Bangla - ভূতের গল্প

কোয়ারেন্টাইন কোয়ার্টার

Spread the love

অর্ঘ্য বসু


দক্ষিণ কলকাতার বালিগঞ্জ অঞ্চলের ঘিঞ্জি কিন্তু অভিজাত এক পাড়ায়, সন্ধ্যেবেলা গাড়ির হেডলাইটে ভিজে থাকা রাস্তায়, হঠাৎই ট্যাক্সি থামল “সৌরভ অ্যাপার্টমেন্ট”-এর সামনে। ঈশিতা ব্যানার্জি ধীরে ধীরে নেমে পড়ল গাড়ি থেকে, কাঁধে একটা মাঝারি ব্যাগ আর হাতে ছোট্ট স্যুটকেস। ট্র্যাভেল অ্যাপে বুক করা এই ভাড়া ফ্ল্যাট, 3B, সে গতকাল রাতেই নিশ্চিত করেছে—দামটা তুলনায় অস্বাভাবিক কম। মালিক ফোনে শুধু বলেছিল, “ঘরটা এখন খালি, কিন্তু বেশ কয়েকজন এসেছিলেন, এক সপ্তাহের বেশি কেউ থাকতে পারেননি।” ঈশিতা পাত্তা দেয়নি। তার কাছে ‘ঘর’ মানে একটা নিরিবিলি জায়গা—যেখানে কেউ প্রশ্ন করে না, কেউ দরজায় কড়া নাড়ে না। চাকরির বদল, একটা সম্পর্কের ভেঙে যাওয়া, আর সেই ভেতরের এক ক্লান্তি—এসব মিলিয়ে সে চাইছিল একটু নিজের মতো থাকতে। কিন্তু লিফটে ওঠার সময়ই যেন কিছু ভারী ভাব ছড়িয়ে পড়ল। করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা কেয়ারটেকার অমিতাভর মুখে এক রহস্যময়তা—সেও যেন প্রশ্ন করতে চায়, “আপনি ঠিক এই ফ্ল্যাটে উঠছেন তো?” ফ্ল্যাটের দরজা খোলার সময়, চাবি একটু কাঁপল তার হাতে, ভেতরে ঢোকার পর হঠাৎ যেন মনে হলো, ঘরটা দীর্ঘদিন ঘুমিয়ে ছিল। জানালায় হালকা ধুলো জমে থাকা, দেওয়ালে এক ধরণের স্যাঁতসেঁতে গন্ধ, আর বাতাসে এমন কিছু—যা খুব স্পষ্ট নয়, কিন্তু অস্বাভাবিক।

ঘরটা ফার্নিশড—কোচ, টেবিল, বিছানা সবই আছে, এমনকি একটা ওয়ার্ডরোব আর কিচেনে বেসিক কুকিং সেট-আপও রাখা। কিন্তু সবকিছুতেই যেন একটা “আগে কেউ ছিল” এর ছাপ। রান্নাঘরের তাকের কোণে একটা ছোট্ট চায়ের কাপ, যেটা ধোওয়া হয়নি; খাটের নিচে পাওয়া গেল একজোড়া পুরনো চপ্পল, পুরুষের নয়, ছোট, সাদামাটা নারীদের স্লিপার। ঈশিতা নিজেকে শক্ত করে বলল, “এমন তো হয়—পুরনো ভাড়াটে হয়তো ফেলে গেছে।” কিন্তু সে টের পেল, ঠিক যেমন তার নিজের মধ্যে একটা দীর্ঘ নিঃশব্দতা জমে আছে, তেমনই এই ঘরেও জমে আছে কথা না বলা কিছু গল্প, ফিসফিস করে ওঠার অপেক্ষায়। জানালা খোলার সময় হঠাৎ পর্দাটা কেমন যেন এক ঝটকায় দুলে উঠল, যেন কেউ ছুঁয়েছে। বাতাসে একটা মৃদু গন্ধ—নাকি স্মৃতি? না, হয়তো ধ্যানের ভুল। কিন্তু রাতে শুয়ে পড়ার পরে যখন বিছানায় শরীর এলিয়ে দেয়, তখন হঠাৎ খেয়াল করল—ঘরের ঠিক কোণটায় একটা দাগ, একরকম ছোপ ছোপ হয়ে আছে। সে আলোটা নিভিয়ে দেয়। ঘুম আসতে চায়, কিন্তু মন যেন কোনো পুরনো চিৎকার শুনতে পায়—খুব নীচুস্বরে, খুব দূর থেকে, “আমি এখনও এখানেই আছি…”

পরদিন সকালে ঘুম ভেঙে ঈশিতা একটু ক্লান্ত অনুভব করে। মনে হয় রাতের ঘুমটা গভীর হয়নি। সে চায়ের পানি বসাতে গিয়ে দেখে, আগের রাতের যে কাপটা সে নিজে ধুয়ে রেখেছিল, সেটা আবারও হালকা ভেজা। যেন কেউ ব্যবহার করেছে। এদিকে দরজা পুরো লক করা, জানালার গ্রিল সুরক্ষিত, বাড়িওয়ালার ফোনও অফ। ঈশিতা নিজেকে যুক্তি দিয়ে বোঝায়—“হয়তো ভেজা ছিল আগেই, আমি খেয়াল করিনি।” কিন্তু এমন অদ্ভুত খটকা একবার মনে জন্মালে, তা আর সহজে যায় না। সে ঘরের ভিতরটা ঘুরে দেখতে শুরু করে, দেয়ালে একটা ছোট খাপে খাপে ঘেরা তাক খোলে—সেখানে পড়ে থাকা একটা পুরনো ডায়েরি। পাতাগুলো হলদে, তারিখ লেখা—২৪ মার্চ ২০২০ থেকে শুরু। প্রথম পাতায় লেখা আছে কেবল: “I have to stay inside. I have no choice.” আর নিচে একটা নাম—Rupa S. ঈশিতা হঠাৎ ঘরটাকে আর আগের মতো দেখতে পারে না। তার মনে হয়, এই ঘরে কেউ সত্যিই একদিন থেকেছে। কেউ যিনি একা ছিলেন, ভয় পেতেন, এবং হয়তো… এখনও কোনোভাবে “থেকে” গেছেন। আয়নার পাশ দিয়ে হাঁটার সময়, সে মুহূর্তের জন্য দেখে—পাশে যেন আরেকটা প্রতিচ্ছবি। কিন্তু ফিরে তাকালে, সেখানে শুধু সে একাই। ঘরটা আবার নিস্তব্ধ। কিন্তু এবার সেই নিস্তব্ধতা, যেন এক অচেনা কারো নিঃশ্বাসে ভারী হয়ে উঠছে।

দুপুরবেলায় শহরের আলো ফিকে হয়ে আসা শুরু করে যখন ঈশিতা বিছানার পাশে রাখা ডায়েরিটা আবার হাতে নেয়। পাতাগুলোয় সময়ের গন্ধ—তীব্র, নির্জন এবং বদ্ধ একটা অস্তিত্ব যেন ঘিরে ধরে। প্রথম কিছু পাতা লেখা ছিল যন্ত্রণার কাব্য। “আজ ৫ দিন হলো, কারো মুখ দেখি না।” তারপর “শরীর কেমন খারাপ, গলা ব্যথা করছে… কিন্তু হাসপাতাল যাবো না। এখানে থাকবো। আমার ঘর—আমার শরীর—আমারই দায়।” ঈশিতা একটু থেমে যায়, মনে পড়ে যায় ২০২০-র সেই ভয়ানক দিনগুলোর কথা, যখন গোটা শহর থেমে গিয়েছিল, রাস্তায় পাতা উড়ত আর অ্যাম্বুলেন্সের আওয়াজে বুক ধড়ফড় করত। কিন্তু রূপার লেখায় যা ছিল, তা নিছক কোভিড আইসোলেশনের কষ্ট নয়—তাতে ছিল কিছু গভীর অসহায়তা, আর একটা অদ্ভুত স্থিরতা। যেন সে এই ঘরের বাইরের জগৎকে মেনে নিতে চায় না। এক জায়গায় লেখা: “ঘরের মধ্যে একটা সময় জমে আছে। আমি জানি, কেউ দরজা না খুললে আমি এখানেই পচে যাবো। কিন্তু সেটা আমার সিদ্ধান্ত।” ঈশিতার গায়ে কাঁটা দেয়। সে আবার তাকায় ঘরের চারদিকে—এই তো, এই বিছানাতেই হয়তো শুয়ে ছিল রূপা, এই জানালায় বসে হয়তো রোদে মুখ গুঁজে ছিল, আর এই দরজাটা সে নিজের হাতে বন্ধ করে দিয়েছিল। একটা প্রশ্ন ধীরে ধীরে উঠে আসে ঈশিতার মনে—রূপা কি নিজেই নিজেকে ঘরে আটকে ফেলেছিল? নাকি কেউ তাকে বাইরে যেতে দেয়নি?

ডায়েরির আরও কিছু পাতায় রূপার মনের পরিবর্তন ফুটে ওঠে। শুরুতে সে ভেঙে পড়েছিল, তারপর ধীরে ধীরে যেন একধরনের আত্মস্থতা গড়ে তোলে। “আমি আর ভয় পাই না। জানালার ওপাশে যা আছে, তার থেকে এই ঘর অনেক বেশি চেনা।” এমনও লেখা আছে, “ঘড়িটা বন্ধ হয়ে গেছে। অথচ আমার মাথার ভেতরে সময় এখনো বেজে চলেছে। শুধু শব্দটা অন্যরকম।” ঈশিতা এক মুহূর্তে অনুভব করে, এই মহিলা সময়কে নিয়ে আর পাঁচজনের মতো ভাবতেন না। তিনি সময়কে বোধহয় ঘরের দেয়ালে দেখতেন, আলো-ছায়ার মধ্যে শুনতেন। যেন ঘরটা একটা জীবন্ত পাত্র হয়ে উঠেছিল—যার মধ্যে সময় আটকে পড়েছে, মানুষ নয়। ঈশিতা জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়, পর্দা একটু সরায়। বাইরের গাছের ডালে কাক বসে, গরম হাওয়ায় নিঃশব্দভাবে দুলছে। অথচ ঘরের ভেতরে এক অচেনা শীতলতা। রূপার লেখা আবার পড়তে পড়তে ঈশিতা হঠাৎ অনুভব করে, সে যেন কোনো ভিন-জগতের ডায়েরি পড়ছে—এক মৃত, অথচ কথা বলতে থাকা নারীর আত্মকথা।

দিনের আলো নিভে আসে, আর ডায়েরির পৃষ্ঠায় আসে এক অস্বাভাবিক মোড়। “আমি স্বপ্ন দেখছি, দরজার বাইরে কেউ দাঁড়িয়ে। তার মুখ নেই, কিন্তু হাত পেছনে বাঁধা। সে বলছে, ‘তুমি বেরোলে আমি ঢুকতে পারি।’ আমি বুঝি না, এই খেলা কী।” ঈশিতা এক নিঃশ্বাসে পড়ে চলে যায় পরের পৃষ্ঠায়—“আজ আমি দরজা খুলিনি, কারণ জানি, বাইরে যা আছে, তা সময় নয়—তা শূন্যতা। আর আমি এই ঘরে সময় হয়ে উঠেছি।” এ লাইনগুলো পড়ে ঈশিতা কেমন যেন ঘোরের মধ্যে পড়ে যায়। তার মনে হয়, ঘরের এক কোণ থেকে কেউ তাকিয়ে আছে—অদৃশ্য, নিঃশব্দ, অথচ সজীব। সে নিজেকে ফিরে টানে, ডায়েরিটা বন্ধ করে বিছানায় রাখে, আর ঘরের মধ্যে হাঁটতে থাকে। প্রতিটি কোণ যেন একেকটি পাতা, যার ভাঁজে গোপন রয়েছে রূপার নিঃসঙ্গতা, ভয়, এবং এক অদ্ভুত সিদ্ধান্ত—থেকে যাওয়ার। হঠাৎ বাতি টিমটিম করে জ্বলে ওঠে, জানালার কাঁচে এক অচেনা প্রতিচ্ছবি। ঈশিতা মুখ ঘুরিয়ে দেখে—ঘরটা ফাঁকা। তবু তার মনে হয়, ঠিক এই মুহূর্তে, ঠিক এই ঘরে, কেউ আরেকবার ডায়েরির শেষ পৃষ্ঠাটি উল্টে দিয়েছে।

রাত বাড়তেই ঈশিতা ঘরের আলো নিভিয়ে দিলেও তার মনের ভেতরের আলো নিভছিল না। বিছানার পাশে রাখা ডায়েরিটা যেন তাকে ডাকছিল—না, ঠিক ডাক নয়, বরং টানছিল। সে আলো জ্বালাল না, মোবাইলের আলোতেই আবার ডায়েরির প্রথম দিকে ফিরে গেল। “২৪ মার্চ ২০২০, মঙ্গলবার”—এই তারিখটা সবার মতো তার মনেও চিরস্থায়ী হয়ে ছিল। ভারতের লকডাউন ঘোষণার সেই প্রথম দিন। রূপার লেখায় ছিল: “আজ রাস্তায় কেউ নেই। গলির কুকুরগুলোও চুপ করে বসে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি, অথচ মনে হচ্ছে আমি একা নই। আমি জানি, কেউ হেঁটে যাচ্ছে ধীরে, নিঃশব্দে। আমি তাকালেই সে থেমে যাবে।” এই কয়েক লাইন পড়তেই ঈশিতা যেন একটা ভারী নিঃশ্বাস অনুভব করে নিজের ঘাড়ের ওপরে। সে পেছনে তাকায়, কিন্তু জানালার পর্দা শুধু হালকা দুলছে। কেউ নেই। কিন্তু কেমন যেন মনে হলো, কারো চোখ, দীর্ঘ সময় ধরে, তাকে একটানা পর্যবেক্ষণ করছে। সে আবার ডায়েরিতে ডুবে যায়, যেন সেই চোখ এড়িয়ে যেতে চাইছে। পৃষ্ঠা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সে দেখতে পায়, প্রতিটি দিন রূপা লিখেছেন, কখনো অস্পষ্ট হাতের লেখায়, কখনো প্রগাঢ় আবেগে। কিন্তু তার লেখার মধ্যে ক্রমশ একটা ছন্দ গড়ে উঠছে—একটা অস্বাভাবিক অভ্যস্ততা।

“২৮ মার্চ”—এই তারিখে লেখা ছিল: “আমার কাশি শুরু হয়েছে। মুখের স্বাদ চলে গেছে। গলার ব্যথা এতটাই যে কথা বলতে পারছি না। কিন্তু কার সাথে কথা বলব?” পরের লাইনগুলো ছিল ঝাপসা, কালির দাগ ছড়িয়ে গেছে—হয়তো চোখের জল পড়েছিল পাতায়। এরপর আসে এমন কিছু লাইন যা ঈশিতার শিরদাঁড়ায় ঠাণ্ডা স্রোতের মতো বয়ে গেল—“আজ ঘরের আয়নাটা আমাকে ফেরত দেয়নি। আমি সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম, কিন্তু প্রতিচ্ছবিতে আমি ছাড়া আরও কিছু ছিল। কিছু… ছায়ার মতো। মনে হয়, আমার শরীর ধীরে ধীরে হালকা হয়ে আসছে, কিন্তু মাথার ভেতর শব্দ বাড়ছে।” ঈশিতা ডায়েরিটা বন্ধ করে না, বরং আরও গভীরে নামতে চায়। হয়তো নিজের ভেতরের একাকীত্বও তার এই ডুবে যাওয়াকে সমর্থন দিচ্ছে। ডায়েরির এক পাতায় লেখা, “রাতে ঘরের দরজা যেন নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেল। আমি আলো নিভিয়ে ছিলাম না। কিন্তু চারদিকে অন্ধকার। হঠাৎ শুনি, আমার নিজের কণ্ঠস্বর কেউ আওড়ে নিচ্ছে। ভুল নয়। সেই কণ্ঠ আমার, কিন্তু আমি বলিনি।” ঈশিতা অনুভব করে, ঘরের মধ্যে কিছু শব্দ ফিরে ফিরে আসছে, দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে, যেমন কেউ বলছে—“আমি এখানেই আছি।”

সে এক মুহূর্তের জন্য ডায়েরি বন্ধ করে দেয়, চুপ করে বিছানায় বসে থাকে। ঘড়ির কাঁটা তখন রাত দুইটা পেরিয়ে তিনটার দিকে এগোচ্ছে। বাইরে নিস্তব্ধতা, পাখির ডাক নেই, গাড়ির শব্দ নেই, এমনকি কুকুরের ঘেউ-ঘেউও থেমে গেছে। অথচ ঘরের মধ্যে যেন এক অনুচ্চ শব্দের সমুদ্র। খুব দূর থেকে যেন কারো গলার আওয়াজ—কোনো কথা নয়, শুধু নিঃশ্বাসের মতন গর্জন। ঈশিতা মোবাইলের আলো একপাশে রাখে, চোখ বন্ধ করে, নিজের নিঃশ্বাস গোনে। হঠাৎ বিছানার পাশের আয়নাটা টক করে আওয়াজ করে, কাঁপে হালকা করে। সে চোখ মেলে দেখে, আয়নায় কেউ নেই। কিন্তু গায়ে কাঁটা দেয়, কারণ ঠিক আয়নার পাশে রাখা ডায়েরিটার শেষ পৃষ্ঠায় লেখা রয়েছে নতুন কিছু লাইন—যা সে আগে দেখেনি। “যখন কেউ আমার মতো একা হবে, তখন আমি তার সঙ্গে থাকব। আমি তো এই ঘরেরই অংশ হয়ে গেছি। কেউ বেরোতে চাইলে, আমার কাছে আসতেই হবে।” ঈশিতা এবার আর ডায়েরি বন্ধ করে না, তার চোখ স্থির হয়ে থাকে শেষ সেই লাইনে, যেখানে লেখা—“আগামীকাল কেউ আসবে। আমি জানি না সে কে। কিন্তু তার ভেতরে আমি ঢুকে যাবো। কারণ আমি তো ঘরটা ছাড়িনি।” চোখের কোণে ঈশিতার কাঁপুনি নামে। সে জানে, সে-ই সেই “আগামীকাল”-এর মানুষ।

সকালে ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গেই ঈশিতা অনুভব করল কিছু একটা ঠিকঠাক হয়নি। জানালার বাইরে আলো ঝলমল, পাখির ডাকও শোনা যাচ্ছে, কিন্তু ঘরের মধ্যে যেন রাতের নিশ্বাস এখনও আটকে রয়েছে। সে বাথরুমে ঢুকেই এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়াল—ওয়াশবেসিনের পাশে রাখা ব্রাশটা তার নিজের নয়। সবুজ রঙা, সস্তা প্লাস্টিকের একটা টুথব্রাশ, যা সে আগে কখনও দেখেনি। ঘরটা তালা দেওয়া ছিল, জানালার গ্রিলেও কোনো ফাঁক নেই। কে ঢুকল? কেন সে জানে না? কিছু না ভেবেই সে বাথরুমের দরজাটা খোলা রেখেই বেরিয়ে এল, বুক ধুকপুক করছে। সে ডায়েরিটার দিকে তাকাল—যেন সেই পাতাগুলো আবার নিজের মতন কিছু লিখে ফেলেছে। সে ধীরে ধীরে কাছে গিয়ে দেখল, আগের লেখা ওই জায়গাতেই আছে—কিন্তু এখন যেন কালি আরও গাঢ়, আরও সাম্প্রতিক। যেন কেউ গতকাল রাতেই লিখেছে: “আজ সে আমার জিনিস ব্যবহার করেছে। আমি তার সঙ্গে থাকতে চাই।” ঈশিতা এবার আর নিজেকে স্থির রাখতে পারল না। দরজা খুলে সোজা নিচে নেমে এল, কেয়ারটেকার অমিতাভর কাছে।

অমিতাভ তখন ঘরের বাইরে এক কোণে চা খাচ্ছিল, খালি মগে ধোঁয়া উঠছে। ঈশিতাকে দেখে সে কিছুটা চমকে গেল, যেন জানত এই সময়েই সে আসবে। ঈশিতা সরাসরি প্রশ্ন করল, “এই ফ্ল্যাটে আগে কে থাকতেন?” অমিতাভ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল, তারপর ধীরে ধীরে বলল, “২০২০-তে একজন ম্যাডাম ছিলেন। রূপা সেন। খুব ভদ্র, একা থাকতেন। স্কুলে পড়াতেন।” ঈশিতা জিজ্ঞেস করল, “তিনি কি কোভিডে মারা যান?” অমিতাভ চোখ নামিয়ে নিল, উত্তর দিল না। শুধু বলল, “তখন তো কেউ কিচ্ছু জানত না। দরজা বন্ধ ছিল, গন্ধ বেরোচ্ছিল। পুলিশ এসে দরজা ভেঙে দেখে… শরীরটা পরে আছে। অনেকদিনের। কিন্তু…” সে থেমে গেল। ঈশিতা বলল, “কিন্তু কী?” অমিতাভ খুব ধীরে বলল, “আমরা জানলার পাশে দাঁড়িয়ে শুনেছিলাম—কেউ বলছিল, ‘আমি তো এখানেই আছি।’ আমরা ভেবেছিলাম কেউ হয়তো বেঁচে আছে… কিন্তু ভেতরে কেউ ছিল না। শুধু একটা দেহ।” ঈশিতার পা ঠান্ডা হয়ে এল, সে এক মুহূর্তে বুঝে গেল, তার ভয়টা কল্পনা নয়—ঘরের মধ্যে সত্যিই কিছু আছে।

ফ্ল্যাটে ফিরে আসার সময় ঈশিতা হাঁটছিল ধীর পায়ে, যেন বাতাসে হাঁটছে না, কোনো ঘন তরলে ভেসে যাচ্ছে। দরজায় চাবি ঢোকানোর সময় সে অনুভব করল, দরজাটা আগে থেকেই খোলা। কিন্তু সে তো বন্ধ করেই বেরিয়েছিল! ভিতরে ঢুকতেই চোখে পড়ল—ডায়েরিটা খোলা, সেই শেষ পাতায় বাতাসে দুলে দুলে নড়ে উঠছে। ঠিক যেভাবে পর্দা দুলছিল রাতের বেলায়। হঠাৎ ঘরের কোণ থেকে আসা এক শব্দ—আলগা নিঃশ্বাস, যেন কেউ তার পাশে দাঁড়িয়ে। ঈশিতা সাহস করে পেছনে তাকায়, কিন্তু কিছুই নেই। অথচ টেবিলের উপর রাখা চায়ের কাপটা থেকে ধোঁয়া উঠছে। সে ছুঁয়ে দেখে—গরম। সে তো নিজে বানায়নি কিছুই! ভেতরে এক বিষণ্ন আতঙ্ক জমে উঠতে থাকে। সে বুঝতে পারে, এই ঘরে সে একা নয়। কেউ আছে, যিনি এই ঘরেরই অঙ্গ হয়ে আছেন—যিনি সময়ের বাইরে চলে গেছেন, কিন্তু দেহের বাইরে নন। ঈশিতা টের পায়, কিছু একটা ধীরে ধীরে তাকে গ্রাস করে নিচ্ছে, কিন্তু সে জানে না—এই ‘অতিথি’ কি শুধু ছায়া, নাকি তার নিজেরই এক প্রতিফলন, যা এই ঘর তাকে দেখাচ্ছে আয়নার মতন। আজ রাতে ঘুমোতে যাবার আগে, সে ডায়েরিটার পাশে একটা চিরকুট রাখল—লেখা: “তুমি যদি থাকো, আমি কথা বলতে চাই।” জানালার ওপাশে তখন ধীরে ধীরে অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। ঘরের দেয়ালে কুয়াশার মতো জমছে নিঃশব্দতার শরীর।

রাত যত গভীর হচ্ছিল, ততই দক্ষিণ কলকাতার সেই পুরনো ফ্ল্যাটটা যেন আরও নিস্তব্ধ, আরও ভারী হয়ে উঠছিল। আকাশে চাঁদ ছিল না, তারাগুলিও যেন লুকিয়ে পড়েছিল। আর সেই অন্ধকারেই, তিয়াসার ঘরের জানালার ওপাশে কাঁচে ধীরে ধীরে ধরা পড়ছিল এক অচেনা প্রতিচ্ছবি। প্রথমে সে ভেবেছিল, নিজেরই প্রতিবিম্ব—কিন্তু আলো-আঁধারিতে ধরা পড়া মুখটা তিয়াসার চেনা ছিল না। একটা জ্যান্ত মুখ যেন কাঁচের ঠিক ওপারে স্থির হয়ে তাকিয়ে ছিল তার দিকে, চোখে গভীর এক বিষণ্ণতা আর বিরহ। বুকের মধ্যে ভয় চেপে ধরলেও, তিয়াসা জানত সে ভুল দেখছে না। সে আবার জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়—প্রতিচ্ছবিটি তখন আর নেই, কিন্তু জানালার কাঁচে দম জমে একটা লাইন আঁকা—”আমার নাম রেবা, আমি এখনও এখানেই আছি।”

তিয়াসা ঘরে পায়চারি করতে করতে হঠাৎ টের পেল, তার ঘরের বাতাসটা যেন পাল্টে গেছে। যেন কেউ সদ্য স্নান করে এসে চুল থেকে জল টপটপ করে ফেলছে, কোথাও একটা শ্যাম্পুর গন্ধ ছড়িয়ে আছে ঘরে। সে দমবন্ধ করে শোবার ঘরের দিকে তাকিয়ে থাকল। ফ্ল্যাটটা একসময় একলা হলেও, এখন যেন তাতে কেউ ঘোরাফেরা করছে। মোবাইল টর্চ জ্বেলে বাথরুমে গিয়ে দেখে বেসিনে হালকা জল জমে, আয়নার কোণায় জল দিয়ে লেখা ‘Reba’। হাতের আঙুলে জল ছুঁয়ে দেখল, সত্যিই ভেজা। এবার সে আর নিজেকে থামাতে পারল না, ফোন করল বাড়ির ওল্ড কেয়ারটেকারকে। কিন্তু ফোন ধরে এক বৃদ্ধ কন্ঠ শুধু বলল, “এই নামটা আর মুখে নিও না… সে তো এখন সময়ের বাইরের কেউ।” এরপর ফোন কেটে যায়। তিয়াসার মাথার মধ্যে ধীরে ধীরে এক অদ্ভুত ভয় জমাট বাঁধে, সে বুঝতে পারে, রেবা কেবল অতীতের একজন মানুষ নয়—রেবা যেন এখনকার সময়েও উপস্থিত।

পরদিন সকালে, ভোররাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায় তিয়াসার। দরজার নিচে সেঁটে থাকা এক হলুদচে পুরনো খামের ওপর লেখা, ‘তিয়াসা ঘোষ, ২০২৫’। খামের ভেতর ছিল এক চিঠি—তাতে অদ্ভুত ভঙ্গিমায় রেবা লিখেছে, “তুই এখানে এসেছিস, আমি জানতাম। ২০২০-তে আমি যেমন একা ছিলাম, তুইও আজ তেমন। কিন্তু একা থাকলেই কি মানুষ মরে যায়? আমি মরিনি। শুধু শরীরটাই থেমে গেছে, বাকিটা সব আছে এই দেওয়াল, এই জানালা, এই আয়নার মাঝে। তুই ভয় পাস না, তুই এখানে একা নোস। তুই আমায় চিনবি। আস্তে আস্তে, সময়ের ভেতর দিয়ে তুই আমায় ছুঁতে পারবি। তখন বুঝবি, মৃত্যু মানে শুধু প্রস্থান নয়—মৃত্যু কখনও কখনও অনন্ত উপস্থিতি।” চিঠিটা পড়ে তিয়াসা জানালার দিকে তাকায়, যেন জানে, ওপারে কেউ আছে—কোনও একজন যে অপেক্ষা করছিল অনেকদিন ধরে, কোনও উত্তর পাওয়ার আশায়।

রাত্রি বারোটা বাজতেই গোটা ফ্ল্যাটটা আবার যেন আগের মতো নিস্তব্ধ হয়ে গেল। নিরবিচারে চলা ছায়া-ছায়া অস্বস্তির মাঝেও সৌমিক এবার সিদ্ধান্ত নেয়, সত্যিটা জানতেই হবে। গত কয়েকদিনে যা যা ঘটেছে, তা কোনো অলীক কল্পনা নয়—তার মানসিক দুর্বলতা নয়, বরং ফ্ল্যাটটা নিজেই কিছু একটা লুকিয়ে রেখেছে। সে আবার সেই পুরনো কাগজপত্রগুলো ঘাঁটতে শুরু করল, যেগুলো খাটের তলার ট্রাঙ্কে পেয়েছিল। আগের মালিকদের চুক্তিপত্র, ইলেকট্রিসিটির বিল, এমনকি কিছু হসপিটালের প্রেসক্রিপশন। একটা জায়গায় ‘সায়ন্তিকা লাহা’ নামটা স্পষ্টভাবে লেখা ছিল—তার জন্মতারিখ ১৯৮৮, আর মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল ২০২০ সালের জুন মাসে। সেই ফ্ল্যাটেই তার কোভিডে মৃত্যু হয়েছিল, যেটায় এখন সৌমিক একা বাস করছে। কিন্তু তারপরে কেউ বলেছিল সায়ন্তিকার দেহ হাসপাতাল থেকেই তুলে নেয় তার পরিবারের কেউ। তাহলে মৃতদেহ কি কখনো এ ফ্ল্যাটে এসেছিল? নাকি…

সেই রাতে সৌমিক ঘুমোতে পারল না। তার কানে কানে কে যেন ধীরে ধীরে বলল, “তুমি চলে যাও। এটা আমার জায়গা।” সে হঠাৎ জেগে উঠে বসল, কিন্তু ঘরে কেউ ছিল না। তবে জানালার কাচে নিজের প্রতিফলন দেখার সময় সে বুঝতে পারল, তার পাশেই আরেকটা প্রতিফলন দাঁড়িয়ে—অত্যন্ত অস্পষ্ট, তবে নারীর অবয়ব—ভেজা চুল, ফ্যাকাশে মুখ, আর চোখে অসম্ভব দৃষ্টি। ঘরটা ক্রমেই ঠান্ডা হয়ে উঠল, আর দেয়ালঘেঁষা আয়নাটা হঠাৎ খটাস করে ফেটে গেল মাঝখান থেকে। সেই মুহূর্তে সৌমিক বুঝে গেল, এ ফ্ল্যাটে সে একা নেই। সায়ন্তিকা এখানেই রয়ে গেছে—হয়তো কারও অপেক্ষায়, হয়তো প্রতিহিংসায়। ভয় এবং কৌতূহলের দ্বন্দ্বে সৌমিক তখন নিজের রেকর্ডারটা অন করে, ঠিক করে প্রতিদিন সে নিজের অভিজ্ঞতা রেকর্ড করবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ জানে এই ফ্ল্যাটের ইতিহাস।

পরদিন সকালে সৌমিক ফ্ল্যাটের দারোয়ান বৃদ্ধ মধুদার সাথে কথা বলে। মধুদা খুব বেশি কিছু বলতে চায় না, কিন্তু শেষ পর্যন্ত জানায় যে ২০২০ সালের সেই লকডাউনে, সায়ন্তিকার মৃত্যু হয়েছিল এই ঘরেই, একা একা। কোভিডের জন্য কেউ আসেনি, দেহও পরে নাকি তিন দিন পরে উদ্ধার হয়েছিল। অথচ রেজিস্টারে যেটা লেখা ছিল, তা ভিন্ন। মধুদা চোখ নামিয়ে বলে, “দেখুন বাবু, কেউ মরলে শরীরটা মরে। কিন্তু যাদের ভিতরে গভীর কিছু অপূর্ণতা থাকে, তাদের আত্মা মরে না। ওই মেয়েটা একা ছিল, অনেকদিন ধরে কারও সাথে কথা বলেনি। সে হয়তো এখনও কারও অপেক্ষায় আছে।” সৌমিকের মেরুদণ্ড দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে যায়। তার মনে পড়ে আগের রাতে সে যে গলা শুনেছিল, সেই একই আবেগে ভরা—অপেক্ষা, অভিমান, আর একরাশ নীরব আর্তি। সেই রাতে সে ঠিক করে, এবার সময় এসেছে সত্যিটা সামনে আনার। সায়ন্তিকার জীবনের গল্পটা, মৃত্যুর নয়—তার নিঃসঙ্গতার, তার কান্নার, তার প্রতীক্ষার গল্পটা সে শুনবে। কারণ হয়তো কেউ এই পৃথিবীতে থেকে যেতে চায় না, কিন্তু কেউ কেউ ছাড়া না পাওয়ার দায়ে আটকে পড়ে… ঠিক সেই ফ্ল্যাটের চার দেওয়ালের মধ্যেই।

রাত্রি তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা। আকাশের রঙ কেমন এক অচেনা নীলচে-কালো হয়ে আছে, যেন শহরের কংক্রিটের ছাদ আর কারেন্টহীন অন্ধকার একত্রে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় জমে উঠেছে। অর্ণব বিছানায় বসে জানালার দিকে তাকিয়ে থাকে। ক’দিন হলো তার ঘুম আসছে না ঠিকমতো। প্রতিদিন এক অস্বস্তিকর অনুভূতি তার শরীর ঘিরে রাখে, মনে হয় কেউ যেন ছায়ার মতো পেছনে দাঁড়িয়ে আছে, নিঃশ্বাস ফেলছে গায়ের পাশে, অথচ চাইলেও সে ঘুরে তাকাতে পারে না। আজও তার ব্যতিক্রম নয়। সে উঠে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। সামনের গাছের পাতা আজ হঠাৎ করেই কাঁপছে না, হাওয়া নেই একটুও, তবুও মনে হয় পাতার ফাঁকে কেউ একজন লুকিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকেই। হঠাৎ পেছন থেকে একটা শব্দ—দরজার খিল নড়ল যেন। কিন্তু সে তো খিল দেয়নি? বুকের ভেতর ধুকপুক ধুকপুক করতে থাকে। সে ধীরে ধীরে পেছনে ফিরে তাকায়। কাউকে দেখা যায় না, কিন্তু ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। একটা শীতলতা ঘিরে ধরেছে তাকে।

অর্ণব নিজের ফোন হাতে নিয়ে টর্চ অন করে ঘরের কোণায় কোণায় তাকাতে থাকে। ঠিক তখনই সে খেয়াল করে, দেয়ালের সেই পুরনো ফোটোফ্রেম, যেটা সে প্রথম দিনেই সরাতে চেয়েছিল কিন্তু তুলতে পারেনি, সেটা এবার একদম হেলে পড়েছে। ফ্রেমের ভেতর থেকে ঝাপসা হয়ে যাওয়া ছবি এখন খানিক স্পষ্ট—একজন মহিলা দাঁড়িয়ে আছে বারান্দার পাশে, তার মুখটা অর্ধেক ছায়ায় ঢাকা। অর্ণব ফোনের টর্চ ফ্রেমের দিকে ধরতেই হঠাৎ ছবিটার পেছনে থেকে কিছু যেন নড়ল। ঠাণ্ডা একটা বাতাস এসে গায়ে লাগল, আর সেইসঙ্গে ফ্রেমটা ধপ করে পড়ে গেল মেঝেতে। অর্ণব দ্রুত গিয়ে ফ্রেমটা তুলতে গেলে নিচে একটা ভাঁজ করা কাগজ বেরিয়ে আসে। খুলে দেখে, সেটা হাতে লেখা একটি চিঠি—“আমি চলে যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তারা যেতে দেয়নি। জানালার ওপার দিয়ে আমি পেরোতে পারিনি। এখনো এখানে রয়ে গেছি—তাদের সঙ্গে, যাদের মুখ নেই, শুধু নিঃশ্বাস আছে। জানালার ওপার দিয়ে তাকিও না…” চিঠিটা যেন অর্ণবের হাত কাঁপিয়ে দেয়। সে জানালার দিকে তাকায়, এবার পরিষ্কার ভাবে দেখতে পায়—একটি নারীমূর্তি দাঁড়িয়ে আছে ঠিক জানালার ওপারে। কিন্তু সেটা বাইরের গাছের ছায়া নয়, কারণ তার চোখ আছে। তাকিয়ে আছে সরাসরি তার দিকেই।

চোখাচোখি হতেই অর্ণব যেন এক তীব্র ঝাঁকুনি খায়, পেছনে পড়ে যায়। ততক্ষণে ঘরের বাতি নিভে গেছে। বাইরের আলোর ঝাপসা আলোয় দেখা যায়, জানালার কাচের ওপারে ধীরে ধীরে সেই নারীমূর্তির হাত উঠে আসছে। হাতের আঙুলে জং ধরা কাঁচির মতো লম্বা নখ, আর চুলে জড়ানো পুরোনো এক মুখোশ—যেটা হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে ব্যবহার করা হত একসময়। অর্ণব বোঝে, সে যাকে এতদিন মৃত ভেবেছিল, সে হয়তো মরেনি—অন্তত শরীর না থাকলেও উপস্থিতি থেকে গেছে। আর সেই উপস্থিতি তাকে ছেড়ে দিতে চাইছে না। জানালার ওপার থেকে কাঁচে ঠক ঠক শব্দ আসে—কেউ চাইছে ঢুকতে। বা হয়তো চায় না ঢুকতে, চায় টানতে… বাইরে থেকে ভিতরে নয়, ভিতর থেকে বাইরে—জানালার ওপারেই হয়তো সে অপেক্ষা করছিল পাঁচ বছর ধরে। এখন সে জানে অর্ণব সব জেনে গেছে।

রাত্রি গভীর হয়ে এসেছে দক্ষিণ কলকাতার বুকে অবস্থিত ওই পুরনো ফ্ল্যাটে। সামান্য আলো ছড়িয়ে আছে শুধুই বারান্দার কাছাকাছি, বাকি ঘর জুড়ে ছায়া যেন ধরা পড়ছে মেঝের চৌকাঠে। অনীক দরজা বন্ধ করে চুপচাপ বসেছিল ডাইনিং টেবিলের পাশে, সামনের চা ঠান্ডা হয়ে গেছে অনেক আগেই। তার চোখ স্থির জানালার কাঁচে, যেখানে প্রতিফলিত হচ্ছিল শুধুই নিজের ছায়া। “সে কি এখনও আছে?” প্রশ্নটা অনীক নিজেকে করতে করতে আচমকা দাঁড়িয়ে গেল। তার মনে হচ্ছিল, সে ঘরের প্রতিটি কোণ থেকে কোনও পুরনো গন্ধ যেন ধীরে ধীরে উঠে আসছে—একটি নির্দিষ্ট স্যানিটাইজার, নোনতা ঘামের সঙ্গে এক অচেনা আতর মেশানো গন্ধ, যেটা তার প্রথম রাতে নাকে লেগেছিল। তখনও সে জানত না, এই ঘরে ২০২০ সালে একজন একা, কোভিড আক্রান্ত মহিলা মারা গিয়েছিলেন। পরে জানতে পেরে সে ভয় পেয়েছিল ঠিকই, কিন্তু আর বেরোতে পারেনি—কেন যেন মনে হচ্ছিল, কিছু তাকে টেনে রাখছে। আজ সেই গন্ধ ফের ফিরেছে। এবং এবার, আগের থেকেও তীব্র, আগের থেকেও ব্যক্তিগত। যেন কেউ তার খুব কাছে দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস ফেলছে, কিন্তু তাকে ছুঁতে পারছে না।

ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠছিল ধীরে ধীরে। দরজার আড়াল থেকে আসছিল চুপি চুপি পায়ের শব্দ—নরম কাপড়ের চপ্পল পরে হেঁটে যাওয়ার মতো, কিন্তু কার চপ্পল? অনীক তো একা ছিল! সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল শোওয়ার ঘরের দিকে, যেখানে সেই বদ্ধ জানালা আর বিছানা ছাড়া কিছুই নেই। দরজার সামনে এসে দাঁড়াতেই হঠাৎ যেন ঠান্ডার শিরশিরানি গায়ে বিঁধে গেল। সে বুঝতে পারল, ভিতর থেকে কারা যেন তাকে দেখছে। কিন্তু কেউ নেই। দরজাটা ফাঁক করে ভিতরে ঢুকতেই বিছানার পাশে রাখা পুরনো কাঠের চেয়ারটা নিজের থেকেই একটু নাড়া দিল। অনীক দাঁড়িয়ে রইল ঠায়। তার গলা শুকিয়ে আসছে। সে ধীরে ধীরে বিছানার দিকে তাকাল। সেখানে একটা কুঁচকানো চাদরের ভাঁজ, যেন কেউ কিছুক্ষণ আগেই সেখানে বসে ছিল। হঠাৎ বিছানার উপরে একটা পেঁচানো সাদা ওড়না চোখে পড়ল। সেটা অনীক ছুঁয়েই বুঝল, একদম কচি গন্ধ—আতরের গন্ধে মেশা, কিন্তু দাগ লেগে আছে পুরনো স্যানিটাইজারের। হঠাৎ দরজা বন্ধ হয়ে গেল হাওয়ার ঝাপটায়। কিন্তু জানালাগুলো তো বন্ধই ছিল!

একটা অদ্ভুত অনুভূতি অনীককে গ্রাস করল—এ ঘরে সে একা নয়, কোনওদিনও ছিল না। বারান্দার দিকে হেঁটে গিয়ে সে বাইরের আলো দেখতে চাইল, কিন্তু পুরো পাড়া অন্ধকার, বিদ্যুৎ আছে অথচ জানলা থেকে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। সে তখন ব্যালকনির রেলিং ধরে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। হঠাৎ, পিছনে পায়ের ছায়া পড়ল জানালায়। ছায়াটা নারীমূর্তি, মাথায় ওড়না, হাতে একটা ডায়েরি ধরা। সেই ডায়েরির চেহারা তার পরিচিত, কারণ আগের দিনই সে পেয়েছিল সেটা বইয়ের তাকের পেছনে। ডায়েরির ভিতরে লেখা ছিল এক মহিলার কথা—তাকে কেউ ‘অপরূপা’ বলে ডাকত, এবং সে একা এই ঘরে ২০২০ সালের লকডাউনে ঢুকে আর কোনওদিন বের হয়নি। কিন্তু সরকারি রেকর্ড বলছে, সে মরে গেছে। তাহলে? কে এই ছায়া? অনীক ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল, পেছনে শূন্যতা। তবে গন্ধটা এখনও রয়েছে। সারা ঘর জুড়ে আতরের মিশ্রণে পুরনো শ্বাস-প্রশ্বাসের ভার, আর তার বুকের ভিতর এক গভীর অস্থিরতা। সেই রাতে সে ঘুমোতে পারল না। কেবল বুঝতে পারল—এই ফ্ল্যাটটা কেবল একখানা ফ্ল্যাট নয়, বরং একটা সময়-গহ্বর, যেখানে কিছু সম্পর্ক, কিছু স্মৃতি, কিছু মৃত্যু জীবিত থেকেও জীবনের বাইরেই থেকে যায়।

পর্দার ফাঁক দিয়ে ভোরের ধূসর আলো আস্তে আস্তে ঘরে ঢুকছিল, কিন্তু ঘরটা যেন আলো খেতে ভুলে গিয়েছে বহুদিন ধরে। সোহিনী আগের রাতটা আবার ঘুমোতে পারেনি। আয়নার মধ্যে থেকে নিজের ছায়াকে কেউ যেন দীর্ঘ সময় ধরে ডেকে চলেছে—”ফিরে যা। এখনও সময় আছে।” কান্নার ধ্বনি, জলপথে ভেসে আসা গলা, সিলিং থেকে একটানা পায়ের শব্দ—সব কিছু মিলে গেছে একটা ভয়াল ও অবাস্তব অভিজ্ঞতায়। আগের রাতে সেই একই আয়নাতে সে দেখতে পেয়েছিল একটি মেয়েকে, যার মাথায় মাস্ক, হাতে স্যানিটাইজার আর চোখে ভয়—সেই ২০২০ সালের সেই কুখ্যাত কোয়ারেন্টাইন-চিহ্নিত মেয়ে। অথচ আশ্চর্যজনকভাবে, মেয়েটি বারবার বলেছে, “আমি কোথাও যাইনি। আমি এখানেই ছিলাম। আমি এখানেই আছি।” আতঙ্কে জমে যাওয়া সোহিনী সেই রাতে দরজার কাছেই বসে ছিল, চুপচাপ, যেন পালানোর পথ খুঁজছে কিন্তু জানে, এই ঘর তাকে ছাড়বে না। একসময় সে আবিষ্কার করল, দেয়ালের গায়ে একটানা লেখা— “Room 4B is not vacant. Ever.”

পরদিন সকালে, ভয় আর বাস্তবের দোলাচলে, সোহিনী খুঁজতে বেরোল বিল্ডিংয়ের পুরনো কেয়ারটেকার বা কোনও প্রাচীন বাসিন্দাকে, যে হয়তো জানে এই ফ্ল্যাটের ইতিহাস। নিচতলায় চায়ের দোকানে বসে থাকা বৃদ্ধটি কানে শুনতে পান না ভালো, কিন্তু ‘4B’ শব্দটি উচ্চারণ করতেই তার মুখ শুকিয়ে গেল। ধীরে ধীরে তিনি জানালেন—২০২০ সালে কোভিডের সময় এখানে একাকী কোয়ারেন্টাইনে ছিলেন এক মহিলা, নাম পায়া যায়নি, কারণ তিনি কারো সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন না। কেউ কেউ বলত তিনি বিদেশ থেকে ফিরেছেন, কেউ বলত তিনি ডাক্তারের স্ত্রী। কিন্তু নিশ্চিত যেটা জানা যায়, তা হলো, তিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন এই ঘরেই, নিঃসঙ্গ অবস্থায়। পরবর্তীকালে ওই ঘর সিল করে দেওয়া হয়েছিল একবছরের জন্য। কিন্তু পরের বছর থেকে ধাপে ধাপে নানান রিনোভেশনের পর আবার ভাড়া দেওয়া হয়—তবে সবসময়ই ফ্ল্যাটটি কিছুদিন পর পর খালি হয়ে যেত। কেউ বেশিদিন থাকতে পারত না। শেষ যে ভাড়াটিয়া ছিল সে মাঝরাতে পাগলের মতো চেঁচিয়ে বিল্ডিং ছেড়ে পালিয়েছিল। আর কেউ আসে না এখন সাধারণত।

সোহিনী সেদিন রাতে ফিরে এসে সিদ্ধান্ত নেয়—সে পালাবে না, সে থাকবে, কারণ কিছু একটা আছে এখানে যেটা অনাবিষ্কৃত। সে ফিরে এসে সমস্ত আলো জ্বালিয়ে দেয়, জানালা খুলে দেয়, কিন্তু ঘর যেন কিছুতেই হাল ছাড়ে না। রান্নাঘরে সে একটা পুরনো কাগজ পায়—ম্যাজিক মার্কারে লেখা—“I counted the days. Nobody came.” তখনই তার খেয়াল পড়ে, ঘড়ির কাঁটা যেন সময়ের বাইরে চলে গেছে—একটা পুরনো ঘড়ি বারবার থেমে থাকে ৮:১৭ তে। সে এবার সাহস করে ঘরের ভিতরের সেই ছোট্ট স্টোররুমের দিকে যায়—যেটা সবসময়েই বন্ধ থাকে। তালাটা যেন বাইরের থেকে লাগানো নয়, ভিতর থেকে বন্ধ। কিন্তু হঠাৎ করে দরজাটা একটু ফাঁক হয়, আর ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে হিমেল বাতাস। ভেতরে ঢুকেই সোহিনী দেখে একটা পুরনো কাঠের চেয়ার, একটা মাস্ক, আর মেঝেতে লেখা, “I waited for the call. It never came.” সেই মুহূর্তে পিছনে দরজা বন্ধ হয়ে যায়। সোহিনী চিৎকার করে ওঠে, কিন্তু তার গলা যেন বাতাসে মিলিয়ে যায়। ঘড়ির কাঁটা আবার থেমে যায় ৮:১৭-তে।

১০

শ্রেয়সী আর কোন শব্দ করে না, নিঃশব্দে তার চুলে বাতাস লেগে উঠছে—এক অন্যমাত্রিক বাতাস, যে বাতাস আর পাঁচটা ঘরের জানলা দিয়ে ঢোকে না, সেই বাতাস শুধু সেইসব ঘরে ঢোকে যেসব ঘর জীবন ও মৃত্যুর সীমারেখায় দাঁড়িয়ে আছে। রুদ্র, শিহরিত শরীর নিয়ে বসে আছে ওই ঘরের মাঝখানে। তার চোখের সামনে সেই চেয়ার, যে চেয়ারে বসে শ্রেয়সী প্রতিদিন ডায়েরি লিখত; সেই ডায়েরির পাতা থেকে আজ রাতে ভেসে এসেছিল একটা ঝাপসা আওয়াজ—‘তুই থাকিস… আমি কখনো যাইনি…’। রুদ্র চেয়েছিল পালিয়ে আসতে, কিন্তু পা যেন কাঁটায় জড়ানো, শরীর তার কথা শুনছে না। দেয়ালের রং বদলে যাচ্ছে, হঠাৎই ঘরটা যেন নিঃশব্দ নয়—তীব্র নিস্তব্ধতার মধ্যেও এক অদৃশ্য গুঞ্জন ঘুরে বেড়াচ্ছে। শ্রেয়সীর শেষ দিনগুলো তার সামনে ভেসে উঠতে শুরু করেছে, যেভাবে মনের দৃষ্টিতে দেখা যায় অতীত, যেটা কখনো ঘটেছে বলে মনে হয় না, তবু সত্যির থেকেও বেশি বাস্তব।

শ্রেয়সী যেদিন ঘরে ঢুকেছিল ২০২০ সালের সেই লকডাউনের সময়, কোভিড আক্রান্ত অবস্থায়, ঘরের দরজাটা বন্ধ হয়েছিল বাইরে থেকে নয়, ভেতর থেকেই। তাকে আর বাইরে বেরোতে দেওয়া হয়নি, কারণ কারো পক্ষে যাওয়া সম্ভব ছিল না। সেই ফ্ল্যাটে একা একা থেকেছে সে, প্রতিদিন খাবার দেওয়া হয়েছে দরজার বাইরে রেখে, কিন্তু কেউই আর তার মুখোমুখি আসেনি। সে একা কথা বলেছে দেয়ালের সঙ্গে, নিজের ছায়ার সঙ্গে, এমনকি মৃত পুরুষের নামও উচ্চারণ করেছে—যার বিছানায় সে শুয়েছিল, যার টেবিলের ডায়েরিতে সে শেষের দিকে নিজের লেখাও শুরু করেছিল। আর তারপর একদিন, হঠাৎই তার শ্বাসকষ্ট বেড়েছিল, দরজার বাইরে কাশি শোনা গিয়েছিল কয়েকদিন, তারপর আর কিছুই না। কেউ দরজা ভাঙেনি। কারণ চারপাশে তখন শুধু মৃত্যুভয়। রুদ্র এখন বুঝছে, শ্রেয়সীর শরীর কখনো বেরোয়নি, সে থেকে গিয়েছিল এই ঘরেই, নিঃসঙ্গ এক আত্মা হয়ে, অদেখা হয়ে।

তবে আজ, এই ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে, যখন রুদ্র সেই ঘরে একা বসে আছে, তখন তার মনে হচ্ছে না সে একা। শ্রেয়সী এসেছে। তার শাড়ির আঁচল একবার জানলার গ্রিলে লেগেছে, একবার সিলিং ফ্যানের তলায় নেমে গিয়েছে। রুদ্র জানে, সে আর এই ঘর ছেড়ে বেরোতে পারবে না। ঠিক যেমন শ্রেয়সী পারেনি। আজ সেই চক্র সম্পূর্ণ হয়েছে। শ্রেয়সী একদিন যেভাবে কারও অপেক্ষায় অপেক্ষা করেছিল, আজ রুদ্র সেই একই ভাবে অপেক্ষা করছে—একটি ছায়ার, একটি উপস্থিতির, যা কোনো নামধারী মানুষের নয়। “কোয়ারেন্টাইন কোয়ার্টার”-এর এই ঘর, যেখানে জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে একটা অদৃশ্য দেওয়াল ছিল, আজ তা ভেঙে গেছে। এবং রুদ্র জেনেছে, কিছু কিছু ঘর কখনোই ফাঁকা হয় না—তারা শুধু সময়ের ভেতর অন্য কারও জন্য অপেক্ষা করে। ঘরের মধ্যে বাতাস আরও ভারী হয়ে আসে। বাইরের শহর চলতে থাকে, কিন্তু দক্ষিণ কলকাতার এই ছোট্ট ফ্ল্যাটের একটা ঘরে—সময় থেমে গেছে চিরতরে।

____

 

 

1000048304.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *