাবে এখনো অটুট। দরজার ওপর খোদাই করা আছে কয়েকটি শব্দ—যে সাহস করে, সে-সত্য পায়।”

রক্তিম হাত বুলিয়ে দেখল। দরজার ফাঁক দিয়ে শীতল বাতাস বেরিয়ে আসছে। মনে হল ভেতরে অজানা এক পৃথিবী অপেক্ষা করছে।

অর্জুন ব্যাগ থেকে লোহার রড বের করে মরচে ধরা তালাটা ভাঙতে লাগল। শব্দ উঠল ধ্বংসস্তূপে। ঠিক তখনই আবার বাঁশির আওয়াজ ভেসে এল, এ বার আরও কাছে। রক্তিমের বুক ধড়ফড় করে উঠল।

অবশেষে তালাটা ভেঙে গেল। দরজা খুলতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এল শ্যাওলায় ভরা বাতাস। দু’জন মশাল হাতে ভেতরে ঢুকল।

সুড়ঙ্গটা নেমে গেছে গভীরে। চারপাশে আর্দ্রতা, দেওয়ালে অদ্ভুত খোদাই। সাপের মতো আঁকাবাঁকা পথ ধরে তারা এগোতে লাগল। হঠাৎ রক্তিম থমকে দাঁড়াল। দেওয়ালে স্পষ্ট কিছু লেখা দেখা যাচ্ছে—অদৃশ্য কালিতে আঁকা সংকেত, যা মশালের আলোয় ঝিলমিল করছে।

সেখানে খোদাই করা আছে—
পূর্বের চোখে সত্য, পশ্চিমের হৃদয়ে মৃত্যু।”

অর্জুন বিস্ময়ে ফিসফিস করে বলল, “মানে, পূর্ব দিকে আছে বাকি চাবির অংশ… আর পশ্চিমে অপেক্ষা করছে মৃত্যুর ফাঁদ।”

রক্তিমের গা শিউরে উঠল। তখনই তারা শুনতে পেল, সুড়ঙ্গের বাইরে লোহার দরজায় কেউ জোরে ধাক্কা দিচ্ছে।

“ওরা এসে গেছে,” অর্জুন দাঁত চেপে বলল। “এখন আমাদের কাছে একটাই পথ—ভেতরে আরও গভীরে নামতে হবে।”

মশালের আলোয় দেখা গেল, সুড়ঙ্গের শেষে দু’টো আলাদা রাস্তা। একদিকে লেখা “পূর্ব”, অন্যদিকে “পশ্চিম।”

রক্তিম অর্জুনের দিকে তাকাল। সিদ্ধান্ত নিতে হবে এখনই। ভুল পথ মানে মৃত্যু। সঠিক পথ মানে গুপ্তধনের আরও এক টুকরো সূত্র।

সামনে দাঁড়িয়ে আছে নিষিদ্ধ দ্বারের সত্যিকারের পরীক্ষা।

পর্ব ৫ : মায়ার আয়না

সুড়ঙ্গের ভেতর মশালের আলো টিমটিম করছিল। রক্তিম আর অর্জুন দাঁড়িয়ে আছে দুই রাস্তার মুখে—একপাশে “পূর্ব”, অন্যপাশে “পশ্চিম।” দেওয়ালের ওপর খোদাই করা অক্ষর যেন বারবার সতর্ক করছে—পূর্বের চোখে সত্য, পশ্চিমের হৃদয়ে মৃত্যু।”

অর্জুন নিঃশ্বাস টেনে বলল, “আমাদের বেছে নিতে হবে। ভুল করলে আর ফেরার পথ থাকবে না।”

রক্তিম বুকের ভেতর ধুকপুক আওয়াজ সামলে বলল, “আমরা পূর্বের পথে যাব। সেখানেই চাবির বাকি অংশ লুকানো।”

দু’জন মশাল হাতে ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগল। সুড়ঙ্গটা ক্রমশ সরু হয়ে আসছিল। দেওয়ালে ঝুলে থাকা শিকড়, মাটির গন্ধ, আর কোথাও কোথাও পানির ফোঁটা পড়ে টুপটাপ শব্দ। হঠাৎ তাদের সামনে দেখা গেল এক ছোটো গর্ভগৃহের মতো ঘর। মাঝখানে একটা পাথরের চৌকি, তার ওপর ঢাকা কাপড়।

অর্জুন কাপড়টা সরিয়ে দিল। নিচে বেরিয়ে এল এক অদ্ভুত বস্তু—একটা আয়না। কিন্তু সাধারণ আয়না নয়। ফ্রেমে খোদাই করা অচেনা প্রতীক, আর আয়নার ভেতর প্রতিফলন অস্বাভাবিক রকম ঝাপসা।

রক্তিম বিস্মিত হয়ে বলল, “এটাই কি সেই মায়ার আয়না?”

অর্জুন মাথা নাড়ল। “কথিত আছে, এই আয়না দিয়ে সত্য আর মিথ্যা আলাদা করা যায়। কিন্তু এর পরীক্ষা ভয়ঙ্কর। আয়নায় তাকালে মানুষ নিজের সত্যিকারের রূপ দেখতে পায়।”

রক্তিম দ্বিধায় পড়ল। হঠাৎ আয়নার ভেতরে যেন আলো ঝলসে উঠল। সে নিজের মুখ দেখল—কিন্তু সেটি ছিল না কেবল বর্তমানের রক্তিম। প্রতিফলনে ফুটে উঠল আরও কয়েকটি মুখ—একজন সৈনিক, এক বৃদ্ধ, এক অচেনা নারী—সব যেন তার ভেতরের বিভিন্ন সময়ের ছায়া।

হঠাৎ আয়নার কোণে জ্বলজ্বল করতে লাগল কিছু অক্ষর। রক্তিম ঝুঁকে পড়ে পড়ল—
পূর্বে চোখ, উত্তরেই কণ্ঠ, দক্ষিণে দ্বার, পশ্চিমে মৃত্যু।”

অর্জুন অবাক হয়ে বলল, “এটা পুরো দিকনির্দেশ! মানে চাবির চারটি অংশ চার দিকে ছড়ানো।”

ঠিক তখনই আয়নার প্রতিফলনে দেখা গেল ভয়ঙ্কর দৃশ্য। সুড়ঙ্গের অন্য প্রান্তে কয়েকজন কালো কাপড়ে মোড়া লোক মশাল নিয়ে ঢুকছে। কিন্তু অদ্ভুতভাবে তারা এখানকার বাস্তবে নেই—কেবল আয়নায় প্রতিফলিত।

রক্তিমের শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। “মানে, ওরা আমাদের পিছু নিয়েছে… আয়নায় দেখা যাচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে তারা আসছে অদৃশ্য পথে।”

অর্জুন তৎক্ষণাৎ আয়নার পাশে পাথরের চৌকিতে হাত বুলিয়ে দেখল। ওখানে ছোট্ট এক ফাঁপা খোপে রাখা আছে আরেকটি ধাতব টুকরো। সে তা বের করল। সেটাও চাবির অংশ—অর্ধেক বৃত্তের মতো, গায়ে খোদাই করা অক্ষর—পূ.ক.গ.”

এবার রক্তিমের মনে ঝড় বয়ে গেল। দক্ষিণ, উত্তর, পূর্ব—তিন দিকের চাবি মিলেছে। এখন বাকি শুধু পশ্চিম। কিন্তু পশ্চিম মানেই মৃত্যু।

হঠাৎ আয়নার ভেতর প্রতিফলন অশুভভাবে কেঁপে উঠল। কালো কাপড়ের লোকগুলো মশাল নেড়ে দ্রুত এগোতে লাগল। রক্তিম আর অর্জুন জানল, সময় ফুরিয়ে আসছে।

অর্জুন বলল, “আয়না আমাদের সতর্ক করেছে। পশ্চিমে গেলে মৃত্যু আছে, কিন্তু হয়তো মৃত্যুর মধ্যেই শেষ সত্য লুকোনো।”

রক্তিম আয়নার দিকে শেষবার তাকাল। প্রতিফলনে নিজের মুখে সে দেখল এক দৃঢ় সংকল্প—যা তাকে গুপ্তধনের খেলায় আরও গভীরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

মশালের আলোয় দু’জন দ্রুত পেছনের পথ ধরে দৌড়ে বেরিয়ে এল। সুড়ঙ্গের ভেতর বাঁশির আওয়াজ আরও কাছে শোনা যাচ্ছিল।

তাদের হাতে এখন তিনটি সূত্র। সামনে অপেক্ষা করছে অন্ধকারতম অধ্যায়—পশ্চিমের হৃদয়।

পর্ব ৬ : ছায়ার অনুসরণ

রাতের অন্ধকার ঘন হয়ে আসছিল। ভগ্ন জমিদারবাড়ির ভেতর দিয়ে বেরিয়ে আসতেই রক্তিম আর অর্জুন দেখল, চারদিকে নিস্তব্ধতা। কিন্তু সেই নিস্তব্ধতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে অদ্ভুত এক শব্দ—পায়ের খসখসানি, যা তাদের প্রতিটি পদক্ষেপের ছায়ার মতো পিছু নিচ্ছে।

রক্তিম কাঁধের ব্যাগ চেপে ধরল। তার ভেতরে এখন তিনটি অর্ধেক চাবি—দক্ষিণ, উত্তর, আর পূর্বের অংশ। অদ্ভুতভাবে এগুলো মিলে একটা বৃত্তের মতো আকার নিচ্ছে। কিন্তু পশ্চিমের অংশ ছাড়া তা অসম্পূর্ণ। আর আয়নার সতর্কতা তাদের মনে বিষ ছড়িয়ে দিয়েছে—পশ্চিম মানেই মৃত্যু।

তারা দ্রুত ভগ্ন বাড়ির পেছনের পথ ধরে বেরোতে লাগল। হঠাৎ করেই হাওয়ার ঝাপটা এসে লণ্ঠনটা নিভিয়ে দিল। চারপাশে অন্ধকার নেমে এল। রক্তিমের বুক ধড়ফড় করতে লাগল। তখনই সে স্পষ্ট শুনল—অন্ধকারে কেউ ফিসফিস করছে।

“তোমরা থেমে যাও… সিন্দুক তোমাদের জন্য নয়…”

অর্জুন চাপা স্বরে বলল, “এটা ওদের ছায়ার খেলা। চোখ বুজলে মনে হবে কেউ কথা বলছে, আসলে এগুলো মানসিক পরীক্ষা।”

রক্তিম ঠান্ডা ঘামে ভিজে গেলেও এগোতে লাগল। পথ যতই এগোচ্ছে, ততই মনে হচ্ছে কেউ অদৃশ্যভাবে পিছু নিচ্ছে। কখনও দেওয়ালের গায়ে, কখনও ভাঙা খিলানের ওপরে, কালো ছায়াগুলো যেন লুকিয়ে লাফাচ্ছে।

হঠাৎ সামনে দেখা গেল একটা সরু সিঁড়ি নেমে গেছে নিচের দিকে। সিঁড়ির শেষ প্রান্তে এক গোপন দরজা। দরজায় খোদাই করা—পশ্চিমের হৃদয়।”

রক্তিম স্থির হয়ে গেল। অর্জুনও কয়েক মুহূর্ত নীরব দাঁড়িয়ে রইল। আয়না স্পষ্ট করে সতর্ক করেছিল—পশ্চিম মানেই মৃত্যু। কিন্তু যদি শেষ সূত্রটা সেখানেই লুকানো থাকে?

অর্জুন বলল, “আমাদের আর কোনো উপায় নেই। ধনরত্নের পথ পেতে হলে মৃত্যুর সীমানায়ও পা ফেলতে হবে।”

তারা সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগল। ভেতরে ঢুকতেই ঘর অস্বাভাবিক ঠান্ডা। দেওয়ালের গায়ে পুরনো প্রতীক আঁকা—ত্রিশূল, চন্দ্র, সাপ, আর এক অদ্ভুত চোখ। ঠিক মাঝখানে রাখা আছে একটা লোহার সিন্দুক, তালা লাগানো।

রক্তিম মশালের আলো ফেলতেই দেখল, সিন্দুকের সামনে মাটিতে খোদাই করা আছে কয়েকটি শব্দ—
রক্ত ছাড়া দ্বার খোলে না।”

তার বুকের ভেতর কেঁপে উঠল। মানে কি সিন্দুক খোলার জন্য রক্ত দিতে হবে?

ঠিক তখনই অন্ধকার থেকে ছায়াগুলো নড়ে উঠল। কালো কাপড়ে ঢাকা কয়েকজন লোক একসাথে বেরিয়ে এল। হাতে লাঠি আর ধারালো অস্ত্র। তাদের চোখে অদ্ভুত জ্যোতি।

অর্জুন গম্ভীর গলায় বলল, “ওরা ধনরক্ষক। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই রহস্য পাহারা দিয়ে আসছে। আমরা এখন ওদের ফাঁদে।”

এক মুহূর্তেই লড়াই শুরু হলো। রক্তিম আর অর্জুন কোনোরকমে পাল্টা লড়াই করল, কিন্তু সংখ্যায় তারা অনেক বেশি। হঠাৎ রক্তিম পেছন থেকে একটা ঘুষি খেয়ে মাটিতে পড়ে গেল। চাবিগুলো ব্যাগ থেকে গড়িয়ে বেরিয়ে এলো। ছায়ামূর্তিরা হুড়মুড়িয়ে এগিয়ে এল চাবির দিকে।

কিন্তু আশ্চর্য! সিন্দুকটা হঠাৎ করেই ঝিলমিল করতে লাগল। তার তালার ফাঁক দিয়ে লালচে আলো বেরোল। যেন চাবিগুলোর উপস্থিতিতে সিন্দুক নিজেই সাড়া দিচ্ছে।

অর্জুন চেঁচিয়ে উঠল, “রক্তিম, শেষ সূত্রটা এখানেই! সিন্দুকই আমাদের পরীক্ষা নিচ্ছে।”

রক্তিম দাঁত চেপে উঠে দাঁড়াল। তার কপাল ফেটে রক্ত বেরোচ্ছিল। সে হাতের রক্ত সিন্দুকের গায়ে ছুঁইয়ে দিল। মুহূর্তের মধ্যে তালাটা ভাঙা আওয়াজে খুলে গেল।

ভেতর থেকে বেরিয়ে এল আরেকটি চাবির অংশ। সেটাই পশ্চিমের অংশ। গায়ে খোদাই করা অক্ষর—প.ক.গ.”

চারটি দিকের চাবি একত্র হলো। কিন্তু সিন্দুক খুলতেই হঠাৎ অদৃশ্য শক্তি ঘরটাকে কাঁপিয়ে তুলল। কালো ছায়াগুলো চিৎকার করে পিছিয়ে গেল।

অর্জুন ফিসফিস করে বলল, “এখন খেলা আসল পর্যায়ে পৌঁছেছে। সামনে অপেক্ষা করছে রক্তের দাম।”

পর্ব ৭ : রক্তের দাম

ঘরটা দুলতে দুলতে থেমে গেল। চারদিকে অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো, যেন মাটির নিচে কোনো প্রাচীন হৃদপিণ্ড স্পন্দন থামিয়ে দিয়েছে। রক্তিম হাতে শক্ত করে ধরল চারটি চাবির অংশ—দক্ষিণ, উত্তর, পূর্ব আর পশ্চিম। এগুলো একসাথে জুড়ে দিলে একটা সম্পূর্ণ বৃত্ত তৈরি হচ্ছে। বৃত্তটা দেখতে যেন অদ্ভুত এক তান্ত্রিক মণ্ডল, গায়ে খোদাই করা প্রতীকগুলো লালচে আলো ছড়াচ্ছে।

অর্জুন নিচু গলায় বলল, “এটাই সিন্দুকের প্রকৃত চাবি। কিন্তু খেয়াল করেছ, প্রতীকগুলো এখনো স্থির নয়? মানে, কিছু একটা বাকি আছে।”

রক্তিম কপালের রক্ত মুছে বলল, “লেখায় স্পষ্ট ছিল—রক্ত ছাড়া দ্বার খোলে না। মানে এই চাবিকে সক্রিয় করতে রক্তের দাম দিতে হবে।”

অর্জুনের চোখে ঝিলিক। “কিন্তু কার রক্ত? সিন্দুক চাইছে আত্মত্যাগ।”

ঠিক তখনই তাদের পেছনে চাপা হাসির শব্দ। ছায়া থেকে বেরিয়ে এল কালো কাপড়ের পাহারাদারদের নেতা। মুখ ঢাকা, কিন্তু চোখে দাহ্য আলো। সে ধীরে ধীরে বলল, “সিন্দুকের রহস্য কোনো বহিরাগত জানবে না। শশাঙ্ক মুখার্জির রক্তের উত্তরসূরি ছাড়া এটি খুলবে না।”

রক্তিম হতবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “মানে কী? শশাঙ্ক মুখার্জির বংশ তো নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে!”

নেতা ঠোঁটে হাসি টেনে বলল, “সবাই নয়। কেউ একজন এখনো বেঁচে আছে। সে-ই এই খেলায় টিকে থাকবে।”

অর্জুনের চোখ হঠাৎ অস্বাভাবিক রকম উজ্জ্বল হয়ে উঠল। রক্তিম বিস্মিত হয়ে তার দিকে তাকাল। “তুমি…?”

অর্জুন ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ। আমি শশাঙ্ক মুখার্জির বংশধর। এ জন্যই আমি জানতাম এত কিছু। এ জন্যই আমি এই খেলায় টানা এসেছি।”

রক্তিমের বুকের ভেতর ঝড় বয়ে গেল। এতদিন যার ওপর ভরসা করেছে, সে-ই আসলে এই রহস্যের কেন্দ্রে।

অর্জুন মৃদু স্বরে বলল, “কিন্তু চাবি খুলতে একটাই শর্ত—বংশধরের রক্ত চাই। রক্ত ছাড়া সিন্দুক সাড়া দেবে না।”

এবার পাহারাদারদের নেতা গম্ভীর স্বরে বলল, “তাহলে বেছে নাও। যদি সত্যিই ধন পেতে চাও, তবে তোমাকেই দিতে হবে রক্তের দাম।”

অর্জুন চোখ বন্ধ করল। কয়েক মুহূর্ত নিস্তব্ধতার পর নিজের ছুরি বের করে কাঁধে আলতো কেটে দিল। রক্ত টপটপ করে পড়ে চাবির বৃত্তের ওপরে। মুহূর্তের মধ্যে বৃত্তের প্রতীকগুলো জ্বলে উঠল আগুনের মতো।

ঘরটা কেঁপে উঠল। দেওয়ালের ভেতর থেকে লুকোনো দরজা সরে গিয়ে দেখা দিল এক গোপন সুড়ঙ্গ। ভেতরে অন্ধকার, কিন্তু শেষে সোনালি আলো ঝলমল করছে।

অর্জুন রক্তিমের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। “এখন বুঝেছ? রক্তের দাম দিয়েই সত্যি পথ খোলা যায়।”

রক্তিম নির্বাক দাঁড়িয়ে রইল। তার ভেতর দ্বন্দ্ব—সে কি অর্জুনকে ভরসা করবে, নাকি এই সবই এক মারাত্মক প্রতারণা?

সেই সময় অদ্ভুত কিছু ঘটল। চাবির বৃত্ত হঠাৎ করে দু’টুকরো হয়ে গেল। এক অংশ রক্তিমের হাতে, আরেক অংশ অর্জুনের হাতে। আলো দু’জনকে আলাদা পথে টেনে নিচ্ছে।

পাহারাদারদের নেতা ভয়ঙ্কর হাসিতে বলল, “এখন খেলা শুরু হল সত্যিকারের। সিন্দুক পাবে কেবল একজন। আরেকজন হারিয়ে যাবে মৃত্যুর আঁধারে।”

রক্তিমের বুক কেঁপে উঠল। এ খেলায় বন্ধুত্ব বা সহযোগিতা নেই—এখানে শুধু আত্মত্যাগ আর বিশ্বাসঘাতকতার পরীক্ষা।

তাদের সামনে এখন সেই সিন্দুকের পথে শেষ দৌড় শুরু হতে চলেছে।

পর্ব ৮ : হারানো সময়

সুড়ঙ্গের দু’পাশে দুই আলাদা আলো ছড়িয়ে পড়ছিল—একদিকে সোনালি, অন্যদিকে রক্তিম। রক্তিম আর অর্জুন দাঁড়িয়ে আছে দুই প্রান্তে, হাতে দু’ভাগে ভাগ হয়ে যাওয়া চাবির অংশ। পাহারাদারদের নেতা যেন ছায়ার মতো মিলিয়ে গেল অন্ধকারে, কিন্তু তার শেষ বাক্যটা যেন দেওয়ালের প্রতিধ্বনির মতো বাজতে থাকল—সিন্দুক পাবে কেবল একজন।”

রক্তিম শ্বাস টেনে বলল, “আমরা একসাথে এতদূর এলাম, এখন যদি আমাদের আলাদা করে দেয়, তবে এ খেলা আমাদের দু’জনের জন্যই মৃত্যুর ফাঁদ।”

অর্জুনের চোখে দ্বিধা। সে কপাল থেকে গড়িয়ে পড়া রক্ত মুছে নিল। “কিন্তু নিয়ম ভাঙা যায় না। শশাঙ্ক মুখার্জির রক্তধারাই সিন্দুক খুলতে পারবে। আর সেটা আমি।”

রক্তিমের বুক ধড়ফড় করে উঠল। তার মনে হচ্ছিল সময় যেন ফুরিয়ে আসছে। চারদিকে অদ্ভুত এক টিকটিক শব্দ ভেসে আসছে, যেন অদৃশ্য ঘড়ি বালি ফুরোচ্ছে।

তারা এগিয়ে গেল আলাদা দুই সুড়ঙ্গে। রক্তিমের পথটা আঁকাবাঁকা, দেয়ালে খোদাই করা অদ্ভুত প্রতীক। প্রতীকগুলো দেখতে দেখতে তার মনে হচ্ছিল যেন সময়ের কোলাজ। কখনও মুঘল সৈনিকদের ছবি, কখনও ইংরেজ অফিসার, কখনও আবার এক বালকের মুখ—যেন ইতিহাসের ছিন্ন টুকরোগুলো ভেসে আসছে।

হঠাৎই সে একটা দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। দরজার ওপরে লেখা—যে সময় হারায়, সে-সত্য পায়।”

দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই চারদিকে ঝলমলে ঘড়ি। কিছু বালিঘড়ি, কিছু সূক্ষ্ম যান্ত্রিক ঘড়ি, আবার কিছু সময় মাপার অদ্ভুত যন্ত্র। প্রতিটা ঘড়িই টিকটিক করছে, কিন্তু কাঁটা একসাথে চলছে না। যেন ভিন্ন ভিন্ন যুগের সময় একসাথে এখানে বন্দি।

মাঝখানে একটা বিশাল পাথরের বালিঘড়ি। রক্তিম কাছে গিয়ে দেখল, এর বালি নামছে বিপরীত দিকে—উপর থেকে নিচে নয়, বরং নিচ থেকে ওপরে। তার চোখ শিউরে উঠল।

হঠাৎ পেছনে অর্জুনের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, কিন্তু অদ্ভুতভাবে প্রতিধ্বনির মতো। “রক্তিম… সময়ের এই ফাঁদে পড়ো না। এটা তোমাকে বিভ্রান্ত করার জন্য। সিন্দুকের আসল সূত্র অন্যদিকে।”

রক্তিম দ্বিধায় পড়ল। আয়নায় আগে থেকেই সতর্ক করা হয়েছিল—উত্তরে কণ্ঠ, দক্ষিণে দ্বার, পূর্বে চোখ, পশ্চিমে মৃত্যু।” তাহলে এই ঘড়িগুলো কি কেবল এক মরীচিকা?

সে পাথরের বালিঘড়ির গায়ে হাত রাখতেই সেটা ফেটে গেল। ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো ছোট্ট এক পিতলের বাক্স। বাক্স খুলে সে অবাক হয়ে গেল—ভেতরে একটা অদ্ভুত যন্ত্র, দেখতে আধা ঘড়ি আর আধা কম্পাসের মতো। কাঁটা অস্বাভাবিকভাবে ঘুরছে, আর প্রতিবার ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে গায়ে অক্ষর ফুটে উঠছে।

লেখা হচ্ছিল—সময়ের সীমানা পেরিয়ে যেতে হলে রক্ত নয়, স্মৃতি চাই।”

রক্তিম হতবাক হয়ে গেল। মানে সিন্দুক খোলার আরেক শর্ত আছে—স্মৃতির দাম দিতে হবে।

ঠিক তখনই ঘড়ির টিকটিক শব্দ থেমে গেল। পুরো ঘর অন্ধকারে ঢেকে গেল। রক্তিম নিজের কানে শুনল, যেন তার শৈশবের কণ্ঠ ডাকছে—মায়ের হাসি, বাবার স্নেহভরা স্বর। ধীরে ধীরে সব স্মৃতি ঝাপসা হয়ে আসছে।

সে আঁকড়ে ধরল যন্ত্রটা। মনে হচ্ছিল, এটাই সত্যিকারের পরীক্ষা—যদি সে এগোয়, তবে তার অতীত স্মৃতি হয়তো মুছে যাবে।

অন্যদিকে, অর্জুনের ছায়া যেন ভিন্ন পথ ধরে এগোচ্ছে। দূরে তার কণ্ঠ শোনা গেল, “রক্তিম, সময় হারিয়ে ফেললে তুমি কিছুই থাকবে না। সিন্দুক শুধু আমাকে দেবে উত্তরাধিকার।”

রক্তিম দাঁত চেপে স্থির করল। সে যন্ত্রটা সক্রিয় করল। মুহূর্তেই মনে হলো তার শৈশব, তার প্রথম বই, কলেজ স্ট্রিটের দিনগুলো ধীরে ধীরে কুয়াশায় মিশে যাচ্ছে। চোখে জল চলে এল, কিন্তু হাত ছাড়ল না।

আলো ঝলসে উঠল। সামনে দেখা দিল সিন্দুকের শেষ দ্বার। সময় যেন থমকে দাঁড়াল।

পর্ব ৯ : অগ্নি–পরীক্ষা

সিন্দুকের শেষ দ্বারের সামনে দাঁড়িয়ে রক্তিমের বুক ধড়ফড় করছিল। হাতে ধরা অদ্ভুত যন্ত্রটা এখনও জ্বলজ্বল করছে, আর তার কাঁটা ঘুরছে উল্টো দিকে। মনে হচ্ছিল প্রতিটি ঘূর্ণন তার মনের গভীর থেকে একটা করে স্মৃতি চুরি করে নিচ্ছে। শৈশবের বন্ধু, পরীক্ষার প্রথম দিন, মায়ের মুখ—সব ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। তবু সে দাঁত চেপে এগিয়ে গেল।

দরজার ওপর খোদাই করা অক্ষরগুলো আগুনের মতো জ্বলছে—অগ্নি–পরীক্ষা ছাড়া সত্য মিলবে না।”

অর্জুনও এসে পৌঁছাল সেই দ্বারে। তার কপাল থেকে এখনও রক্ত গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু চোখে জেদ। সে ফিসফিস করে বলল, “এটাই শেষ বাঁক। তুমি যদি দ্বিধা করো, সিন্দুক আমার হবে।”

রক্তিম তাকাল তার দিকে। “তুমি বংশধর হতে পারো, কিন্তু ইতিহাসকে কেবল রক্তে লেখা যায় না। আমি যদি স্মৃতি হারিয়েও যাই, এই পথ আমি শেষ করব।”

দরজা খুলতেই ভেতরে দেখা গেল বিশাল এক হলঘর। চারদিকে অগ্নিশিখা জ্বলছে, যেন আগুনের নদী। মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল সিন্দুক—কালো ধাতব তৈরি, গায়ে খোদাই করা অসংখ্য প্রতীক। আগুনের তাপে বাতাস ভারী, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।

দুই পাশে রাখা আছে দুই পাথরের স্তম্ভ। একটাতে লেখা—রক্ত দিয়ে দাও জীবন, খুলবে দ্বার।” আরেকটাতে—স্মৃতি দিয়ে দাও অতীত, মিলবে সত্য।”

অর্জুন গর্জে উঠল, “আমি রক্ত দিয়েছি! এখন সিন্দুক খুলব আমি।” সে ছুরি তুলে আবার নিজের হাত কেটে রক্ত সিন্দুকের ওপর ছিটিয়ে দিল। মুহূর্তের মধ্যে আগুন আরও তীব্র হয়ে উঠল, কিন্তু সিন্দুক অটল রইল।

রক্তিম কাঁপতে কাঁপতে যন্ত্রটা সিন্দুকের ওপর রাখল। সঙ্গে সঙ্গে যন্ত্রটা অগ্নিশিখার মতো জ্বলে উঠল। কাঁটার ঘূর্ণনে আলো ছড়িয়ে গেল চারদিকে। রক্তিম অনুভব করল তার মনের ভেতর থেকে শেষ স্মৃতিগুলো গলে যাচ্ছে—কলেজ স্ট্রিটে আর্কাইভে খাতাটা খুঁজে পাওয়ার মুহূর্ত, হোস্টেলের ছাদের রাত, এমনকি এই অভিযানের শুরুটুকুও মুছে যাচ্ছে।

কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে সিন্দুকের তালা এক প্রচণ্ড শব্দে খুলে গেল।

অর্জুন হতবাক হয়ে তাকাল। “অসম্ভব! তুমি বংশধর নও, তবু সিন্দুক তোমার কাছে সাড়া দিল?”

সিন্দুক ধীরে ধীরে খোলার সঙ্গে সঙ্গে আগুন স্তিমিত হয়ে এল। ভেতরে ঝলমল করছে সোনা, রত্ন, মুঘল আমলের অলঙ্কার। কিন্তু সবচেয়ে ভেতরে রাখা এক পুঁথি—পুরনো চামড়ায় বাঁধা, পাতাগুলোতে খোদাই করা গোপন লিপি।

রক্তিম হাত বাড়াতেই পুঁথিটা হালকা আলো ছড়িয়ে উঠল। মনে হচ্ছিল যেন ইতিহাসের নিজস্ব কণ্ঠ তাকে ডেকে নিচ্ছে।

অর্জুন রাগে চিৎকার করে উঠল। “না! এটা আমার রক্তের উত্তরাধিকার!” সে রক্তিমের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল।

ঠিক তখনই আগুনের শিখা আবার জেগে উঠল। পাথরের স্তম্ভ থেকে বজ্রধ্বনির মতো আওয়াজ ভেসে এল—অগ্নি–পরীক্ষায় লোভী হারায়, সত্যসন্ধানী বাঁচে।”

অর্জুন শিখার মধ্যে তলিয়ে গেল, তার আর্তচিৎকার ঘরে প্রতিধ্বনিত হল, তারপর স্তব্ধ।

রক্তিম নিস্তব্ধ দাঁড়িয়ে রইল। তার হাতের ভেতর এখন শুধু সেই পুঁথি। সোনা, রত্ন তার চোখে ঝাপসা। কারণ তার স্মৃতি প্রায় সব মুছে গেছে। সে জানে না সে কে, কোথা থেকে এসেছে। শুধু জানে—এই পুঁথির ভেতরে আছে এক অমূল্য সত্য।

সিন্দুক এখন খোলা, কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা সত্যের ওজন বহন করতে পারবে কি একজন মানুষ?

পর্ব ১০ : অন্তিম সিন্দুক

ঘরের ভেতর আগুন নিভে এল ধীরে ধীরে। চারপাশে গুমোট ধোঁয়া আর পোড়া মাটির গন্ধ। বিশাল সিন্দুকটা এখন খোলা, আর তার ভেতরে ঝলমল করছে সোনা–রত্ন, অমূল্য অলঙ্কার। তবু রক্তিমের চোখ সেদিকে স্থির থাকল না। তার দৃষ্টি আটকে রইল সেই প্রাচীন পুঁথির ওপর, যা মৃদু আলো ছড়িয়ে নিজেই যেন নিঃশ্বাস নিচ্ছে।

সে হাত বাড়িয়ে পুঁথিটা তুলে নিল। পাতা খুলতেই অচেনা লিপি ভেসে উঠল—কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে তার চোখে সবকিছু স্পষ্ট হতে লাগল। যেন হারিয়ে যাওয়া স্মৃতির বিনিময়ে সে পেয়েছে ভাষার এই দান।

পাতার ওপরে লেখা ছিল—সিন্দুক কেবল ধনরত্ন নয়, ইতিহাসের আয়না। যে সত্যের জন্য রক্ত ঝরেছে, যে সময় হারিয়েছে মানুষের প্রজন্ম, সবকিছু এখানে অঙ্কিত।”

রক্তিমের বুক কেঁপে উঠল। সোনা–রত্ন হয়তো দামী, কিন্তু এই পুঁথি অমূল্য। এর ভেতরে লেখা আছে জমিদার শশাঙ্ক মুখার্জির প্রকৃত কাহিনি—কীভাবে সে ইংরেজদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেনি, বরং নিজের জীবন দিয়ে রক্ষা করেছিল মুর্শিদাবাদের সাধারণ মানুষকে। কিংবদন্তি ইচ্ছে করেই বিকৃত করা হয়েছিল, যাতে ধনরত্নের সত্য আড়াল থাকে।

কিন্তু এই সত্য প্রকাশ পেলে ইতিহাস নতুনভাবে লেখা হবে।

সে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। চোখের সামনে ঝাপসা—কারণ তার স্মৃতির অনেকটাই হারিয়ে গেছে। সে জানে না তার নাম রক্তিম, সে কোথা থেকে এসেছে। শুধু জানে, তার হাতে এখন এক উত্তরাধিকার—যা কেবল ধনের নয়, মানুষের বিশ্বাসেরও প্রতীক।

ঠিক তখনই ভগ্ন সুড়ঙ্গের ওপার থেকে শোনা গেল কোলাহল। কালো কাপড়ে ঢাকা পাহারাদাররা আবার এগিয়ে আসছে। কিন্তু এবার তাদের চোখে আর রক্তের জ্যোতি নেই, বরং ভয়ের ছায়া। তারা বুঝেছে, সিন্দুকের পরীক্ষা শেষ হয়েছে।

একজন বয়স্ক পাহারাদার মাটিতে নতজানু হয়ে পড়ে বলল, “তুমি বেছে নেওয়া মানুষ। আমাদের প্রজন্ম ধরে যা পাহারা দিয়েছি, তা এখন তোমার হাতে।”

রক্তিম স্তব্ধ দাঁড়িয়ে রইল। তার ঠোঁটে কোনো উত্তর এল না। কেবল মৃদু আলোয় ভিজে থাকা পুঁথিটা বুকের কাছে চেপে ধরল।

ধীরে ধীরে আগুন নিভে গিয়ে ঘরটা ঠান্ডা হয়ে গেল। সিন্দুকের ভেতরে সোনা–রত্ন ঝলমল করছে, কিন্তু কারও দৃষ্টি সেদিকে গেল না। কারণ আসল সিন্দুক তো খুলে গেছে—মনের সিন্দুক, যেখানে সত্য চিরকাল বন্দি ছিল।

রক্তিম সুড়ঙ্গ পেরিয়ে বাইরের আলোয় পা রাখল। ভোর হয়ে এসেছে। সূর্যের প্রথম কিরণ তার মুখে পড়তেই মনে হলো, সে যেন নতুন এক জন্ম পেল।

সে জানে না ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে। হয়তো সে ইতিহাসের এই পুঁথি বিশ্বকে দেবে, হয়তো চিরতরে আড়াল করে রাখবে। কিন্তু একটা সত্য স্পষ্ট—অন্তিম সিন্দুক ধন নয়, বরং সময়ের, স্মৃতির আর আত্মত্যাগের প্রতীক।

পেছনে জমিদারবাড়ির ধ্বংসস্তূপ নীরব দাঁড়িয়ে রইল। যেন সবকিছু আবার মাটির নিচে চাপা পড়ল। কেবল বাতাসে ভেসে এল এক অদৃশ্য কণ্ঠস্বর—
যে সত্য খুঁজে পায়, সে-প্রকৃত ধনবান।”

রক্তিম চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিল। তার মনে আর কোনো ভয় নেই। কেবল আছে সেই আলো, যা আগুনের ভেতর থেকেও বেঁচে উঠেছে।

গল্প এখানেই শেষ, কিন্তু গোপন সিন্দুকের ছায়া চিরকালই থেকে যাবে ইতিহাসের অন্ধকার গলিতে—যেখানে রক্ত, সময় আর স্মৃতির দাম দিয়েই সত্য খুঁজে পাওয়া যায়।

***

WhatsApp-Image-2025-08-19-at-4.58.13-PM.jpeg

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *