তনুশ্রী পাল
১
কলেজের দুপুরগুলো ছিল অন্য রকম—নীরব ক্লাসঘরের বাইরে যেন নতুন করে জীবন শুরু করত ক্যাম্পাস। গরমের গন্ধে ভরা বাতাস, ঢিলেঢালা হাঁটা, খোলা চুলে হাসতে থাকা মেয়েরা, আর সেই একটুখানি অলসতা—সব মিলিয়ে যেন দুপুরটা ক্যাম্পাসের প্রাণহীন দেওয়ালেও কিছু চঞ্চলতা ঢেলে দিত। দক্ষিণ কলকাতার এক সরকারি কলেজের প্রাণকেন্দ্র ছিল তার ক্যাফেটেরিয়া। এই ক্যাফে ছিল আধা-পুরনো, ছাদের পাখাগুলো একটু কেঁপে কেঁপে চলে, জানলার গায়ে লেগে থাকা ধুলোবালি রোদে চিকচিক করে, আর তার মাঝে থাকা টেবিলগুলোর প্রতিটিই যেন নিজস্ব এক গল্পবই। একপাশে সাদা দেয়ালে রঙিন চুনকামের মতো আঁকা কিছু কবিতা, একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা চা-ওয়ালা বুবাইদা, যার হাসিমুখে চা পান করাটা ছিল এক অন্য অভিজ্ঞতা। এখানেই প্রতিদিন জড়ো হতো চার বন্ধু—সোহম, তৃণা, রুদ্র আর মিনু। এদের মধ্যে সোহম ছিল দলের মাথা, ইংরেজি বিভাগের ছাত্র, লেখালেখি করে, বক্তৃতা ভালোবাসে, আর কথাবার্তায় একধরনের গভীরতা আছে ওর। তৃণা সমাজবিজ্ঞানের ছাত্রী, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা আর সাহসী ভাবনা দিয়ে ও পুরো দলে এক রকমের ভারসাম্য এনে দিত। রুদ্র, গণিত বিভাগের ছাত্র, এমন এক মানুষ যে কথায় কথায় মজার জোক ছুঁড়ে দিয়ে যে কোনো পরিবেশ হালকা করে ফেলতে পারে, আর মিনু—ইতিহাসের মেয়ে, সবচেয়ে শান্ত, সবচেয়ে গভীর, সব কিছু নোট করে রাখা ওর স্বভাব। সেদিন দুপুরটাও শুরু হয়েছিল আগের মতোই। চারজন বসেছিল ক্যাফের মাঝের টেবিলটায়, তৃণার হাতে কফির কাপ, রুদ্র চায়ের সঙ্গে মুড়ি খাচ্ছে, আর সোহম ও মিনু তর্ক করছে এক নতুন সাহিত্য ম্যাগাজিন নিয়ে। হঠাৎ পাশের টেবিল থেকে একটা উত্তেজিত গলা শোনা গেল—”Guys! আমার ফোনটা নেই!” সবাই চমকে তাকালো। রোহান মালিক—কমার্স বিভাগের সবচেয়ে স্টাইলিশ ছেলে, যার মোবাইল ফোনটা ছিল অদ্ভুতভাবে দামী আর ব্যক্তিত্বময়, সে-ই চিৎকার করছিল। ওর মুখে ঘাম, চোখে আতঙ্ক। রোহান বারবার বলছে, “আমি এখানে বসেছিলাম… ফোনটা টেবিলেই রেখেছিলাম… মিনিট পাঁচেক আগে ছিল, এখন নেই! এটা কোনো দুষ্টুমি না, কেউ সত্যিই আমার ফোনটা চুরি করেছে।” মুহূর্তে ক্যাফেতে ছড়িয়ে পড়ল গুঞ্জন। কে নিল? কেন নিল? এটা কি মজা নাকি সত্যি কিছু লুকিয়ে আছে? এমন সময়ে ক্যাম্পাস যেন থেমে গেল। ক্যাফের ফ্যানের ঘোরাঘুরি, ক্যান্টিনের হাঁকডাক, সবকিছু স্তব্ধ হয়ে একটা মোবাইলের সন্ধানে দাঁড়িয়ে গেল। কিন্তু তখন কেউই বুঝে উঠতে পারছিল না, এই মোবাইল চুরির ঘটনা শুধু একটা যন্ত্র হারানোর কাহিনি নয়, বরং সেটা হবে সেই দরজা—যার পেছনে লুকিয়ে থাকবে বহু ক্লাসমেটের গোপন চরিত্র, সম্পর্কের টানাপোড়েন, আর এমন কিছু সত্য যা কাউকে কাউকে ভেঙে দেবে, কাউকে গড়ে তুলবে।
চুপচাপ বসে থাকা সোহম ধীরে ধীরে তার চোখ ঘুরিয়ে নিচ্ছিল ক্যাফের প্রতিটি মুখের দিকে। প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি, হঠাৎ মোবাইল বের করে তাকানো, অস্থিরতা—সব কিছু তার চোখ এড়িয়ে যাচ্ছিল না। “তুমি ফোনটা কোথায় রেখেছিলে?” প্রশ্ন করল সোহম। রোহান কাঁপা গলায় বলল, “এই টেবিলেই। আমি পাঁচ মিনিটের জন্য ওয়াশরুমে গেছিলাম, এসে দেখি নেই। তখন তোমরাও ছিলেন না এখানে।” তৃণা তখন বলল, “ক্যাফেতে তো সিসিটিভি আছে! দেখা যাক না ফুটেজ।” রুদ্র হেসে বলল, “সে তো আছে, কিন্তু সেটা বছরখানেক হলো কাজ করছে না। তার নাকি কারেন্ট লাইন কাটা।” এই তথ্যটা শুনে যেন চারপাশ হঠাৎ অন্ধকার হয়ে গেল। ক্যাফের মতো একটা জায়গায়, যেখানে প্রতিদিন শতাধিক ছাত্র-ছাত্রী আসে, সেখানে সিসিটিভি না থাকাটা কতটা দুর্ভাগ্যজনক সেটা নতুন করে বোঝা গেল। হঠাৎ সেই মুহূর্তেই ক্যাফের এক কোণ থেকে উঠে গেল অনন্যা রায়—বায়োলজির শান্ত স্বভাবের মেয়ে, চোখে চশমা, কথাবার্তায় একরকমের চাপা ভাব। সে হঠাৎ টেবিল ছেড়ে উঠে বেরিয়ে গেল, কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই। সোহম লক্ষ্য করল, তার হাঁটার গতি যেন স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি। মিনু ফিসফিস করে বলল, “অনন্যা একটু কাঁপছিল না?” সোহম বলল, “আমারও তাই মনে হল। ফোনটা চুরি যাওয়া মাত্রই ও উঠে গেল। একটা কারণ তো থাকতে পারে।” রুদ্র মজা করে বলল, “তুমি ডিটেকটিভের মতো কথা বলছিস, ভাই!” তৃণা বলল, “যদিও এটা ছোট ব্যাপার, কিন্তু কেন জানি মনে হচ্ছে এটা আসলেই কোনো সাধারণ মজা নয়। রোহান যেভাবে রিঅ্যাক্ট করছে, ওর মুখে একটা আতঙ্ক আছে। মনে হচ্ছে ফোনটার মধ্যে কিছুর একটা ওজন আছে।” মিনু চিন্তিত চোখে তাকিয়ে বলল, “হ্যাঁ, একটা ফোন চুরি যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যদি কারও মুখে ভয় চলে আসে, তবে ফোনে এমন কিছু ছিল যা সে কারো দেখাতে চায় না। শুধু ছবি বা মেসেজ নয়, হয়ত কিছু প্রমাণ বা গোপন কিছু।” সোহম তখন বলল, “তাহলে এখন থেকে আমরা যা দেখব, সেটা শুধু একটা চুরির তদন্ত নয়—এই ক্যাম্পাসের অন্ধকার দিকগুলো একে একে প্রকাশ পাবে। আমি বলছি, আমাদের চারজনের একটা ‘ইনফর্মাল ইনভেস্টিগেশন’ শুরু করা উচিত। কেউ ভাববে মজা করছি, কিন্তু আমাদের কাজ সত্যিটা খুঁজে বের করা।” বাকিরা একটু অবাক হলেও রাজি হয়ে গেল। রোহান তখনও ক্যাফের এক কোণে চুপচাপ বসে, ফোন ফিরে পাওয়ার আশা প্রায় ছেড়ে দিয়েছে। সে বুঝতেও পারছে না, ঠিক কাকে বিশ্বাস করবে আর কাকে নয়। কিন্তু তার অজান্তেই, সেদিন সেই চারজন বন্ধু ঠিক করে ফেলল—এই মোবাইল চুরির রহস্যের সমাধান না করে তারা থামবে না।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতেই ক্যাফের ভিড় হালকা হয়ে এল। রোদ পড়ে যাওয়ায় আলো নিস্তেজ, বাতাসে যেন ক্লান্তির গন্ধ। চারজন বন্ধু আবার ফিরে এল সেই একই টেবিলে। রোহান ততক্ষণে চলে গেছে, কিন্তু ওর চেয়ারের নিচে কিছু একটা যেন চকচক করছিল। মিনু সেটা হাতে নিল—একটা টিস্যুতে মোড়ানো ছোট কাগজ, তাতে লেখা—“A4 @ 3PM।” প্রথমে মনে হয়েছিল এটা স্রেফ কোনো কাগজের টুকরো, কিন্তু সোহমের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। “A4 মানে কি ওর ক্লাসরুম?” প্রশ্ন করল তৃণা। “না,” বলল সোহম, “আমাদের কলেজে A4 বলতে বোঝায় পুরনো অ্যাকাডেমিক বিল্ডিংয়ের একটা বন্ধ ঘর, যেটা এখন আর ব্যবহার হয় না। রোহান কি কারো সঙ্গে সেখানে দেখা করতে যাচ্ছিল?” রুদ্র বলল, “মানে কি ফোন চুরি হওয়ার আগেই কোনো সিক্রেট মিটিং ছিল?” সোহম বলল, “সম্ভব। কাল তিনটেয় A4-এ গেলে হয়তো কিছু বুঝতে পারব।” চার বন্ধু পরস্পরের দিকে তাকালো—এক চিলতে কৌতূহল, একফোঁটা ভয়, আর অনেকখানি উত্তেজনা মিশে। হয়ত রোহান নিজেই কিছু লুকোচ্ছে। হয়ত কেউ ওকে ব্ল্যাকমেল করছে। হয়ত ফোনটা কে নিয়েছে সেটা জানা সহজ হবে না। ক্যাফের একটি মোবাইল চুরি, অনন্যার হঠাৎ উঠে যাওয়া, রোহানের মুখে আতঙ্ক, আর সেই কাগজে লেখা একটি সাদা সংকেত—সব মিলিয়ে আগামীকাল তিনটে যেন তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় কিছু প্রকাশ করতে চলেছে। বাইরে ক্যাম্পাসে বাতাস একটু ঠান্ডা, আলো ফুরিয়ে আসছে, কিন্তু চার বন্ধুর চোখে তখন আলো জ্বলে উঠেছে। কলেজ লাইফের সেই নিখাদ আনন্দ, সেই ছেলেমানুষি হাসি—তার পেছনে যে এমন অদ্ভুত ও গা ছমছমে রহস্য লুকিয়ে আছে, সেটা তারা কোনওদিন ভাবেনি।
২
পরদিন দুপুরে কলেজের আকাশ যেন একটু বেশি নীল ছিল, কিন্তু চার বন্ধুর মুখে স্পষ্ট ছিল উত্তেজনা আর অদৃশ্য এক টান। তিনটে বাজতে তখনও কিছুটা সময় বাকি, কিন্তু সোহম, তৃণা, রুদ্র আর মিনু আগেভাগেই পৌঁছে গিয়েছিল পুরনো অ্যাকাডেমিক বিল্ডিংয়ের সামনে। এই বিল্ডিংটি কলেজের মূল ক্যাম্পাস থেকে একটু দূরে, ঝোপঝাড়ে ঘেরা, দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে, ছাদ থেকে লতা ঝুলে আছে—যেন সময় ভুলে গিয়েছে এই ঘর। অনেকদিন আগেই এখানে ক্লাস বন্ধ হয়ে গেছে, এখন কেবল প্রশাসনিক রেকর্ড রাখা হয়, বা কোনও শিক্ষক দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে বসেন একা চুপচাপ। কিন্তু “A4 ঘর” ছিল এই বিল্ডিংয়ের সবচেয়ে রহস্যময় জায়গা—ঘরের দরজা প্রায় সারা বছর বন্ধ, মাঝে মধ্যে হয়তো কোন পিয়ন এসে ঝাঁট দেয়, তাও মাসে একবার। সেদিন তাদের কারোর মুখে বেশি কথা ছিল না। রুদ্র খানিকটা ঠাট্টার ছলে বলল, “আচ্ছা, যদি কেউ ভেতরে থেকে লুকিয়ে থাকে আর হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ে?” মিনু বলল, “আমরা তো সিনেমায় না, রুদ্র।” কিন্তু তৃণা বলল, “অবশ্যই সিনেমার মতোই মনে হচ্ছে, এই মোবাইল চুরির পর যা ঘটছে…” সোহম চুপচাপ ঘরের জানালার ফাঁক দিয়ে চোখ রাখছিল। ঘরটি ভিতর থেকে অন্ধকার, তবে দরজার নিচ দিয়ে হালকা আলো ফাঁসছে। হঠাৎই কারা যেন ধীর পায়ে আসছে এমন শব্দ শোনা গেল। চারজন চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল। ঘড়ির কাঁটা বলছে ঠিক ৩:০২। কেউ একজন এলো, কিন্তু তারা কেউ না—এলো অনন্যা রায়। ওর মুখে কাঁপুনি, চোখে লজ্জা আর একটু ভয়। সোহম এগিয়ে গেল সামনে, জিজ্ঞেস করল, “তুমি এখানে কেন এসেছো, অনন্যা?” অনন্যা ঘেমে গিয়েছে, বলল, “আমার সঙ্গে কেউ দেখা করতে বলেছিল… রোহান।” বাকিরা চমকে উঠল। সোহম বলল, “রোহান ফোন চুরির আগেই এই জায়গার কথা বলেছিল বুঝি?” অনন্যা বলল, “হ্যাঁ। আমি কিছু বলতে পারিনি তখন। ভয় পেয়েছিলাম…” হঠাৎ করেই ভিতরের দরজা একটু খোলে, আর ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে এমন একজন, যাকে দেখে চারজন বন্ধুই স্তব্ধ হয়ে যায়—তানভীর সিদ্দিকী।
তানভীর, আইটি বিভাগের ছাত্র, শান্ত স্বভাবের, যাকে কেউ কখনও উচ্চস্বরে কথা বলতে দেখেনি। ছেলেটা সবসময় কম্পিউটার, কোডিং, আর প্রযুক্তির দুনিয়াতেই বুঁদ থাকে। ওর মুখে তখন চাপা অভিব্যক্তি, চোখে যেন ধরা পড়ে গিয়েছে এমন অপরাধীর মতো ছায়া। সোহম বলে উঠল, “তুমি এখানে কী করছো?” তানভীর মুখ নামিয়ে বলল, “আমি… আমি রোহানের ফোন পাই।” বাকিরা চমকে উঠল। “মানে?” রুদ্র চিৎকার করল। তানভীর মাথা তুলে বলল, “সেইদিন ক্যাফেতে, রোহান যখন উঠে গেল, আমি তার টেবিলের পাশে বসেছিলাম। আমি খেয়াল করেছিলাম ফোনটা রাখা আছে। আমি জানতাম ফোনে এমন কিছু আছে যেটা আমি জানলে ভালো হয়…” তৃণা রেগে গিয়ে বলল, “তুমি মানে চুরি করেছো!” তানভীর বলল, “না, আমি সেটা বলতে চাইনি। আমি ফোনটা নিই, কারণ রোহান অনেকদিন ধরে একটা মেয়েকে নিয়ে ব্ল্যাকমেল করছিল। আমি সেটা বুঝেছিলাম, আর ফোনে তার প্রমাণ ছিল।” সবাই হতবাক। “কাকে?” মিনু কাঁপা গলায় প্রশ্ন করে। তানভীর একবার অনন্যার দিকে তাকায়। মেয়েটি চোখ নামিয়ে ফেলে। সবটা যেন এখন পরিষ্কার—রোহান ফোনে অনন্যার ব্যক্তিগত কিছু ছবি বা তথ্য পেয়ে তাকে হুমকি দিচ্ছিল, আর সেই চাপে অনন্যা দিনের পর দিন ক্লাসে নিঃশব্দ হয়ে থাকত, আর আজ এই “A4 ঘর” ছিল রোহানের সঙ্গে অনন্যার একটি চূড়ান্ত মিটিং, যেটা বাধ্যতামূলক ছিল, হয়তো শর্ত ছিল কিছু দিতে হবে। কিন্তু তানভীর হয়তো এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করেই ফোন নিয়েছিল। সোহম সামনে এগিয়ে বলল, “তুমি ফোনটা কোথায় রেখেছো?” তানভীর একবার ব্যাগ খুলে একটি মোবাইল বের করল—রোহানের সেই ফোন। সোহম সেটা হাতে নিয়ে বলল, “এটা কলেজ অথরিটির কাছে দিতে হবে। ব্ল্যাকমেলিং ক্রাইম। তুমি যদি সত্যি সত্যি প্রতিবাদ করেছো, তোমার সেই সাহসের সম্মান প্রাপ্য। কিন্তু আইন হাতে নেওয়া অন্য কথা।” অনন্যার চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছিল, মিনু তার পাশে গিয়ে হাত রাখল। সোহম বুঝে গেল, আজ একটা অন্যায় থামানো গেল, কিন্তু এরকম আরও গল্প লুকিয়ে আছে হয়তো এই ক্যাম্পাসেই।
বিকেল তখন গড়িয়ে যাচ্ছে। চারপাশের আলো একটু কমছে, পাখিরা ফিরে যাচ্ছে বাসায়। A4 ঘরের স্যাঁতসেঁতে গন্ধ, দেওয়ালের পুরনো চুনকাম, ধুলোবালি—সব কিছু যেন সাক্ষী থাকল এক অপ্রকাশিত সত্য প্রকাশের। রোহান তখনও জানে না তার ফোন ফেরত এসেছে, এবং তার মুখোশ খুলে যাচ্ছে একেকটা সত্যের আলোয়। অনন্যা মুখ তুলে বলল, “আমি পুলিশে যেতে চাই না, আমি চাই না আমার বাবা-মা কিছু জানুক। কিন্তু আমি চাই, রোহান যেন আর কাউকে এমন না করে।” সোহম মাথা নেড়ে বলল, “ভরসা রাখো। ওকে কলেজ অথরিটি ডিল করবে, আর আমাদের চারজনের ওপর এখন একটা দায়িত্ব এসে গেছে। যদি কেউ আমাদের মতো ভয় না পায়, আমরা তাকে ভয় কাটাতে সাহায্য করব।” মিনু চুপচাপ একটা ছবি তুলে রাখল—ফোনটা, দরজা, আর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অনন্যা ও তানভীরকে। ওর নোটবুকে লেখা থাকবে এই দিনের গল্প। রুদ্র চুপচাপ বলল, “ভেবেছিলাম মজার তদন্ত হবে, কিন্তু এখানে তো মানুষ ভেঙে যাচ্ছে…” তৃণা বলল, “হ্যাঁ, কিন্তু এই ভাঙনের মধ্যেই তো আসল গড়ার জায়গা তৈরি হয়।” চারজন একসঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে কলেজ বিল্ডিংয়ের দিকে ফিরে যাচ্ছিল। তারা জানে না, সামনে আরও কিছু রহস্য আসছে, আরও মুখোশ খোলার পালা। কিন্তু তারা এটুকু জানে—এই ক্যাম্পাসে তারা শুধু বন্ধুই নয়, একেকজন হয়ে উঠেছে অদৃশ্য এক সতর্ক পাহারাদার। মোবাইল চুরির এই ঘটনার ভেতরে যে এতটা গভীর অন্ধকার লুকিয়ে ছিল, সেটা তারা কখনও কল্পনাও করতে পারেনি। আর এখন সেই অন্ধকার সরানোর দায়িত্ব তারা নিয়েছে নিজেরাই—চুপচাপ, সজাগ আর সাহসের সঙ্গে।
৩
কলেজের পরদিন সকালটা অন্য রকম ছিল। ক্যাম্পাসের বাতাসে এক অদ্ভুত স্তব্ধতা যেন জমে ছিল, ঠিক যেমন ঘটে কোনো অজানা অশান্তির আগের মুহূর্তে। চার বন্ধু – সোহম, তৃণা, রুদ্র আর মিনু – আগের দিনের A4 ঘরের ঘটনার পর মানসিকভাবে বেশ চাপে ছিল, যদিও তারা প্রকাশ করছিল না। তবে তারা বুঝে গিয়েছিল, রোহান মালিক শুধু মোবাইল হারানোর জন্যই নাটক করছে না, বরং নিজের কুকর্মকে চাপা দেওয়ার জন্যই সবটা সাজাচ্ছিল। কলেজ প্রশাসনের হাতে ফোনটি তুলে দেওয়ার পর থেকেই রোহান ক্লাসে একরকমভাবে চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল। কাউকে কিছু বলছিল না, এমনকি অনন্যার দিকে তাকাতেও সাহস পাচ্ছিল না। কিন্তু রহস্য এখানেই শেষ হয়নি। সোহম লক্ষ্য করেছিল, মোবাইল ফেরত পাওয়ার পরও রোহানের মধ্যে একটা ভয়ের ছাপ রয়ে গিয়েছিল—যেন ফোনের ভেতরে এমন কিছু ছিল যা এখনও উদ্ধার হয়নি, কিংবা আরও কেউ জানে সেই গোপন। ওদের তদন্ত অসমাপ্ত, সেটা ও স্পষ্ট বুঝেছিল। সেইদিন সকালে ক্লাস শুরুর আগে সোহম একা একা লাইব্রেরি বিল্ডিংয়ের পেছনে গিয়েছিল। সেখানেই হঠাৎ মুখোমুখি হয় সে শিবাংশু সেনের—ফিজিক্স অনার্সের এক শান্ত ছেলেকে, যে সাধারণত খুব একটা মিশে না, বই আর ব্ল্যাকবোর্ডই ওর পৃথিবী। কিন্তু আজ শিবাংশুর মুখে উদ্বেগ, সোহমকে একপাশে ডেকে নিয়ে বলে, “ভাই, রোহানের ওই ফোনে আমি কিছু দেখেছিলাম… একদিন ওর ক্লাউড এক্সেস হ্যাক করে ঢুকেছিলাম।” সোহম অবাক হয়, কিন্তু শিবাংশু যা বলে, সেটা শুনে মাথা ঘুরে যায়—“ও শুধু অনন্যাকে না, আরও দু’জন মেয়েকে ব্ল্যাকমেল করত… ভিডিও ক্লিপ বানিয়ে রাখত, আর সব ফোল্ডার রাখা ছিল ‘BWB’ নামে।” সোহম জিজ্ঞেস করে, “BWB?” শিবাংশু একটু ইতস্তত করে বলে, “Blackboard Behind… ব্ল্যাকবোর্ডের পেছনে। ওদের ক্যাম্পাসে একটা নির্দিষ্ট ক্লাসরুম আছে, যেখানে ব্ল্যাকবোর্ডের পেছনে একটা গোপন জায়গায় ও একটা পেনড্রাইভ রেখে আসত, যেন প্রমাণ সবসময় হাতের বাইরে থাকে, কেউ ধরতেও না পারে।”
এতক্ষণে ছবিটা আরও পরিষ্কার হয়ে উঠল। রোহান নিজের মোবাইল হ্যাক হতে পারে বুঝেই আসল ফাইলগুলো সরিয়ে রেখেছিল অফলাইন ড্রাইভে। সোহম সাথে সাথে খবর দিল বাকিদের—তৃণা, রুদ্র, মিনু। তারা সবাই মিলে স্থির করল, ব্ল্যাকবোর্ডের সেই গোপন জায়গাটা খুঁজে বের করতেই হবে। শিবাংশুর কথামতো তারা পৌঁছোল “C2” ক্লাসে—বায়োলজি বিভাগের পুরনো ল্যাব ক্লাসরুম, যেখানে বড় বড় খাপ খুলে রাখা ব্ল্যাকবোর্ড ছিল। ঘরটা কিছুদিন আগেই পরিত্যক্ত হয়েছিল ল্যাব সংস্কারের জন্য, তাই এখন একপ্রকার ফাঁকা। ঘরে ঢুকেই একটা অদ্ভুত গন্ধ এসে নাকে লাগে—পুরনো কেমিক্যাল, ধুলো, আর অজানা কিছু পচে যাওয়ার গন্ধ যেন। রুদ্র হাসিমুখে বলল, “ব্ল্যাকবোর্ডের পেছনে গুপ্তধন খোঁজার মুডে আছি!” কিন্তু বাকিদের মুখে সে রকম হাসি নেই, বরং অদ্ভুত রকমের সতর্কতা। ব্ল্যাকবোর্ডটা তিনজন মিলে একটু টানতেই তার পিছনে বেরিয়ে এল একটা কাঠের প্যানেলের গহ্বর, যেখানে সত্যি সত্যিই গোঁজা ছিল একটা পুরনো পেনড্রাইভ—ধুলোতে ভর্তি, কিন্তু অক্ষত। তৃণা সেটি হাতে তুলে নিয়ে বলল, “এবার বোঝা যাবে আসলে এই ছেলেটি কী করত।” পেনড্রাইভটি সেদিনই মিনুর ল্যাপটপে খুলে দেখা হয়। ভিতরে ছিল বেশ কয়েকটি ফোল্ডার, যার একটির নাম “BWB” এবং বাকিগুলি কৌশলে ছদ্মনামে রাখা—“Notes,” “Assignment backup,” “Voice Memo”—সবই আসলে ছিল গোপন ভিডিও, ভয়েস রেকর্ড, এমনকি স্ক্রিনশট, যেখানে মেয়েদের ব্যক্তিগত চ্যাট পর্যন্ত ছিল। সোহম বাকিদের দেখে বলল, “এখনো যদি আমরা মুখ বন্ধ রাখি, তবে আমরাও এই অন্যায়ের শরিক হয়ে যাবো।” সেই মুহূর্তে তারা সবাই একমত হয়—কোনো দ্বিধা না রেখে, আজই কলেজ অথরিটির কাছে এই প্রমাণ তুলে দিতে হবে। যদিও তারা জানত, রোহান প্রভাবশালী—তার বাবা কলেজ গভর্নিং বডির সদস্য, পুলিশ ডাকলে বড় ঝামেলা হবে। কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গেলে এই ভয় অতিক্রম করতেই হবে। অনন্যা ও অন্য দুই মেয়েকে না জানিয়ে তারা এই পদক্ষেপ নেবে না—এটাই ঠিক করে তারা।
বিকেলে যখন কলেজের ডেপুটি প্রিন্সিপালের ঘরে তারা ঢুকল, তখন বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল। বাইরের সেই মেঘলা আকাশ যেন প্রতিফলিত হচ্ছিল ঘরের ভেতরের পরিবেশে। চারজন চুপ করে বসে, পেনড্রাইভ এগিয়ে দিল। প্রিন্সিপাল প্রথমে চমকে গেলেন, তারপর ভিডিও ফুটেজ দেখে রীতিমতো মুখ কালো হয়ে গেল। কিছু না বলে কলেজ ডিসিপ্লিন কমিটির মিটিং ডাকা হলো, ওদিকে অনন্যা ও অন্য দুই ছাত্রীকে ডেকে জিজ্ঞাসা করা হলো তারা অভিযোগ আনতে চায় কিনা। তিনজনেই কেঁপে কেঁপে সত্যি স্বীকার করল, কিন্তু চায়নি বাড়িতে কিছু জানানো হোক। কলেজ কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিল রোহানকে একাডেমিকভাবে বরখাস্ত করে তদন্ত চলবে, আর আইনি পদক্ষেপ নিতে হলে ছাত্রীদের অনুমতি লাগবে। ক্যাম্পাসে খবরটা ছড়িয়ে পড়তেই কেউ বিশ্বাস করতে পারছিল না—যে ছেলেটি এতদিন ‘কুল’ ছিল, যার ফলোয়ার ছিল অসংখ্য, সে এমন নোংরা কাজ করত! তবে সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল, এই পুরো ঘটনাটির শুরু হয়েছিল একটি ছোট মোবাইল চুরি দিয়ে, যা আসলে ছিল একটি পর্দা—যার আড়ালে চাপা পড়ে ছিল অত্যন্ত ভয়ঙ্কর, নারকীয় এক বাস্তবতা। ক্লাসমেটরা ধীরে ধীরে চার বন্ধুর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল, যদিও কেউ কেউ বলল—“আরও ঝামেলা বাড়াতে কি দরকার ছিল?” কিন্তু সোহম বলল, “এই চুপ করে থাকাটাই তো ঝামেলার শিকড়। যদি আমরা কেউ আওয়াজ না তুলি, তবে অন্যায়টা নিয়ম হয়ে যায়।” দিন শেষে মিনু তার ডায়েরিতে লিখল—“আজ একটা ব্ল্যাকবোর্ড শুধু লেখার জায়গা নয়, সত্যি গোপন করবার জায়গা হিসেবেও দেখা গেল। কিন্তু কিছু ব্ল্যাকবোর্ড ধুয়ে ফেলা দরকার, কালি মুছে ফেলতে না পারলে নতুন কিছু লেখা যায় না।” বাইরে তখন রোদ উঠেছে, বৃষ্টির পর ক্যাম্পাস যেন আবার ধোয়া হয়ে গেছে। ছেলেমেয়েরা চায়ের স্টলে, মাঠে, করিডোরে আবার নিজেদের মতো। চার বন্ধু জানে—এটাই জীবনের আসল ক্যাম্পাস, এখানে প্রতিদিনই একটা নতুন ক্লাস শুরু হয়, আর তাদের কাজ সেই ক্লাসে প্রশ্ন তুলতে শেখা।
৪
কলেজের করিডোরটি যেদিন থেকে রোহান বরখাস্ত হলো, সেদিন থেকেই এক অদ্ভুত রকম নীরবতার ভেতর ঢুকে পড়ল। এই করিডোর দিয়েই প্রতিদিন অসংখ্য পদচারণা, হাসির দুলুনি, প্রেমপত্র গুজগুজানি, পরীক্ষা-পূর্ব কাঁপুনি—সবকিছুর সাক্ষী ছিল, অথচ আজ এই করিডোর যেন হাঁপিয়ে উঠেছে। দেয়ালের পিলারে জড়িয়ে থাকা স্মৃতি ও গুঞ্জন হঠাৎ করেই যেন নিঃশব্দে মাথা নামিয়ে ফেলেছে। চার বন্ধুর দিকে সবাই তাকাচ্ছে, কেউ মুগ্ধ চোখে, কেউবা কিঞ্চিত আড়ষ্ট হয়ে—যেন তারা এমন কিছু করেছে যা সাহসিকতা ও ঝুঁকির মিশেলে তৈরি। কিন্তু তারাই জানে, সত্যি বলার দায় কেমন গা ঘেঁষে চলে। সোহম বুঝতে পারছিল, স্রেফ রোহান নয়, ক্যাম্পাসের একেকটা করিডোর, ক্লাসরুম, এমনকি ছাত্রী-শৌচাগারেও লুকিয়ে আছে বহু ‘অজানা অপরাধ’। আগে সে কখনও ভাবেনি, কলেজ এমন এক জায়গাও হতে পারে যেখানে বন্ধুত্বের মুখোশের আড়ালে তীব্র ষড়যন্ত্র লুকিয়ে থাকতে পারে। সেইদিন দুপুরে, ক্লাস শেষ হতেই তৃণা হঠাৎ জানায়, “আমাদের আরও কিছু মেয়ের সঙ্গে কথা বলা উচিত। হয়তো এদের অভিজ্ঞতা, ভয়—সব কিছু আজ আমাদেরই শোনা উচিত।” মিনু সায় দিল, “একটা গোপনীয় আলোচনা, যেখানে কেউ কাউকে বাধ্য করবে না, শুধু শোনা হবে।” পরদিন কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের একাংশকে নিয়ে তারা আয়োজন করল একটি “ওপেন-সার্কল” সেশনের—পুরনো সেমিনার হলের এক কোণে। কোনও শিক্ষক ছিল না, কোনও রেকর্ডারও নয়, কেবল চারজন বন্ধু বসে ছিল বৃত্তের মাঝে, আর একে একে বসতে শুরু করল দশজন মেয়ে, যাদের চোখে ছিল দ্বিধা আর ঠোঁটে বহুদিন চেপে রাখা গল্প। কেউ বলল, “রোহান শুধু না, আরও কয়েকজন ছেলে ওর সঙ্গে ছিল।” কেউ বলল, “প্রথম বর্ষেই এক সিনিয়র আমাকে রাত্তিরে মেসেজ পাঠাত, স্ক্রিনশট নিয়ে হুমকি দিত।” আবার একজন চুপ করে বলল, “আমি চেয়ারম্যানের ছেলের বিরুদ্ধে কিছু বলিনি, কারণ জানতাম প্রমাণ করতেও পারব না।”
সোহম আর তৃণা স্তব্ধ হয়ে শুনছিল, কথাগুলো যেন এক একটা কাঁটা হয়ে শরীর বেয়ে ঢুকছে। তারা জানত না এত অভ্যন্তরীণ ভয়, এত চুপচাপ নির্যাতনের ইতিহাস লুকিয়ে আছে এই আধা-আধুনিক কলেজের আধুনিক সাজে ঢাকা দেওয়ালে। সেই আলোচনায় মিনু একটা লাইন বলল, যা সবাইকে নড়েচড়ে বসতে বাধ্য করল—“যতক্ষণ না তোমার কথা কেউ শোনে, ততক্ষণ তোমার ভয় চিরন্তন হয়ে থাকে। কিন্তু কেউ শুনলে ভয়টাও একটু একটু করে পিছু হটে।” এই লাইনটার পরে চারপাশের বাতাস যেন হালকা হয়ে এল। মেয়েরা একটু সাহস পেল, কেউ কারো কাঁধে হাত রাখল, কেউ চোখ মুছল। রুদ্র বলল, “আমরা কেউ পারফেক্ট না। কিন্তু এই মুহূর্ত থেকে আমরা যদি একে অপরকে নিরাপদ রাখার দায় নিই, তাহলে ভবিষ্যতের ক্যাম্পাসটা একটু হলেও আলাদা হবে।” সেশন শেষে সবাই একে অপরের দিকে তাকিয়ে একটা চোখের ইশারায় বলল, ‘ধন্যবাদ’। এই ছোট্ট উদ্যোগ যেন এক পাথরে হাত রাখার মতো—যা একদিন হয়তো বড় কোনও আন্দোলনের বীজ হয়ে উঠবে। কিন্তু ঠিক তখনই বাইরে থেকে কেউ একজন জানাল, “রোহান কলেজে এসেছে।” সোহম উঠে দাঁড়াল, “এখানে?”—সবাই চমকে গেল। বরখাস্ত হওয়ার পর কলেজে পা রাখার অনুমতি ছিল না তার। তারা দৌড়ে গেল মূল করিডোরে—সেই পুরনো চকচকে করিডোর, যেটা আজ নিঃশব্দ, অথচ তাতেই দাঁড়িয়ে রোহান, একা, মুখ কালো, হাতে মোবাইল। সবাই তাকে ঘিরে ধরল না, কেবল দূর থেকে তাকিয়ে রইল। রোহান এগিয়ে এসে সোহমের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “আমার বাবা চেষ্টা করছে আমাকে ফেরাতে… প্রশাসনে কথা বলছে।” সোহম ঠান্ডা গলায় বলল, “আমরা জানতাম। কিন্তু আমরা ভয় পাই না। তুমি ফিরলেও এই কলেজের মুখোমুখি সত্য পাল্টাবে না।” রোহান একটু থেমে বলল, “আমি জানি, আমি যা করেছি, সেটা মাফ পাবার মতো না। কিন্তু…” ও কিছু বলতে পারল না, গলা আটকে গেল। সোহম তাকে চোখে চোখ রেখে বলল, “তুমি চাইলে ক্ষমা চাও, কিন্তু মনে রেখো, এই করিডোরে আরও অনেক চিৎকার এখনও ওঠেনি। আজ শুধু তুমি ধরা পড়েছো, কাল আমরা আরও মুখোশ খুলব।” রোহান মাথা নামিয়ে সরে গেল, আর সেই মুহূর্তে করিডোরের নীরবতা যেন ফেটে গিয়ে এক ধ্বনির রেশ ছড়িয়ে দিল—একটি সাহসী প্রজন্ম, যারা অন্যায়ের ভয়ে নত নয়, বরং প্রশ্ন করতে জানে।
সন্ধ্যার আলো পড়তে পড়তে ক্যাম্পাস ধীরে ধীরে ফাঁকা হতে লাগল। গাছের পাতা গা ছুঁয়ে বাতাসে দুলছে, যেন তারাও হাঁপ ছেড়ে বাঁচছে। চার বন্ধু সেদিন একসঙ্গে ক্যাফেতে ফিরে এল, যেখানে সবকিছু শুরু হয়েছিল। বুবাইদা চা দিতে দিতে বলল, “আজ তোমাদের চা ফ্রি, হিরোদের চা টাকা নেয় না।” সবাই হেসে উঠল। এই হাসির মধ্যেও এক ক্লান্তি, এক স্বস্তি আর একটু কষ্ট ছিল। সোহম তাকিয়ে দেখল সেই করিডোরটা, যেখানে অনেক গল্প লেখা হয়, আবার মুছেও যায়। সে বুঝল, এই নীরব করিডোর শুধু স্মৃতি নয়, বিপ্লবের পথও হতে পারে। কলেজের প্রতিটি ইট যেন আজ তাদের নামে একটি করে অনুচ্ছেদ লিখছে—যেখানে শুধু ক্লাস নয়, জীবনেরও শিক্ষা মিলছে। ক্যাফের সেই টেবিলে বসে তারা চারজন চুপচাপ চা খেল, মুখে আলো-আঁধারির খেলা। তৃণা বলল, “একেকটা কেস যেন আস্ত এক উপন্যাস।” রুদ্র বলল, “আর আমরা সেই উপন্যাসের ডিটেকটিভ!” মিনু বলল, “ডিটেকটিভ নয়, পাহারাদার।” সোহম চুপ করে তাকিয়ে থাকল আকাশের দিকে। সূর্য অস্ত যাচ্ছে, কিন্তু তার রঙে আজও আগুন। ঠিক যেমন তাদের ভেতরটাও এখনো পোড়ায়—সত্যের খোঁজে, সাহসের ডাকে। এই ক্যাম্পাসে ক্যাফে থেকে A4 ঘর, ব্ল্যাকবোর্ডের পেছনের গোপন রহস্য, আর সাইলেন্ট করিডোর—সব কিছুর মাঝখানে তারা চারজন দাঁড়িয়ে, সময়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে।
৫
ঘটনাগুলোর মধ্যে দিয়ে কেটে যাওয়া প্রতিটা দিন যেন কলেজের প্রতিটি দেয়ালে কিছু গোপন শব্দ রেখে যায়। সেদিন ছিল শুক্রবার। একটা অদ্ভুত নিঃশব্দ ভর করেছিল গোটা ক্যাম্পাসে। রোহানের বরখাস্ত, ছাত্রীদের সাহসী বক্তব্য, ব্ল্যাকবোর্ডের পেছন থেকে পাওয়া তথ্য—সব মিলিয়ে কলেজ প্রশাসন বাইরে থেকে একরকম হলেও, ভিতরে একটা অস্বস্তিকর কাঁপন শুরু হয়ে গিয়েছিল। শিক্ষকদের মধ্যে অনেকে বলছিলেন, “এইসব করে কলেজের নাম খারাপ হচ্ছে”—আবার কেউ কেউ বলছিলেন, “বাচ্চারা সাহস করেছে, এমন হলে তো অন্যরাও এগোবে।” এই দ্বিমতপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে একদিন হঠাৎ কলেজের মূল ওয়েবসাইটে নতুন একটা লিঙ্ক আসে—“ফিডব্যাক ফর্ম: নিরাপত্তা ও আচরণ সম্পর্কিত”। সাধারণ একটা গুগল ফর্ম, যেখানে ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের অভিজ্ঞতা জানাতে পারবে, নাম না বলেও। তৃণা যখন লিংকটা দেখল, তখনই সে বলল, “এটা ভালো উদ্যোগ… অন্তত কেউ চাইলে নিজের কথা বলতে পারবে।” কিন্তু মিনু গভীরভাবে ফর্মটা দেখে বলল, “একটা বিষয় খেয়াল করেছো? ফর্মটা নামহীন ঠিকই, কিন্তু ফর্মে থাকা cookies-tracking এর মাধ্যমে ইমেইল ID ধরা যাচ্ছে।” সবাই চমকে উঠল। রুদ্র বলল, “মানে কেউ ফর্মে কিছু লিখলে, প্রশাসন বা অন্য কেউ সহজেই বুঝতে পারবে কে লিখেছে?” সোহম বলল, “তাহলে এটা সাহস উৎসাহ দেওয়ার জন্য না, বরং নজরদারি শুরু করার ফাঁদ।” তারা চারজন সাথে সাথেই সিদ্ধান্ত নেয়, ফর্মের ওপরে নজর রাখতে হবে। এরপরের দুই দিনে প্রায় ৪৩টি ফর্ম জমা পড়ে। অধিকাংশ ফর্মে অভিযোগ, অভিজ্ঞতা বা কোনো না কোনো এক ছাত্র বা শিক্ষকের আচরণ সম্পর্কে লেখা থাকে। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তৃতীয় দিনে। হঠাৎ দেখা যায়, সেই ফর্মগুলো একে একে ডিলিট হয়ে যাচ্ছে।
তৃণা ও মিনু ফর্মের ব্যাকএন্ড চেক করে দেখতে পায়, অভিযোগগুলোর ২০টির বেশি ‘Removed by Admin’ ট্যাগ পড়েছে। সোহম বলে, “মানে এখানে কেউ চেষ্টা করছে সত্যকে ঢেকে দিতে।” রুদ্র গম্ভীর গলায় বলে, “এটা আর শুধু একজন রোহানের গল্প নয়, এটা আরও গভীরে ছড়ানো…” তখন তারা সিদ্ধান্ত নেয় ফর্মে কিছু ‘নকল’ অভিযোগ জমা দেবে, যাতে বোঝা যায় কাকে টার্গেট করা হচ্ছে। তারা ছদ্মনামে লিখল—“C2 ক্লাসে এক সিনিয়র মেয়ে প্রথম বর্ষের মেয়েদের উপরে মানসিক চাপ দিচ্ছে” বা “লাইব্রেরিতে এক অধ্যাপক ছাত্রদের অকারণে প্রশ্ন বন্ধ করে দেন”—এইসব স্বাভাবিক অভিযোগের মধ্যে কয়েকটি ছিল সত্যিকারের অভিযোগ, বাকিগুলো টেস্ট কেস। ফলাফল ভয়ঙ্কর। যেসব অভিযোগ অধ্যাপক বা প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ কারও বিরুদ্ধে, সেগুলোই একে একে মুছে ফেলা হচ্ছে। আর যেগুলো সাধারণ বা কম প্রভাবশালীদের নামে, সেগুলো এখনো জমা আছে। মিনু বলল, “মানে সত্যকে সেন্সর করার এক নতুন কৌশল চলছে।” ঠিক সেই মুহূর্তে সোহমের ইমেইলে একটা অদ্ভুত মেইল আসে—বিষয়: “তুমি খুব সাহসী… কিন্তু সবাই সাহস পছন্দ করে না।” আর কেউ না, পাঠিয়েছে shadowform.feedback@protonmail.com থেকে। ইমেইলের মধ্যে কোনো লেখা নেই, শুধু একটা PNG ফাইল—ফিডব্যাক ফর্মের স্ক্রিনশট, যেখানে মিনু ছদ্মনামে করা একটি অভিযোগ হাইলাইট করা। তারা বুঝে গেল, কেউ শুধু ফর্ম ট্র্যাক করছে না, বরং তাদের চারজনের গতিবিধি, IP লগ, ডিভাইস আইডি পর্যন্ত ট্র্যাক করছে। এই ঘটনা একেবারে পালটে দিল পরিস্থিতি। কলেজ প্রশাসনের ভেতরেই কেউ আছে—যে বাইরের মুখোশে সুশৃঙ্খল, কিন্তু ভিতরে সে সব কিছুর ওপরে নজরদারি চালাচ্ছে। এবং এখন সে জানে—এই চারজনই মূল খেলোয়াড়।
সেদিন সন্ধ্যায় ক্যাফের পিছনের বেঞ্চে বসে তারা গভীর আলোচনা করে। মিনু বলল, “আমরা যে পথ বেছে নিয়েছি, সেটা সহজ হবে না। এখন থেকে আমাদের শুধু সত্য খুঁজে বার করলেই চলবে না, নিজেরাও নিরাপদ থাকতে হবে।” সোহম বলল, “আমাদের যেকোনো ফোন, মেইল, চ্যাট—সব মনিটর হচ্ছে ধরে নিতে হবে।” তৃণা তখন বলল, “তবে এখন আমাদের দরকার একজন ভেতরের লোক—অ্যাডমিন বা সিস্টেমসের কেউ, যে আমাদের সাহায্য করতে পারে।” ঠিক তখনই রুদ্র একটু দ্বিধায় বলল, “আমার এক বন্ধু আছে… নাম সৌরভ ঘোষ, কলেজের IT cell-এ কাজ করে। ও হয়তো আমাদের সাহায্য করতে পারে।” সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, রুদ্রই সৌরভের সঙ্গে যোগাযোগ করবে, আর বাকিরা ফিডব্যাক ফর্মের প্রমাণ সংগ্রহে মন দেবে। কিন্তু সেদিন রাতে, মিনুর ফোনে হঠাৎ একটা ম্যাসেজ আসে—“Don’t play heroes. Heroes fall first.” আরেকটি নামহীন নম্বর থেকে আসা হুমকি। কিন্তু এইবার তারা ভয় না পেয়ে আরেকটু শক্ত হয়। কারণ তারা জানে, শত্রু যখন ভয় দেখায়, তখন সে জানে তার অবস্থান দুর্বল। ক্যাম্পাসে নীরবতা বাড়ছে, অথচ শব্দগুলো এখন ছায়ার মতো ধরা পড়ছে। করিডোরে ছাত্রছাত্রীদের ফিসফিসানি শুরু হয়েছে—“নতুন কি ঘটবে?”, “কীভাবে এতকিছু জানছে ওরা?”, “আরও কি আছে?” আর এই নীরব উত্তরের মাঝেই সোহম একটি নোটবুকে লিখে রাখে—“যে দেয়াল চুপ করে থাকে, তার পেছনে সবচেয়ে বেশি গল্প জমে। আর যখন দেয়াল ফাটে, শব্দ হয় না, বিস্ফোরণ হয়।”
৬
কলেজের সেন্ট্রাল লাইব্রেরির পাশেই এক ছোট্ট ভবন, নাম “কম্পিউটার অপারেশন ইউনিট”—সেখানেই কাজ করে সৌরভ ঘোষ, কলেজের অফিশিয়াল আইটি সাপোর্ট টেকনিশিয়ান। সকাল দশটার দিকে রুদ্র যখন সৌরভকে ফোন করে, ও একটু ঘাবড়ে গেল। “তুই এত সকালে ফোন করলি? কিছু হয়েছে?” রুদ্র তখন আর দেরি না করে ওদের পুরো কাহিনি ছোট করে বুঝিয়ে দেয়—ফিডব্যাক ফর্ম, অজানা ইমেইল, এবং অভিযোগগুলো ডিলিট হয়ে যাওয়ার বিষয়। সৌরভ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “তোরাই প্রথম না, যারা এই ফর্ম নিয়ে সন্দেহ করল।” রুদ্র বিস্মিত হয়ে বলে, “মানে?” তখন সৌরভ জানায়—মাত্র তিনদিন আগে এক ছাত্রী, নাম অনুষ্কা, ওর কাছেও এসেছে। সেই অনুষ্কা বলেছিল যে, ফর্মে দেওয়া অভিযোগের পরে তার গার্জিয়ানের কাছে ফোন গিয়েছিল, অথচ অভিযোগে কোনো পরিচয় ছিল না। সে ভয় পেয়ে চুপ করে যায়, আর এখন কলেজে আসেও না। সৌরভ এরপর বলে, “আমি জানতাম কিছু একটা চলছে। আমাদের সার্ভারে একটা ‘ছায়া-অ্যাকাউন্ট’ তৈরী হয়েছে, যেটা ফর্মগুলো মনিটর করছে। সেটা বাইরের কেউ করতে পারে না—কেউ চাইলে অ্যাক্সেস লগ ফেলে দিতে পারে, কিন্তু ওইভাবে সেটিংস বদলানো বা রিয়েল টাইম ফিল্টার লাগানো কেবল একজনই পারে—সিস্টেম অ্যাডমিন পল্লব বিশ্বাস।” রুদ্র হতবাক হয়ে বলে, “ও তো সিনিয়র… ছাত্র হিসেবে IT Cell-এ কাজ করত, এখন চাকরি পেয়েছে কলেজের মেইন সিস্টেম হ্যান্ডল করে।” সৌরভ মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ। ওর অ্যাক্সেস সর্বোচ্চ। আর ও-ই ফর্মের অরিজিনাল ব্যাকএন্ড কোড লিখেছে।” সেদিন বিকেলে রুদ্র, সোহম, তৃণা আর মিনু মিলে সৌরভের সার্ভাররুমে ঢোকে। রুমটা ছোট, কিন্তু দেয়ালজুড়ে পর্দা ঝুলছে, যন্ত্রের গুমগুম শব্দ, আর চারপাশে তারের জঞ্জাল—একটা অদ্ভুত আঁধার জগতের মতো। সৌরভ সবাইকে বসিয়ে বলে, “আমি রিস্ক নিচ্ছি, কিন্তু তোমরা যেটা শুরু করেছো, তার সঙ্গে থাকতে চাই। এসো, দেখি পল্লবের ছায়া-অ্যাকাউন্টে কী কী আছে।”
তখন সৌরভ ওদের একটা পুরনো ডেস্কটপে লগইন করায়, যেখানে সে তার ব্যক্তিগত ‘লগ ড্যাম্পার’ টুল চালায়—এটা এমন এক প্রোগ্রাম যা সার্ভারের প্রতিটি পরিবর্তনের ইতিহাস ধরে রাখে। সেখানেই ধরা পড়ে, ফিডব্যাক ফর্ম চালু হওয়ার পর থেকেই প্রতিটি ফর্ম পল্লবের ব্যক্তিগত এক ইমেইলে অটো ফরওয়ার্ড হচ্ছে—pallav.alpha@eduproxy.in। শুধু তাই না, সৌরভ দেখায়, যেসব অভিযোগ গোপনে মুছে ফেলা হয়েছে, তার তালিকাও আছে। একটির টপিক দেখে সবাই স্তব্ধ—“Cafeteria CCTV Footage Request”। তৃণা অবাক হয়ে বলে, “মানে কেউ ক্যাফের ভিডিওর অনুরোধ জানিয়েছিল, আর সেটা ডিলিট করা হয়েছে?” মিনু ফিসফিস করে বলে, “মানে আরও কিছু লুকোনো আছে…”। তারপর সৌরভ আরেকটি ফোল্ডার খোলে—সেখানে দেখা যায়, কিছু কনভারসেশন লগ। এই চ্যাটগুলো কলেজের ইন্টারনাল ইনস্ট্যান্ট মেসেজ সার্ভিসের—যেটা শুধুমাত্র অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ইউজারদের জন্য বরাদ্দ। সেখানে ‘PB_Admin’ নামে একজন ব্যবহারকারী কথোপকথন চালাচ্ছে আরেকটা ইউজারনেম ‘D-Prin’ এর সঙ্গে। চ্যাটে পরিষ্কার বোঝা যায়—ডেপুটি প্রিন্সিপালের অনুমতি ছাড়াই ফিডব্যাক ফর্মে নজরদারি চালানো হচ্ছে, ছাত্রদের উপর মানসিক প্রভাব ফেলতেই ফর্ম চালু করা হয়েছে। আরও দেখা যায়, কিছু “পার্সোনাল প্রোফাইল” রাখা হচ্ছে—যাদের মধ্যে সোহম, তৃণা, রুদ্র আর মিনুর নামও আছে। ওদের গত এক মাসের গুগল সার্চ, IP লোকেশন, এমনকি ওদের ক্লাস টাইমিং পর্যন্ত রিপোর্ট করা হচ্ছে নিয়মিত। সবটাই হচ্ছে গোপনে, অথচ আইনি ছাড়পত্র ছাড়াই। রুদ্র জোরে শ্বাস নিয়ে বলে, “এটা তো সাইবার ক্রাইম।” সৌরভ মাথা নেড়ে বলে, “আমি জানি। কিন্তু কারও হাতে কিছু নেই কারণ সবাই ভয় পায়… কারণ পল্লবের পিছনে আছে গভর্নিং বডির এক বড় নাম—অরিন্দম মুখার্জি, কলেজ সেক্রেটারি।” সোহম চুপচাপ সবটা শুনে বলল, “আমরা আর চুপ থাকব না। আমাদের শুধু প্রমাণ লাগবে—এই কথোপকথনের স্ক্রিনশট, এই ফরওয়ার্ডিং ট্র্যাক, আর সেই ব্ল্যাকলিস্টেড অভিযোগগুলোর কপি।” সৌরভ বলল, “তাহলে তোমরা আজ রাতে আসো, আমি সব রেডি করে রাখব। কিন্তু সাবধানে থেকো—তোমাদের ফোন, মেইল, সব নজরদারিতে।”
সেদিন রাতে কলেজ থেকে ফিরে মিনু তার ডায়েরিতে একটা লাইন লেখে—“ছায়ারাও কথা বলে, যদি কেউ মন দিয়ে শোনে।” তারা বুঝে গেছে, আর কোনও মোবাইল চুরি নয়, এবার তারা মুখোমুখি সত্যিকারের তথ্যচুরির—যেখানে মানুষের মতামত, অভিযোগ, এমনকি ভয় পর্যন্ত হ্যাক হয়ে যাচ্ছে। চারজন মিলে ঠিক করে, এইবার আর কোনও ক্যাফে টেবিল বা বন্ধ দরজার আড়ালে আলোচনার জায়গা থাকবে না—তারা চুপিচুপি একটা “অ্যাসেম্বলি” ডাকবে, যেখানে তারা প্রকাশ্যে সামনে আনবে এই চক্রান্তের প্রমাণ, সবার সামনে। কিন্তু তারা জানে, এই সিদ্ধান্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ যাকে তারা ফাঁস করতে চলেছে, সে শুধু একজন অ্যাডমিন না, সে একটি কাঠামোর প্রতীক—যেটা ভয় আর নিয়ন্ত্রণ দিয়ে কলেজকে চালায়। রাত্রি তখন গভীর, বাইরের রাস্তার বাতি টিমটিম করে জ্বলছে। চার বন্ধু নিজেদের ফোন অফ করে, একটা পুরনো ডায়াল-টোন ফোনে কথা বলে। তারা বুঝে গেছে, আধুনিক চোখ যেন সব সময় তাদের পেছনে। সৌরভ আগেই সতর্ক করেছে—“তোমাদের সামনে এবার শুধু প্রশাসন না, পুরো কাঠামো দাঁড়িয়ে।” সোহম জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখে, অন্ধকার হলেও আকাশে এখনো একটা তারা জ্বলছে। সে মনে মনে ভাবে, “এই তারা যদি পথ দেখাতে পারে, তাহলে সাহস পথ হারাবে না।” আর তখনই একটা নতুন অ্যালার্ট আসে সৌরভের ফোনে—“Unauthorized backup request detected: Target – Form Feedback Logs”। কেউ বা কিছু বুঝে গেছে—ছায়ার ভেতর এবার আলো ফাটতে শুরু করেছে।
৭
কলেজের সেই অ্যাসেম্বলি হল, যেখানে একসময় বিতর্ক প্রতিযোগিতা, নবীনবরণ বা সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আয়োজন হতো, আজ তা প্রস্তুত হচ্ছিল এক অভূতপূর্ব ঘটনার জন্য—একটি ‘স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র সম্মেলন’। কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে ডাকেনি, অথচ খবর রটে গেছে, আজ বিকেল চারটেয় সেখানে ‘ক্যাফে কেস’ দলের তরফ থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘোষণা করা হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ছাত্র এই মেসেজ ছড়িয়েছে ইনস্টাগ্রামে, WhatsApp গ্রুপে, এমনকি কলেজ ব্লগেও। রুদ্র, তৃণা, মিনু ও সোহম—চার বন্ধু সকাল থেকেই প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। সৌরভ আগের রাতেই তাদের একটি পেনড্রাইভ দিয়েছে—সেখানে রয়েছে প্রমাণের কপি: ফিডব্যাক ফর্ম থেকে ফরওয়ার্ড হওয়া মেইল, মুছে দেওয়া অভিযোগের তালিকা, পল্লবের ইমেইল লগ, আর ‘PB_Admin’ ও ‘D-Prin’ এর মধ্যে কথোপকথনের স্ক্রিনশট। তার সাথে যুক্ত করা হয়েছে অনুষ্কার ভয়েস রেকর্ড, যেখানে সে বলে—“আমার বক্তব্য মুছে ফেলা হয়েছে, আমি ভীত। কিন্তু আমি একা না থাকলে আবার বলতে পারি।” মিনু একটা লাল কাপড়ে পেনড্রাইভ মুড়ে রাখল, যেন সেটাই আজকের সংগ্রামের প্রতীক। চারজন জানত, অ্যাসেম্বলি হলে যা হবে, তা শুধু ক্যাম্পাস ইতিহাসে নয়, বহু ছাত্রের চিন্তায় পরিবর্তন আনতে পারে। তাদের বক্তব্য হবে স্বল্প, কিন্তু প্রমাণভিত্তিক; তৃণা বলল, “আমরা কোনও নেতা না, শুধু চোখ খোলা রাখতে চাইছি।” হলের সামনের সিঁড়িতে তখন ছাত্রছাত্রীরা জড়ো হতে শুরু করেছে—অনেকে জানে না কী হবে, অনেকে জানেও, আবার কেউ এসেছে শুধু গুঞ্জন শুনে। ঠিক ৩:৫৮-এ সোহম মাইক ধরল।
“বন্ধুরা,” তার কণ্ঠ ছিল স্থির, “আজ আমরা কোনও অভিযোগ করতে আসিনি, কোনও নাটক দেখাতে আসিনি। আমরা শুধু দেখাতে এসেছি কিছু সত্য যা আপনারা নিজেরাই বিচার করবেন।” এরপর হলের মাঝখানে রাখা একটি প্রজেক্টরের সামনে দাঁড়িয়ে মিনু লাল কাপড় খুলে পেনড্রাইভটি বের করে লাগাল। স্লাইডে প্রথমেই দেখা গেল সেই মেইল তালিকা—৪৩টি অভিযোগ যেগুলো পল্লব বিশ্বাসের ব্যক্তিগত মেইলে গিয়েছে। পরের স্লাইডে দেখা গেল ‘Removed by Admin’ ট্যাগ। তারপর ভিডিও প্লে করল রুদ্র—একটি রেকর্ডিং যেখানে পল্লব নিজে বলছে, “যে অভিযোগ কলেজের সম্মান ক্ষুণ্ন করে, সেগুলো মুছে দিতেই হবে।” হলজুড়ে ধীরে ধীরে কানাঘুষি শুরু হল, কেউ কেউ ফিসফিস করে বলছে, “ওর তো প্রশাসনের সাথেই লিঙ্ক…” ঠিক তখনই স্ক্রিনে আসে সেই ভয়েস ক্লিপ—অনুষ্কার। তার কাঁপা গলায় বলা কথা, “আমার ওপর চাপ ছিল, আমাকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল, যেন কিছু না বলি।” তারপরে স্লাইডে আসে একটি স্ট্যাটমেন্ট, যেটা সবাইকে কাঁপিয়ে দেয়—“সত্যকে নীরব করলেই সে মিথ্যে হয়ে যায় না, বরং আরও প্রবল হয়ে ওঠে।” সোহম তখন বলে, “আমরা সবাই কলেজে এসেছি জানার জন্য, বেড়ে ওঠার জন্য। যদি আমাদের ভয় দেখিয়ে চুপ করানো হয়, তবে আমরা শিখছি কেবল মাথা নিচু করা। আজ আমরা যদি একসাথে মাথা তুলে দাঁড়াই, তাহলে ভবিষ্যতের কেউ আর একা পড়ে থাকবে না।” তৃণা যোগ করে, “এই ফিডব্যাক ফর্ম ছিল ছায়ার মতো এক হাতিয়ার, যা আলোয় আনা দরকার। আজ সেই আলোয় আমরা সবাই দাঁড়িয়ে।” হল তখন আর নিঃশব্দ নয়—চারদিকে চাপা উত্তেজনা, হাততালি, আর কিছু শিক্ষকের চিন্তিত চাহনি।
আর তখনই সামনে আসে এক চমকপ্রদ দৃশ্য—পল্লব বিশ্বাস নিজেই হলের পেছন দিক দিয়ে ঢুকে পড়ে। চোখে ভয় নেই, কিন্তু এক অদ্ভুত রাগ। “এইভাবে তোমরা আমার বিরুদ্ধে জনমত গড়ছো? প্রমাণ দিয়ে কাউকে ছোট করা যায় না,” সে চেঁচিয়ে ওঠে। কিন্তু তখনই ছাত্রদের ভেতর থেকে কেউ বলে ওঠে, “তুমি তো আমাদের কণ্ঠ বন্ধ করতে চেয়েছিলে!” আরেকজন বলে, “তুমি ক্ষমতায় ছিলে, দায়িত্বে নয়!” একজন অধ্যাপক, যিনি এতক্ষণ চুপ ছিলেন, উঠে দাঁড়িয়ে বলেন, “এই চারজন ছাত্র যা করেছে, সেটা সাহসিকতার নিদর্শন। কলেজে যদি সত্য লুকোনো হয়, তাহলে ছাত্রদের চুপ থাকার অধিকার থাকে না।” পল্লব কিছু বলার আগেই দেখা যায়, ডেপুটি প্রিন্সিপাল নিজে প্রবেশ করছেন। তার হাতে একটি কাগজ, তিনি ঘোষণা করেন, “এই প্রমাণের ভিত্তিতে আমরা প্রশাসনিকভাবে তদন্ত শুরু করছি। ফিডব্যাক ফর্ম স্থগিত করা হলো। আর যাঁরা এর অপব্যবহার করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” সে মুহূর্তে গোটা হল যেন হাওয়ার ঢেউয়ে দুলে ওঠে—চোখেমুখে প্রশান্তি, এক অদৃশ্য জয়ের ছাপ। পল্লব আর কোনও কথা না বলে ঘুরে দাঁড়ায়। চার বন্ধু জানে, যুদ্ধটা এখানেই শেষ নয়, কিন্তু আজ একরকমের মুক্তি এসেছে। সন্ধ্যা নেমে আসছে, হলের আলো ধীরে ধীরে নিভছে। ছাত্ররা বেরিয়ে যাচ্ছে—কেউ বলছে “সালাম ওদের”, কেউ জিজ্ঞেস করছে, “এখন কি হবে?” সোহম ক্যাফের দিকে তাকিয়ে বলে, “যা হবে, সেটা এখন আমরা ঠিক করব।” রুদ্র হেসে বলে, “আজ ক্যাম্পাসে আলো কিছুটা বেশি জ্বলছে মনে হচ্ছে!” মিনু বলে, “আলো তখনই বেশি জ্বলে, যখন কেউ সাহস করে সুইচ অন করে।” তৃণা চুপ করে থাকে, কেবল তার চোখে জল চিকচিক করে—একটা বোবা লড়াই আজ গলা পেয়েছে।
৮
অ্যাসেম্বলি হলের ঘটনার পরে কলেজে এক অদ্ভুত পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করল। ক্যাম্পাসের বাতাসে যেমন হঠাৎ করে ঝিরঝিরে এক সতেজতা নেমে এসেছিল, তেমনি সেই হাওয়ার তলায় জড়ো হচ্ছিল পুরনো ধুলোমাখা ভয় আর গোপন ক্ষোভ। ডেপুটি প্রিন্সিপালের ঘোষণা অনুযায়ী কলেজ প্রশাসন একটি ‘তদন্ত কমিটি’ গঠন করে, যাদের কাজ—প্রমাণ পর্যালোচনা, ছাত্রছাত্রীদের বক্তব্য নেওয়া, এবং অভিযুক্তদের শনাক্ত করা। পল্লব বিশ্বাস আপাতত সাসপেন্ড হয়, কিন্তু তার ছায়া পুরোপুরি সরেনি। চার বন্ধু বুঝতে পারল—এই তদন্ত শুধু পল্লবকে ঘিরে নয়, বরং একটি গোটা ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে। সৌরভ জানাল, “সার্ভারে কিছু ফাইল এমনভাবে এনক্রিপ্টেড, যা সাধারণ সিস্টেম দিয়ে খোলা যাবে না। কিন্তু কেউ একজন ভেতরে থেকেই সেগুলো হাইড করেছে।” তখনই মিনু বলল, “তাহলে পল্লব একা নয়। কেউ বা কারা ছিল তার সাথেও।” তদন্ত কমিটি এক এক করে ছাত্রছাত্রীদের ডাকে—অনুষ্কা, তন্বী, আমন, যশ, এমনকি বুবাইদাকেও। অনেকেই মুখ খোলে, কেউ আবেগে কেঁদে ফেলে, কেউ আবার দুরুদুরু গলায় শুধু বলে—“ও বলেছিল, কিছু বললে দেখিয়ে দেবে…”। এই জবানবন্দিগুলোর মাঝে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, পল্লবের পিছনে ছিল আরও কয়েকজন—কিছু ছাত্র, কিছু শিক্ষক, আর কিছু অদৃশ্য ‘অনুজ্ঞা’। এইসব শব্দ ধরা পড়তে শুরু করে তদন্ত কমিটির রিপোর্টে। আর ঠিক সেই সময়ই একটা ভয়ংকর বিষয় ঘটে—রুদ্রের ল্যাপটপ হ্যাক হয়ে যায়। রাত্রে হঠাৎ তার স্ক্রিনে ফুটে ওঠে এক লাইন—“ছায়ার পেছনে ছুটলে আলো নিভে যাবে।” তার সাথে অজানা কিছু ভিডিও, যার মধ্যে রয়েছে চার বন্ধুর ব্যক্তিগত মুহূর্ত, তাদের পুরনো ইনস্টাগ্রাম ডিএম, এমনকি একটা অডিও যেখানে রুদ্র ও সোহম নিজেদের মধ্যে তর্ক করছে। উদ্দেশ্য একটাই—তাদের মধ্যে ফাটল ধরানো।
সোহম শুরুতে রেগে যায়। “ওরা এখন চাইছে আমাদের নিজেদের মধ্যে সন্দেহ জন্মাক। যেন আমরা চারদিকে ঘুরে নিজেরাই ভেঙে পড়ি।” তৃণা শান্ত ভাবে বলে, “ভয় পাওয়ার সময় এটা না। ওরা জানে আমাদের প্রভাব ছড়িয়েছে, তাই এবার মন ভাঙার খেলা শুরু করেছে।” কিন্তু যত দিন যাচ্ছে, ওদের ওপর চাপ বাড়ছে। একদিন মিনুর ভাইয়ের ফোনে মেসেজ আসে—“তোর বোন যা করছে, তার মূল্য দিতে হবে।” মিনু তখন একা একা অনেকক্ষণ চুপ থাকে, চোখ বন্ধ করে, তারপর নিজের সেলফোনে একটি ভিডিও রেকর্ড করে ফেলে—নিজের বক্তব্য, নিজের ভয়, নিজের প্রশ্ন। এরপর সেটা সে পোস্ট করে কলেজ ব্লগে—একটা খোলা চিঠির মতো। চিঠির শিরোনাম—“আমার নাম আছে সেই তালিকায়, তবু আমি আছি আলোয়”। ভিডিওটি ভাইরাল হয়ে যায়, এবং পরদিন সকালেই কলেজে ছাত্রছাত্রীদের ভেতর এক অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখা যায়—তারা হাতে হাতে একটি পোস্টার তৈরি করেছে, যেখানে চার বন্ধুর নাম, তাদের কাজের উল্লেখ, আর নিচে লেখা—“তারা কথা বলেছে। এবার আমরা বলি।” হল, করিডোর, সিঁড়ি—সব জায়গায় এই পোস্টার। ক্যাম্পাস যেন জেগে উঠেছে, চোখ খুলে দেখছে নতুন করে। আর তখনই তদন্ত কমিটির এক মেম্বার, অধ্যাপক রমেন্দ্রনাথ ঘোষ, চুপিচুপি সোহমকে ডেকে বলে, “এই তদন্তে আমি দেখছি আরও বড় কিছু লুকিয়ে আছে। কলেজের WiFi সার্ভার লগ, ক্লাসরুম ক্যামেরা ফিড—এসব কেউ ইচ্ছা করেই মুছে ফেলেছে। আর কেউ একজন ছায়ার আড়ালে থাকছে, যার নাম এখনো ওঠেনি।”
সন্ধ্যায় তারা চারজন আবার জড়ো হয় ক্যাফের সেই পুরনো বেঞ্চে। একসময় যেখানে মোবাইল চুরি হয়েছিল, সেখানেই এখন আলোচনা হচ্ছে দেশের তথ্যস্বাধীনতা আইন, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, এবং কিভাবে ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের আত্মপরিচয়ের প্রতি দায়বদ্ধ। তৃণা বলে, “এই পুরো ঘটনার নাম দেওয়া যেতে পারে ‘ছায়ালিপি’। কারণ এটা শুধু কিছু ফর্ম বা অভিযোগ নয়, এ যেন এক দীর্ঘ ছায়ার আখ্যান।” রুদ্র বলে, “তবে এই ছায়ালিপির সব শব্দ এখনো পড়া হয়নি। আমাদের সামনে রয়েছে আরও পাতা…” ঠিক তখনই সৌরভ আসে এক খবর নিয়ে—“আজ রাতে একটা সার্ভার ব্যাকআপ হচ্ছে, ওখানেই থাকবে সেই হিডেন ফাইলগুলোর কপি। আমি যদি ঢুকতে পারি, হয়তো আরও প্রমাণ পেয়ে যাব।” তারা সবকিছু ছাপিয়ে একটা জিনিস বুঝে ফেলে—পল্লব একটা মুখ, কিন্তু তার পেছনে রয়েছে আরও একটা ঘর। সেই ঘর এখনো অন্ধকার, এবং তারা জানে, সেখানে আলো নিয়ে ঢুকতেই হবে। কারণ সত্য যতই চাপা থাকুক, একবার আলো পড়লে আর ফিরে যাওয়ার পথ থাকে না। আর তখনই সোহম তার নোটবুকে লেখে—“শুরুটা ক্যাফেতে, শেষটা হবে ক্যাম্পাসের মাঝখানে। যেখানে সবাই শুনবে, দেখবে, আর বুঝবে—ছায়া যতই বড় হোক, আলোকে ঠেকাতে পারে না।”
৯
কলেজ ক্যাম্পাসে সেই রাতে অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা নেমেছিল। পরীক্ষার ছুটির কারণে অধিকাংশ ক্লাস বন্ধ, ছাত্রাবাসে নির্জনতা, আর প্রশাসনিক ভবনের আলো পর্যন্ত নিভে গিয়েছে আগেভাগেই। ঠিক এমন এক রাতে সৌরভ, সোহম, রুদ্র, তৃণা এবং মিনু মিলে প্রবেশ করল কম্পিউটার অপারেশন ইউনিটের ভিতরের সেই নির্জন সার্ভাররুমে—যেখানে আজ রাতেই চলছে ‘মাসিক ব্যাকআপ প্রসেস’। সৌরভ আগেই জানিয়ে দিয়েছিল, এই ব্যাকআপ চলাকালীন সার্ভারের সিকিউরিটি লেয়ার কিছু সময়ের জন্য দুর্বল হয়। তাদের লক্ষ্য—সেই ছোট্ট ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া। সৌরভ একটা পুরনো কীবোর্ড টেনে আনল, তারপরে লগ ইন করল রুট-অ্যাক্সেস দিয়ে। ঘরজুড়ে গুঞ্জন শব্দ—সার্ভারের ফ্যান, হার্ডডিস্ক স্পিন, আর তাদের হৃৎস্পন্দন যেন একসাথে তাল মিলিয়ে বেজে উঠছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা একটা লুকনো ফোল্ডারে পৌঁছে যায়—নাম “Sys_Logs_Archive”। সৌরভ ফিসফিস করে বলে, “এটাই সেই জায়গা… এখানেই আগের মাসের ফিডব্যাক ফর্ম, ব্ল্যাকলিস্ট লিস্টিং, এমনকি মেইল ফরওয়ার্ডিং সেটিংস ব্যাকআপ থাকবার কথা।” কিন্তু ফোল্ডার ওপেন করতেই তারা দেখে—দশটা ফাইলের মধ্যে মাত্র তিনটি অ্যাক্সেসযোগ্য, বাকি সব এনক্রিপ্টেড। সৌরভ বলে, “আমার পাসওয়ার্ড দিয়ে একবার চেষ্টা করে দেখি…”
ফাইল খুলতেই প্রথমেই যা তারা দেখে তা হতবাক করে দেয়—একটা এক্সেল ফাইল, নাম “Watch_List_Students”। তাতে লেখা আছে ১২ জন ছাত্রছাত্রীর নাম, বয়স, ডিপার্টমেন্ট, এবং “মনিটরিং লেভেল”—যার পাশে স্কোর দেওয়া আছে, ‘Medium’, ‘High’, ‘Extremely High’। চারজনের নাম—সোহম, মিনু, তৃণা ও রুদ্র সেই তালিকায় ‘Extremely High’ হিসেবে চিহ্নিত। মিনু ফাইল স্ক্রল করে দেখতে থাকে, আর একটা সেল খুলে পড়ে—“Cafeteria_Incident_Suspects: Classified – Awaiting Command Approval”। রুদ্র চোখ বড় করে বলে, “তাহলে আমাদের শুরু থেকেই সন্দেহ করেছিল ওরা!” সৌরভ বলে, “আরেকটা ফোল্ডার আছে… ‘Admin Chat Logs’।” সেখানেই তারা পায় পল্লবের চ্যাট যেটা আরও গভীর—একটা ইউজারনেম “ShadowAxis” এর সঙ্গে কথোপকথন, যেটা স্পষ্ট করে দেয় পল্লব নিজেও আদেশ নিচ্ছিল কাউকে। ‘ShadowAxis’ লিখছে—“চতুর্থ ছেলেটা (রুদ্র) বেশি স্পষ্টবাদী। তার ওপর নজর বাড়াও।” আরেক জায়গায় লেখা—“ফিডব্যাকের ভেতর যারা রোহানের পক্ষে কথা বলেছে, তাদের চিহ্নিত করে রাখো। প্রয়োজনে অভিভাবকদের কাছে বার্তা পাঠাও।” এতদিন পল্লবকে ওরা ‘মূল হোতা’ মনে করছিল, এখন বোঝা যাচ্ছে—সে একজন চালক, কিন্তু চাবি ছিল আরেকজনের হাতে। সৌরভ বলে, “এই ShadowAxis কে ধরতে হবে… একমাত্র তখনই আমরা জানব কে এই পুরো বিষয়টার মাস্টারমাইন্ড।” তখনই রুদ্র বলে, “দেখো, এই ব্যাকআপে আরও কিছু মিডিয়া ফাইল আছে।” খুলতেই দেখা যায়, একটি ক্লাসরুমে গোপনভাবে তোলা ভিডিও—যেখানে রোহান কিছু অস্বস্তিকর ভঙ্গিতে ক্লাসে এক মেয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তবে সেই ভিডিওর নিচে টাইমস্ট্যাম্প ‘Edited_Clip_02_Trimmed’—মানে ভিডিওটা সম্পাদিত, যার মাধ্যমে রোহানকে ফাঁসানো হয়েছিল।
এই চাঞ্চল্যকর তথ্য দেখে সবাই স্তব্ধ হয়ে যায়। সোহম বলে, “মানে ক্যাফে মোবাইল চুরি ছিল শুধু একটা ডিভারশন, আসল প্ল্যান ছিল রোহানকে সরানো।” তৃণা বলে, “আর সেটাই সফলও হয়েছিল…” তখনই সার্ভার স্ক্রিনে নীল আলো জ্বলে ওঠে—একটা অ্যালার্ট: Unauthorized File Transfer Detected। সৌরভ বলে, “দ্রুত, সব প্রমাণ পেনড্রাইভে কপি করো!” তারা কাজ শুরু করতেই আরেকটা নোটিফিকেশন আসে—Remote Session Initiated from Admin Console। কেউ ঢুকছে সার্ভারে, দূর থেকে। সৌরভ বলে, “আমরা সময় পাচ্ছি না, মাত্র ৩ মিনিট!” তখন চারজন আলাদা আলাদা ফোল্ডার থেকে সব ড্র্যাগ করে পেনড্রাইভে নিতে শুরু করে—তাদের হাত কাঁপছে, গলা শুকিয়ে গেছে, তবু চোখ স্থির। কপি শেষ হতেই সৌরভ নিজেই কম্পিউটার শাটডাউন করে দেয়। সবাই দ্রুত বেরিয়ে আসে সার্ভাররুম থেকে। বাইরে তখন রাত ১টা, ক্যাম্পাসে একটাও পাখির ডাক নেই—শুধু গলার গভীরে গুমোট এক উত্তেজনা। তারা জানে, এখন তাদের হাতে এমন কিছু আছে যা পুরো কলেজ প্রশাসনকে নাড়িয়ে দিতে পারে। কিন্তু তার মানে আরও বিপদ, আরও ছায়া… আর হয়তো সেই ছায়া এবার একেবারে সামনে দাঁড়াবে।
১০
শুক্রবারের সকালটা যেন নিঃশব্দে দম চেপে ধরা ভোর। কলেজের আকাশ মেঘলা, বাতাসে ভেজা ধুলো আর কফির গন্ধ মিশে ছিল, কিন্তু ক্যাম্পাসের পরিবেশ ছিল অস্বাভাবিক নিস্তব্ধ। কেউ উচ্চস্বরে হাসছিল না, করিডোরে হাঁটাহাঁটি করছিল না—মনে হচ্ছিল গোটা কলেজ শ্বাসরুদ্ধ হয়ে কোনও এক অজানা ঘোষণার অপেক্ষায়। কারণ আজ তদন্ত কমিটি জমা দেবে তাদের চূড়ান্ত রিপোর্ট। চার বন্ধু—সোহম, তৃণা, রুদ্র আর মিনু—আগের রাতেই নিজেদের মধ্যে কথা সেরে নিয়েছিল। সৌরভের দেওয়া প্রমাণগুলো যতটা বিস্ফোরক ছিল, ততটাই বিপজ্জনক। সেই প্রমাণের কপি আগেই তারা তিন জায়গায় ব্যাকআপ করে রেখেছে—একটা অনলাইন ক্লাউডে, একটা পেনড্রাইভে, আর একটা পুরনো চিপে, যা মিনু নিজের বইয়ের পাতার মধ্যে লুকিয়ে রেখেছে। কলেজ প্রশাসনের তরফে ঘোষণা হয়েছিল, বিকেল চারটেয় অ্যাসেম্বলি হলে সকলের সামনে তদন্ত কমিটি রিপোর্ট পাঠ করবে। তার আগে সকাল থেকে করিডোরে ফিসফিস শুরু হয়েছিল—“পল্লবের নাম থাকবে না তো?”, “ওর সাথে আর কারা ছিল?”, “ছোটবেলায় যাকে আমরা ক্লাস মনিটর ভাবতাম, সে এখন কী করে এই রকম করল?” তবে সবচেয়ে বড় কথা ছিল—‘ShadowAxis’ কে?
বিকেল চারটার ঠিক আগে হলভবনের সামনের ফটকে ছাত্রছাত্রীদের ভিড় জমে যায়। প্রত্যেকের চোখে প্রশ্ন, কৌতূহল, ভয় আর উত্তেজনার অদ্ভুত মিশ্রণ। অ্যাসেম্বলি হলে তদন্ত কমিটির পাঁচ সদস্য মঞ্চে উঠে বসেন, যাঁদের মধ্যে ছিলেন অধ্যাপক রমেন্দ্রনাথ ঘোষ, ইংরেজির অধ্যাপিকা সুতপা লাহিড়ী, ও আইটি বিভাগের অজয় সিনহা। সবার সামনে অধ্যাপক রমেন্দ্রনাথ ধীরে, ভারী গলায় বলতে শুরু করেন, “গত তিন সপ্তাহে যা ঘটেছে, তা শুধু কয়েকটি অভিযোগ নয়, একটি অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার পরিচয় দিয়েছে। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু পাঠ্যবই আর শ্রেণিকক্ষ দিয়ে গড়ে ওঠে না, গড়ে ওঠে বিশ্বাস দিয়ে।” তারপর একে একে উঠে আসে সেইসব প্রমাণ—ব্ল্যাকলিস্টেড ফর্ম, গোপন নজরদারি, মনিটরিং সফটওয়্যারের অবৈধ ব্যবহার, অনুষ্কার ভয়েস ক্লিপ, এবং সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য—একটি নির্দিষ্ট ইউজারনেম “ShadowAxis” যে পল্লব বিশ্বাসকে নির্দেশ দিচ্ছিল। তখন রুদ্র উঠে দাঁড়িয়ে বলে, “ShadowAxis কে?” সকলে নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকায়। অধ্যাপক ঘোষ বলেন, “আমরা অনুসন্ধানে পেরেছি—‘ShadowAxis’ ছিল কলেজ সেক্রেটারি অরিন্দম মুখার্জির ব্যক্তিগত সার্ভার থেকে পরিচালিত। এবং আইটি রিপোর্টে প্রমাণিত, সে-ই ছিল এই ‘মনিটরিং প্রকল্প’-এর মুখ্য পরিকল্পনাকারী।” হলজুড়ে নীরব বিস্ফোরণ ঘটে। অনেকে চিৎকার করে ওঠে, কেউ কান ধরে মাথা নামিয়ে ফেলে। এতদিন যে ব্যক্তি কলেজের ‘ভবিষ্যতের রূপকার’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তাঁর নাম এখন উঠে এসেছে এই ছায়া ষড়যন্ত্রের নেপথ্যে।
পরদিন কলেজে এক অদ্ভুত সকাল নামে। পল্লব বিশ্বাসের চাকরি সাময়িকভাবে স্থগিত করে দেওয়া হয়, এবং তাকে শোকজ নোটিশ পাঠানো হয়। অরিন্দম মুখার্জির বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসনের কাছে তদন্ত দাবি জানানো হয়, এবং ছাত্র সংসদ থেকে নতুন করে ‘ইথিক্স কমিটি’ গঠন হয়, যার প্রথম চার সদস্য—সোহম, তৃণা, রুদ্র, ও মিনু। কিন্তু আসল জয় ছিল অন্য জায়গায়। ক্যাফেটেরিয়া এখন আবার ছাত্রছাত্রীদের প্রাণবন্ত আলোচনার কেন্দ্র। কেউ নতুন গান বাজাচ্ছে, কেউ ফিল্ম ক্লাবের পোস্টার লাগাচ্ছে, কেউ আবার বই পড়ছে জানলার ধারে। মোবাইল চুরির ঘটনাকে আজ অনেকেই ভুলতে বসেছে, কিন্তু চার বন্ধু জানে—এই ছোট ঘটনাই ছিল দরজা, যার পেছনে ছিল এক অন্ধকার খুপরি। সেই খুপরি থেকে আলো এনে তারা দেখিয়েছে—যেকোনো প্রতিষ্ঠান, যেকোনো ক্ষমতা, যদি স্বচ্ছ না হয়, তাহলে প্রশ্ন তোলা কর্তব্য। সেই দিন ক্যাম্পাসে তৃণা একটা দেয়ালে এক লাইন লিখেছিল, “ছায়া যত গভীর হোক, প্রশ্ন করলেই ফাটল ধরে।” আর তার নিচে অনেক হাত একে একে লিখে যায় নিজের নাম। আর সোহম, একটি কোণে বসে, নিজের নোটবুকে শেষ লাইনটি লেখে—“আমরা চারজন কেউ গোয়েন্দা নই, কেউ নেতা নই—আমরা শুধু বিশ্বাস করেছিলাম, ক্যাম্পাস কোনো ছায়ার নয়, ওটা আলোয় ভরা একটা ঘর। সেই ঘরের জানালা আবার খুলেছে।”
১১
গ্রীষ্মের ছুটি শুরু হওয়ার আগেই কলেজে চূড়ান্ত বর্ষের পরীক্ষা হয়ে গিয়েছে। ক্যাম্পাস এখন অনেকটা ফাঁকা—ছাত্রছাত্রীরা কেউ বাড়ি চলে গেছে, কেউ ইন্টার্নশিপে ব্যস্ত, কেউ আবার স্নাতকোত্তরের প্রস্তুতিতে মগ্ন। কিন্তু ক্যাফেটেরিয়া এখনও খোলা, আর ঠিক সেই কোণার টেবিলটাও, যেখান থেকে “ক্যাফে কেস” শুরু হয়েছিল, এখনও আগের মতোই আছে—সামান্য চা দাগে ভরা, এক পাশে ছোট করে খোদাই করা কিছু শব্দ—”C4″, “#ShadowFree”, “Biswa’s End”, আর “TRSM”। তৃণা, রুদ্র, সোহম ও মিনু—চারজনই জানত, আজকের দেখা-সাক্ষাৎটা কিছুটা ‘শেষ দেখা’র মতো, কারণ সামনে তাদের ভবিষ্যৎ শুরু হচ্ছে—নতুন শহর, নতুন ইনস্টিটিউশন, আর নতুন পরিচয়। কিন্তু আজ, ক্যাফের সেই পুরোনো বেঞ্চে বসে, তারা যেন ফিরে যাচ্ছিল সেই সব মুহূর্তে, যেখানে একটা মোবাইল চুরি, একটা অভিযোগ ফর্ম, আর একটা কাঁচা সন্দেহ বদলে দিয়েছিল তাদের জীবন। “জানো,” মিনু হঠাৎ বলে ওঠে, “এই ক্যাফের আলো, আর ওই হলঘরের অন্ধকার… আমি এখন আলাদা করে চিনতে পারি। আলো সব সময় মসৃণ নয়, কিন্তু ওটাই সত্য।” রুদ্র হেসে বলে, “তাই তো… আমরা ক্যাফের স্যান্ডউইচ না খেয়ে ষড়যন্ত্র ভেদ করেছিলাম।”
সোহম টেবিলে হাত রেখে বলে, “তবে জানো, সবচেয়ে বড় শিক্ষা কী হয়েছে?” সবাই চুপ করে শুনছে। সে বলে, “আমরা ভেবেছিলাম সমস্যাটা কোনো এক-একজন মানুষের… পরে বুঝেছি, সমস্যাটা ছিল একটা মনের ভেতরকার কাঠামোর, যা বলে—’চুপ করে থাকো’, ‘দেখেও দেখো না’, ‘জানলেও চলো না’। কিন্তু আমরা হাঁটতে শুরু করেছিলাম, আর সেই হাঁটার মধ্যেই আলো জন্মেছিল।” তৃণা চোখ সরু করে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে, “আজ ক্যাম্পাসের ছায়াগুলো আর তত ঘন লাগছে না। মনে হচ্ছে, যেন কেউ খুঁজে পেয়েছে জানালার হ্যাঁচকা দরজা।” রুদ্র একটা খাম বের করে দেয়—চার কপি প্রিন্টেড নিউজপেপারের স্ক্যান, যেখানে লেখা:
“Four Undergraduates Expose Surveillance Ring in Prestigious College”
আরেকটি শিরোনাম:
“Administrative Abuse Uncovered Through Student-Led Cyber Investigation”
তাদের ছবি সেখানে আছে—হাসিমুখ, পাশাপাশি দাঁড়িয়ে, সৌরভ মাঝখানে। সবাই একবার চুপ করে থাকে। সেই চুপের ভেতর অনুরণন করে বৃষ্টির শব্দ, ক্যান্টিনের হাঁসফাঁস আওয়াজ, আর ছুটির কলেজের ক্লান্ত নিস্তব্ধতা। তৃণা বলে, “তুমি এবার দিল্লি চলে যাচ্ছ, তাই না রুদ্র?” সে মাথা নেড়ে বলে, “হ্যাঁ, পলিটিক্যাল সায়েন্সে মাস্টার্স। আর তুমি তো কলকাতায় থাকছ—জার্নালিজম?” তৃণা হেসে বলল, “হ্যাঁ। তথ্যের পেছনে ছুটতে ভালো লাগে এখন।” মিনু বলল, “আমি ভাবছি এক বছর বিশ্রাম নেব। ক্যাম্পাসের বাইরেও তো এক জীবন আছে।” সোহম চুপ করে ছিল এতক্ষণ, এবার বলে, “আমি কলেজে থেকেই যাব, নতুন ব্যাচে পড়াবার সুযোগ পেয়েছি।” তখন সবাই তাকায় তার দিকে—তৃণা বলে, “মানে তুমি ওদের বলবে, মোবাইল চুরি থেকেও শুরু হতে পারে একটা বিপ্লব?” সোহম মাথা নেড়ে হেসে বলে, “আমি বলব, সত্যি কোথায় আছে সেটা প্রশ্ন করো। উত্তর এলেই তার পেছনে হাঁটো।”
সন্ধ্যা নামার মুখে চারজন উঠে দাঁড়ায়। ক্যাফের টেবিলটায় একবার চোখ বুলিয়ে নেয়—এখনও যেমনটা ছিল, তেমনি। কেউ কিছু বদলায়নি, কিন্তু বদলে গিয়েছে তাদের চোখ। তারা বেঞ্চের ওপর একটা ছোট্ট কাগজ রেখে যায়, যেখানে লেখা:
“ক্যাফে কেস শেষ নয়। এটা শুরু ছিল। আলোকে দেখার, ছায়াকে প্রশ্ন করার সাহসের শুরু। আমরা ছিলাম, আছি, থাকব—প্রতিটি সেই জায়গায়, যেখানে সত্য কাঁপে, আর কেউ বলার সাহস পায় না।”
চারটি নাম নিচে লেখা—তৃণা, রুদ্র, সোহম, মিনু। ক্যাম্পাস ধীরে ধীরে ফাঁকা হচ্ছে, কিন্তু সেই কাগজটা উড়ে যায় না—তার নিচে রাখা আছে একটা কাঁচের পেপারওয়েট, যেটা একবার রোহান এনে দিয়েছিল। দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে তৃণা হঠাৎ থেমে বলে, “স্মরণ রাখো, কখনো না কখনো আলো ফিরবেই। আমরা শুধু তাকে ডেকে আনব।” সোহম তাকিয়ে বলে, “আর ক্যাফে থাকবে, যেমন ছিল। গল্প শুরু হবে আবার, অন্য কারো হাতে, অন্য চা কাপের পাশে।” তারা বাইরে পা রাখে। বাইরের আলো তখন নরম, সন্ধ্যার রঙে ভেজা। ক্যাম্পাসের পেছনের গেটে যখন তারা একে একে বেরিয়ে আসে, তখন দূর থেকে শোনা যায় কেউ একজন গুনগুন করে গাইছে—
“আলোয় নাম, ছায়ায় হেঁটে এসেছি অনেকদিন…”
___




