Bangla - তন্ত্র

কৌশিকী অরণ্যের নিশীথবেলা

Spread the love

ঋষি বন্দ্যোপাধ্যায়


হিমালয়ের কোলে অবস্থিত সেই পাহাড়ি গ্রামটির নাম ছিল থোলাং। বহু পুরনো এক মানচিত্রে ছায়ার মতো দাগ কাটা ছিল এই নাম, যার অর্থই আজ আর স্পষ্ট নেই। ঋদ্ধিমান, যিনি নিজেকে একজন হিমালয় গবেষক এবং অ্যাডভেঞ্চার ব্লগার বলে পরিচয় দেন, ঠিক করেছিলেন এইবার ট্রেকিং করবে এমন এক স্থানে, যেটা এখনও পর্যটকের হাতছোঁয়ার বাইরে। তার সঙ্গী হয়েছিল অভিষেক—অভিনব চোখে ছবি তুলতে পারা একজন ভ্রমণ-চিত্রগ্রাহক। থোলাং গ্রামের ঘন মেঘে ঢাকা সরু রাস্তা ধরে তারা যখন পৌঁছাল, তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার রং ছড়িয়ে পড়ছে পাহাড়ের গায়ে। গ্রামবাসীরা দেখল দুই শহুরে যুবক ব্যাকপ্যাক নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, হাতে ধরা ছেঁড়া মানচিত্র, চোখে উত্তেজনার আলো। একজন বৃদ্ধ বলল, “ওপারে যাবেন না বাবু, কৌশিকী অরণ্য রাতে ডাকে।” ঋদ্ধিমান হাসল, অভিষেক ক্যামেরা তুলল সেই মুখে ভয়ের রেখা আঁকা লোকটির। স্থানীয় চায়ের দোকানের কাচের জানালায় ছায়া হয়ে ঝুলে থাকা একটি পুরাতন ছবি তাদের চোখে পড়ে—এক দোলনায় বসে থাকা এক সন্ন্যাসিনী, যার পেছনে কুয়াশার ছায়া যেন অরণ্যের মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে। ছবি তুলে নিল অভিষেক। চা খেতে খেতে ঋদ্ধিমান বলল, “আমাদের যাত্রা কাল শুরু হবে। সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ঢুকব কৌশিকীতে।” কেউ কিছু বলল না, শুধু দোকানের বয়স্ক মালিকটা ফিসফিস করে বলল, “যদি নবচক্রের গায়ে পা পড়ে, ফিরবেন কি না, ঈশ্বরই জানেন।”

পরদিন সকালে অরণ্যে প্রবেশ করল তারা—দুই বন্ধুর পা পড়ে সেই শাল-পাইন-রূপী বনের বুকের গভীরে, যেখানে সূর্য ঢোকে সংকোচে আর বাতাস বইতে চায় না উচ্চারণে। প্রথমদিকে সবই ছিল এক ঘোরের মতো—পাখির ডাক, ঝর্ণার শব্দ, পাইন পাতার মাঝে আলো-ছায়ার খেলা। অভিষেক ছবি তুলছিল, আর ঋদ্ধিমান কুড়িয়ে নিচ্ছিল পাথরে খোদাই করা চিহ্নের স্কেচ। কিন্তু ঘণ্টা দুয়েক হাঁটার পর হঠাৎ তারা আবিষ্কার করল একটি অদ্ভুত স্থান—বনের ঠিক মাঝখানে একটি প্রাচীন, গোলাকৃতি পাথরের বেদি, যার চারপাশে পাতা পচা ও অদ্ভুত ঘ্রাণে ভরা। বেদির গায়ে ছিল ন’টি বৃত্তের নক্সা—প্রতিটি বৃত্তের ভেতরে লেখা এক প্রাচীন ভাষার মন্ত্র। ঋদ্ধিমান ধীরে ধীরে হাত রাখল বেদির কেন্দ্রে, আর তখনই যেন জমে থাকা আকাশ বিদীর্ণ হয়ে এক মুহূর্তের জন্য চারপাশে অন্ধকার নেমে এল। অভিষেক চিৎকার করে উঠল—পেছনে তাকিয়ে সে দেখল, ঋদ্ধিমান কোথায় নেই। তার আশপাশে সবকিছু অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে—পাইনগাছগুলি যেন গলতে শুরু করেছে কুয়াশায়, শব্দগুলো হারিয়ে যাচ্ছে কোনও বৃত্তাকার সুরে। সে দৌড়ে পালাতে চাইল, কিন্তু তার গা ঘিরে যেন কাঁচের দেয়াল তৈরি হয়ে গেছে। আর ঠিক তখনই, আকাশের নিচে ঘন ছায়ার ভেতর থেকে এক অশরীরী গলার ফিসফিসানি শোনা গেল—“তোমরা নবচক্র স্পর্শ করেছ, এবার সময় ও কল্পনার দরজা খুলে গেছে।” ঝপ করে শব্দ করে অভিষেক অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল, আর তার ক্যামেরা মাটিতে পড়ে থেমে গেল সেই মুহূর্তের ঠিক পরেই।

কখন যে তারা আলাদা হয়ে গেল, তা কেউ জানে না। যখন ঋদ্ধিমান চোখ খুলল, দেখল চারপাশে একই সূর্যাস্ত—কিন্তু সূর্যটা নড়ছে না, আলো একইভাবে পড়ছে গাছের পাতায়, শব্দগুলো থেমে আছে, আর তার ঘড়ির কাঁটা এক জায়গাতেই আটকে আছে: সন্ধ্যা ৫:৩২। সে হাঁটছে, অথচ একই পথ বারবার ঘুরে আসছে। আর অন্যদিকে, অভিষেক ধীরে ধীরে উঠে দেখে তার সামনে কুয়াশা ঢেকে রেখেছে পুরো অরণ্য, কিন্তু হঠাৎ ঝর্ণার ধার থেকে ভেসে আসে এক মৃদু ডাক—“অভিষেক… এদিকে আয়…” সেই কণ্ঠস্বর তার পরিচিত, তার শৈশবের দিদিমার মতো। সে ভয় পায়, আবার টানে অনুভব করে। তখনও সে জানত না, এই অরণ্যের বুকে তারা আর ট্রেকার নয়—তারা এখন নবচক্র বন্ধনের ‘পথিক’, আর ফিরে যাওয়ার জন্য শুধু একটিই উপায়—নিজেকে খুঁজে পাওয়া, ভয়কে জয় করা, আর বন্ধনের কেন্দ্রে পৌঁছে তা টুকরো টুকরো করে ভাঙা। কিন্তু সেই কেন্দ্রে রয়েছে সেই শক্তি, যিনি একশো বছর ধরে ঘুমিয়ে আছেন এক অর্ধ-মৃত তান্ত্রিকের চোখে। নিশীথবেলার অরণ্য হালকা বাতাসে নিঃশব্দ হয়ে থাকে, কিন্তু সেই নিঃশব্দতা আজ ভরে উঠছে দুই আগন্তুকের নিঃশ্বাসে, যাদের কেউ জানে না—এখন তারা কোন জগতে আছে, সময়ের, না কল্পনার। তারা আর জানেও না, বেঁচে থাকলেও তারা সত্যিই জীবিত কি না।

***

অভিষেক ধীরে ধীরে জ্ঞান ফিরে পায়। প্রথমে কিছুই স্পষ্ট হয় না—চারপাশে কুয়াশা, যেন একটা পুরু স্বপ্নের চাদরে ঢেকে গেছে সবকিছু। সে উঠে বসে দেখে তার ক্যামেরা একপাশে পড়ে আছে, কিন্তু ব্যাটারি নেই। গাছপালা অবিকল আগের মতো, অথচ কোথাও যেন কিছু পাল্টে গেছে। বাতাস ভারী, শব্দ নেই—না পাখির, না ঝিঁঝিঁর। তখনই সে দেখে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটি ছায়ামূর্তি, আধা-স্বচ্ছ, কিন্তু তীব্রভাবে চেনা। সেই মুখ—তার দিদিমার, যিনি মারা গিয়েছিলেন বছর দশেক আগে। কিন্তু তাঁর মুখে এখন অদ্ভুত শান্তি, চোখে অশ্রুর রেখা। “তুই অবশেষে এলি, অভি,” বলে ওঠে সেই সত্তা। অভিষেক চমকে ওঠে, মুখে কোনো কথা জোটে না। সে জানে এইটা সম্ভব নয়। কিন্তু তার মন বলে—এই কণ্ঠ, এই গন্ধ, এই দৃষ্টি—সব সত্যি। “এটা কোথায়?” জিজ্ঞেস করে অভিষেক। জবাব আসে না। শুধু চারপাশের কুয়াশা ধীরে ধীরে রঙ নিতে থাকে—তার ছোটবেলার বাড়ি, দিদিমার রান্নাঘর, ছেলেবেলার প্রিয় কুকুর ‘নেনো’। একে একে দৃশ্যগুলো ফুটে উঠতে থাকে যেন তার স্মৃতিকে কেউ বড় স্ক্রিনে দেখাচ্ছে। সে হাঁটে সেই দৃশ্যের মধ্যে, ভুলে যায় কৌশিকী, ভুলে যায় ঋদ্ধিমানকে। কিন্তু এই স্মৃতিজগত যেন নিঃশ্বাস নেয় তার ভয় ও ইচ্ছা দিয়ে। সে বুঝতে পারে না—সে কি স্বপ্ন দেখছে, না কি স্বপ্ন তাকে দেখছে?

অন্যদিকে, ঋদ্ধিমান পাথরের বেদির পাশেই জ্ঞান ফিরে পায়। সূর্য যেখানে ছিল, এখনও সেখানেই আছে—না বাড়ে, না কমে। সময় যেন বন্ধ হয়ে আছে। ঘড়ির কাঁটা নড়ছে না, মোবাইল সম্পূর্ণ ডেড। প্রথমে সে ভাবে—সম্ভবত হাইপোথারমিয়া বা উচ্চতার কারণে তার মস্তিষ্ক বিভ্রান্ত হচ্ছে। সে বেদি থেকে সরে গিয়ে খোঁজ করে অভিষেককে—কিন্তু সে নেই। না কোনও পদচিহ্ন, না কোনও চিৎকার। অরণ্য যেন নিজের শরীরে গিলে ফেলেছে তার বন্ধুকে। ঋদ্ধিমান ডাক দেয়, চিৎকার করে—প্রতিক্রিয়া নেই। সে হাঁটতে থাকে একটি নির্দিষ্ট দিকে, কিন্তু পাঁচ মিনিট পর আবিষ্কার করে সে আবার ঠিক সেই বেদির সামনে দাঁড়িয়ে। ঘামছে, দিশাহারা বোধ করছে—যতটা না ক্লান্তিতে, তার চেয়েও বেশি এক অজানা ঘূর্ণির ভিতর ঘুরে পড়ার ভয়ে। তখন তার মনে পড়ে—রাতের চায়ের দোকানে একজন বলেছিল, “নবচক্রে পা রাখলে সময় আটকে যায়।” সে সেই খোদাই দেখতে শুরু করে—প্রতিটি বৃত্তে এক-একটি প্রতীক, যেটা সুনির্দিষ্ট ভয়ের প্রতিচ্ছবি। হঠাৎ এক বৃত্তে তার চোখ আটকে যায়—এক পিঞ্জর, যার মধ্যে আটকে আছে এক পাখির কঙ্কাল। আর তার নিচে লেখা: “স্বাধীনতা শুধু তখনই সম্ভব, যখন ভয়কে তুমি চিনতে শেখো।” ঋদ্ধিমান হঠাৎ অনুভব করে তার নিজস্ব ভয়—একাকীত্ব। সবসময় যুক্তির আশ্রয় নিয়ে সে সেই ভয় ঢেকে রেখেছিল। এখন তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে অরণ্যের নিঃসঙ্গ বাতাসে।

এইভাবে, তারা দুজন—একজন সময়বিহীন জগতে, অন্যজন কল্পনার ফাঁদে—আটকে পড়ে দুই পৃথক মায়াবৃত বাস্তবতায়। অথচ কোথাও যেন এক সূক্ষ্ম সূত্রে তারা জড়িত থেকে যায়। ঋদ্ধিমান শুনতে পায় দূর থেকে এক অচেনা বাঁশির সুর, অভিষেক দেখে একটি বই তার ঘরের জানালায় খোলা পড়ে আছে—যার পাতায় হঠাৎ করে ঝলকে ওঠে ‘Kaushiki’ নামটি। অভিষেক বইটি ছুঁতেই চারপাশের দৃশ্য বদলে যায়, এবং সেখানে দাঁড়িয়ে এক সন্ন্যাসিনী—হাঁটু পর্যন্ত জল, এক ঝর্ণার নিচে চোখ বুজে বসে আছেন। তিনি চোখ খুলে শুধু বলেন, “যদি ফিরতে চাস, বন্ধন ভাঙতে হবে। কিন্তু মনে রাখিস, প্রত্যেক নবচক্র এক-একটি ভয়।” অভিষেক তাকিয়ে থাকে বিস্ময়ে, আর অরণ্য জেগে ওঠে এক নতুন সুরে—সেই সুরে যা তারা আগে কখনও শোনেনি, এবং এখন থেকে আর এড়াতে পারবে না। কৌশিকী তাদের গ্রহণ করেছে—এবং রাত্রি এখন কেবল শুরু।

***

ঋদ্ধিমান তৃতীয়বারের মতো একই পাথরঘেরা জায়গায় ফিরে এল। যেদিকেই হাঁটুক না কেন, সে যেন এক বৃত্তের মধ্যে আটকে পড়েছে—একই গাছ, একই পাতা, একই পোকা তার পায়ের কাছে উড়ছে, আবার ফিরে যাচ্ছে আগের জায়গায়। সূর্যটাও যে আর west-এ হেলে পড়ছে না—বরং সে একইভাবে স্থির, একটুও বদলায়নি আলো। সময় যেন পরিহাস করছে তাকে নিয়ে। সে এবার বসে পড়ে একটি বড় শালগাছের গোড়ায়, মাথা নিচু করে ভাবে—তার যুক্তিবাদ, তার বৈজ্ঞানিক বুদ্ধি, এসব এখন কোনো কাজে আসছে না। হঠাৎ তার চোখে পড়ে গাছের গুঁড়িতে একটা পুরনো খোদাই—একটি অদ্ভুত প্রতীক, যেন একটা খোলা চোখের ভিতর এক বৃত্ত, আর তার কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছে একটি মানুষ। ঠিক নিচেই লেখা আছে একটি অচেনা ভাষায় কিছু শব্দ, যেটা যেন সনস্কৃত বা তার কোনো অনুরূপ প্রাচীন তান্ত্রিক ছায়া। সে পকেট থেকে নোটবুক বার করে নকল করতে থাকে প্রতীকটা। খেয়াল করে যে খোদাইটা একাধিক স্তরে করা, আর সেই স্তরগুলি ন’টি চক্রের গঠন তৈরি করেছে—এমনই এক নবচক্র, যার কথা বলা হয়েছিল দোকানদার বৃদ্ধের মুখে। হঠাৎই এক অদ্ভুত শব্দ কানে আসে—এক বয়স্ক পুরুষের কর্কশ কণ্ঠ, যেন গাছের গায়ে ঘষা পাথরের মত: “সময়কে বোঝার চেষ্টা করিস না, ঋদ্ধিমান। তুই সময়ের ভেতরে নেই, সময় এখন তোর ভেতরে।” ঋদ্ধিমান চমকে উঠে দেখে, তার ঠিক সামনে বসে আছে এক আধা-পচা মুখওয়ালা বৃদ্ধ, যার চোখদুটো অন্ধকার আর অসীমের মিশেলে তৈরি। সেই লোকের গায়ে ছেঁড়া জটা, সারা গায়ে ছাই, আর গলায় একটা ধাতুর তালা ঝুলছে—যা থেকে ছড়াচ্ছে একটা অসহ্য ধাতব গন্ধ। “তুই নবচক্রের প্রথম চক্রে আটকে পড়েছিস—‘কালমোহ’। এই কুঠুরির বাইরে কিছু নেই, যতক্ষণ না তুই নিজের সময়ের ভয়কে চিনবি।”

ঋদ্ধিমান কিছু বলার আগেই তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক পুরনো দৃশ্য—তার ছোটবেলার ছবি, যখন সে একা একা ঘরে বসে থাকত, বাবা-মা কাজে যেত, বন্ধুবান্ধব বলতে ছিল না কেউ। সময় তখন তার কাছে ছিল অসীম এক শূন্যতা। সে একা বসে বসে দেয়ালে আঁকত ঘড়ির ছবি, আর ভাবত, “এভাবে বেঁচে থাকার মানে কী?” সেই পুরোনো ভয় তার ভিতরে আজও রয়ে গেছে, যা সে লুকিয়ে রেখেছিল পড়াশোনার সাফল্যের আড়ালে। এবার তা ফুটে উঠল প্রকৃতির এক অচেনা দর্পণে। সে এবার সেই অদ্ভুত সন্ন্যাসীর দিকে ফিরে বলে, “কীভাবে বেরোবো আমি?” সন্ন্যাসী বলে, “নিজের তৈরি ভয়ের প্রতিচ্ছবিকে ভেঙে দে—যতক্ষণ না তুই বুঝবি সময়কে বেঁধে রাখা যায় না, ততক্ষণ তুই নিজেই বন্দি।” ঋদ্ধিমান চোখ বন্ধ করে বসে পড়ে। তার শ্বাস ধীরে ধীরে ভারী হয়, সে চোখের সামনে কল্পনায় ভাসায় সেই ছোট্ট ছেলেটিকে, যে দেয়ালে ঘড়ি আঁকছে, আর কাঁদছে নিঃশব্দে। এই কল্পনা একসময় গলে গিয়ে একটা নতুন আলোয় বদলে যায়। সে খোলে চোখ, দেখে সন্ন্যাসী আর নেই, জায়গাটা বদলে গেছে—তার সামনে একটি ধূসর পাথরের পথ, যার শেষে রয়েছে ন’টি পাথরের স্তম্ভ, প্রতিটিতে লেখা এক-একটি প্রতীক। নবচক্রের দরজা খুলে গেছে তার জন্য, কিন্তু এই তো মাত্র প্রথম স্তর—এখনও আটটা ভয় বাকি।

অন্যদিকে, অভিষেক এখনও সেই কল্পনার জগতে। এবার সে দেখে তার সামনে দাঁড়িয়ে সেই পুরনো প্রেমিকা—সায়নী, যাকে সে বছর চারেক আগে ছেড়ে দিয়েছিল ক্যারিয়ারের জন্য। সে এসে বলে, “তুই ফিরে এলি, অভি। এইবার আর ছাড়িস না আমায়।” অভিষেক এগিয়ে যায়, হাত ধরে, কিন্তু তার হাত গিয়ে লাগে শূন্যতায়—সায়নী তার হাতের সামনে থেকেই হাওয়া হয়ে যায়। এরপর চারপাশে দৃশ্য বদলে যেতে থাকে দ্রুত, যেন কল্পনার ভিতরেও ঘূর্ণি উঠেছে। একটা ঝরনা থেকে আওয়াজ আসে, “যতক্ষণ না সত্যি চোখে চোখ রাখবি নিজের ভুলের, ততক্ষণ এই মায়া ছাড়বে না তোকে।” অভিষেক থেমে যায়। হঠাৎ ঝরনার পাথরে সে দেখতে পায় তার নিজের মুখ—কিন্তু চোখ দুটি ফাঁকা। সেই ফাঁকায় সে দেখে তার দিদিমার মুখ, সায়নীর চোখের জল, নিজেরই ক্লান্ত মুখাবয়ব। সে বুঝে ফেলে—এই অরণ্যের কল্পনা শুধু তার স্মৃতি নয়, এগুলো তার অপরাধবোধের ছায়া। আর এই ছায়া না মুছে, সেই ঝর্ণার ওপারে যাওয়ার পথ নেই। অরণ্যের ছায়া ঘনীভূত হতে থাকে, আর তার ভিতর থেকে আবার সেই সন্ন্যাসিনীর কণ্ঠ ভেসে আসে—“ভয় কি দেখায় তোকে, না তুই ভয়কে সৃষ্টি করিস? এবার তা ঠিক করে ফেল। কারণ চতুর্থ চক্রের পরেই… সে অপেক্ষা করছে।”

আরও গভীরে, কৌশিকী তখন নিশীথের দিকে এগোচ্ছে। এক অরণ্য, দুই যাত্রী, আটটি ভয়, এবং এক প্রাচীন তান্ত্রিক, যার নাম এখনও উচ্চারিত হয়নি—ভৃগুনাথ। সময় থেমে থাকে না, কিন্তু কল্পনায় সময় ফাঁদ পাতে। আর যদি সময়ই না থাকে, তাহলে মুক্তি কি কল্পনা? নাকি সে-ও নবচক্রের অংশ? ঋদ্ধিমান হাঁটছে নবচক্রের পথে, অভিষেক উঠছে কল্পনার পাহাড়ে—আর দূরে, এক পাথরের মূর্তি ধীরে ধীরে চোখ খুলে বলে ওঠে—”তাদের কেউ যদি চতুর্থ চক্র পেরোয়, আমি জেগে উঠব।”

***

অভিষেক তার সামনে দাঁড়ানো সেই কুয়াশাময় মূর্তিটিকে একদৃষ্টে দেখছিল। ঝর্ণার ধারে বসে থাকা সেই বৃদ্ধা, তার মৃত দিদিমা, যেন ঘুমঘোরে কথা বলছিল, “তুই বড় একা, অভি… এত বছর পরও তোকে কেউ বোঝেনি, না?” দিদিমার চোখদুটি ছিল অদ্ভুত রকম উজ্জ্বল, যেন হাজার বছর পুরনো ক্লান্তি জমে আলো হয়ে উঠেছে সেখানে। অভিষেক এগিয়ে গেল, কিন্তু এবার আর সে ছোঁয়ার চেষ্টা করল না। ভেতরে ভেতরে সে বুঝছিল কিছু একটা অস্বাভাবিক। চারপাশের দৃশ্য যতই নিখুঁত হোক না কেন—ঘরের পর্দা, জানালার বাইরের ছাদের ধূলিমলিন রেখা, এমনকি দিদিমার হাতের সেই টিনের বাক্স—সবই যেন একটি মঞ্চের মতো বানানো, একটি স্মৃতির থিয়েটার। “তুই কি সত্যিই দিদিমা?”—তার গলা কাঁপে। মূর্তিটা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়, বলে, “তুই চাইলেই আমি তাই হতে পারি। তোর যা যা অভাব, আমি তা পূরণ করে দেবো। এই অরণ্যে সময় নেই, ভয় নেই, কেবল শান্তি। থাক এখানেই।” সে বলে আরেক পা এগিয়ে দেয়। অভিষেক চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে, হঠাৎ পিছনে তাকিয়ে দেখে তার হাতে ক্যামেরা নেই, তার গায়ে নেই ট্রেকিং জ্যাকেট, বরং সে পরেছে সেই পুরোনো কলেজের জামা, যেটা সে শেষবার পড়েছিল সায়নীর সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার দিন। “এই তো আমার পুরোনো জীবন,” ভাবে সে। কিন্তু কেন এই জীবন এখানে, এখন? তার মনে পড়ে যায়—সেই শেষ সন্ধ্যা, যখন সায়নী বলেছিল, “তুই শুধু পালাতে জানিস, অভি। তোর ভেতরটা ঘর নয়, শূন্যতা।” এখন এই মায়াবৃত ঘরে দাঁড়িয়ে সে স্পষ্ট বুঝতে পারে, এই মায়া তার নিজের তৈরি। এই দিদিমা, এই ঘর, এই শান্তি—সবই তার গভীর আকাঙ্ক্ষার প্রতিচ্ছবি। কিন্তু এগুলো তাকে ফিরতে দিচ্ছে না।

ঠিক তখনই ঝর্ণার শব্দ হঠাৎ বদলে যায়—এখন তা যেন শিসের মতো বাজছে, একটা ঘূর্ণিময় বাঁশির সুর। দিদিমা মুখ ঘুরিয়ে বলে, “তুই যদি ওদিকে যাস, এই পৃথিবীটা একবারেই হারিয়ে যাবে।” অভিষেক চুপ করে থাকে। সে সামনে এগোয় না, পেছনেও যায় না। কিন্তু এবার তার চারপাশে দৃশ্য বদলে যেতে থাকে—ঝর্ণা গড়িয়ে যাচ্ছে ছাদের মধ্যে দিয়ে, দিদিমা আর নেই, ঘর ভেঙে পড়ছে শূন্যে, চারপাশের দৃশ্য ভেঙে যাচ্ছে কাচের মতো। তার সামনে এবার ফুটে ওঠে এক উঁচু পাহাড়, যার গায়ে খোদাই করা এক চিহ্ন—তিনটি চোখ, একটি মুখহীন মুখ, আর তার নিচে লেখা “চতুর্থ চক্র: মোহরূপিণী”। তার মনে হয়, এই মোহের জগৎ এখন আর বন্ধন নয়, বরং দরজা—যেটা সে পার করলেই নিজেকে খুঁজে পেতে পারবে। সে চোখ বন্ধ করে বলে, “আমার মায়া আমিই বানিয়েছি, আর এখন আমিই তা ছাড়ছি।” চোখ খুলতেই সে দেখে, এখন সে সেই পাহাড়ের গায়ে দাঁড়িয়ে, ঝর্ণা শুকিয়ে গেছে, আর সামনে বসে আছে একজন মহিলা—চোখে লাল সিঁদুরের রেখা, গায়ে তামার গয়না, এক হাতে একটি পুঁথির গ্রন্থ।

এদিকে ঋদ্ধিমান নবচক্রের তৃতীয় স্তর পেরিয়ে এসেছে—সময়, একাকীত্ব, আর তর্ক। এবার সে পৌঁছেছে এক পাহাড়ি গুহার মুখে, যার গায়ে নকশা করা একটি হাত—যার পাঁচটি আঙুল পাঁচদিকে ছড়িয়ে গেছে, প্রতিটি আঙুলের ডগায় অগ্নিশিখার প্রতীক। সে গুহার ভেতরে প্রবেশ করে, দেখে চারপাশে অদ্ভুত সব প্রতিচ্ছবি ভাসছে বাতাসে—তার নিজের মুখ, তার বন্ধুর মুখ, এমনকি এক মেয়ের মুখ, যাকে সে ভালোবেসেছিল, কিন্তু সে ভালবাসা সে স্বীকার করেনি, কারণ তার নিজের আবেগকে সে দুর্বলতা মনে করত। “তুই তো শুধু অন্যদের ভুল খুঁজতে জানিস, কিন্তু নিজের কাঁটা লুকিয়ে রাখিস,” বলে একটি প্রতিচ্ছবি। সে থেমে যায়, স্বীকার করে নেয়—সে সবসময় নিজেকে যুক্তির খাঁচায় বন্দি রেখেছে। এবার সে নিজের বুক থেকে একটি পুরোনো নোট খুলে ছিঁড়ে ফেলে দেয়। চারপাশের ছায়া গলে যায়। সামনে পথ খুলে যায়, এক সরু সিঁড়ি উঠে গেছে অরণ্যের মাথার দিকে। দূরে কোথাও বাজে এক অলৌকিক ঢাক, যেন কেউ বা কিছু জেগে উঠছে।

অভিষেকও পৌঁছে গেছে মোহের দরজা পেরিয়ে সেই মহিলার কাছে, যিনি পুঁথি হাতে বসে। তিনি বলে, “তোর কল্পনা তোর শক্তি, তোর ভয় তোর অস্ত্র। নবচক্রের ষষ্ঠ স্তর তুই নিজেই, অভি। এখন একটিই প্রশ্ন—তুই কি ফিরে যেতে চাস?” অভিষেক বলে, “আমি ফিরতে চাই, কিন্তু ঋদ্ধিমানকে ছাড়া নয়।” মহিলা তার হাতে দেয় পুঁথির একটি ছেঁড়া পৃষ্ঠা—যেখানে আঁকা আছে দুইজন পথিক, দুই জগতের দুটি দরজা, এবং মাঝখানে একটি শূন্যতা—যেটিকে বলা হয়েছে ‘সংযুক্তি’। মহিলা বলে, “তোমরা যদি একই মুহূর্তে একই সত্য স্বীকার করো, তবে সেই শূন্যতা ভাঙবে। নয়তো, তোমাদের কেউই ফিরতে পারবে না।” অভিষেক সেই পৃষ্ঠা জড়িয়ে রাখে, জানে—সবকিছু এখন একসাথে বাঁধা।

নিশীথবেলায় কৌশিকী অরণ্য হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে যায়। বাতাস থেমে যায়, পাখিরা নীরব, গাছপালা স্তব্ধ। গুহার ভিতর ঘুমিয়ে থাকা এক প্রাচীন ছায়া এবার ধীরে ধীরে উঠে বসে, তার গলায় আবার ঝুলে পড়ে সেই ধাতুর তালা। সে ফিসফিসিয়ে বলে—“তারা চারটি চক্র পেরিয়েছে। এবার তাদের আমি নিজেই দেখব। নবচক্র ভাঙবে না, কারণ ভয় কখনও সত্যকে স্বীকার করে না।” এবং তখন, দূর থেকে, সেই বাঁশির সুর আবার বেজে ওঠে—একই সঙ্গে করুণ, সতর্ক, আর অলঙ্ঘনীয়।

***

অরণ্যের গভীরে, এক লাল পাতায় মোড়া ঢালের গা বেয়ে ঋদ্ধিমান উঠে চলেছে, পায়ের নিচে পিচ্ছিল শ্যাওলার গন্ধ, মাথার উপর খেজুরপাতার মতো ঝুলে থাকা ঝোপ থেকে কখনো-সখনো ঝরে পড়ছে জলবিন্দু—একেকটা যেন সময়ের হিসেবছাড়া ক্ষণ। নবচক্রের চতুর্থ স্তর পার হয়ে সে বুঝেছে, এই অরণ্য কোনো ভৌগোলিক মানচিত্রে টানা রেখার খেলা নয়—এটা এক মানসিক গোলকধাঁধা, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ তার নিজের ভিতরের ভয়কে অনুরণিত করে তোলে। সামনে এসে দাঁড়ায় এক প্রাচীন মন্দির ধ্বংসস্তূপ—মাটি ফেটে গিয়ে তার ভেতর থেকে গজিয়ে উঠেছে একগুচ্ছ বিশালাকৃতির বৃক্ষ, আর ঠিক সেই গাছের শেকড়ের মাঝে জড়িয়ে আছে নবচক্রের পঞ্চম স্তরের দরজা। দরজাটা পাথরে খোদাই, মাঝখানে ফুটে আছে এক অদ্ভুত দাগ—যেন মানুষের বুকের ওপর পিন দিয়ে আঁকা একটি বৃত্ত, আর তাতে আটকে আছে একটি চোখ। তার নিচে লেখা, “সংযুক্তি—শুধু তখনই পথ খুলবে, যখন দুটি সত্য একই সময়ে স্বীকার করা হবে।” ঋদ্ধিমান প্রথমে কিছু বুঝতে না পারলেও হঠাৎ মনে পড়ে যায় অভিষেককে—তার একমাত্র সঙ্গী, যে হারিয়ে গিয়েছিল এই অরণ্যে প্রবেশের ঠিক পরেই। এতক্ষণ নিজেকে বাঁচানোর লড়াইয়ে সে বন্ধুর কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিল। সেই দৃষ্টিই তাকে নিয়ে আসে এই স্তরের মূল পরীক্ষায়—‘সহানুভূতির বোধ’।

একই সময়ে, অভিষেক দাঁড়িয়ে আছে একটি ছেঁড়া পুঁথির পৃষ্ঠা হাতে, তার সামনে সেই পাহাড়ি নারী—মোহরূপিণী সন্ন্যাসিনী—যিনি এখনও মৌন। পৃষ্ঠা খুলে সে আবার পড়ে—“তোমরা যদি একই মুহূর্তে একই সত্য স্বীকার করো, তখনই বন্ধন ভাঙবে। নয়তো, চক্র নিজেই আবার শুরু হবে।” অভিষেক এখন প্রথমবার অনুভব করে, এই পথ একার নয়। ঋদ্ধিমান ছাড়া এই নবচক্র জয়ের কোনো উপায় নেই। হঠাৎ ঝর্ণার পাথরে সে খুঁজে পায় আরেকটি দাগ—একটি চোখ এবং বৃত্ত, ঠিক ঋদ্ধিমানের পথের মতো একই চিহ্ন। পৃষ্ঠার নিচে লেখা, “চক্রের বাইরে যেতে হলে জোড়া তৈরি করো, নিজের অহংকে ভাঙো।” অভিষেক স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে, তারপর হাত রাখে সেই দাগের উপর। ঠিক সেই মুহূর্তে, বহু মাইল দূরে ঋদ্ধিমানও হাত রাখে সেই একই খোদাইচিহ্নে। অরণ্যের বুক কেঁপে ওঠে—এক আলো গজিয়ে ওঠে মাটির গভীর থেকে, এক সাদা রেখা উঠে যায় আকাশ পর্যন্ত। তাদের দুই অবস্থান যেন একটি অভিন্ন শিরায় মিলিত হয়—আর তখনই এক বিশাল শব্দে পঞ্চম চক্রের দরজা খুলে যায়।

আলোয় ভেসে ওঠে এক শূন্য জায়গা—না এটি অরণ্য, না পাহাড়, না গুহা। এ এক সীমান্তশূন্য স্তর—সংযুক্তি। এখানে স্থান নেই, কেবল অনুভব আছে। ঋদ্ধিমান ও অভিষেক হঠাৎ একে অপরকে দেখতে পায়—দুই পৃথক দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ, এখন এক কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে। কথা হয় না, কণ্ঠ নেই, কিন্তু মনুষ্যতাকে পেরিয়ে তারা অনুভব করে যে তারা দুজনেই ভয় পেয়েছিল—একজন একাকীত্বের, আরেকজন পরিত্যাগের। তারা একই সঙ্গে মেনে নেয়, “আমি ভয় পেতাম হারিয়ে যাওয়াকে, এবং আমি আজও ঠিক বুঝিনি ভালোবাসাকে।” সেই স্বীকৃতি ঘিরে যেন নবচক্রের মাঝখানে এক বিস্ফোরণ ঘটে—আলো ছড়িয়ে পড়ে দিগ্বিদিক, এবং সেই আলোয় দেখা দেয় প্রথমবার ভৃগুনাথ তান্ত্রিক—তার শরীরে হাড় আর ছাইয়ের ছাপ, চোখে মৃত জ্যোতি, এবং কণ্ঠে এমন এক শব্দ, যা ভাষা ভেদ করে গায়ে কাঁটা দেয়। “তোরা নবচক্রের মূল বুঝে ফেলেছিস… কিন্তু বন্ধন ভাঙা মানেই তো মুক্তি নয়,” বলে সে, “এখন শুরু হবে শেষ দীক্ষা।”

ভৃগুনাথ হাত তোলে, তার ছায়া গলে গলে ছড়িয়ে পড়ে অরণ্যজুড়ে। মাটি থেকে উঠে আসে অতীতের স্মৃতিচিহ্ন, ভয়, ক্ষোভ—সব মিশে গিয়ে এক দানবীয় চক্র তৈরি করে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে তারা দুজন। ভৃগুনাথ বলে, “যার ভিতরে চক্র, সে কখনওই চক্রের বাইরে নয়। এবার প্রমাণ কর—তোমরা সত্যিই মুক্ত হতে পারো কি না।”
অরণ্য এবার সত্যিকার অর্থেই জীবন্ত। একদিকে তাদের বন্ধনের প্রাচীন ভিত্তি নড়ে ওঠে, অন্যদিকে ভয় আবার ফিরে আসে। আলো আর ছায়ার লড়াই শুরু হয় কৌশিকীর বুকে।

এবং তখনই, ঋদ্ধিমান অভিষেকের দিকে তাকিয়ে বলে, “আমরা ফিরে যাব—কিন্তু এইবার কেবল বেরোতে নয়, বোঝার জন্য।”
অভিষেক হেসে ফেলে, “চক্র শুধু ভয় নয়, ভাই। এটা বন্ধুত্বও। সেটা তোরা জানিস না, গুরুজী।”

চ্যাপ্টার ৫ এখানেই শেষ হয়—দুই বন্ধু দাঁড়িয়ে এক ভয়ঙ্কর শক্তির মুখোমুখি, যা শুধুই বাহ্যিক নয়, বরং তাদের ভেতরের প্রতিচ্ছবিও। কিন্তু এবার তারা একসাথে। নবচক্র টালমাটাল, সংযুক্তি স্তর খোলা, এবং ভৃগুনাথ—জেগে।

***

ভৃগুনাথ তান্ত্রিক দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল বৃত্তের ঠিক কেন্দ্রে—তার চারপাশে আঁকা আছে অশুদ্ধ রক্তের লালাক্ষরে একটি পুরাতন মণ্ডল, যা থরথর করে কেঁপে উঠছে। তার দেহে গলে গলে পড়ছে ভস্ম, আর গলার তাম্রতালাটি ঝিকঝিক করছে যেন আগুনের ছোঁয়ায় জেগে উঠেছে কোন অলৌকিক সত্তা। আকাশজুড়ে কালো মেঘ জমেছে, অথচ বৃষ্টির ধারা নেই—শুধু কাঁচের মতো স্তব্ধ বাতাস, যার গভীরে দাঁড়িয়ে আছে অভিষেক ও ঋদ্ধিমান, দুজনই এবার মাটিতে খালি পায়ে, বুকভরা সাহস আর চোখভরা সংশয় নিয়ে। “এবার শুরু হবে শেষ স্তর—‘ভূ-তন্ত্র’, যেখানে শুধু ভয় নয়, তোমাদের বিশ্বাসকেও ভাঙা হবে,” বলে ওঠে ভৃগুনাথ। তার কণ্ঠে যেন হাজার মৃত আত্মার ফিসফাস, আর তার প্রতিটি শব্দে অরণ্যের বৃক্ষদল কেঁপে ওঠে। নবচক্রের মাটিতে ধ্বনি উঠতে থাকে—মন্ত্র নয়, বরং এক বিকৃত শব্দ-সংহিতা, যেটা দেহে ঢুকে চেতনায় ঘূর্ণি তোলে। হঠাৎ করে চারপাশের অরণ্য গিলে নেয় বাস্তব—মাটি ফেটে গিয়ে উঠে আসে মূর্তি, ছায়া, স্মৃতি, আর শূন্যতা—যেখানে ছায়া সায়নীর মুখে, দিদিমার মুখে, আবার কোথাও হয়তো নিজের মুখেই রূপ নেয়।

অভিষেক আর ঋদ্ধিমান দুই বিপরীত দিক থেকে এগিয়ে যায় বৃত্তের কেন্দ্রে, যেখানে মাটি জ্বলছে অথচ পুড়ছে না। তারা বুঝে যায়, লড়াইটা শুধু ভৃগুনাথের নয়—এটা নিজেদের বিপরীত সত্তার সঙ্গে। হঠাৎ ভৃগুনাথ দুই হাতে দুই রেখা ছুঁড়ে দেয় তাদের দিকে। অভিষেক দেখে সে ফিরে গেছে সেই রাতে—যেদিন সায়নী তাকে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, “তুই আমার কথা শুনিস না, তুই শুধু নিজের ছবির পেছনে দৌড়াস।” সায়নীর চোখে পানি নয়, এবার রক্ত। সে চিৎকার করে ওঠে, কিন্তু এবার সে আর পালায় না। সে বলে, “হ্যাঁ, আমি ব্যর্থ ছিলাম। আমি ভয় পেতাম গভীরতা।” কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে চারপাশ থেকে ছায়াগুলো ভেঙে পড়ে, আর তার সামনে থেকে দৃষ্টিটা পরিষ্কার হয়। অন্যদিকে, ঋদ্ধিমান দেখে তার শৈশবের সেই অন্ধকার ঘর—মায়ের নিঃশব্দ কান্না, বাবার মুখে শব্দহীন অভিমান। সে দাঁড়িয়ে আছে জানালার ধারে, বাইরে তাকিয়ে—ঠিক যেমনটা ছিল সেই দশ বছর বয়সে। এবার সে ধীরে ধীরে দরজা খুলে বাইরে যায়, বলে, “আমার ভিতরের অন্ধকারটাই আমাকে চালিয়েছে। আমি ভয় পেতাম একা থাকতে, তাই কখনো কারো কাছে কিছু চাইতাম না।” এই স্বীকৃতি দিয়েই, তার চারপাশের জগৎ কাঁপে, ছায়াগুলো গলে যায় ধ্বংসস্তূপে।

ভৃগুনাথ গর্জে ওঠে। তার চোখ এখন রক্তাভ, শরীর থেকে বেরিয়ে আসছে ছায়া-সাপ, যাদের প্রত্যেকটি এক-একটি পুরাতন ভয়কে ধারণ করছে। সে বলে, “তোমরা ভয় স্বীকার করেছ, কিন্তু তন্ত্রের চক্র এখনও ভাঙোনি।” তখন অভিষেক তার পুঁথির পৃষ্ঠাটি তুলে ধরে, যেটা ধ্বংস হয়নি আগুনে। তাতে লেখা: “সংযুক্ত চেতনা তন্ত্রকে পরাভূত করে—কারণ তন্ত্র শক্তি, কিন্তু চেতনা সৃষ্টি।” সে ঋদ্ধিমানের দিকে তাকিয়ে বলে, “বন্ধু, একসাথে এগোই। ভয়কে নয়, বিশ্বাসকে সঙ্গে নিয়ে।”
ঋদ্ধিমান মাথা নাড়ে। তারা একসাথে হাঁটে বৃত্তের শেষ রেখা পেরিয়ে—ভৃগুনাথের দিকে, যে এবার আর সুরক্ষা পায় না চক্রের মধ্যমণ্ডল থেকে। তার মুখ বেঁকে যায়, সে বলে, “তোমরা চক্র ভাঙলে। কিন্তু জানো না, আমি চক্র নই, আমি সেই চেতনার ছায়া, যা তন্ত্রকে রক্ষা করে।” তখন ঋদ্ধিমান বলে, “ছায়া শুধু তখনই থাকে, যখন আলো পেছনে থাকে। এবার আমরা সামনে তাকাচ্ছি।” এই কথার পরেই মাটির নিচ থেকে এক আলো উঠে আসে—এক অগ্নিজ্যোতি, যেটা গজিয়ে ওঠে ঠিক তাদের পায়ের তলায়। সেই আলোতে ধ্বসে পড়ে বৃত্তের কেন্দ্র, ভৃগুনাথ টেনে নেয়া হয় নিজেরই ছায়ার মধ্যে, আর তার তাম্রতালাটি পড়ে থাকে নিঃশব্দে। চারপাশের অরণ্য থেমে যায়, কুয়াশা দূরে সরে যায়, পাতার ফাঁকে সূর্য ওঠে—আসল সূর্য, সময়ের সূর্য, যা এতদিন ছিল অনুপস্থিত।

তারা আবার দেখে নিজের শরীর, মুখে ধুলো, গায়ে কাদা, কিন্তু চোখে এক আলোর রেখা। কৌশিকী অরণ্য এবার নীরব নয়—এবার সে প্রাণে ভরা। নবচক্র আর নেই, মাটি শান্ত, আর দূরে পাখিরা গান গাইছে। তারা ফিরে আসে সেই জায়গায়, যেখান থেকে প্রথম বেদি খুঁজে পেয়েছিল। কিন্তু এবার বেদি নেই। শুধু পড়ে আছে একটি ভাঙা পাথরের টুকরো—যাতে আঁকা একটি বৃত্ত, যার মাঝখানে দুইটি ছায়া হাত ধরে।

***

অভিষেক ও ঋদ্ধিমান অরণ্যের পাথুরে পথ বেয়ে নামছিল, কিন্তু এবার যেন পা-দুটি আরও ভারী—শুধু ক্লান্তিতে নয়, কিছু একটার অজানা পূর্বাভাসে। কৌশিকী অরণ্যের গা দিয়ে যখন তারা নিচে নামছিল, তখন দেখল—ঝরনাটা শুকিয়ে গেছে, সেই বাঁকটা যেখান দিয়ে তারা ঢুকেছিল সেখানে আর আগের মাটির গন্ধ নেই। বনের গায়ে টাঙানো নামফলকটা একেবারে ঝাপসা হয়ে গিয়েছে, তার অর্ধেকটা ভাঙা। আশেপাশে কোথাও মানুষের সাড়া নেই। তারা হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছায় সেই পাহাড়ি গ্রামটায়, যেখান থেকে তারা ট্রেকিং শুরু করেছিল—কিন্তু পুরো গ্রামটা যেন বদলে গেছে। নতুন দোকান, ভাঙা কুঁড়েঘর, মোবাইল টাওয়ার, একেবারে নতুন মুখ। সেই ছোট চায়ের দোকানটা যেখানে সেই বৃদ্ধ লোকটি তাদের নবচক্রের গল্প বলেছিল, সেটা নেই। বদলে একটা আধুনিক চা-ক্যাফে, কাঁচের দেয়াল ঘেরা। তারা দুজনে তাকিয়ে রইল, অপ্রস্তুত, যেন নিজেদের ঠাঁই খুঁজে পাচ্ছে না পরিচিত এই ভিন্নতায়।

এক বৃদ্ধ ভটভটি চালককে অভিষেক জিজ্ঞেস করল, “বাবা, এখান থেকে ট্রেকিং রুটে ঢোকার যে পাথরের রাস্তা ছিল, মনে আছে তো?” বৃদ্ধ তাকিয়ে থাকলেন কয়েক সেকেন্ড। তারপর বললেন, “ওখানে এখন আর কেউ যায় না বাবু। চার বছর আগে দুটো ছেলে নিখোঁজ হয়েছিল ওদিকে, তখন থেকে বনদপ্তর জায়গাটা বন্ধ করে রেখেছে। রীতিমতো সংবাদে এসেছিল খবরটা। আপনাদের মতো দেখতে একজনে তো ছিল ফটো তোলার ছেলেটা… ক্যামেরা হাতে…”

ঋদ্ধিমান ও অভিষেক একে অপরের দিকে তাকায়। ঠোঁট শুকিয়ে আসে। তারা ফিরে আসে গ্রামের পোস্ট অফিসে। খাতা ঘেঁটে দেখে—হ্যাঁ, চার বছর আগে ঠিক এই তারিখেই তারা পাহাড়ে উঠেছিল। কিন্তু তারা তো কেবল এক রাত পার করে ফিরেছে! সেই চায়ের দোকানদারও নেই, কেউ তার নামও মনে করতে পারে না। তারা দুজনে নিজের মোবাইল অন করে—নেটওয়ার্ক ফিরে আসে। অসংখ্য মিসড কল, বার্তা, একাধিক নিউজ পোর্টালের স্ক্রিনশট—‘Two trekkers missing in Kaushiki forest for over a week’, ‘Search ends, rescue fails’, ‘Presumed dead’.

অভিষেকের ফেসবুক খুলে সে দেখে তার প্রোফাইলে কেউ RIP লিখে দিয়েছে, স্মৃতি ভাগ করেছে। ঋদ্ধিমানের পরিবারের লোকজন তার নামে একটি ছোট মন্দির তৈরি করেছে, সে দেখে সেই ছবিও। চার বছরে, তাদের জীবন থেমে যায়নি, বরং চলে গিয়েছে এক ভিন্ন পথে—তাদের অনুপস্থিতি কারও কাছে প্রশ্ন, কারও কাছে শুধুই ক্ষয়।

তারা ফিরে যায় সেই পুরনো শহরে—যেখানে এখন অভিষেকের বাসা বিক্রি হয়ে গেছে, আর ঋদ্ধিমানের অফিসে নতুন মানুষ। কেউ আর জানে না তারা কোথা থেকে ফিরে এল। কেউ তাদের বিশ্বাসও করে না। একমাত্র জেগে আছে সেই তান্ত্রিক পাণ্ডুলিপির ছেঁড়া পৃষ্ঠা—যা এখন একরকম কালো হয়ে গিয়েছে, কিন্তু এক কোণে নতুনভাবে আঁকা—“সংযুক্তির ছায়া থেকে জন্ম নেয় নতুন চক্র। ফিরেছে যারা, তাদের মধ্যে চিহ্ন রয়ে যায়।”

তাদের শরীরের গায়ে এখন মাঝেমধ্যে জেগে ওঠে ছায়াচক্রের দাগ—ঘুমের মধ্যে তারা এখনও বাঁশির শব্দ শুনতে পায়, এবং সময়চক্রে তারা অনুভব করে—তারা আসলে ফিরেও এসেছে না।

***

আধা-আলো ঘরের নিঃস্তব্ধতায় অভিষেক দাঁড়িয়ে ছিল আয়নার সামনে। তার গায়ে ধুলো জমে আছে, চুল এলোমেলো, কিন্তু সবচেয়ে অস্বস্তিকর ছিল তার বুকের ঠিক বাঁদিকের সেই গোল দাগটা—যেটা সে একবার দেখে ভেবেছিল, জোঁকের কামড়, আবার একবার মনে হয়েছিল কোনো পোকার ছিদ্র। কিন্তু আজ, আঠারো দিন পরেও, দাগটা বদলাচ্ছে। সেটি এখন স্পষ্টতই একটি চক্র—ছোট্ট, ধাতব ধূসর ছায়ার মতোন, যেন শরীরের তলায় কিছু একটা ঘুরছে। রাত হলেই দাগটা গরম হয়ে ওঠে। আর তখনই সেই বাঁশির সুর—ঝর্ণার মত নয়, বরং অরণ্যের গা দিয়ে বয়ে চলা এক অবিনাশী মন্ত্রের মত বেজে ওঠে।

ঋদ্ধিমানও এই দাগ পেয়েছে। সে বারবার চেকআপ করিয়েছে—কিন্তু রিপোর্টে কিছুই নেই। অভিষেককে সে একদিন ফোনে বলেছিল, “এটা মনে হয় শুধু শরীরের দাগ নয়, মনে একটা স্তর তৈরি হয়েছে। আমি এখন কারও চোখে তাকালে তাদের স্মৃতির ভেতর কিছু একটা দেখতে পাই। যেমন একটা বাচ্চা ছেলেকে দেখলেই আমি তার হারিয়ে যাওয়া খেলনাটার গন্ধ পাই। এটা স্বাভাবিক না।” অভিষেক তখন চুপ ছিল। কারণ তার মধ্যেও একই রকম অনুভূতি—রাতের স্বপ্নে সে দেখছে এক অচেনা বালিকাকে, যার গায়ে ছাই, গলায় তালা, আর হাতে একটা ছোট পুঁথি। সেই মেয়ে বারবার বলে, “তুমি এসেছিলে, কিন্তু চক্র এখনও জাগ্রত।”

একদিন গভীর রাতে, অভিষেক হঠাৎ জেগে ওঠে—তার ঘরের জানালার ফাঁক দিয়ে এসে ঢোকে সেই পরিচিত ঠাণ্ডা বাতাস। সে উঠে জানালায় গিয়ে দেখে—ঠিক রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে এক কিশোর, যার পরনে স্কুলব্যাগ, চোখ দুটো অদ্ভুত স্থির। ছেলেটা তার দিকে তাকিয়ে বলে, “ভৃগুনাথ এখনও ঘুমায়নি। আপনি তাকে কেবল রক্ত থেকে সরিয়েছেন, মাটি থেকে নয়।” এই বলে ছেলেটা রাস্তা পেরিয়ে হাওয়ার মধ্যে গলে যায়।

ঋদ্ধিমান আর অভিষেক আবার দেখা করে—এইবার তারা সেই ছেঁড়া পুঁথির অংশগুলো খুলে দেখে। সেগুলোতে আগেই লেখা ছিল:

> “যারা নবচক্র ছুঁয়ে ফেলে, তাদের শরীরে রয়ে যায় তন্ত্রের দাগ। এ দাগ তারা নিয়ে বেড়ায় জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। চক্র ভাঙে, কিন্তু চেতনা বহন করে সেই শক্তি। যারা বহন করে, তারাই হয় পরবর্তী রক্ষক।”

 

তারা বোঝে, তারা এখন রক্ষা করছে সেই চেতনা—ভৃগুনাথ যেটাকে কু-তন্ত্রে পরিণত করতে চেয়েছিল। এখন সেই তন্ত্র সঠিক পথে রক্ষা করার দায়িত্ব তাদের ওপর।

তাদের পরবর্তী অভিযান শুরু হয়—এই দাগ কাদের মধ্যে জন্ম নিচ্ছে, কোথায় ছায়া তৈরি হচ্ছে, আর কে হতে পারে পরবর্তী বাহক? একদিন এক খবর আসে—এক কিশোরী হারিয়ে গেছে মানালি থেকে, সন্ধান মেলে না। তার ঘরে পাওয়া গেছে ছাই দিয়ে আঁকা চক্রচিহ্ন। তার স্কুলের ডায়েরিতে লেখা একটি বাক্য: “আমি তাকে স্বপ্নে দেখি—তার গায়ে তালা, চোখ নেই, কিন্তু সে আমায় ডাকছে নাম ধরে।”

অভিষেক জানে, এখন শেষ হয়নি কিছুই। বরং শুরু হয়েছে “চক্র-চেতনার দ্বিতীয় স্তর”—যেখানে অস্তিত্ব আর বাস্তবের সীমারেখা একেবারে মুছে যায়।

অরণ্য এখন অনেক দূরে, কিন্তু তার নিশীথবেলা এখনও তাজা। কৌশিকী ঘুমিয়ে নেই। কেবল তার গায়ে পড়ে থাকা ছায়ারা এখন অন্যদের ডাকছে।

আর সেই ডাক, ঠিক যেন একটি বাঁশির মত—
নীরব, কিন্তু থামানো যায় না।

____

 

1000040414.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *