অমিয় দাসগুপ্ত
📜 অধ্যায় ১
বীরভূমের বুক চিরে যে সরু মেঠো পথগুলো কুড়ুলগাছ, শিমুলগাছের ছায়ায় মিশে গেছে শূন্যের অতলে, সেই পথে রাতের নিস্তব্ধতায় শুধু শোনা যায় দূরের শিয়ালের ডাক আর ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা সুর। সেদিনের রাত যেন আর পাঁচটা রাতের মতো নয়। পূর্ণিমার আলোয় ভিজে থাকা সেই রাত কেমন এক গা ছমছমে হাওয়ায় কেঁপে উঠছে বারবার। মহলপুরের সেই বিশাল প্রাসাদ—যার উঁচু মিনারগুলো আকাশ ছুঁয়েছে, যার সিংহদ্বারে দু’পাশে পাথরের বাঘ দাঁড়িয়ে আছে মাথা উঁচু করে, যার অন্দরমহলের অজস্র জানালা দিয়ে মৃদু বাতাস ঢুকে পড়ছে, সেই প্রাসাদের মধ্যে জ্বলছে শুধুমাত্র দুটি প্রদীপ। জমিদার অনন্ত নাথ রায় একাকী বসে আছেন দোতলার দক্ষিণ কোণের বিশাল ঘরটিতে, যেখানে দেয়ালের গায়ে সোনা খচিত আলপনার কাজ করা। তার সামনে রয়েছে একটি প্রকান্ড শালগাছের কাঠের টেবিল, যার উপরে রয়েছে অজস্র দলিলপত্র, মানচিত্র, শাস্ত্রগ্রন্থ—কিন্তু অনন্ত নাথের দৃষ্টি সেদিকে নেই। তার দু’চোখ যেন ঘরের অন্ধকারের দিকে স্থির হয়ে আছে, সেই অন্ধকারের মধ্যে লুকিয়ে থাকা এক যন্ত্রণার দিকে, যা কেবল তিনিই জানেন। তার লম্বা দাড়ি, গায়ে জড়ানো মলিন রেশমের চাদর, কপালে ভাঁজ আর দুটি চোখে বেদনার গভীর ছায়া—সব মিলিয়ে তিনি যেন এই নিস্তব্ধ প্রাসাদের এক জীবন্ত প্রেতাত্মা। দেওয়ালে ঝোলানো বংশমালার ছবিগুলোও যেন সেই রাতে অন্যরকম নিঃশব্দে তাকিয়ে রয়েছে তার দিকে। বাইরে ছাদের কিনারা বেয়ে বৃষ্টি পড়ছে টপটপ করে, হাওয়ার দাপটে জানালার পাল্লা খচমচ শব্দে কাঁপছে। অনন্ত নাথ চুপচাপ বসে আছেন, তার মনে কেবল এক প্রশ্ন—এমন পরিণতি তারই বা কেন, তার বংশেরই বা কেন? এত ধন-সম্পদ, এত প্রতিপত্তি, অথচ জীবনের একমাত্র স্বপ্ন—একটি সন্তান, একটিমাত্র উত্তরাধিকারী—সেই আশাটুকু যেন প্রতিবার ঈশ্বর তাকে ফিরিয়ে দিচ্ছেন।
দীর্ঘ পনেরো বছরের দাম্পত্য জীবনে তিনি এবং রানীমা ভানুমতী দেবী অনেক আশা করেছিলেন, বহু মন্দিরে মানত করেছিলেন, অসংখ্য পুরোহিতের পুজো দিয়েছিলেন, বহু নদীতে স্নান করেছেন, কত তান্ত্রিকের কাছে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন—কিন্তু সব বৃথা। অমাবস্যার রাতগুলো তার কাছে হয়ে উঠেছে অভিশপ্ত; সে রাতগুলোতে তিনি শূন্য প্রাসাদে বসে থাকেন, জানালার ফাঁক দিয়ে রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন আর ভাবেন, সত্যিই কি তার বংশ শেষ হতে চলেছে? তার মনে পড়ে সেই প্রাচীন গোপন শাপের কথা, যা নাকি এককালে তার পূর্বপুরুষের করা অন্যায়ের জন্য এই বংশকে দেওয়া হয়েছিল। কথিত আছে, মহলপুরের তৎকালীন রাজা এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারকে অন্যায়ভাবে হত্যা করেছিলেন, সেই অপরাধের শাস্তিস্বরূপ তাদের বংশে এক সময় এসে উত্তরাধিকার রোধ হয়ে যাবে। অনন্ত নাথের ঠাকুর্দা ছিলেন নিঃসন্তান, তার পিতা একমাত্র সন্তান ছিলেন, আর এখন অনন্ত নাথ—সন্তানহীন। কতবার নিজের ভেতর থেকে ঈশ্বরকে প্রশ্ন করেছেন তিনি—পাপ যদি পূর্বপুরুষের হয়, শাস্তি কেন তাকে ভোগ করতে হবে? কিন্তু জবাব মেলেনি। প্রাসাদের প্রতিটি ঘর যেন তার এই দুঃখের সঙ্গী; অন্দরমহলের দেওয়ালগুলো, রানীর সাজঘরের আয়নাটা, লোহার সিন্দুকগুলো, এমনকি সিংহদ্বারের বাঘগুলোও যেন তার নীরব কান্না শুনেছে অজস্রবার। রাত যত গভীর হয়, তার দেহের রক্ত যেন আরও ভারী হয়ে ওঠে, তার শিরা-উপশিরায় বেদনার বিষ ঢুকে পড়ে। অশান্ত অন্তর শান্ত করতে তিনি হাত বাড়িয়ে নেন তার পুরনো হুকোটার দিকে, নিঃশ্বাসে টেনে নেন তামাকের ধোঁয়া। সেই ধোঁয়ার ঘূর্ণিতে তিনি হারিয়ে যেতে চান, ভুলে যেতে চান তার নিঃসঙ্গতা, তার ব্যর্থতা। কিন্তু এই নিশুতি রাতের অন্ধকার তাকে ক্রমশ আরও গিলে ফেলতে থাকে।
প্রাসাদের বাইরে দূরের শ্মশানঘাট থেকে ভেসে আসছে এক আশ্চর্য ভৌতিক সুর। অনন্ত নাথ চমকে ওঠেন। কানে এ সুর নতুন নয়; তিনি বহুবার এ সুর শুনেছেন, কিন্তু আজকের মতো এত গভীর আর বিভীষিকাময় মনে হয়নি। বৃষ্টি তখন কিছুটা থেমে এসেছে, কিন্তু বাতাসে বয়ে আসছে শ্মশানভূমির সেই অদ্ভুত গন্ধ, যা মৃতদেহ পোড়ানোর পর রাতের হাওয়ায় ভেসে বেড়ায়। এমন সময় অন্ধকার ঘরের এক প্রান্তে থাকা বড় পিতলের ঘড়িটি টুং টুং শব্দে বারোটার সময় ঘোষণা করল। রাতের এই মুহূর্তে প্রাসাদের প্রায় সকলেই নিদ্রামগ্ন, শুধুমাত্র বাইরে পাহারারত কিছু প্রহরী আর কুকুরগুলোর দূরের ঘেউ ঘেউ ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। অনন্ত নাথ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন, জানালার দিকে এগোলেন। শীতল বাতাস জানালার ফাঁক গলে তার মুখে এসে লাগল। তার দৃষ্টি দূরের শ্মশানঘাটের দিকে; সেখানে মৃদু আগুনের আলো জ্বলছে, আর আগুনের চারপাশে ছায়ামূর্তিরা নড়ছে চড়ছে। অনন্ত নাথের বুকের মধ্যে ধুকপুকানি বেড়ে যায়। তার মনে পড়ে যায় সেই পুরোহিতের কথা, যে একবার বলেছিল—”রাত্রি দ্বাদশ প্রহরে শ্মশান ঘাটে ভৌতিক শক্তি জাগে, সে শক্তি সন্তানের আশায় কাতর হৃদয়কে ফাঁদে ফেলে। হুঁশিয়ার থাকবেন জমিদার বাবু।” কিন্তু এতদিন পর এই নিস্তব্ধ রাত্রে সেই কথাগুলো যেন নতুন করে ভয় ধরিয়ে দেয় তার হৃদয়ে। তিনি জানালার গরাদের ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন, শ্মশানের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন, মনে মনে ভাবতে থাকেন—সেই অশরীরী শক্তি কি সত্যিই তার দিকে এগিয়ে আসছে? সেই রাতের নিস্তব্ধতা কেটে যায় না, প্রতিটি মুহূর্ত যেন তার বুকে পাথরের মতো ভারী হয়ে বসে থাকে।
ঠিক তখনই হঠাৎ বিদ্যুতের ঝলকানিতে মুহূর্তের জন্য শ্মশানঘাটের এক কোণে তিনি দেখতে পান এক শাড়িপরা নারীকে—তার সাদা মুখ আর লাল লাল চোখের দৃষ্টি যেন ঠিক তারই দিকে তাকিয়ে আছে। অনন্ত নাথের রক্ত হিম হয়ে যায়। সেই নারীর মুখে হাসির মতো কিছু একটার আভাস, যা বৃষ্টির ফোঁটার মতো শীতল আর ভয়ংকর। নারীর গলার লম্বা নেকলেসের মধ্যে এক আশ্চর্য লাল পাথর চকচক করছে, যা বিদ্যুতের আলোয় রক্তের মতো লাল দেখায়। অনন্ত নাথ জানালার পাল্লা এক ধাক্কায় বন্ধ করে দেন, পিছিয়ে আসেন ভেতরের অন্ধকারে। তার নিঃশ্বাস যেন গলায় আটকে আসে, বুকের ভেতর ঢিপঢিপ করতে থাকে হৃদয়। তিনি জানেন না, এই নারী কে? এই নারী কি মানুষের রক্তমাংসের নারী, নাকি সেই পুরনো অভিশাপের রূপ? এই নারী কি সত্যিই তার সন্তানের আশায় পাগল হৃদয়ের সামনে এক ফাঁদ পেতে বসেছে? নাকি তার মনের কল্পনা? রাত তখন আরও গভীর হয়, বৃষ্টি ফের শুরু হয়, আর অনন্ত নাথ দোতলার ঘরের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকেন—ভীত, কিংকর্তব্যবিমূঢ়, আর নিঃসঙ্গ, তার অভিশপ্ত ভাগ্য আর অজানা কালোতিমায়া ভবিষ্যতের দ্বারপ্রান্তে।
📜 অধ্যায় ২
সে রাতটা বীরভূমের ইতিহাসে এক রহস্যময় রাত হিসেবে বেঁচে থাকবে, যদি কেউ সত্যিই সেই রাতের প্রতিটি ঘটনার সাক্ষী হতে পারত। অমাবস্যার ঘন অন্ধকার আকাশে চাঁদের কোনো চিহ্ন নেই, আকাশজোড়া মেঘ, আর তার ফাঁক দিয়ে মাঝে মাঝে বিদ্যুতের চমক যেন অদৃশ্য দানবের নখের আঁচড় এঁকে দিয়ে যাচ্ছে। জমিদার অনন্ত নাথ রায় সেই রাতে প্রাসাদের অন্দরমহল থেকে বেরিয়ে এলেন এক অজানা টানে, বুকের মধ্যে এক তীব্র ব্যথা আর অশান্তি নিয়ে। তার পা যেন আপনমনে চলতে থাকে, মনে হচ্ছিল কারো ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি শ্মশানের পথ ধরেছেন। মেঠো পথের দুই পাশে অন্ধকারে মিশে থাকা শাল, মহুয়া, বট আর অশ্বত্থ গাছের ছায়াগুলো রাতের বাতাসে নড়ছে, আর গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে অদ্ভুত এক ছায়া যেন তাকে অনুসরণ করছে। দূরে শ্মশানঘাটের আগুনের জ্বলজ্বলানি আর ধোঁয়ার কুণ্ডলী অন্ধকার আকাশের দিকে উঠছে, আর বাতাসে ভেসে আসছে পোড়া চন্দনের, ঘৃতের আর দেহের মিশ্র গন্ধ, যা এক সময় মানুষের মনকে শিহরিত করে। অনন্ত নাথের মাথায় ঘুরছিল হাজার প্রশ্ন—কেন তিনি যাচ্ছেন এই অভিশপ্ত স্থানে? কে টানছে তাকে? সেই অজানা নারীর মুখ কি তিনি দেখতে পেয়েছিলেন জানালার ফাঁক দিয়ে? নাকি সেই মুখ তার কল্পনারই ফল? কিন্তু প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি অনুভব করলেন, কোনো এক অদৃশ্য হাত যেন তাকে শ্মশানের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। তার সঙ্গী কেবল বাতাসের হাহাকার আর তার নিজের হৃদয়ের ক্রমবর্ধমান ধুকপুকানি।
শ্মশানঘাটের কাছাকাছি পৌঁছেই তিনি বুঝলেন, এই স্থান আগের মতো নেই। আজ রাতের শ্মশান যেন আরও ভয়ঙ্কর, আরও রহস্যময়। শ্মশান ঘাটে পোড়ানো হচ্ছে এক মৃতদেহ, যার চিতা থেকে লালচে আগুনের শিখা আকাশ স্পর্শ করার চেষ্টা করছে। চারপাশে ছায়ার মতো ঘুরছে কয়েকজন শ্মশানবাসী, যাদের চোখে মুখে ক্লান্তি, ভয়, আর অলৌকিকতার আতঙ্ক। অনন্ত নাথ দাঁড়িয়ে পড়লেন দূরে এক বটগাছের ছায়ায়। সেই সময় বিদ্যুতের ঝলকানি তার চারপাশকে আলোকিত করে ফেলল আর ঠিক তখনই তিনি দেখলেন সেই নারীকে—যে নারী একা বসে আছে শ্মশানের এক কোণে, অর্ধেক আলোর আর অর্ধেক অন্ধকারের মধ্যে। তার পরনে সবুজ-ধূসর শাড়ি, যার আঁচল মাটিতে লেপ্টে আছে। মাথার চুল লম্বা, প্রায় কোমর ছুঁয়ে যাচ্ছে, সেই চুলের ভেতর থেকে মাঝে মাঝে বিদ্যুতের আলোয় চকচক করছে তার লাল চোখের দৃষ্টি। সেই নারী আস্তে আস্তে মুখ তুলে অনন্ত নাথের দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টি যেন তার অন্তরাত্মা পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিল। নারী হাসল—একটা নিঃশব্দ, অদ্ভুত হাসি, যার মধ্যে লুকিয়ে আছে মায়া, যন্ত্রণা আর শয়তানি। বাতাস থমকে গেল, শ্মশানের সমস্ত শব্দ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। জমিদার অনুভব করলেন, তার দেহ যেন জমে গেছে, পা সরছে না, চোখ ফেরাতে পারছেন না। নারী ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল, যেন মাটির ওপর ভেসে আসছে তার পা, সেই পায়ের নূপুর বেজে উঠল অদ্ভুত সুরে—যা না শোনা যায়, না উপেক্ষা করা যায়। সে এগিয়ে এলো অনন্ত নাথের দিকে, আর তার ঠোঁটের কোণে সেই একই রহস্যময় হাসি।
নারী যখন একেবারে কাছে চলে এল, তখন অনন্ত নাথ দেখলেন তার মুখ—মসৃণ শীতল, অদ্ভুত সুন্দর কিন্তু ভয়ংকর। চোখের পাতা নড়ছে না, চোখের তারা লাল, আর সেই চোখে যেন আগুনের লেলিহান শিখা। সে স্বরলিপির মতো মিষ্টি কণ্ঠে বলল—“অনন্ত নাথ রায়, তুমি কি চাও না তোমার বংশের প্রদীপ জ্বলে উঠুক? তুমি কি চাও না, তোমার রক্তে জন্ম নিক উত্তরাধিকার?” অনন্ত নাথ স্তব্ধ হয়ে শুনলেন। নারীর কথা শুনে তার বুক কেঁপে উঠল। কতদিন ধরে তিনি এই কথা শুনতে চেয়েছেন! কিন্তু এই নারী? কে সে? কোথা থেকে সে তার মনের গভীর বাসনা জানল? নারী আরেক পা এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল—“আমি তোমাকে সন্তান দেবো, এমন সন্তান যা তোমার বংশকে অমর করবে। কিন্তু মনে রেখো, শর্ত থাকবে। সেই সন্তান যখন দ্বাদশ বসন্তের ফুল ফোটাবে, তখন তাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। কারণ সে হবে আমার সন্তানও, তোমার মতো। তুমি রাজি তো?” অনন্ত নাথের শরীর শীতল হয়ে গেল। মাথার ভেতর ঝড় বয়ে গেল। সে কি উত্তর দেবে? একদিকে বংশের আশার আলো, অন্যদিকে এই অজানা অন্ধকার চুক্তি! কিন্তু মনের এক কোনায় লুকিয়ে থাকা পিতা হবার আকাঙ্ক্ষা যেন তার সমস্ত ভয়কে গ্রাস করে নিল। বিদ্যুতের ঝলকে আর একবার নারীকে দেখলেন অনন্ত নাথ—সে যেন রাতের অন্ধকারেরই রূপ, সেই অন্ধকার থেকে উঠে আসা অভিশাপ, অথচ সেই অন্ধকারের ভেতরেই তার বংশ রক্ষার প্রদীপ। তার মুখ দিয়ে শব্দ বেরোল—“আমি রাজি।”
সেই মুহূর্তে বাতাস হুহু করে বয়ে উঠল, শ্মশানের আগুন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল, আর নারী ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল অন্ধকারের মধ্যে। শুধু তার কণ্ঠস্বর বাতাসে ভেসে রইল—“বংশ বাঁচাবে তোমার ত্যাগ। মনে রেখো শর্ত!” অনন্ত নাথ সেখানে দাঁড়িয়ে রইলেন, একাকী, শ্মশানের চিতার তাপে, বৃষ্টির ফোঁটার আঘাতে আর নিজের বুকের ভেতর তোলপাড় করা অনুভূতিতে। রাত তার শেষ প্রান্তে পৌঁছাল, কিন্তু অনন্ত নাথ জানলেন, তার জীবন নতুন এক অভিশপ্ত অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। সেই রাতে শ্মশান আর প্রাসাদের মাঝের পথ ধরে ফিরে গেলেন তিনি, পায়ের শব্দে শ্মশানবাসীদের ঘুম ভাঙল না, কেবল বৃষ্টির শব্দে লুকিয়ে গেল তার নিশীথ যাত্রার ইতিহাস। তিনি জানলেন না, কতো বড়ো অন্ধকার তার দিকে এগিয়ে আসছে।
📜 অধ্যায় ৩
প্রাসাদের চতুর্দিকের অন্ধকার যেন হঠাৎ করে এক নতুন জীবনের আশায় উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সেই রাতে শ্মশানঘাট থেকে ফিরে আসার পর জমিদার অনন্ত নাথ রায় নিঃশব্দে অন্দরমহলের মধ্যে ঢুকে পড়েছিলেন। তার চোখে মুখে ছিল এক অদ্ভুত অস্থিরতা, হৃদয়ে মিশ্র অনুভূতির ঝড়। বাইরে তখন রাত শেষের দিকে, পাখিরা ডাকছে, আকাশের কোণে জ্যোৎস্নার ফিকে আলো পড়ছে। অনন্ত নাথের পা যেন আর চলছিল না, মাথা ভারি হয়ে আসছিল, বুকের ভেতর কেবলই ধুকপুকানি। সেই ভয়ংকর চুক্তির কথা তার মাথার মধ্যে বারবার ঘুরপাক খাচ্ছিল, আর সেই রহস্যময়ীর লাল চোখের দৃষ্টি যেন শীতল ছুরি হয়ে তার মনের গভীরে বিঁধে যাচ্ছিল। কিন্তু তবু, সেই শর্তের পেছনে যে স্বপ্ন, যে বাসনা—একটি সন্তান পাওয়ার আশার আলো—তা যেন সমস্ত ভয়কে ঢেকে দিচ্ছিল। রানীমা ভানুমতী তখন ঘুমোচ্ছিলেন, মুখে শান্তির ছাপ। তার নিঃশ্বাস ওঠানামা করছে ধীরে ধীরে, যেন এক গভীর নির্ভরতার ছন্দে। অনন্ত নাথ দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকলেন, অশ্রুসজল চোখে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রইলেন। এতদিন ধরে এই মুখটি কেবল সন্তানহীনতার যন্ত্রণায় কাতর হয়ে এসেছে। আজ কি তবে সেই অন্ধকার ঘুচবে? তার অন্তর যেন একসঙ্গে আনন্দ আর আতঙ্কে কেঁপে উঠল।
দিন পেরোল। অমাবস্যার সেই রাতের পর অদ্ভুতভাবে প্রাসাদের বাতাসে যেন এক অজানা সুর ভেসে বেড়াতে লাগল। কয়েকদিনের মধ্যে ভানুমতী দেবীর মধ্যে দেখা দিল শারীরিক পরিবর্তন। প্রথমে তিনি নিজেই বুঝতে পারেননি; মাঝে মাঝে ক্লান্তি আসত, হালকা মাথা ঘোরা, ভোজনের অরুচি, বুক ধড়ফড়। মহলে সেবিকা মহিলারা ফিসফিস করে কথাবার্তা বলতে শুরু করল—”দেবীর কপালে কি তবে আশার আলো জ্বলল?” ডাক পড়ল রাজবৈদ্যের। বৈদ্য এলেন, কপালে হাত রাখলেন, নাড়ি দেখলেন, চোখ মুছলেন, তারপর অবশেষে মৃদু হেসে বললেন—“দেবীর গর্ভে দেবদূতের আগমন হয়েছে।” সেই কথা শুনে প্রাসাদের অন্দরের বাতাস যেন আনন্দে কেঁপে উঠল। চুড়ির শব্দ, শঙ্খের ধ্বনি, সেবিকা আর দাসীদের মুখে হাসির ঝিলিক ছড়িয়ে পড়ল। ভানুমতী দেবী বিস্ময়ে নিজের কপালে হাত রাখলেন, চোখের জল গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে। অনন্ত নাথ সেই সময় দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন, মুখে এক অনুচ্চারিত ভয়ের ছায়া, কিন্তু চোখে সন্তানের আশায় তৃষ্ণার্ত এক দীপ্তি। প্রাসাদজুড়ে শুরু হল মঙ্গলাচরণ, মানত দেওয়ার আয়োজন, পুজো, উপোস আর নানা রীতির পালা। বীরভূমের প্রজারা পর্যন্ত এ খবরে আনন্দিত হল। এতদিনে জমিদার বংশে আসছে উত্তরাধিকারী! কিন্তু কেবল অনন্ত নাথ জানতেন, এই আনন্দের ছায়ায় লুকিয়ে রয়েছে সেই শ্মশানঘাটের অভিশপ্ত শর্ত, সেই রাতের অদৃশ্য ফাঁস।
ভানুমতীর গর্ভাবস্থার দিনগুলো পেরোতে লাগল ধীরে ধীরে। আকাশে ঋতুর পালাবদল ঘটল, বৃষ্টি এলো, শীত এলো, আবার বসন্তের কুন্তল বাতাস বইল। প্রাসাদের অন্দরমহল যেন বেঁচে উঠল। ভানুমতীর গর্ভে বেড়ে উঠল সেই সন্তান, যে হবে বংশের প্রদীপ, যে হবে প্রাসাদের গর্ব। রানীমা তার প্রতিটি মুহূর্তে সন্তানের স্বপ্নে বিভোর থাকতেন। তিনি নিজের হাতে বুনতেন সন্তানের পোশাক, সোনার চুড়ি গড়াতেন সোনারকারদের দিয়ে। আঙিনায় বেলগাছের নিচে বসে কাঁথা সেলাই করতেন আর ভবিষ্যতের কথা ভাবতেন। অনন্ত নাথ মাঝে মাঝে চুপিচুপি সেই দৃশ্য দেখতেন আর অজানা আশঙ্কায় শিউরে উঠতেন। মাঝে মাঝে রাতের বেলা শ্মশানঘাটের দিকে তাকিয়ে তিনি যেন অনুভব করতেন সেই রহস্যময়ী নারীর ছায়া দূর থেকে প্রাসাদের দিকে চেয়ে আছে, তার শর্ত স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে নীরবে। কিন্তু সেই শর্তের কথা স্ত্রীর কাছে প্রকাশ করতে পারলেন না তিনি। তার হৃদয় দ্বিধায় জর্জরিত হল—একদিকে পিতৃত্বের আনন্দ, অন্যদিকে ডাকিনীর শর্তের অভিশাপ। এই অন্তর্দ্বন্দ্বের মাঝেই দিনগুলো কেটে যেতে লাগল। প্রাসাদের চারপাশে আকাশে পাখিদের উড়ান, মহলের প্রাচীন তুলসীতলার মোমবাতির আলো, সেবিকাদের হাসি, রানীমার মুখের প্রশান্তি—সব কিছু যেন সেই অভিশপ্ত রাতে করা চুক্তিকে মুহূর্তে ভুলিয়ে দিতে চাইল, কিন্তু তা সম্ভব হল না।
অবশেষে সেই দিন এলো। বীরভূমের আকাশে সূর্য উদিত হল এক সোনালি আভায় ভেসে থাকা সকালে। বায়ুতে মাদারের ফুলের গন্ধ, আঙিনায় গঙ্গাজলের ছিটে, আর মহলের নারীদের শঙ্খের ধ্বনি যেন এক মহাজাগতিক বার্তা বয়ে আনল। ভানুমতীর প্রসববেদনা শুরু হল। সেবিকা আর ধাত্রীদের ছুটোছুটি, রাজবৈদ্যের নিত্যপ্রয়াস, প্রাসাদের বাইরে প্রজাদের জটলা—সব মিলিয়ে এক উত্তেজনার আবহ। অনন্ত নাথ অন্দরের ঘরের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে প্রার্থনা করতে লাগলেন। তার চোখ বন্ধ, কপালে চন্দনের ফোঁটা ঘামে মিশে গিয়ে গড়িয়ে পড়ছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর শোনা গেল এক নবজাতকের প্রথম কান্নার শব্দ। সেই শব্দ যেন আকাশ ভেদ করে পৌঁছে গেল মহাকাশের দেবলোক পর্যন্ত। জমিদারের বুকের ভেতর এক অদ্ভুত অনুভূতি হলো—যেন হৃদয়ের সব শূন্যতা পূর্ণ হল সেই কান্নার ধ্বনিতে। ভানুমতী কাঁপা হাতে সন্তানের মুখে হাত বোলালেন, তার চোখের কোণে আনন্দের অশ্রু। শিশুটি যেন প্রথমেই তার মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসল। প্রাসাদজুড়ে মঙ্গলধ্বনি উঠল। কিন্তু অনন্ত নাথের বুকের ভেতর আনন্দের সঙ্গে সঙ্গে ভয়ের কাঁপুনি বয়ে গেল—কারণ তার মন জানে, এই সন্তান শুধু তার নয়, এই সন্তানের জন্ম অলৌকিক শর্তের বন্ধনে বাঁধা। শ্মশানঘাটের অন্ধকার, সেই নারীর লাল চোখের দৃষ্টি, সেই শর্ত—সব যেন একসঙ্গে তার মনে ফিরে এলো। আর সেই মুহূর্তেই শপথ নিলেন অনন্ত নাথ—যে করেই হোক তিনি তার সন্তানকে রক্ষা করবেন, ডাকিনীর শর্ত পূর্ণ হতে দেবেন না।
📜 অধ্যায় ৪
প্রাসাদের প্রাচীন দেওয়ালগুলো বহু শতাব্দীর ইতিহাসের সাক্ষী থেকেছে, কিন্তু সেদিন সেই দেওয়ালগুলো যেন প্রথমবার এক নবজাতকের কান্নায় কেঁপে উঠল। বীরভূমের আকাশে তখন ভোরের আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে। মৃদু বাতাসে বকুল আর শিমুল ফুলের মিশ্র সুগন্ধ ভেসে আসছে দূরের বন থেকে। প্রাসাদের আঙিনায়, শঙ্খ, কাঁসর আর মৃদু ঢাকের শব্দে মিলিয়ে যাচ্ছে নবজাতকের কান্নার আওয়াজ। মহলের নারীরা কপালে হাত ঠেকিয়ে ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছেন। অনন্ত নাথ প্রাসাদের দক্ষিণ প্রান্তের ছোট্ট মন্দিরে মাথা নত করে বসে আছেন, চোখ বুজে কপালে চন্দনের ফোঁটার নিচে ঘামের ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে। মনের গভীরে এক অদ্ভুত শান্তি, সন্তানের জন্মের পর বহুদিনের আশা পূরণের প্রশান্তি, অথচ সেই শান্তির নিচে লুকিয়ে রয়েছে এক অমোঘ আশঙ্কা। তিনি জানেন এই শিশুর জন্ম যেমন আশীর্বাদ, তেমনি সেই অমাবস্যার রাতে করা চুক্তির এক অমোঘ পরিণতি। রানীমা ভানুমতী তখন নিজের কোলের দিকে চেয়ে আছেন। নবজাতক বিজয় নাথ এক আশ্চর্য মুগ্ধতায় তার দিকে চেয়ে আছে। শিশুর চোখে অদ্ভুত এক দীপ্তি, যা যেন সদ্যোজাতের চোখে থাকার কথা নয়—সেই দৃষ্টি মায়ের হৃদয়ে আনন্দের পাশাপাশি এক অজানা শিহরণ জাগিয়ে তুলল। বিজয় নাথের হাত-পা মেলছে ধীরে ধীরে, যেন সে নতুন পৃথিবীকে ছুঁয়ে দেখছে। ঘরে প্রবেশ করা সূর্যের প্রথম আলো শিশুর মুখে পড়ল, আর সেই মুখ যেন কেমন এক রহস্যময় আভায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল।
প্রাসাদজুড়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলল বিজয়ের জন্মোৎসব। দূরদূরান্তের জোতদার, মহাজন, ব্রাহ্মণ, বৈদ্যরা উপহার নিয়ে এলেন। আঙিনায় ঢাকঢোলের আওয়াজে মিশে গেল মহলের প্রাচীন প্রার্থনার সুর। গাঁয়ের মানুষ, প্রজারা প্রাসাদের বাইরে জড়ো হল, যেন তাদেরও এই বংশরক্ষার মহোৎসবে ভাগ আছে। রাজবৈদ্য বললেন, শিশুর স্বাস্থ্য আশ্চর্য ভালো, এমন প্রাণবন্ত শিশু তিনি বহু বছর দেখেননি। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে বিজয়ের চোখের দীপ্তি নিয়ে সকলেই বিস্মিত হল। শিশুর চাহনি গভীর, কখনও কখনও সেই চোখে এমন এক চাহনি দেখা যেত যা দেখে অনেকে চমকে উঠত। সেবিকারা ফিসফিস করে বলত—”এই ছেলে বড়ো হয়ে নিশ্চয়ই কোনো দেবশক্তি হবে।” কিন্তু অনন্ত নাথ জানতেন, সেই চোখের দীপ্তি কেবল আশীর্বাদ নয়, সেই দীপ্তিতে লুকিয়ে আছে শ্মশানঘাটের সেই অমাবস্যা রাতের চুক্তির ছায়া। বিজয় নাথের ছোট ছোট হাত মুঠো করে কখনও আকাশের দিকে ওঠাত, কখনও শূন্যের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসি দিত—যা সাধারণ শিশুর জন্য অস্বাভাবিক। রাতে সে হঠাৎ জেগে উঠে অজানা ভাষায় কিছু বলে যেত, যা শুনে সেবিকারা কপালে হাত ঠেকাত। এমনকি একবার ভোররাতে প্রাসাদের দরজা খোলা অবস্থায় তাকে আঙিনার তুলসী গাছের তলায় পাওয়া গেল, যখন সবার ধারণা ছিল সে রানীমার কোলেই রয়েছে। সেই রাতের পর থেকে প্রাসাদে এক অলিখিত আতঙ্কের বাতাবরণ তৈরি হতে লাগল, যা কারও মুখে প্রকাশ পায়নি, কিন্তু সকলেই অনুভব করেছিল।
বিজয় নাথের শৈশব শুরু হল। সে বড় হতে লাগল, তার মুখে হাসি ফুটতে লাগল, আর প্রাসাদে যেন নতুন প্রাণের সঞ্চার হল। ভানুমতীর মুখে মাতৃত্বের তৃপ্তি, বিজয়ের প্রতিটি আচরণে তার মুখে আশার আলো। কিন্তু বিজয়ের বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার মধ্যে কিছু অদ্ভুত লক্ষণ স্পষ্ট হতে শুরু করল। সে দিনের বেলায় খুব শান্ত, কিন্তু রাতের বেলা তার চোখে সেই প্রাচীন দীপ্তি যেন আরও স্পষ্ট হত। একা একা সে অজানা দিকে তাকিয়ে থাকত, বা মাটিতে আঙুল দিয়ে বৃত্ত আঁকত, মাঝে মাঝে অজানা ভাষায় বকবক করত। ভৃত্য রাতুল একবার রাতের বেলা দেখেছিল বিজয় দক্ষিণ দিকের জানালার দিকে তাকিয়ে হাত তুলে কিছু বলতে বলতে মৃদু হাসছে। রাতুল ভয়ে চমকে গিয়ে সেই কথা কাউকে বলতে সাহস পায়নি। বিজয়ের জন্মের পর থেকে প্রাসাদের দক্ষিণ-পূর্ব কোণের শালবনের দিকে রাতের বেলা অদ্ভুত আলো দেখা যেত। মাঝে মাঝে শ্মশানঘাটের দিক থেকে ভেসে আসত অদ্ভুত ডামডোল আর কুকুরের হাহাকার। অনন্ত নাথের বুকের ভেতর ক্রমেই ভয় জমতে থাকল, তিনি রাত্রে ছাদে উঠে দূরের শ্মশানঘাটের দিকে তাকিয়ে থাকতেন আর সেই নারীর মুখ মনে করার চেষ্টা করতেন। তিনি জানতেন, সময় এগিয়ে চলেছে, আর বিজয় প্রতিদিন একদিন করে কাছাকাছি যাচ্ছে সেই অভিশপ্ত দ্বাদশ বর্ষের দিকে।
কিন্তু তবু, প্রতিটি দিন প্রাসাদের জন্য এক নবজীবনের প্রতীক ছিল। বিজয়ের জন্মের পর প্রজারা আশার আলো দেখেছিল। গ্রামের মন্দিরে নিয়মিত পুজো, রাজবৈদ্যের নতুন চিকিৎসা আয়োজন, সোনারকারদের ব্যস্ততা—সব কিছু বিজয়কে কেন্দ্র করে ঘুরপাক খেতে থাকল। অনন্ত নাথও সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি পুত্রের জন্য সমস্ত আয়োজন করে দেবেন। প্রাসাদের পাঠশালায় শিক্ষক নিযুক্ত হলেন, বিজয়ের জন্য বাল্যবন্ধুদের ডাক পড়ল, সে যেন স্বাভাবিক জীবন পায়। কিন্তু বিজয়ের চোখের সেই দীপ্তি, তার আচরণের মধ্যে লুকিয়ে থাকা অলৌকিকতার ছাপ ক্রমেই অনন্ত নাথকে অশান্ত করে তুলল। তিনি দিনের বেলা বিজয়ের হাসিমুখের দিকে তাকিয়ে হৃদয় শান্ত রাখার চেষ্টা করতেন, কিন্তু রাতের বেলা সেই চোখের অদ্ভুত দীপ্তি যেন তার বুকের মধ্যে শীতল স্রোতের মতো বয়ে যেত। শ্মশানঘাটের সেই রাত, সেই চুক্তি, সেই লাল চোখের ডাকিনী—সব স্মৃতি রাতের আঁধারে ফিরে ফিরে আসত। আর অনন্ত নাথ প্রতিটি রাত শেষে মনে মনে প্রার্থনা করতেন, “হে ঈশ্বর, আমাকে শক্তি দাও, যাতে আমি আমার সন্তানকে এই অভিশাপ থেকে রক্ষা করতে পারি।”
📜 অধ্যায় ৫
প্রাসাদের আঙিনায় মাধবীলতার লতা জড়িয়ে ধরেছে প্রাচীরের গা, আর তুলসীতলার দীপশিখা প্রতিটি সন্ধ্যায় যেন বিজয়ের শৈশবকে আশীর্বাদ করে তুলছিল। বিজয় নাথ প্রাসাদের প্রাণ হয়ে উঠেছিল, কিন্তু তার শৈশবের প্রতিটি পদক্ষেপে মিশে ছিল এক অজানা অস্থিরতা, যা কেবল অনন্ত নাথ আর কয়েকজন কাছের মানুষই উপলব্ধি করতেন। বিজয় ছিল চঞ্চল, বুদ্ধিমান, অসম্ভব মিষ্টি স্বভাবের; তার হাসিতে প্রাণ পেত রানীমা ভানুমতী আর প্রাসাদের প্রতিটি দাসী-দাস, সেবিকা আর শিক্ষক। কিন্তু বিজয়ের চোখে সেই অদ্ভুত দীপ্তি—যা জন্মের পর থেকেই সকলকে এক অনুচ্চারিত আশঙ্কায় ফেলেছিল—দিনের পর দিন স্পষ্ট হতে থাকল। দিনগুলোতে সে খেলত, পড়ত, প্রাসাদের আঙিনা দাপিয়ে বেড়াত; কিন্তু রাত নামলেই বিজয় যেন অন্য এক রূপ নিত। প্রায়ই শোনা যেত সে ঘুমের ঘোরে অজানা ভাষায় কথা বলছে, কপালে ঘাম, বুকের ভেতর ধড়ফড় শব্দ; কখনও কখনও সে আচমকা উঠে বসে শূন্যের দিকে হাত বাড়িয়ে কী যেন আঁকতে চাইত। ভৃত্য রাতুল একরাতে দেখেছিল বিজয়কে ছাদের কোণে দাঁড়িয়ে দূরের শ্মশানঘাটের দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, যেন কারও সঙ্গে নীরবে কথা বলছে। সেই রাতের পর থেকে রাতুল ভয়ে আর ছাদমহলে যেতে সাহস করত না। বৃষ্টি ভেজা রাতগুলোতে বিজয়ের অদ্ভুত আচরণ যেন আরও প্রবল হয়ে উঠত। কখনও বিজয় নিঃশব্দে অন্দরের অন্ধকার কোণে বসে থাকত, কখনও জানালার গরাদের ফাঁক দিয়ে দূরের শালবনের দিকে তাকিয়ে থাকত, আর তার ঠোঁটে কেমন এক রহস্যময় হাসি খেলা করত। অনন্ত নাথ প্রতিটি রাত জেগে থাকতেন, দূর থেকে সন্তানের দিকে চেয়ে চেয়ে তার বুকের মধ্যে ক্রমশ জেগে উঠত এক অজানা আতঙ্ক, যা তিনি কারও কাছে প্রকাশ করতে পারতেন না।
এরই মধ্যে একদিন প্রাসাদে আগমন ঘটল পুরোহিত ভৃগুনাথ শাস্ত্রীর। তিনি ছিলেন মহলপুরের এক সুপরিচিত ব্রাহ্মণ, যিনি প্রাসাদের পুজো-আর্চা ও জন্মলগ্নে ছক কষার দায়িত্বে থাকতেন। বিজয়ের জন্মলগ্নের সময় তার কিছু অশুভ গ্রহের যোগ নিয়ে তিনি ইঙ্গিত করেছিলেন, কিন্তু আনন্দে উদ্বেল পরিবার তখন সেই আশঙ্কার কথা মনেই রাখেনি। কিন্তু বিজয়ের শৈশবের অদ্ভুত আচরণ, বিশেষত রাতে শ্মশানঘাটের দিকে তার দৃষ্টি আর অজানা ভাষার বকবকানি শোনার পর, ভানুমতী রানীমা নিজের অজানা আশঙ্কায় ভৃগুনাথ শাস্ত্রীকে ডেকে পাঠালেন। ভৃগুনাথ শাস্ত্রী প্রাসাদের দক্ষিণ কোণের ঘরটিতে বসে বিজয়ের কুণ্ডলী, জন্মলগ্ন আবার নতুন করে পরীক্ষা করতে শুরু করলেন। বাইরে তখন বাতাসে ঝড়ের ইঙ্গিত, আকাশে মেঘের ঘনঘটা। প্রদীপের নিভু নিভু আলোয় তার কপালের ভাঁজ গভীর হয়ে উঠল। অনেকক্ষণ নীরব থেকে শেষে তিনি অনন্ত নাথ আর ভানুমতীর দিকে তাকিয়ে ধীরে বললেন—“মহারাজ, শিশুর জন্মলগ্নে যে অশুভ গ্রহের দৃষ্টি ছিল, তা সহজে কাটবে না। শিশুর ওপর কোনো শক্তি নজর রেখে চলেছে। তার চেহারা, চাহনি, রাতে তার অজানা ভাষায় কথা বলা—সব ইঙ্গিত দিচ্ছে এক অশরীরী শক্তির প্রভাব। শীঘ্রই বড় কোনও দুর্ঘটনা বা বিপদের সম্ভাবনা রয়েছে।” ভানুমতী দেবীর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল, তিনি আঁচল মুখে চেপে ধরে অশ্রু সংবরণ করলেন। অনন্ত নাথ শাস্ত্রীর কথা শুনে শিউরে উঠলেন। শাস্ত্রী আরও বললেন—“রক্ষা করার একমাত্র উপায় হল নিয়মিত মহা চণ্ডীপাঠ, শ্মশানকালীর আরাধনা এবং শ্মশানঘাটের দক্ষিণ কোণে যে শালগাছটি আছে তার গোড়ায় নির্দিষ্ট দিনে পুজো। কিন্তু…”—তিনি থেমে গেলেন, চোখে এক অজানা আতঙ্ক—“কোনো শর্ত ভাঙা হয়েছে কি মহারাজ? কোনো প্রাচীন অভিশাপ কি এই বংশকে ঘিরে রেখেছে?” অনন্ত নাথের বুকের মধ্যে সে প্রশ্ন যেন বজ্রপাতের মতো আঘাত করল। তিনি কিছু বললেন না, শুধু মাথা নিচু করে বসে রইলেন।
পুরোহিত ভৃগুনাথ শাস্ত্রীর সতর্কবার্তার পর থেকে প্রাসাদের বাতাসে আরও ভারী হয়ে উঠল অজানা ভয়ের ছায়া। প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যা পুজো হতে লাগল, চণ্ডীপাঠের ধ্বনি প্রাসাদ ভরিয়ে তুলল, কিন্তু অনন্ত নাথ জানতেন, এই সব আয়োজন সেই শ্মশানঘাটের অমাবস্যা রাতের চুক্তিকে ঠেকাতে পারবে না। দিন পেরোতে লাগল, বিজয় বড় হতে লাগল, আর প্রতিটি দিন অনন্ত নাথকে আরও কাছে নিয়ে যাচ্ছিল সেই অভিশপ্ত দ্বাদশ বর্ষের দিকে। রাতের বেলা তিনি ছাদে উঠে দূরের শ্মশানঘাটের দিকে তাকিয়ে থাকতেন, বাতাসে ভেসে আসা শ্মশানের গন্ধ আর কুকুরের হাহাকারে তার বুকের মধ্যে এক অজানা কাঁপুনি বয়ে যেত। তিনি দেখতেন দূরের শালবনের ফাঁক দিয়ে কেমন এক অদ্ভুত আলো মাঝে মাঝে জ্বলে ওঠে আর মিলিয়ে যায়। মনে হত সেই অদৃশ্য নারী, সেই লাল চোখের ডাকিনী এখনো দূর থেকে প্রাসাদের দিকে চেয়ে আছে, তার শর্তের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে প্রতিটি নিশ্বাসে। বিজয় যখন গভীর ঘুমে থাকে, অনন্ত নাথ তার কপালে হাত বোলাতেন আর নীরবে প্রার্থনা করতেন, “হে দেবী, হে ঈশ্বর, রক্ষা করো আমার পুত্রকে। তার ভাগ্যকে এই অন্ধকারের হাত থেকে বাঁচাও।” কিন্তু সেই রাতগুলোতে প্রায়ই শোনা যেত, বিজয় ঘুমের ঘোরে কারও সঙ্গে কথা বলছে, কেউ যেন তার স্বপ্নের মধ্যে এসে তাকে ডাকছে। এমনকি এক রাতে সেবিকা লক্ষ্মী বিজয়কে ঘুমের মধ্যে বিড়বিড় করতে শুনল—“আমি তো তোমার সন্তান, মা। আমি তো তোমারই।” সেই কথা শোনার পর লক্ষ্মী সারা রাত ঘুমোতে পারেনি, ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে সকালে রানীমার কাছে ছুটে গিয়েছিল।
এরপর অনন্ত নাথ স্থির করলেন, তিনি নিজের করা ভুলের শাস্তি নিজেই ভোগ করবেন, কিন্তু বিজয়কে শিকার হতে দেবেন না। তিনি মহলপুরের সমস্ত তান্ত্রিক, সিদ্ধপুরুষ, ব্রাহ্মণদের ডাকতে শুরু করলেন। প্রাসাদে এক অদ্ভুত যুদ্ধের আবহ তৈরি হল—যেখানে এক পিতা লড়াই করছে নিজের পুত্রকে অলৌকিক অন্ধকার থেকে বাঁচানোর জন্য। শ্মশানঘাটের দক্ষিণ কোণের সেই শালগাছের গোড়ায় ভৃগুনাথ শাস্ত্রীর নির্দেশে বিশেষ যজ্ঞ শুরু হল। প্রাসাদের ছাদে বসানো হল বিশেষ তাবিজ, দরজায় দরজায় ঝোলানো হল নিমপাতা আর রূপার তাবিজ। কিন্তু শ্মশানঘাটের সেই অদৃশ্য ডাকিনী কি এতো সহজে পিছু হঠবে? বিজয়ের চোখের সেই দীপ্তি, তার আচরণ, তার রাতের অজানা স্বর—সবকিছুই যেন ক্রমে ক্রমে বাড়তে লাগল। আর অনন্ত নাথ প্রতিটি মুহূর্তে অনুভব করতে থাকলেন—সময় ফুরিয়ে আসছে। দ্বাদশ বর্ষ ক্রমশ এগিয়ে আসছে, আর অদৃশ্য সেই অভিশাপের ছায়া ঘনিয়ে আসছে প্রাসাদের আকাশে।
📜 অধ্যায় ৬
বিজয় নাথের দ্বাদশ জন্মদিন ক্রমেই কাছে আসছিল, আর প্রাসাদের প্রতিটি প্রাচীরে, প্রতিটি বাতাসের হাওয়ায় যেন সেই শীতল ছায়া ছড়িয়ে পড়ছিল। একসময় যে আঙিনা তার হাসিতে মুখর হয়ে উঠত, যেখানে তুলসীতলার বাতাসে মাধবীলতা দুলত, সেখানেই এখন নেমে এসেছে এক নিস্তব্ধতার ঘোর। বিজয়ের চেহারা পাল্টে যেতে শুরু করেছে। তার চোখের দীপ্তি গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে, সেই দীপ্তিতে মিশে গেছে এক অজানা শীতলতা। দিন-রাতের পার্থক্য যেন বিজয়ের জীবনে ফিকে হয়ে গেছে—সে দিনের বেলাতেও মাঝে মাঝে জানালার গরাদের ফাঁক দিয়ে শ্মশানঘাটের দিকে তাকিয়ে থাকে, মুখে এক রহস্যময় হাসি, ঠোঁটে ফিসফিস শব্দ। রাতের বেলায় সে কখনও আচমকা জেগে উঠে চিৎকার করে ওঠে, যেন কারও কাছে প্রাণভিক্ষা করছে, আবার কখনও বিছানা ছেড়ে বেরিয়ে গিয়ে ছাদের কোণে দাঁড়িয়ে দূরের শালবনের দিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। অনন্ত নাথ প্রতিটি রাত ধরে তার ছেলের দিকে তাকিয়ে বুকের ভেতর তোলপাড় অনুভব করতেন। তিনি জানতেন, প্রতিটি দিন তার সন্তানকে নিয়ে তাকে সেই অভিশপ্ত দ্বাদশ বছরের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে, যেখানে ডাকিনীর শর্ত পূরণের সময় আসছে।
প্রাসাদে তান্ত্রিকদের আনাগোনা বেড়ে গেল। মহলপুর, কাশী, উজ্জয়িনী থেকে ডাকা হল সিদ্ধপুরুষদের। শ্মশানঘাটের দক্ষিণ কোণে মহাযজ্ঞ শুরু হল। রাতের বেলা শ্মশানঘাট থেকে প্রাসাদের দিকে ভেসে আসা ধোঁয়ার গন্ধে মিলিয়ে যেত যজ্ঞের ধূপ-ধুনোর গন্ধ। কিন্তু বিজয়ের উপর অদৃশ্য সেই ছায়া যেন দিন দিন প্রবল হতে লাগল। তার স্বাভাবিকতা হারিয়ে যেতে লাগল। সে একা একা বনের দিকে যেতে চাইত, বারান্দায় বসে দূরের শ্মশানঘাটের দিকে হাত তুলে কিছু বলতে বলতে হাসত, কখনও বা হঠাৎ অজানা ভাষায় আওয়াজ তুলত। এক রাতে প্রাসাদের ভৃত্যরা বিজয়কে শূন্য বারান্দায় দাঁড়িয়ে দক্ষিণের বাতাসের দিকে হাত নাড়তে দেখেছিল, আর তার চোখের লাল আভা যেন অন্ধকারের মধ্যেও জ্বলজ্বল করছিল। সেই রাতের পর থেকে আর কেউ রাতে একা বিজয়ের কাছে যেতে সাহস করত না। রানীমা ভানুমতী কান্নায় ভেঙে পড়তেন প্রতিটি রাতের শেষে, আর অনন্ত নাথ আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হতেন—যে করেই হোক তিনি পুত্রকে রক্ষা করবেন।
বিজয়ের দ্বাদশ জন্মদিনের আগের সপ্তাহ থেকে প্রকৃতিও যেন বদলে গেল। বীরভূমের আকাশে অদ্ভুত কালো মেঘ জমে উঠল, দিনের বেলাতেও আলো ফিকে হয়ে এল। শালবনের ভেতর থেকে কুকুর আর শিয়ালের হাহাকার ভেসে আসত প্রতিটি সন্ধ্যায়। শ্মশানঘাটের আগুন যেন সেই সময়গুলোতে আরও উজ্জ্বল জ্বলতে থাকত, আর তার লাল আভা আকাশ ছুঁয়ে ফেলত। প্রাসাদের ভেতর রানীমা, ভৃত্য, সেবিকাদের মুখ ফ্যাকাশে, চোখে আতঙ্কের ছায়া। অনন্ত নাথ শেষ চেষ্টা হিসেবে মহায়জ্ঞের আয়োজন করলেন। প্রাসাদের প্রাচীন প্রাঙ্গণে, যেখানে শতাব্দী প্রাচীন বটগাছ দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে শুরু হল চণ্ডীপাঠ, তন্ত্রমন্ত্র, শ্মশানকালীর আরাধনা। আগুনের শিখা, ধূপ-ধুনো, বীজমন্ত্রের ধ্বনি ছড়িয়ে পড়ল বাতাসে, কিন্তু অনন্ত নাথ জানতেন, এই লড়াই স্রেফ এক পিতার অন্ধ যুদ্ধ। প্রতি রাতে তিনি ছাদে উঠে দূরের শ্মশানঘাটের দিকে চেয়ে থাকতেন আর মনে করতেন সেই রাতের অভিশপ্ত চুক্তি, সেই নারীর লাল চোখের দৃষ্টি, আর সেই অশরীরী কণ্ঠস্বর—“যখন দ্বাদশ বসন্ত ফুটবে, তাকে ফিরিয়ে দিতে হবে…”
অবশেষে সেই রাত এল। বিজয়ের জন্মদিন। আকাশে কালো মেঘ, বৃষ্টি আসি আসি করছে। রাতের আকাশে বিদ্যুতের চমক, শ্মশানঘাটের আগুন সেই বিদ্যুতের আলোয় আরও ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছে। বিজয় প্রাসাদের ভেতরে নিঃশব্দে বসে আছে, তার চোখে লাল দীপ্তি জ্বলছে, ঠোঁটে সেই রহস্যময় হাসি। রানীমা ভয়ে কাঁপছেন, আঁচলে মুখ চাপা দিয়ে অশ্রু সংবরণ করছেন। অনন্ত নাথ অস্ত্র হাতে ছুটে বেরোলেন শ্মশানঘাটের দিকে—শেষ লড়াই, শেষ চেষ্টা। বৃষ্টির ফোঁটা গায়ে এসে পড়ছে, বিদ্যুৎ আকাশ চিরছে, শ্মশানঘাটে পৌঁছেই তিনি দেখলেন সেই নারীকে—অর্ধেক অন্ধকারে, অর্ধেক আগুনের আলোয় দাঁড়িয়ে আছে। তার লাল চোখে আগুন, ঠোঁটে সেই অভিশপ্ত হাসি। অনন্ত নাথ চিৎকার করে উঠলেন—“আমার সন্তানকে নিও না! আমি যা চাও তাই দিতে প্রস্তুত!” কিন্তু অন্ধকারের গভীরে সেই কণ্ঠস্বর ভেসে এল—“শর্ত ভাঙা যায় না, রাজা! দ্বাদশ বসন্তের ফুল ফোটার শর্ত পূর্ণ হতেই হবে!” চারপাশে বাতাসের হাহাকার, শ্মশানের আগুন যেন আকাশ ছুঁয়ে যাচ্ছে, আর অনন্ত নাথের বুকের মধ্যে শীতল কাঁপুনি বয়ে যাচ্ছে। সেই রাতের অন্ধকারে শুরু হল জমিদারের শেষ যুদ্ধ—এক পিতার অভিশপ্ত লড়াই।
📜 অধ্যায় ৭
বীরভূমের আকাশ যেন সেই রাতে কোনো নক্ষত্রের আলো নিতে অস্বীকার করেছিল। রাতের অন্ধকার এমন গভীর ছিল, যা চোখের পাতা নামিয়েও অনুভূত হতো না। বাতাসে এক অদ্ভুত শীতলতা, যেন শ্মশানের আগুনও সেই শীতে নিস্তেজ হতে চাইছে। বিজয়ের দ্বাদশ জন্মদিনের রাত। প্রাসাদের প্রতিটি মানুষ চুপচাপ মাটির দিকে তাকিয়ে আছে, চারপাশে শঙ্খের আওয়াজ নেই, ঢাকের বাজনা নেই, নেই কোনো আলোকসজ্জা—শুধু আতঙ্কের অদৃশ্য জাল চারপাশে বিস্তৃত। বিজয় তখন অন্দরমহলের সবচেয়ে গোপন ঘরে বসে আছে, তার চোখ দুটো লাল দীপ্তিতে জ্বলছে, ঠোঁটে সেই অজানা হাসি। রানীমা ভানুমতী আঁচল দিয়ে মুখ চেপে ধরে নিঃশব্দে কাঁদছেন, যেন এই অশ্রুতে তিনি সন্তানকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চাইছেন। অনন্ত নাথ সেই সময় ছাদে উঠে দূরের শ্মশানঘাটের দিকে চেয়ে ছিলেন। দূর থেকে শ্মশানের আগুনের লাল আভা ভেসে আসছে, বাতাসে ভেসে আসছে অজানা ডামডোলের শব্দ, আর অন্ধকারের মধ্যে তিনি স্পষ্ট দেখতে পেলেন সেই নারীমূর্তিকে। সেই মুখ, সেই লাল চোখ, সেই ভয়ঙ্কর হাসি—যা তিনি বারবার স্বপ্নে দেখেছেন। মনে হলো যেন সেই ডাকিনী হাত বাড়িয়ে প্রাসাদের দিকে ডাকছে, বিজয়কে চাইছে। জমিদারের বুকের ভেতর শীতল কাঁপুনি বয়ে গেল, কিন্তু তিনি স্থির করলেন—যে করেই হোক, আজ রাতে তিনি সন্তানের প্রাণ বাঁচাবেন।
শুরু হল সেই রাতের লড়াই। অনন্ত নাথ মন্ত্রপূত তরবারি হাতে নিয়ে ছুটলেন শ্মশানঘাটের দিকে। চারপাশের বাতাস কেঁপে উঠছে, বৃষ্টি নামল হঠাৎ, বিদ্যুতের চমক আকাশকে ছিন্নভিন্ন করছে। শ্মশানঘাটে পৌঁছেই অনন্ত নাথ দেখলেন ডাকিনী শ্মশানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে, চিতার আগুনের লাল আভায় তার চুলগুলো উন্মাদিনীর মতো উড়ছে, তার লাল চোখে শ্মশানের আগুনের প্রতিফলন, তার ঠোঁটে সেই অভিশপ্ত হাসি। ডাকিনী এক হাতে আগুনের শিখা তুলেছে, আরেক হাত বাড়িয়ে ডাকছে—“শর্ত পূর্ণ করতে হবে, রাজা। সময় শেষ!” অনন্ত নাথ এগিয়ে গিয়ে চিৎকার করে বললেন—“আমার সন্তানকে নিও না, হে রক্তলোচনা! যা চাও, আমি দিতে প্রস্তুত। আমার প্রাণ নিও, আমার সব নিও, কিন্তু ওকে নিও না।” ডাকিনী হাহা করে হেসে উঠল—সেই হাসি যেন শ্মশানের হাহাকারকে ছাড়িয়ে আকাশ বিদীর্ণ করে দিল। চারপাশে বাতাসে মিশে গেল সেই নারীকণ্ঠের ভয়াল আওয়াজ, শিয়ালের হাহাকার আর অশরীরী মন্ত্রের গুঞ্জন। শ্মশানঘাটের আগুন যেন আরও বেশি লাল হয়ে উঠল, সেই লাল আভায় অনন্ত নাথের চোখ ভিজে এল, কিন্তু তিনি পিছিয়ে গেলেন না।
ডাকিনী এবার আগুনের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে আবার দেখা দিল শ্মশানঘাটের দক্ষিণ প্রান্তে, শালগাছের নিচে। তার চারপাশে ছায়ার মতো ঘুরছে অশরীরী আরও কিছু ছায়ামূর্তি। অনন্ত নাথ বুঝলেন, এটি আর কেবল ডাকিনীর নয়, পুরো এক অশরীরী শক্তির জাল তৈরি হয়ে গেছে। তিনি মহাযজ্ঞের অঙ্গার তুলে নিয়ে মন্ত্রপাঠ করতে করতে ছুটে গেলেন শালগাছের দিকে। প্রতিটি পদক্ষেপে তার মনে হচ্ছিল মাটির নিচ থেকে হাত বেরিয়ে তার পা ধরে টানছে। বাতাসে অদৃশ্য কণ্ঠস্বর—“রাজা, তুমি শর্ত ভেঙেছ! রক্ত দিতে হবে! দ্বাদশ বর্ষের প্রতিজ্ঞা পূর্ণ না হলে বংশ ধ্বংস হবে!” বিদ্যুৎ চমকে আবার দেখা দিল ডাকিনীর লাল চোখ, এবার সে আগুনের মধ্যে হাত ডুবিয়ে চিতার শিখা হাতে তুলে নিল, আর বিজয়কে ডাকতে থাকল—“এসো, এসো আমার সন্তান, সময় হয়েছে!” অনন্ত নাথ হুঁশ হারালেন না, তিনি নিজের কপালে অঙ্গার মাখিয়ে ছুটলেন ডাকিনীর দিকে, শেষ চেষ্টায় একাই ঝাঁপিয়ে পড়লেন সেই আগুনের লেলিহান শিখার মধ্যে।
ঠিক সেই সময় বিজয় ঘরের ভেতর থেকে আচমকা উঠে দাঁড়াল, তার চোখে এক অদ্ভুত শূন্যতা, মুখে সেই অজানা ভাষার মন্ত্রগুঞ্জন। রানীমা ভয়ে ছেলেকে জড়িয়ে ধরতে গিয়ে দেখলেন, ছেলের শরীর শীতল বরফের মতো, আর চোখে সেই অন্ধকারের ডাক। বিজয় যেন নিজেই বেরিয়ে যেতে চাইছে ঘরের বাইরে, শ্মশানের দিকে ছুটে যেতে চাইছে। বাইরে তখন অনন্ত নাথের আর্তনাদ ভেসে আসছে, “হে কালী, হে মাতা, আমার সন্তানকে রক্ষা করো!” শ্মশানঘাটের আগুন আকাশ ছুঁয়ে যাচ্ছে, আর ডাকিনীর সেই লাল চোখের দীপ্তি বিজয়ের ঘরের ভেতর পর্যন্ত যেন প্রবেশ করছে। ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের মেঝেতে অনন্ত নাথের ছিটানো অঙ্গারের রেখা জ্বলে উঠল, শুদ্ধ মন্ত্রের শক্তিতে শিকল হয়ে ঘিরে নিল ঘরটিকে। ডাকিনীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল—“আজ নয় রাজা, কিন্তু তুমি আমার হাত থেকে চিরকাল রক্ষা পাবে না। দ্বাদশ বর্ষের রাত্রি শেষ হল, কিন্তু শর্ত ভাঙার ফল বংশের রক্তে লেখা থাকবে!” শ্মশানের আগুন ধীরে ধীরে নিভে এল, ডাকিনীর ছায়া মিলিয়ে গেল অন্ধকারের গভীরে, আর ভোরের প্রথম আলোয় প্রাসাদের আঙিনায় পড়ল নিঃশেষ, বিধ্বস্ত এক রাতের শেষ অশ্রু।
📜 অধ্যায় ৮
সেই রাতের পর ভোরের প্রথম আলো যেন বীরভূমের আকাশে আলো নয়, অন্ধকারের চিহ্ন এঁকে দিল। প্রাসাদের আঙিনায় সূর্যের কিরণ ফোটার বদলে যেন পড়ল এক নিঃশব্দ অশ্রু, যার ভারে মাটির ঘাসগুলো নুয়ে গেল। পাখিরা ডাকল না, বাতাসও থমকে গেল। শ্মশানঘাটের আগুন রাতের লেলিহান থেকে নিস্তেজ ছাইয়ে পরিণত হয়েছে, আর সেই ছাই-গন্ধ মিশে আছে বাতাসে। প্রাসাদের প্রতিটি কোণ নিস্তব্ধ, কেবল সেই নিঃশব্দতা ভেঙে যাচ্ছে রানীমা ভানুমতীর কান্নায়। তিনি সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরে বসে আছেন, বিজয় যেন এক নিঃপ্রাণ পুতুলের মতো তাঁর কোলে শুয়ে আছে। রাতের সেই ভয়াল যুদ্ধের পরে বিজয়ের চাহনি নিস্তেজ, চোখে কোনো দীপ্তি নেই, যেন সমস্ত শক্তি কেড়ে নেওয়া হয়েছে। অনন্ত নাথ ছাদ থেকে নেমে এসে ধূলিধূসরিত, চোখে শূন্য দৃষ্টি নিয়ে ছেলের দিকে চেয়ে আছেন। তিনি জানেন, ডাকিনী সেই রাতে সন্তানকে নিয়ে যেতে পারেনি, কিন্তু সেই শর্তের ছায়া মুছে যায়নি। বরং বংশের রক্তে লেখা হয়ে গেছে এক অমোঘ অভিশাপ, যার ছায়া প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে থাকবে। শ্মশানের দিকে তাকালে দেখা যাবে শালগাছের গোড়ায় অঙ্গারের রেখা, সেই রাতের লড়াইয়ের স্মৃতি। শালবন যেন কেঁদে চলেছে, বাতাসে শোকের সুর বাজছে।
এরপর দিনগুলো প্রাসাদে যেন অভিশাপের মতন নেমে এল। বিজয় ধীরে ধীরে আগের মতো স্বাভাবিক হতে চেষ্টা করল, কিন্তু সেই রাতের পর থেকে সে যেন আর আগের বিজয় রইল না। তার চাহনি শূন্য, হাসি ফিকে, মুখে অজানা বিষণ্ণতা। সে আর আগের মতো আঙিনায় দৌড়োয় না, আর পাখির পেছনে ছুটে যায় না। প্রাসাদের ভৃত্যরা ফিসফিস করে বলে, “ওর মধ্যে কিছু একটা ঢুকে গেছে সেই রাতের পর থেকে।” অনন্ত নাথ ছেলের দিকে চেয়ে প্রতিটি দিন এক অজানা অপরাধবোধে জর্জরিত হয়ে থাকেন। তিনি নিয়মিত মহাযজ্ঞ করেন, শ্মশানকালীর পুজো করেন, কিন্তু ভেতরে ভেতরে জানেন, এই অভিশাপ কোনো পুজোতে মিটবে না। বংশের প্রতিটি সন্তান সেই ছায়ার শিকার হবে। প্রাসাদের প্রাচীন পাথরের দেওয়ালগুলোও যেন রাতের বেলায় সেই ডাকিনীর কণ্ঠস্বর ফিরিয়ে দেয়—“দ্বাদশ বসন্ত পার হল, কিন্তু ঋণ শোধ হয়নি, রাজা!” ভানুমতী রানীমা ছেলের চোখের দিকে চেয়ে চুপ করে থাকেন, জানেন—তার বিজয় আর সেই উজ্জ্বল চোখের শিশু নয়। প্রাসাদের কর্তার সেই একরাত্রির চুক্তি তার মমতার বাগান শুকিয়ে দিয়েছে।
শুধু প্রাসাদ নয়, চারপাশের গ্রামেও পরিবর্তন হতে থাকে। প্রজারা দূর থেকে প্রাসাদকে এক অভিশপ্ত স্থল হিসেবে দেখতে শুরু করে। কেউ রাত নামলে প্রাসাদের পাশ দিয়ে যেতে সাহস করে না, কেউ আর প্রাসাদের জল নিতে আসে না, বটতলার হাটের গল্পে শোনা যেতে থাকে—প্রাসাদের ছাদে রাতের বেলায় দেখা যায় আগুনের রেখা, আর শালগাছের নিচে লাল চোখের ছায়া নাকি ঘোরে। বিজয়ের নামটিও যেন জনমানসে ভয় জাগায়। আর অনন্ত নাথ? তিনি রাতের বেলা ছাদের কোণে বসে দূরের শ্মশানঘাটের দিকে চেয়ে থাকেন, প্রতিটি নিঃশ্বাসে অনুভব করেন সেই অভিশপ্ত চুক্তির ভার। এক রাতে, যখন শালবন থেকে ভেসে আসে শেয়ালের হাহাকার, অনন্ত নাথ নিজের হৃদয়েই সেই ডাকিনী কণ্ঠস্বর শুনতে পান—“বংশের রক্তে লেখা হল ঋণ, রাজা, তুমি কি রক্ষা করতে পারবে তোমার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?” সেই কথা শোনার পর থেকে জমিদার রাতের ঘুম হারিয়ে ফেলেন। দিন-রাতের সীমারেখা তার কাছে মুছে যায়, তিনি সন্তানকে রক্ষা করার জন্য এক অজানা প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন, যেন ভবিষ্যতের কোনো রাতে ডাকিনী আবার ফিরে এলে তিনি প্রস্তুত থাকেন।
কিন্তু ডাকিনীর ছায়া কি এতো সহজে সরে যায়? রাত বাড়লে বিজয়ের ঘুমের মধ্যে আবার শোনা যায় অজানা ভাষার ফিসফিসানি। শ্মশানঘাটের আগুন মাঝেমাঝেই অদ্ভুতভাবে জ্বলে ওঠে, আর বাতাসে ভেসে আসে অজানা সুগন্ধ যা আসলে শ্মশানের ছাই-গন্ধের মিশ্রণ। অনন্ত নাথ অনুভব করেন, এই লড়াই শেষ নয়, বরং শুরু। তিনি স্থির করেন, বংশের ভবিষ্যৎ রক্ষায় যাবতীয় শক্তি নিয়োগ করবেন। প্রাসাদে ডাকা হবে আরও শক্তিশালী তান্ত্রিক, মন্দিরে হবে আরও মহাযজ্ঞ, আর নিজের পুত্রকে তিনি পাঠাবেন দূরে—যেখানে ডাকিনীর ছায়া পৌঁছাতে পারবে না। কিন্তু অন্ধকারের শিকল কি এত সহজে ছিঁড়ে ফেলা যায়? ডাকিনীর অভিশাপের ছায়া তখনও শালবনের গভীরে গুমরে কাঁদছে, অপেক্ষা করছে তার সময়ের জন্য—যখন সেই ঋণ শোধ হবে রক্তে, আর রাজবংশের শেষ প্রদীপ নিভিয়ে দেবে এক অভিশপ্ত অমাবস্যার রাত।
📜 অধ্যায় ৯
রাতের আকাশে অমাবস্যার অন্ধকার যেন প্রাসাদের প্রতিটি দেয়ালকে আরও কালো করে তুলেছিল। প্রাসাদের উঁচু মিনারগুলো শালবনের লতা-গুল্মের মতো ছায়া ফেলছিল মাটির উপরে। সেই রাতে বিজয় চুপিচুপি ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল। বয়সে সে তখন দ্বাদশ বর্ষ পেরিয়ে ত্রয়োদশে পা রেখেছে, কিন্তু চোখে সেই শৈশবের সরলতা নেই; রয়েছে এক অজানা আতঙ্ক, যে আতঙ্ক তাকে ঘর ছাড়তে বাধ্য করেছে। সে জানে, প্রাসাদের চারপাশে যজ্ঞের অঙ্গাররেখা, মন্ত্রপূত তাবিজ আর তান্ত্রিকদের রক্ষাকবচ কিছুই তাকে আর রক্ষা করতে পারবে না। তাই সে নিঃশব্দে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল, পায়ের আওয়াজ শোনা গেল না, কেবল বাতাসে শিয়ালের আর্তনাদে সেই রাতের নীরবতা ফেটে পড়ল। শালবনের মধ্যে দিয়ে বিজয় দৌড়োতে লাগল, বনের ভেতর শালপাতার ঘ্রাণ, বুনো ফুলের গন্ধ মিশে আছে বাতাসে, কিন্তু সেই গন্ধের নিচে লুকিয়ে আছে শ্মশানের ছাই-গন্ধ, সেই অমোঘ অভিশাপের গন্ধ। শ্মশানঘাটের আগুন দূরে ক্ষীণ হয়ে এসেছে, কিন্তু বিজয়ের মনে হচ্ছে সেই আগুন যেন তার পিছু নিয়েছে। প্রতিটি গাছের ফাঁক দিয়ে সে দেখতে পাচ্ছে সেই লাল চোখের দীপ্তি, যেন অদৃশ্য কেউ তাকে অনুসরণ করছে।
প্রাসাদে তখন আতঙ্কের অন্ধকার। ভোরের আলো ফোটার আগে ভানুমতী রানীমা ছেলের শূন্য খাট দেখে চিৎকার করে ওঠেন। অনন্ত নাথ ছুটে আসেন, ছেলের অনুপস্থিতি দেখে শিউরে ওঠেন। তার বুকের ভেতর থেকে এক অজানা আশঙ্কার ঢেউ উঠে আসে। তিনি জানতেন, এই রাতেই হয়তো সেই ডাকিনীর ছায়া আবার ফিরে এসেছে, আর বিজয় নিজেই সেই ছায়ার টানেই প্রাসাদ ছেড়ে বেরিয়ে গেছে। তিনি সমস্ত ভৃত্য, সেপাই, সেবিকা আর তান্ত্রিকদের ডাক পাঠালেন। চারদিকে শুরু হল খোঁজ। শালবন, শ্মশান, নদীর ঘাট, বটগাছের তলা—সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ল অনুসন্ধান। কিন্তু বিজয়ের কোনো খোঁজ নেই। দূরের আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, মেঘের গর্জন শোনা যাচ্ছে, আর শালবনের ভেতর থেকে ভেসে আসছে সেই অশরীরী হাসি, যা সেই রাতের ডাকিনীর। অনন্ত নাথ বোধ করলেন, এটি আর কেবল ডাকিনীর লড়াই নয়। বিজয় হয়তো সেই শিকল ভেঙে পালিয়েছে, কিন্তু অশুভ শক্তি তার পিছু ছাড়বে না। রাতের আকাশে শকুনের ডাক আর শেয়ালের হাহাকার মিলে গিয়ে এক বিভীষিকার সুর তুলল।
বিজয় তখন এক গভীর শালবনের ভেতরে পৌঁছে গেছে। চারপাশে কুয়াশার মতো এক অদ্ভুত ধোঁয়া, বাতাসে শ্মশানের গন্ধ। সে দিকভ্রান্ত হয়ে হেঁটে চলেছে, পায়ের তলায় শুকনো পাতার মড়মড় শব্দ উঠছে, মাঝে মাঝে শালপাতার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো এসে পড়ছে তার মুখে, যেখানে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট। হঠাৎ সে দেখতে পেল এক অজানা শালগাছের নিচে অগ্নিশিখার মতো কিছু জ্বলছে। কাছে যেতেই সে চমকে গেল। শালগাছের গোড়ায় বসে আছে এক অর্ধউন্মাদ তান্ত্রিক, যার চোখ লাল, মুখে ভাঙা দাঁতের সারি, কপালে ছাই মেখে সে মন্ত্রপাঠ করছে। বিজয় থমকে গেল। তান্ত্রিক ধীরে ধীরে চোখ তুলে তার দিকে তাকাল আর গর্জে উঠল—“তোকে রক্ত দিতে হবে বংশের ঋণ মেটাতে! ডাকিনীর শর্ত পূর্ণ না হলে তোর রক্তে লেখা হবে বংশের শেষ পৃষ্ঠা!” বিজয় পিছু হটতে গিয়ে হোঁচট খেল শালগাছের গোঁড়ায়, আর সেই সময় বাতাসে ভেসে এল সেই অশরীরী কণ্ঠ—“ফিরে এসো সন্তান, সময় হয়েছে!” বিজয় ছুটতে শুরু করল, পেছনে শালগাছের নিচে আগুন জ্বলছে, তান্ত্রিকের আর্তনাদ আর শ্মশানের ছাইগন্ধ তাকে গ্রাস করে নিতে চাইছে।
প্রাসাদে সেই রাত ছিল নিদ্রাহীন। অনন্ত নাথ প্রাসাদের ছাদে দাঁড়িয়ে দূরের শালবনের দিকে চেয়ে আছেন। ভোরের প্রথম আলো ফোটার বদলে দেখা যাচ্ছে শালবনের ফাঁক দিয়ে লাল আগুনের রেখা, শকুনের উড়ান, আর বাতাসে অদৃশ্য মন্ত্রের গুঞ্জন। তিনি জানেন, বিজয়ের ফিরে আসা মানে হবে নতুন বিপদ, আর বিজয়ের না-ফেরা মানে হবে বংশের ধ্বংস। প্রাসাদের দরজায় মন্ত্রপূত তাবিজ, আঙিনায় ছাই-অঙ্গারের রেখা, কিন্তু সেগুলো কি অশুভ শক্তিকে আটকাতে পারবে? ভানুমতী রানীমা নিঃশব্দে প্রার্থনা করছেন তুলসীতলার তলায়, আর অনন্ত নাথ মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলেন—এবার শেষ লড়াই শুরু হবে। বংশের ভবিষ্যৎ রক্ষায় তিনি ডাকবেন সেই মহা তান্ত্রিককে, যে হয়তো একদিন ডাকিনীর অভিশাপ ভাঙতে পারবে। কিন্তু দূর আকাশের শকুনের ডাক আর শালবনের আগুনের লাল রেখা যেন বলে দিচ্ছে, এই অভিশাপ এতো সহজে পিছু হটবে না। অমাবস্যার রাতের ছায়া তখনও প্রাসাদের চারপাশে জড়িয়ে আছে, অপেক্ষা করছে সেই রক্তের ঋণ মেটানোর জন্য।
📜 অধ্যায় ১০
রাতের আকাশ যেন ভোরের প্রতিশ্রুতি ভুলে গিয়েছিল। অমাবস্যার পরের রাত, কিন্তু আকাশে আলো নেই, বাতাস নেই, কেবল এক অদৃশ্য অশরীরী শীতলতা বয়ে চলেছে। সেই রাতে অনন্ত নাথের প্রাসাদে পৌঁছল এক অদ্ভুত সন্ন্যাসী, যার কপালে ত্রিপুণ্ড ছাই, চোখদুটো গভীর গহ্বরের মতো কালো, আর গলায় লোহিত বীজমালার রেখা। শকুনের ডাক, শিয়ালের হাহাকার, শ্মশানের ছাই-গন্ধ—সব মিশে গিয়ে সেই আগমনের ঘনঘটা তৈরি করল। বটগাছের নিচে সেই সন্ন্যাসী বসে পড়ল, চোখ বন্ধ করে মন্ত্রগুঞ্জন শুরু করল, আর তার চারপাশে বাতাস ভারি হয়ে উঠল। অনন্ত নাথ ধীরে ধীরে তার কাছে গিয়ে কপালে হাত ঠেকিয়ে প্রণাম করলেন, কাঁপা গলায় বললেন—“মহাত্মা, আমার বংশের উপর অভিশাপ নেমে এসেছে। ডাকিনীর ছায়া আমার সন্তানকে গ্রাস করতে চায়। তাকে রক্ষা করার আর উপায় নেই। আপনার শরণাপন্ন হয়েছি।” সন্ন্যাসী চোখ খুললেন, সেই চোখে যেন রাতের গভীরতা মিশে আছে। তিনি ধীরে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন—“রাজা, বংশের ঋণ রক্তে লেখা হয়েছে। শ্মশানযুদ্ধ শুরু হবে এবার। প্রস্তুত হও।”
সেই রাত থেকে শুরু হল শ্মশানযুদ্ধের প্রস্তুতি। মহা তান্ত্রিক প্রাসাদের দক্ষিণ প্রান্তের শ্মশানঘাটে মহাযজ্ঞের আয়োজন করলেন। শ্মশানের চারপাশে বৃত্তাকারে অঙ্গাররেখা আঁকা হল, তার মাঝে বসানো হল মন্ত্রপূত যজ্ঞকুণ্ড। শ্মশানের মৃত ছাই, তুলসী, বেলপাতা, ভস্ম, অশ্বত্থপাতা আর অগ্নিকুণ্ডের কাঠ দিয়ে সাজানো হল সেই ক্ষেত্র। দূরের শালবনে শকুন উড়ে চলেছে, শেয়ালের আর্তনাদ ছড়িয়ে পড়ছে, আর বাতাসে শ্মশানকালীর মন্ত্রমালা গুঞ্জন তুলছে। রাতের পর রাত সেই তান্ত্রিক শ্মশানঘাটে বসে মন্ত্রজপ করছেন, আগুনে ঘৃতাহুতি দিচ্ছেন, চারপাশে অদৃশ্য ছায়ামূর্তি জড়ো হচ্ছে। প্রাসাদজুড়ে আতঙ্কের বাতাবরণ—কেউ অন্ধকারের পর প্রাসাদের বাইরে পা রাখে না। বিজয়কে রাখা হয়েছে প্রাসাদের সবচেয়ে গোপন ঘরে, যেখানে তান্ত্রিকের নির্দেশে চারপাশে অশ্মন্ত্রের রেখা টানা হয়েছে। ভানুমতী রানীমা তুলসীতলার তলায় বসে প্রার্থনা করছেন, চোখের জল শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, কেবল ঠোঁটে মন্ত্রপাঠ চলছে।
কিন্তু অশুভ শক্তি কি থেমে থাকে? শ্মশানঘাটের আগুন রাতে হঠাৎ জ্বলে ওঠে, বাতাসে ভেসে আসে অদৃশ্য হাসি, সেই ডাকিনীর। শালগাছের ফাঁক দিয়ে দেখা যায় লাল চোখের দীপ্তি, দূরের শালবনের ভেতর অন্ধকারে ছায়া নড়াচড়া করছে। শ্মশানযজ্ঞের প্রতিটি রাতে অশরীরী কণ্ঠস্বর শোনা যায়—“রক্ত চাই, ঋণ চাই। শর্ত পূর্ণ করতে হবে, রাজা!” মহা তান্ত্রিক সেই কণ্ঠস্বর শুনে আরো শক্তিতে মন্ত্রপাঠে নিমগ্ন হন। এক রাতে ঝড় উঠে আসে শ্মশানঘাটের ওপরে, যজ্ঞের আগুন আকাশ ছুঁতে চায়, আর অনন্ত নাথ ছুটে যান সেই যজ্ঞমণ্ডপে, কাঁপা গলায় তান্ত্রিককে বলেন—“মহাত্মা, বাঁচান, আমার সন্তানকে বাঁচান!” তান্ত্রিক জ্বলন্ত অঙ্গার হাতে নিয়ে চিৎকার করে উঠলেন—“এ লড়াই বংশের নয়, রাজা! এ লড়াই সময় আর অভিশাপের। প্রস্তুত হও, শ্মশানযুদ্ধের রাত আসছে। রক্তের ঋণ শোধ না হলে বংশের প্রদীপ নিভে যাবে।” অনন্ত নাথ বোঝেন, সেই রাত আর দূরে নয়।
শেষ প্রস্তুতির রাত এলো। শ্মশানঘাটের মাঝখানে মহা যজ্ঞের অগ্নিশিখা লেলিহান হয়ে জ্বলছে। তান্ত্রিকের চারপাশে মন্ত্রপূত রেখা, শালপাতার বেদি, অঙ্গারের বৃত্ত। দূরের আকাশ বিদ্যুতের ঝলকানিতে আলো করে দিচ্ছে শালবনের শীর্ষ, আর বাতাসে শ্মশানের ছাই-গন্ধ, অদৃশ্য মন্ত্রগুঞ্জন মিলেমিশে ভয়াবহ এক সুর তুলছে। বিজয় ঘরের ভেতর অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে, মুখে ফিসফিস আওয়াজ, কপালে ঘাম, আর অজানা ভাষার মন্ত্রগুঞ্জন বেরোচ্ছে ঠোঁট ফাঁক করে। অনন্ত নাথ প্রাসাদের ছাদ থেকে শ্মশানঘাটের লাল আভা দেখেন আর প্রতিটি নিঃশ্বাসে অনুভব করেন অশুভ ছায়ার উপস্থিতি। তান্ত্রিকের মুখ থেকে মন্ত্র বেরোচ্ছে—“কালী কালিকা, শ্মশানবাসিনী, রক্ষা করো!” রাতের শেষ প্রহর, ঝড়ের বেগ বাড়ছে, শালগাছের পাতায় পাতায় যেন অশরীরী মূর্তির মিছিল শুরু হয়েছে। শ্মশানযুদ্ধের রাতের অপেক্ষায় সমস্ত বীরভূম যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেছে, শুধু বাতাসে শোনা যায় ডাকিনীর সেই অমোঘ কণ্ঠ—“শর্ত পূর্ণ কর, রাজা, নইলে তোমার বংশের প্রদীপ নিভে যাবে এই রাতেই!”
📜 অধ্যায় ১১
রাতের আকাশে বিজলির ঝলকানি আর কালো মেঘের গর্জন যেন জানিয়ে দিচ্ছিল এই রাত অন্য রাতের মতো নয়। শ্মশানযজ্ঞের অগ্নিকুণ্ডে লেলিহান শিখা আকাশ ছুঁতে চাইছিল, তার লাল আভায় শালবন যেন আগুনের বনে পরিণত হয়েছে। মহা তান্ত্রিক বেদির মাঝে বসে মন্ত্রজপে নিমগ্ন, তার চারপাশে অঙ্গাররেখা জ্বলছে, আর বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে তার কণ্ঠের গম্ভীর মন্ত্রধ্বনি। শ্মশানঘাটের চারদিক থেকে ঘিরে এসেছে সেই অশরীরী শক্তি। বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে ছাই-গন্ধে, শালগাছের ফাঁক দিয়ে লাল চোখের ছায়া জ্বলজ্বল করছে। ডাকিনীর সেই ভয়ানক হাসি শোনা গেল—যা শ্মশান, শালবন আর প্রাসাদ মিলিয়ে বীরভূমের রাতকে কাঁপিয়ে দিল। বিজয় তখন প্রাসাদের গোপন কক্ষে অচেতন, কপাল ঘামে ভিজে গেছে, ঠোঁট ফাঁক করে বেরোচ্ছে অজানা ভাষার মন্ত্র। অনন্ত নাথ ছেলের দিকে চেয়ে নিজের অস্তিত্ব বিসর্জনের শপথ নিলেন—“যদি রক্ত চাই, তবে আমার রক্ত নিও, হে অভিশপ্ত শক্তি। আমার সন্তানের নয়!”
ঝড়ের বেগ বাড়তে লাগল। শ্মশানযজ্ঞের আগুন যেন রক্তরঙের হয়ে উঠল। অদৃশ্য ছায়া অঙ্গাররেখা ছুঁতে এলে জ্বলে উঠে পিছু হটিয়ে দিচ্ছে তাদের। তান্ত্রিকের গলা ফেটে যাচ্ছে মন্ত্রপাঠে, সে উলুধ্বনি তুলছে, আর বাতাসে ঘুরে আসছে সেই মন্ত্র—“শ্মশানবাসিনী কালিকা, অভিশাপের বন্ধন ছিন্ন করো!” ডাকিনী এবার শালগাছের নিচে আকার নিল। তার কেশরাশি উন্মাদিনীর মতো বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে, চোখে লাল জ্যোতি, মুখে সেই বিভীষিকাময় হাসি। সে হাত বাড়িয়ে আগুনের শিখা নিজের দিকে টেনে নিল। শ্মশানের বাতাস আগুনের কণায় কণায় জ্বলছে, যেন আকাশে আগুনের অশ্রুবিন্দু ছিটকে পড়ছে। অনন্ত নাথ শ্মশানের বেদির দিকে ছুটে এলেন, কপালে ছাই মেখে তান্ত্রিকের হাতে অঙ্গার তুলে দিয়ে বললেন—“আমার জীবন দিয়ে অভিশাপ ভাঙো মহাত্মা!” তান্ত্রিক চোখ বন্ধ করে বলল—“রাজা, এ যুদ্ধ প্রাণের নয়, এ যুদ্ধ শক্তির। কিন্তু তোমার আত্মোৎসর্গ শক্তিকে আহ্বান করবে। প্রস্তুত হও!”
ডাকিনীর ছায়া এবার অঙ্গাররেখা অতিক্রম করার চেষ্টা করল। শ্মশানযজ্ঞের আগুন চড়তে চড়তে লাল থেকে নীল হলো, বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল ঝড়ের গর্জন আর শিয়ালের হাহাকার। প্রাসাদের আঙিনায় শালপাতার ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকা বিজয়ের নিঃস্পন্দ দেহ থেকে মন্ত্রপূত রেখার আলো ছড়িয়ে পড়ছে। ডাকিনী চিৎকার করে উঠল—“রক্ত চাই! ঋণ চাই! রাজা, শর্ত পূর্ণ কর!” অনন্ত নাথ বেদির পাশে দাঁড়িয়ে নিজের রক্ত অঙ্গারে ছিটিয়ে দিলেন, বললেন—“আমার রক্তে বংশের ঋণ শোধ করো!” মুহূর্তে অঙ্গাররেখা লেলিহান শিখায় ফেটে পড়ল, ডাকিনীর ছায়া কেঁপে উঠল, শ্মশানের বাতাসে সেই নারীকণ্ঠের আর্তনাদ মিশে গেল। তান্ত্রিক মন্ত্রপাঠে গর্জে উঠল—“শক্তি, মায়া, অশুভের বন্ধন ভাঙো!” চারপাশে বিদ্যুৎ চমকে উঠল, শালগাছ ভেঙে পড়ল শ্মশানের আগুনে, আর বাতাসে মিশে গেল ডাকিনীর ছায়া।
শেষরাতের অন্ধকার ধীরে ধীরে ভোরের কিরণে লাল হলো। শ্মশানঘাটের আগুন নিভে এল, অঙ্গাররেখা নিঃশেষ হলো, আর সেই রাতের বিভীষিকা হাওয়ার মতো মিলিয়ে গেল বাতাসে। মহা তান্ত্রিক নিস্তেজ কণ্ঠে বললেন—“রাজা, যুদ্ধ শেষ, কিন্তু অভিশাপ পুরোপুরি মোছা যায়নি। রক্তের ঋণ শোধ হয়েছে তোমার আত্মোৎসর্গে, কিন্তু ছায়া রয়ে গেছে ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা স্বরূপ।” অনন্ত নাথ নিঃশ্বাস ফেলে ছেলের দিকে চেয়ে থাকলেন—যে বেঁচে আছে, কিন্তু সেই রাতের ছায়া তার চোখের শূন্যতায় লেগে আছে। শ্মশানযুদ্ধের রাত শেষ হলেও বীরভূমের আকাশে সেই অশরীরী রাতের কাহিনি বাতাসে গুঞ্জন তুলল—যে কাহিনি থেকে যাবে ইতিহাসে, শ্মশানঘাটের ছাইয়ের ঘ্রাণে, শালগাছের পাতার ফিসফাসে।
📜 অধ্যায় ১২
শ্মশানযুদ্ধের রাত পেরিয়ে ভোরের প্রথম আলো যখন বীরভূমের আকাশ ছুঁল, তখন শালবনের পাতায় পাতায় যেন এক নিঃশ্বাসের ভার হালকা হয়ে গেল। রাতের বিভীষিকার ছায়া মিলিয়ে গেলো কুয়াশার মতো। প্রাসাদের আঙিনায় রক্তরঙের আভা ফিকে হলো, আর বাতাসে শ্মশানের ছাইগন্ধের বদলে এল বেলফুলের মৃদু গন্ধ। অনন্ত নাথ প্রাসাদের ছাদ থেকে নেমে আসছেন ধীরে ধীরে; শরীর ক্লান্ত, চোখ লাল, কিন্তু মুখে এক আশ্চর্য শান্তির রেখা। তিনি জানেন, নিজের প্রাণের রক্ত দিয়ে তিনি বংশকে রক্ষা করেছেন। ভানুমতী রানীমা ছুটে এসে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরেন—বিজয় তখনো নিঃস্পন্দ, কিন্তু মুখে অজানা প্রশান্তির ছাপ। তান্ত্রিক নিঃশব্দে মন্ত্রজপ করতে করতে প্রাসাদ ত্যাগ করেন, কারণ তিনি জানেন, তার কাজ শেষ। শালগাছের পাতায় তখন হালকা বাতাস বয়ে যাচ্ছে, আর দূরের শ্মশানঘাটে নিভে যাওয়া আগুনের অঙ্গার থেকে হালকা ধোঁয়া উঠছে, যেন সেই রাতের স্মৃতি বাতাসে মিলিয়ে দিতে চাইছে।
দিন পেরোতে থাকে, বীরভূমের সেই অভিশপ্ত প্রাসাদে আবার জীবনের ছন্দ ফিরে আসে। বিজয় ধীরে ধীরে সুস্থ হয়, কিন্তু তার চোখে আর সেই শিশু সুলভ উজ্জ্বলতা নেই। তার চোখ যেন অজানা কোনো শূন্যতার সাক্ষী হয়ে গেছে। সে রাত তাকে বড় করে দিয়েছে, এক লহমায় কেড়ে নিয়েছে শৈশবের সরলতা। অনন্ত নাথের আত্মবলিদান প্রজাদের মুখে মুখে কিংবদন্তি হয়ে যায়—“রাজা নিজের রক্ত দিয়ে অভিশাপের ঋণ শোধ করেছেন।” প্রাসাদের চারপাশে তান্ত্রিকরা পুনঃযজ্ঞ করেন, শ্মশানঘাট শুদ্ধ করা হয়, আর সেই শালগাছের গোড়ায় তৈরি হয় এক ছোটো মন্দির—যেখানে প্রজারা রক্তের ঋণ মেটানোর প্রতীক হিসেবে পুজো দিতে থাকে। বীরভূমের আকাশে শকুনের ডাক থেমে যায়, শালবনের ছায়া আর রাতের বেলায় লাল চোখের দীপ্তি দেখা যায় না। কিন্তু বাতাসে থেকে যায় এক চাপা শোকের গন্ধ, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম মনে রাখে সেই রাতের গল্প।
বিজয় বড় হতে থাকে, শিখতে থাকে বংশের দায়িত্ব, শিখতে থাকে মানুষের অভিশাপ আর আশীর্বাদের পার্থক্য। সে রাতের শিক্ষা তার চরিত্র গড়ে তোলে—কঠোর, ন্যায়পরায়ণ আর দায়িত্ববান। সে যখন প্রাসাদের কর্তা হয়, তখন বংশের ইতিহাস সে লিখতে শুরু করে, যেখানে লিপিবদ্ধ থাকে সেই অভিশপ্ত রাতের কাহিনি, ডাকিনীর শর্ত, আর তার পিতার আত্মত্যাগ। শালগাছের নিচে প্রতিটি বছরে অমাবস্যার রাতে বিজয় নিজেই পুজো দেয়, আর মনে মনে শপথ করে—এই বংশ আর কখনো অশুভ চুক্তির বন্ধনে জড়াবে না। প্রাসাদের ভেতর নতুন প্রজন্ম আসে, নতুন রক্ত, নতুন আশা। কিন্তু শালবনের বাতাসে ফিসফিস করে সেই রাতের ছায়া—যা মানুষকে সতর্ক করে, লোভের বিনিময়ে শর্তের চুক্তি যেন আর না করে কেউ।
শেষত, বীরভূমের মানুষ সেই রাত থেকে শিক্ষা নেয়। তারা শিখে যায়, শক্তি বা সন্তানপ্রাপ্তির লোভে অজানা শক্তির সাথে চুক্তি করাই সর্বনাশ ডেকে আনে। অনন্ত নাথের কাহিনি হয়ে ওঠে উপকথা, যা রাতের হাটের আগুনের পাশে বসে বয়োজ্যেষ্ঠরা বলে যায়—যাতে নতুন প্রজন্ম সতর্ক থাকে। শালগাছের নিচে গড়ে ওঠা মন্দির একদিন তীর্থক্ষেত্র হয়ে ওঠে, যেখানে মানুষ প্রার্থনা করে—“অশুভ শক্তি থেকে আমাদের রক্ষা করো।” আর ডাকিনীর কণ্ঠস্বর? তা হারিয়ে যায় বীরভূমের বাতাসে, শ্মশানের ছাইয়ে মিশে থাকে। সেই রাতের গল্প থেকে যায় শুধু শালপাতার ফিসফাসে, আর আকাশের নক্ষত্রের নিঃশব্দ চাহনিতে—যা মনে করিয়ে দেয়, মানুষের লোভই তার অভিশাপের উৎস, আর আত্মত্যাগেই রয়েছে মুক্তি।
-সমাপ্ত-


