Posted in

কুয়াশার ভিতর সত্যি

Spread the love

সৌমেন পাল


কুন্দিলপুর — ছোট্ট একটি গ্রাম, দক্ষিণ ২৪ পরগনার পেটের ভেতর সেঁধিয়ে থাকা, যেন চুপিচুপি বেঁচে থাকা এক টুকরো সময়। এখানে ভোর হয় ধানক্ষেতে পাখিদের ডাকে, আর বিকেল নামে কুঁচো মাছ ধরা ছেলেদের হৈচৈয়ে। ঝিলের ধারে প্রাচীন বটগাছটা আজও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে, যেমনটা ছিল পঁচিশ বছর আগে — যখন অভয়চরণ মণ্ডল প্রথম এই গ্রামে এসেছিলেন সরকারি স্কুলে শিক্ষক হিসেবে। মাথায় তখন পাকা চুল তেমন ছিল না, চোখের কোণেও ক্লান্তির রেখা ছিল না। তিনি তখন সদ্য কলেজ-ফেরত এক আদর্শবাদী তরুণ, বিশ্বাস করতেন শিক্ষাই পারে সমাজকে বদলাতে। গ্রামের মাটির রাস্তা, খড়ের ঘর, ঘোলা জলের পুকুর, অবিশ্বাস আর কুসংস্কারে ভরা মন — সব কিছুর মাঝেই তিনি দেখেছিলেন সম্ভাবনার এক আলো। তিনি পেয়েছিলেন একটি স্কুল, ছয়টা ক্লাসঘর, ফাঁকা একটা লাইব্রেরি আর একটা টিনের ঘর — যেটা পরে শিক্ষক ঘর হিসেবে তৈরি হয়েছিল। সেই ছোট্ট পাঠশালাই ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিল তার জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। ছাত্রছাত্রীদের নাম ধরে চিনতেন, কে কোনদিন অসুস্থ, কার মা ক্যান্সারে মারা গেছে, কারা না খেয়ে স্কুলে আসে — সব তার নখদর্পণে। অভয়চরণ শুধু শিক্ষক ছিলেন না, ছিলেন বাবা-মায়ের অভাব মেটানোর মতো এক স্নেহময় বৃদ্ধ, যিনি হোমওয়ার্কের থেকেও বেশি গুরুত্ব দিতেন ভালো মানুষ হয়ে ওঠার পাঠে। তাঁর ক্লাসে রবীন্দ্রনাথের কবিতা যেমন পড়ানো হতো, তেমনি শেখানো হতো — “নারী শুধু স্ত্রী নয়, মানুষও”।

সময় বদলেছে, কিন্তু গ্রামের হৃদয় অনেকটাই একরকম রয়ে গেছে। অভয়চরণ এখন ষাটের কোঠা পার করেছেন। সাদা ধুতি আর পাতলা সুতির পাঞ্জাবিতে তিনি এখনও স্কুলে যান, যদিও সরকারিভাবে অবসর নেওয়ার পর তার কোনও দায়িত্ব নেই। “মাস্টারমশাই” এখন গ্রামের এক জীবন্ত প্রতীক — যেখানে সমস্যা, সেখানে তিনি। তাঁর স্কুল এখন পাকা ভবন হয়েছে, আধুনিক টয়লেট হয়েছে, কিন্তু ক্লাসে উপস্থিতির হার কমে গেছে, কারণ অনেক পরিবার আবার মেয়েদের শীঘ্রই বিয়ে দিয়ে দেয়। স্কুল ফাঁকা, কিন্তু বিয়ের প্যান্ডেল গিজগিজ করছে। অভয়চরণ সেটা লক্ষ্য করেন, কষ্ট পান, কিন্তু মুখে বলেন না কিছু। তবু, যেদিন চৈতালী ঘোষ তার কাছে এসে মাটির দিকে চোখ রেখে বলে — “স্যার, আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে, আপনি কিছু করতে পারবেন?” — সেদিন থেকে অভয়চরণ আবার ভেতর থেকে জেগে ওঠেন। তার বুকের ভিতরটা কেঁপে ওঠে, ঠিক যেন পুরোনো দিনের সেই আগুনটা আবার ধিকধিক করে জ্বলতে শুরু করেছে। চৈতালী তার সবচেয়ে মেধাবী ছাত্রী, বাংলা আর ইতিহাসে অসাধারণ। ছোটোবেলা থেকেই দেখে আসছেন তাকে — বাবাকে হারানোর পরও স্কুলে আসা বন্ধ করেনি কখনও। সে বিয়ে চায় না, সে পড়তে চায় — শুধু এইটুকু বলেই সে কেঁদে ফেলে। অভয়চরণ বোঝেন, এই লড়াইটা শুধুই চৈতালীর না, এ লড়াই গ্রামের সেই সব মেয়েদের, যারা নিজের জীবন নিয়ে কোনও সিদ্ধান্তই নিতে পারে না। তিনি সেই রাতেই নিজের পুরনো খাতার পাতা ওলটান — যেখানে এক সময় স্কুলের সভা, ছাত্রভবিষ্যতের প্ল্যান, লাইব্রেরি সংস্কারের খসড়া লেখা ছিল। আজ নতুন করে শুরু করতে হবে — এবার শিক্ষা নয়, জীবন রক্ষার পাঠ নিতে হবে।

সেই রাতেই অভয়চরণ একটি কাগজে কয়েকটি নাম লেখেন — তার প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের, যাদের তিনি এখনও বিশ্বাস করেন। কেউ এখন কলেজে, কেউ পুজোতে ব্যান্ডে বাজায়, কেউ গরুর খামার চালায়, আবার কেউ শহরে সাংবাদিকতা শিখছে। তিনি ঠিক করেন, তাদের নিয়ে একটি মঞ্চ গড়বেন — যার কাজ হবে শুধু লেখাপড়া শেখানো নয়, সমাজকে সচেতন করা। নাম দেন “আলো” — কারণ এই অন্ধকারের মধ্যে আলো জ্বালানোর জন্যই তো এই পথচলা। পরদিন সকালে ঝড়বৃষ্টি উপেক্ষা করে পাঁচজন ছেলে-মেয়ে তার বাড়িতে হাজির হয়। তাদের মধ্যে ছিল বিপ্লব — তার একদা ছাত্র, এখন কলকাতার একটি ছোট নিউজ পোর্টালের সাংবাদিক। অভয়চরণ তার সামনে চৈতালীর কাহিনি রাখেন। বিপ্লব চোখ টিপে বলে, “স্যার, একটা প্রতিবেদন লিখব। কিন্তু শুধু লেখা চলবে না — আমাদের গ্রামেই কিছু করতে হবে।” পরের কয়েকদিনে অভয়চরণ দেখেন, গ্রামের গায়ে গায়ে উঠছে পেন দিয়ে লেখা পোস্টার — “আমার বিয়ে আমি ঠিক করব”, “১৮-এর আগে বিয়ে নয়”, “মেয়েরাও মানুষ”। দেওয়াল লিখন, পথনাটিকা, সন্ধেবেলার গল্প বলা — “আলো”র কাজ ক্রমে ছড়িয়ে পড়ে। গ্রামের কিছু মানুষ অবাক হয়ে যায়, কিছু বিরক্ত হয়, আর কিছু গোপনে প্রশংসা করে। অভয়চরণ জানতেন, এই পথ সহজ হবে না। সামনে আসবে সমাজের বাধা, ধর্মের অপব্যাখ্যা, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা আর রাজনৈতিক চাপ। কিন্তু তিনি আজ আর থামবেন না। চৈতালীর চোখের জল তার নীরবতা ভেঙে দিয়েছে — তিনি প্রস্তুত, কুয়াশার ভিতর থেকেও সত্যিকে টেনে বের করে আনার জন্য।

***

মেঘলা বিকেলের কুয়াশা তখন ধীরে ধীরে নামছিল কুন্দিলপুরের মাটিতে। স্কুল ছুটি হয়ে গেছে অনেকক্ষণ আগেই, কিন্তু অভয়চরণ মণ্ডল তখনও নিজের টেবিলে বসে পুরনো রেজিস্ট্রার বইয়ের পাতা ওল্টাচ্ছিলেন। বইগুলোর ঘ্রাণে মিশে ছিল বহু প্রজন্মের কাহিনি — কিছু সফলতা, কিছু হারিয়ে যাওয়া নাম। হঠাৎ দরজায় হালকা টোকা। মাথা তুলে তাকাতেই তিনি দেখলেন চৈতালী, ভেজা চুল, মুখে স্পষ্ট উদ্বেগ, আর হাতে একটা মুড়কির ঠোঙার মতো ভাঁজ করা খাম। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বলল, “স্যার, এটা আপনার জন্য।” খামটা টেবিলে রেখে সে দ্রুত বেরিয়ে গেল, ঠিক যেমনটা অজস্রবার পরীক্ষার পর খাতা রেখে সে পালিয়ে যেতো। অভয়চরণ অবাক হয়ে খাম খুললেন। ভেতরে একটা হাতের লেখা চিঠি — আঁকাবাঁকা কিন্তু স্পষ্ট। সেখানে লেখা — “স্যার, আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে। আমি পড়তে চাই, কিন্তু মা বলছে— এবার মেয়ের দায়িত্ব শেষ করতে হবে। আমি যদি নিজেকে শেষ হতে না দিতে চাই, তাহলে আমি কী করতে পারি? আপনি তো বলেন— মানুষ নিজের জীবন নিজে গড়ে তোলে। আমি কি পারব না? আপনি না থাকলে হয়তো পারব না।” পড়তে পড়তে তার চোখে চশমার আড়ালে এক ধরণের অদ্ভুত ক্ষোভ জমে উঠল। এই মেয়ে, যে স্কুলের অ্যাসেম্বলিতে প্রথম বক্তৃতা দিয়েছিল, যে স্বাধীনতা দিবসে “নারীর অধিকার” নিয়ে কবিতা পড়েছিল, সে আজ নিজের জীবন নিয়ে অপরের সিদ্ধান্ত মেনে নিচ্ছে — কেন? শুধু সে মেয়ে বলেই?

পরদিন সকালে চৈতালী আর স্কুলে আসেনি। অভয়চরণ খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন, বিয়ের শাড়ি কেনা হয়ে গেছে, শ্বশুরবাড়ির লোকজন এসে দেখে গেছে, পাকা কথাও হয়ে গেছে। পাত্র — শহরের বড় ব্যবসায়ী, বয়স ৩৫, আগেও বিয়ে হয়েছিল কিন্তু মেয়ে মারা গেছে। গ্রামের লোকেরা বলে, “ভাগ্য খুলে গেছে মেয়ের — শহরের পাত্র, গাড়ি আছে, দোকান আছে, খাওয়া পরার চিন্তা নেই।” কিন্তু কেউ বলে না, মেয়েটার পড়াশোনার কী হবে? তার স্বপ্নগুলো কোথায় যাবে? অভয়চরণ তখন একাই হাঁটতে থাকেন চৈতালীদের বাড়ির দিকে, গিয়ে দেখেন — উঠোনে প্যান্ডেল বাঁধা হচ্ছে, মেয়েটিকে ঘরের ভেতরে আটকে রাখা হয়েছে, যেন সে পালাতে না পারে। তিনি বাইরে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলেন, “তোমরা কি জানো, এটা বেআইনি?” চৈতালীর মা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু বলে, “মেয়ের ভবিষ্যৎ তো আপনাদের হাতে নয় স্যার, সমাজ যা দেখে, আমরা তাই দেখি।” অভয়চরণ কোনও উত্তর না দিয়ে ফিরে আসেন, কিন্তু তার চোখে তখন যুদ্ধের আগুন। স্কুলে ফিরে তিনি টেবিল থেকে একটা নোটবুক বের করেন, প্রথম পাতায় লেখেন — “আলো মঞ্চ”। নিচে লিখে রাখেন দশটা নাম — তার প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী, যারা সমাজ বদলাতে চেয়েছিল কোনও এক সময়। এবার সময় এসেছে তাদের ফিরিয়ে আনার।

সন্ধ্যায় স্কুলের পুরনো ঘরে প্রথম আলোচনাসভা বসে। অভয়চরণ বলেন, “চৈতালী শুধু একটা মেয়ে নয়, ও একটা প্রশ্ন — আমরা কীভাবে সমাজে বসে সবকিছু চুপচাপ মেনে নিই?” বিপ্লব, তার একদা ছাত্র, বলে — “স্যার, মিডিয়ায় বিষয়টা তুলব, কিন্তু গ্রামে সচেতনতা না এলে কাজ হবে না।” সিদ্ধান্ত হয়, প্রথমে নাটক হবে — নাম “আমার জীবন, আমার অধিকার”। গ্রামের হাটে, পুকুরঘাটে, বটতলায় — যেখানে লোক জমে, সেখানেই হবে পথনাটিকা। পরদিন থেকেই শুরু হয় প্রস্তুতি। ছাত্রছাত্রীরা কবিতা লেখে, স্লোগান তৈরি হয় — “শরীর নয়, স্বপ্ন দেখার অধিকার দাও”, “বাল্যবিবাহ মানে কন্যাহত্যা”! অভয়চরণ আবার জীবন্ত হয়ে ওঠেন — স্কুলের দেওয়ালে আঁকা হয় নতুন ছবি, নারী শিক্ষার প্রতীক। কিন্তু তার সঙ্গে শুরু হয় গুঞ্জন — “মাস্টারমশাই পাগল হয়ে গেছে”, “ধর্মদ্রোহী কথা বলছে”, “বাচ্চারা উস্কানি দিচ্ছে মেয়েদের।” পঞ্চায়েত সদস্য সনাতন দাস পরিষ্কার জানিয়ে দেন, “গ্রামে এইসব নাটক চলবে না। এত কথা বুঝলে শহরে চলে যাক সবাই।” অভয়চরণ জানতেন, তার সামনে পথ কঠিন, কিন্তু ভেতরের চৈতালী চিঠির অক্ষরগুলো তাকে প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দিচ্ছে — লড়াই শুরু হয়েছে, এখন থামা যাবে না।

***

কুন্দিলপুর গ্রামের পুকুরঘাট, বটতলা আর চায়ের দোকান যেন হঠাৎ করেই একটি শব্দে মুখরিত হয়ে উঠেছিল — “আলো”। প্রথমদিকে কেউ বুঝতে পারছিল না, এটা কোনও নতুন পত্রিকা? না কোনও রাজনীতির শাখা? কিন্তু ধীরে ধীরে যখন ছেলেমেয়েরা দুপুরবেলা পুকুরপাড়ে নাটকের মহড়া দিতে শুরু করল, বটগাছের গোড়ায় লাগানো হল সাদা কাপড়ে লেখা: “বাল্যবিবাহ আইনত অপরাধ”, “মেয়ের ভবিষ্যৎ ওর অধিকার” — তখন বোঝা গেল, এ শুধু কথার হাওয়া নয়। অভয়চরণ মণ্ডলের হাতে গড়া “আলো” সত্যিই অন্ধকার ঠেলে সামনে আসা এক ছোট্ট মশাল। নাটকের দল গড়ে উঠল তাঁর ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে — কেউ স্কুলে পড়ে, কেউ কলেজে, কেউ কাজের ফাঁকে সময় বের করে আসে। বিপ্লবের নেতৃত্বে শুরু হয় সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রচার — মোবাইলে তোলা নাটকের ভিডিও, পোস্টার, ইন্টারভিউ ছড়িয়ে পড়তে থাকে কাছের গ্রামগুলিতে। এমনকি শহরের এক বেসরকারি চ্যানেল একদিন খবর ছেপে দেয় — “গ্রামে শিক্ষকের নেতৃত্বে বাল্যবিবাহ বিরোধী আন্দোলন”। আর সেখানেই প্রথমবার অভয়চরণ বুঝতে পারেন, তাঁদের আওয়াজ কুয়াশা ভেদ করে আরও দূরে পৌঁছেছে।

নাটকের প্রথম প্রদর্শনী হয় শনি হাটে — যেখানে সপ্তাহে একদিন আশেপাশের গ্রামের লোকজন আসে বাজার করতে। সেদিন বিকেলে আলো নাট্যদল “আমার জীবন, আমার অধিকার” নাটকটি পরিবেশন করে — যেখানে এক কিশোরী কিভাবে নিজের বিয়ে আটকায়, পড়াশোনা করে এবং শেষে পঞ্চায়েতের মিটিংয়ে দাঁড়িয়ে নিজের বক্তব্য রাখে। লোকজন মুগ্ধ হয়ে দেখে, কেউ কেউ চোখ মুছে, আবার কেউ অস্বস্তিতে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। মঞ্চ শেষ হতেই একজন বৃদ্ধ বলে ওঠেন, “আমার নাতনিকে আমিও স্কুলে পাঠাব। ওর মায়ের বিয়ে হয়েছিল দশ বছরে — কিন্তু ওর যেন হয় না।” সেদিন থেকেই নাটকটা কুন্দিলপুরের গল্প হয়ে দাঁড়ায় — যেখানে ছেলেমেয়েরা রাত জেগে পোস্টার আঁকে, স্লোগান লেখে, কারো খেতে কাজ সেরে আসে, কেউ পাড়ার দাদাদের চোখ এড়িয়ে মহড়ায় যোগ দেয়। কিন্তু এই আলোর পাশে ছায়াও গাঢ় হতে থাকে। স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য সনাতন দাস একদিন অভয়চরণকে ডেকে বলেন, “আপনি আপনার বয়স বুঝে চলুন মাস্টারমশাই। ধর্মের, সমাজের বিরুদ্ধে যাচ্ছেন — মেয়েদের এত শিক্ষিত করলে মাথায় চড়ে বসবে।” অভয়চরণ শান্তভাবে বলেন, “মেয়েরা মাথা তুলে বাঁচুক — সেটাই তো শিক্ষা।” কথার উত্তরে সনাতন হাসেন, “তবে এবার স্কুলের রিনিউয়াল বরাদ্দ বন্ধ করে দিতে হবে।”

চাপ শুরু হয় চারদিক থেকে। স্কুলের রক্ষণাবেক্ষণের টাকা আটকে দেওয়া হয়, অভয়চরণের নামে ‘সন্দেহজনক বিদেশি তহবিল’ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে, এমনকি নাটক চলাকালীন পুলিশ এসে ‘অনুমতি’ কই জানতে চায়। “আলো”-র ছেলেমেয়েরা ভয় পেতে শুরু করে — কেউ কেউ দূরে সরে যায়। অভয়চরণ তখন আবার তাদের একত্র করেন, ছোট্ট স্কুলঘরে দাঁড়িয়ে বলেন, “যেখানে সমাজ কথা বলতে দেয় না, সেখানেই কথা বলা সবচেয়ে জরুরি। ভয় লাগতেই পারে, কিন্তু আজ যদি আমরা পিছিয়ে যাই, তাহলে চৈতালীদের আর কেউ বাঁচাবে না।” তার এই কথায় আগুন ছড়িয়ে পড়ে। নাজমা খাতুন, যিনি এতদিন বিরুদ্ধ ছিলেন, তিনি একদিন মাদ্রাসায় ছাত্রীদের সামনে দাঁড়িয়ে বলেন, “ইসলামে বাল্যবিবাহের কোনও বাধ্যতা নেই। মেয়ের সম্মতি ছাড়া কিছু হয় না। যারা বলে মেয়েদের গোপনে বিয়ে দিতে হয়, তারা ধর্ম নয়, নিজেদের সুবিধে বোঝে।” তাঁর মুখে এই কথাগুলো শুনে একদা মুখ ঘুরিয়ে থাকা গ্রামের লোকরাও প্রশ্ন তুলতে শুরু করে — “তাহলে এতদিন যা হত, সেটা কি ভুল ছিল?” “আলো” আস্তে আস্তে একটা আন্দোলন নয়, একটা আশা হয়ে ওঠে — যেখানে কোনও দল নেই, কোনও রঙ নেই, শুধু কিছু সাহসী কণ্ঠ আর কিছু চোখ — যারা বলে, “আমরা প্রশ্ন করব।” কুয়াশার ভিতর সত্যের ছোট্ট বীজটি তখন মাটিতে গাঁথা হয়ে গেছে — অপেক্ষা, আলো ফোঁটার।

***

আন্দোলনের শিকড় যত মাটির গভীরে প্রবেশ করতে থাকে, ততই ছায়ারা আরও দীর্ঘ হয়। “আলো” নামের এই ছেলেমেয়েগুলোর দলটা যখন সন্ধেবেলা নাটক করে বা পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে কিশোরীদের বোঝায়— বিয়ে মানে জীবন শেষ নয়, তখন সেই ছায়ার মানুষগুলো কানে কানে বলে ওঠে— “মেয়েরা মাথাচাড়া দিচ্ছে”, “এই মাস্টারমশাই গ্রামের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে।” গ্রামের মধ্যবয়সী পুরুষদের একাংশ যেন অস্বস্তিতে পড়ে যায়, কারণ এতদিন যাদের শুধুই বিয়ে দেওয়ার বস্তু বলে মনে করা হতো, সেই মেয়েরাই আজ প্রশ্ন করছে। ছায়ার মানুষগুলো খুব স্পষ্টভাবে দেখা যায় না — তারা চায়ে চুমুক দিতে দিতে বলে, “আজকালকার ছেলেমেয়েরা তো গোঁয়ার”, তারা পুজোর আগে দোকান খুলে বসে বিয়ের নিমন্ত্রণ কার্ড ছাপায়, আবার রাতের বেলায় গাঁয়ের মোড়ে বসে “আলো”-র পোস্টার ছিঁড়ে ফেলে। অভয়চরণ জানতেন এই লড়াই শুধু রাজনীতির সঙ্গে নয়, এটা মানসিকতার সঙ্গে — যেটা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জমে উঠেছে মানুষের মগজে। যে ছায়ারা নিজের মেয়ের বিয়েতে গরু উপহার পায় বলে খুশি হয়, তারাই বলে — “মেয়েরা বেশি পড়লে বিয়ের যোগ্য পাত্র পাওয়া যায় না।”

এই ছায়ারা শুধু সমাজে নয়, পরিবারেও বাসা বাঁধে। একদিন বিপ্লবের ছোট বোন পূর্ণিমা অভয়চরণের কাছে এসে বলে — “স্যার, আমাকে নাটকে অভিনয় করতে দেবে না বাবা। বলে, এসব করলে বিয়ে হবে না।” বিপ্লব চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে, তার চোখে অপমান আর অভিমানের ছায়া। নাজমা খাতুনকেও নিজের মাদ্রাসার ট্রাস্টি বোর্ড নোটিশ দেয় — “আপনি ধর্মের নামে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন।” কিন্তু তিনি পিছু হটেন না। চুপচাপ হিজাব পরে নিজের ছাত্রীর কাছে গিয়ে বলেন, “পড়তে চাইলে লুকিয়ে এলেও শেখাব।” অভয়চরণ প্রতিদিন স্কুলের বেঞ্চে বসে দেখেন, কোন কোন ছাত্রের চোখে আগুন আছে, আর কে ভয়ে মুখ নিচু করে হাঁটে। একদিন স্কুলের মিটিংয়ে সনাতন দাস ঢুকে পড়ে। মুখে হালকা হাসি, হাতে একটা কাগজ — বিদ্যালয় পরিচালন সমিতির তরফ থেকে অভয়চরণকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে, কারণ তিনি “ছাত্রছাত্রীদের উসকানি দিচ্ছেন”, “সমাজবিরোধী কার্যকলাপে যুক্ত।” সেদিন স্কুলঘর নিস্তব্ধ, বোর্ডে লেখা ছিল— “আজকের পাঠ — বিবেক”। অভয়চরণ কাগজটা হাতে নিয়ে কেবল বলেন — “যে স্কুল বিবেক শেখায়, তাকে কি সমাজবিরোধী বলা যায়?”

এই অপমানের পরও “আলো” থেমে যায় না। বরং তাদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। নাটক আরও ধারালো হয়, পোস্টার আরও বড়ো হয়, সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের ফলোয়ার বাড়ে। শহরের কিছু আইনজীবী যোগাযোগ করে, সরকারি মহিলা কমিশনের এক আধিকারিক মাধবী সেন গ্রামে এসে নিজের চোখে পরিস্থিতি দেখে যান। কিন্তু গ্রামের ছায়ার মানুষেরা হাল ছাড়ে না। তারা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে — বলে, “স্কুলে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ চলছে।” অভয়চরণ একদিন থানায় ডাকা পড়েন, চেয়ারে বসিয়ে জেরা করা হয় — “আপনার বিদেশি ফান্ড কোথা থেকে আসে?”, “আপনি কি কোনও এনজিও-র সঙ্গে যুক্ত?” তিনি শুধু বলেন, “আমার ছাত্ররাই আমার ফান্ড, আর আমি যুক্ত শুধু বিবেকের সঙ্গে।” থানার বাইরে দাঁড়িয়ে চৈতালী, বিপ্লব, নাজমা ও পূর্ণিমারা তার জন্য অপেক্ষা করছিল। একসময় থানা থেকে বেরিয়ে তিনি তাঁদের বলেন — “এই ছায়ারা শুধু আলো দেখলেই ভয় পায়। তারা জানে, সত্যি বেরিয়ে এলে তারা লুকোবার জায়গা পাবে না। কাজেই আমাদের আলো আরও উজ্জ্বল করতে হবে — যাতে ছায়ারা ভয় পায়, কিন্তু মেয়েরা আর ভয় না পায়।” সেই সন্ধ্যায় কুন্দিলপুরে বৃষ্টি নামে — সেই প্রথম কোনও বৃষ্টির রাতে গ্রামপ্রধানের দেওয়ালে কেউ সাদা রঙে লিখে যায় — “মেয়েরাও মানুষ। শিক্ষা তাদের অধিকার।”

***

পুজোর ঠিক আগের সপ্তাহ, কুন্দিলপুরের আকাশে যেন অদৃশ্য ঘন মেঘ জমেছিল — শুধু বৃষ্টি নয়, এক ধরনের অস্থিরতা। হাটে-বাজারে ঘোরাঘুরি করছিলেন মেয়েদের শাড়ির ব্যবসায়ীরা, আর সেই সঙ্গে গোপনে বিলি হচ্ছিল চৈতালীর বিয়ের কার্ড। অভয়চরণ মণ্ডল তা জানার সঙ্গে সঙ্গেই ছুটে যান চৈতালীর বাড়িতে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা চৈতালীর মামা হেসে বলে, “আপনি অনেক তো নাটক করালেন, স্যার। এবার বরং একটু মিষ্টি মুখ করুন।” ঘরের ভেতর থেকে তখন বাজছে বিয়ের সানাইয়ের রেকর্ডেড সুর, আর চৈতালী— ঘরের কোণে বসে, চোখে লাল রক্তজল। অভয়চরণ বলে ওঠেন, “এ বিয়ে আইনত অপরাধ। মেয়েটার বয়স ১৮ হয়নি।” চৈতালীর মা তখনও গলায় মাফলার জড়িয়ে হালকা গলায় বলে ওঠেন, “স্যার, আপনি তো জানেন, সমাজ কী ভাবে দেখে। মেয়েকে এখন না দিলে কাল পাত্র আসবে না।” সেদিন বিকেলে “আলো” মঞ্চে বৈঠক বসে। চৈতালী তখন চুপ করে সবার দিকে তাকায়। একসময় উঠে দাঁড়িয়ে বলে — “আমি আদালতে যাব। আমার জীবন নিয়ে আমি সিদ্ধান্ত নিতে চাই।” সবাই স্তব্ধ হয়ে যায়। এরপর ঘটে যায় কুন্দিলপুরের ইতিহাসে সবচেয়ে সাহসী পদক্ষেপ — এক কিশোরী নিজের বাল্যবিবাহ আটকাতে যায় থানায় জেনারেল ডায়েরি করতে।

থানার এসআই প্রথমে হাসতে হাসতে বলে, “বাড়ির মেয়ের এফআইআর করছো! কার সঙ্গে পরামর্শ নিয়ে এসেছো? এসব শহরের গল্প।” কিন্তু সঙ্গে ছিলেন অভয়চরণ, বিপ্লব, পূর্ণিমা ও আইন পড়ুয়া অমরেশ — “আলো”র নতুন সদস্য, যিনি কলকাতার ল কলেজে পড়ে। অমরেশ এগিয়ে এসে বলে, “চাইল্ড ম্যারেজ অ্যাবোলিশন অ্যাক্ট অনুযায়ী, বাল্যবিবাহে জড়িয়ে পড়লে কেবল বিয়ে নয়, পরিবারকেও শাস্তি দেওয়া যেতে পারে।” থানা তখন মৃদু গম্ভীর হয়। চৈতালীর জবানবন্দি নেওয়া হয়। সেদিন থেকেই গ্রামের লোকের মুখে মুখে ফেরে — “মেয়েটা পুলিশে গেছে নিজের বিয়ে আটকাতে!” কেউ প্রশংসা করে, কেউ মুখ বাঁকায়। আবার কিছু পরিবার মেয়েদের বাড়ির বাইরে যেতে মানা করে দেয় — “ওদের সঙ্গে থেকো না, মেয়ে মাথা উঁচু করে কথা বলে শিখে এসেছে।” অথচ শহরের একাধিক পত্রিকায় চৈতালীর ছবি ছাপা হয় — “চৈতালী ঘোষ: কুন্দিলপুরের সাহস”, “বাল্যবিবাহ রুখল এক স্কুলছাত্রী”। অভয়চরণ মণ্ডল বলেন, “এই মেয়েটিই আমাদের ভবিষ্যৎ। বাকি মেয়েরা যদি চৈতালীর সাহস পায়, তাহলে এই গ্রামে আর কোনও বাল্যবিবাহ হবে না।” আদালত প্রাথমিকভাবে নিষেধাজ্ঞা জারি করে বিয়েতে। সরকারি মহিলা কমিশনের অফিসার মাধবী সেন কুন্দিলপুরে আসেন তদন্তে, চৈতালীর সাক্ষাৎকার নেন, অভয়চরণের স্কুল পরিদর্শন করেন এবং বলেন — “আপনাদের আন্দোলন প্রশাসনের সহায়তা পাবে। কিন্তু আপনাদের রাস্তাটা কঠিন। ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সহজ নয়।”

এরপর থেকে “আলো” কেবল নাটক করে না, তারা আইনি সহায়তা শিবির চালু করে, যেখানে গ্রামের মেয়েরা এসে তাদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেয়। অনেকেই আসে লুকিয়ে, কেউ মাসির হাত ধরে, কেউ চুপি চুপি সাইকেলে চেপে আসে। নাটক এখন হয় পুকুরঘাটের বদলে ক্লাবঘরে, পোস্টার ছেঁড়ার বদলে দেয়ালচিত্রে মেয়েরা নিজের গল্প আঁকে। “আলো” এখন কেবল একটি দল নয় — এটি একটি সাহসী অবস্থান, যার কেন্দ্র চৈতালীর মতো মেয়েরা। কিন্তু সবকিছুর মাঝেই, সনাতন দাস পেছনে কাজ চালিয়ে যেতে থাকে। সে এবার অন্য কৌশল নেয় — পুলিশের মাধ্যমে অভয়চরণকে ডেকে পাঠায় “উস্কানি” দেবার অভিযোগে। থানায় বসে অভয়চরণ নির্ভয়ে বলেন — “উস্কানি নয়, আমরা অধিকার শেখাই।” মাধবী সেন থানায় গিয়ে সাফ জানান, “এই মানুষটি যদি সমাজে না থাকতেন, তাহলে আপনাদের থানায় আরও কন্যা আত্মহত্যার কেস রেজিস্টার করতে হতো।” ততদিনে চৈতালী মেয়েদের মুখ হয়ে গেছে। এক সাক্ষাৎকারে সে বলে — “আমি আইন জানতাম না, কিন্তু জানতাম আমি মানুষ। আর মানুষ হবার জন্য ভালোবাসা যেমন দরকার, তেমনই চাই সম্মান। আমি সেটা চেয়েছিলাম। এখন আমি অন্যদের সেটা চাইতে শেখাচ্ছি।” আদালত রায় দেয় — চৈতালীর বিয়ে বাতিল, তার নিরাপত্তা এবং পড়াশোনার দায়িত্ব সরকার গ্রহণ করবে। কুন্দিলপুরে সেই প্রথম কোনও মেয়ের জীবনে বিয়ের আগে আসে বিচার। অভয়চরণ মণ্ডল বাড়ি ফিরে একা একা বলেন — “এই সত্যি শুধু চৈতালীর নয় — এটা এক বীজ, যে বীজ থেকে একদিন মুক্তির বনফুল ফোটাবে।”

***

চৈতালীর বিয়ে রুখে যাওয়ার ঘটনা কুন্দিলপুরে যতই আলো ছড়াতে থাকল, ততই ধর্মের গায়ে বসা ধুলোরা ছিটকে পড়তে লাগল। সমাজের সেই গোপন গলি, যেখানে ধর্মের নামে নিয়ম বানিয়ে মেয়েদের ইচ্ছেগুলো দমিয়ে রাখা হতো, সেগুলো যেন চিড় ধরে ফাটতে শুরু করল। এই রকম এক সময়েই পঞ্চায়েত সদস্য সনাতন দাস ও তার লোকজন গ্রামের কালীমন্দিরের সামনে এক চণ্ডীপাঠের আয়োজন করে এবং সেখানে অভয়চরণ মণ্ডলের বিরুদ্ধে সরাসরি বক্তৃতা দেয় — “ধর্মের শত্রু, সমাজের শত্রু, ছেলেমেয়েদের উসকানি দিচ্ছে।” গ্রামের অনেকেই জড়ো হয়, কিন্তু অভয়চরণ নিজে সেই মঞ্চে না গিয়ে বাড়ির বারান্দা থেকে চুপচাপ তাকিয়ে থাকেন। এদিকে মুসলিম পাড়ায়, নাজমা খাতুন যখন মাদ্রাসার ছাত্রীদের বাল্যবিবাহ থেকে বিরত থাকতে বলছেন, তখন এক মৌলানা এসে তাকে বলেন, “আপনি ধর্ম জানেন? কোরআন পড়েছেন?” নাজমা হেসে বলেন, “আমি একজন মেয়ে, আমি কোরআনও পড়েছি, আর জীবনও। আপনি যদি আসল ধর্ম দেখাতে চান, তবে বলুন— কোথায় লেখা আছে যে ১৫ বছর বয়সে মেয়ের বিয়ে দিলে সে সুখ পাবে?” মৌলানার মুখ থমথমে হয়ে ওঠে। তবুও তারা বলে— “এই মহিলা ভুল কথা বলছে, ধর্ম নষ্ট করছে।” এভাবেই ধর্মের নামে গড়ে ওঠা একটা অদৃশ্য মুখোশ, যার আড়ালে চলছে নারী-অধিকার হরণ, অশিক্ষার প্রশ্রয় আর স্রেফ আধিপত্যের খেলা।

এই পরিস্থিতিতে “আলো” সিদ্ধান্ত নেয় — ধর্মকে বোঝাতে হবে ধর্ম দিয়েই। তারা একটি উদ্যোগ নেয় — “ধর্ম ও নারী: পুনর্পাঠ” নামে একটি আলোচনা সভা। গ্রামের ক্লাবঘরে তারা আয়োজন করে সেই সভার, যেখানে আমন্ত্রিত হন হিন্দু পুরোহিত শ্রীমতী ভবানী দেবী, যিনি নারী পুরোহিত হওয়ায় বহুবার আক্রমণের শিকার হয়েছেন, এবং প্রখ্যাত ইসলামিক স্কলার ড. রুবিনা সিদ্দিকী। সেই দিন বিকেলে হলঘরে জনসমাগম চমকপ্রদ। ভবানী দেবী বলেন, “আমরা ভুলে গেছি— ধর্ম মানে কল্যাণ, জ্ঞান, সহমর্মিতা। আর যদি শিক্ষা না হয়, তবে সেটা ধর্ম নয়, অধর্ম।” ড. রুবিনা বলেন, “ইসলামে ‘নিকাহ’ হবার শর্তই হলো পূর্ণ সম্মতি। একটি অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যার কাছ থেকে কি আপনি সত্যিকার সম্মতি আদায় করতে পারেন?” এই দুই মহিলার বক্তৃতা যেন আকাশের ওপর জমে থাকা কুয়াশাকে ছিন্ন করে রোদ এনে দেয়। পরদিন “আলো” পুস্তিকা ছাপায় — “ধর্ম নয়, ধর্মের অপব্যাখ্যা আমাদের শত্রু।” এই পুস্তিকা গ্রামে ঘরে ঘরে বিলি হয়, এমনকি পুরনো মন্দিরের দেওয়ালেও লাগানো হয়, মসজিদের পাশের গলিতে ছড়িয়ে পড়ে। স্কুলের এক মুসলিম ছাত্র বলেছিল — “আম্মি প্রথমবার আমাকে বলল, তুই পড়াশোনা কর, বিয়ে পরে।” তখন অভয়চরণ মণ্ডল বলেছিলেন — “তোমার পড়া, তোমার জীবনের মূল। বিয়ে একটা সামাজিক সংস্থান, কিন্তু শিক্ষা তোমার অস্তিত্ব।”

তবে প্রতিরোধ এখানেই থেমে যায় না। এবার পঞ্চায়েত “আলো”র কাজ বন্ধ করতে প্রশাসনের কাছে চিঠি দেয় — “গ্রামে ধর্মীয় উসকানি হচ্ছে।” মাধবী সেন দপ্তর থেকে এসে আবার তদন্ত করেন, এবং সাফ জানিয়ে দেন — “একটি আন্দোলন ধর্ম নয়, আইন ও অধিকার নিয়ে কথা বলছে। আপনাদের অভিযোগ ভিত্তিহীন।” অভয়চরণ জানতেন, সমাজের বুকে ধর্মের মুখোশ সবচেয়ে ভয়ংকর প্রতিপক্ষ। কারণ সেটি গায়ে শালীনতা চাপিয়ে, ভেতরে লুকিয়ে রাখে নৃশংসতা। সেই কারণেই তিনি গ্রামের নবীন ছাত্রদের দিয়ে এক অভিনব কর্মসূচি শুরু করেন — “ধর্মপাঠ শিবির”। হিন্দু-মুসলিম সকল ছাত্রছাত্রী মিলে ধর্মগ্রন্থ থেকে মানবিক শিক্ষার অংশ পড়তে শেখে, তার অর্থ বোঝে, এবং সেগুলো দিয়ে নাটক করে। একদিন তারা একটি নাটকে দেখায়— কোরআনের আয়াত, যেখানে শিক্ষার গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, আর গীতার শ্লোক, যেখানে বলা হয়েছে “বিদ্যাবান জনসেবীই আসল ব্রাহ্মণ।” মঞ্চের পর গ্রামপ্রধানের মুখে কেউ কোনও কথা শুনতে পায় না। নাজমা খাতুন মঞ্চে উঠে বলেন — “যদি সত্যিই ঈশ্বর থাকে, তবে সে নারীকে গৃহবন্ধী রাখতে বলে না। সে তাকে আলোর দিকে হাঁটতে বলে।” সেদিন অভয়চরণ মণ্ডল চুপচাপ পেছনে বসে থাকেন, তাঁর মুখে একটি হাসি। হয়তো সেই হাসি কুয়াশার ভিতরেও সত্যি থাকার প্রমাণ।

***

নাটকের আলোর নিচে দাঁড়িয়ে থাকা চৈতালীর মুখ যেন বদলে গেছে। সেই যে বছর দুয়েক আগেও সে স্কুলের প্রাচীরে মুখ লুকিয়ে বলত, “স্যার, আমি বাঁচতে চাই”, আজ সে মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলে, “আমি একজন মানুষ, আমি বাঁচব নিজের শর্তে।” কুন্দিলপুর ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করেছে — এটা এখন আর শুধু এক কৃষিনির্ভর গ্রাম নয়, এটা যেন এক জেগে ওঠা কণ্ঠের জনপদ। “আলো”র পথনাটিকা এখন নিয়মিত আয়োজন, মেয়েরা এখন নিজের পড়াশোনা নিয়ে কথা বলে, কেউ চুপ করে বিয়েতে রাজি হয় না। অভয়চরণ মণ্ডলের বাড়িতে প্রতিদিন কেউ না কেউ এসে বলে, “স্যার, আমার মেয়েটাও ওদের দলে নাম লিখতে চায়।” চৈতালীর ঘটনার পরে স্কুলে ভর্তির হার বেড়েছে, বিশেষ করে মেয়েদের মধ্যে। নাজমা খাতুন স্কুলের পাশেই একটা লাইব্রেরি চালু করেছেন, নাম দিয়েছেন “আলোকপথ”, যেখানে শুধু মেয়েরাই বই পড়তে আসে, পত্রিকা পড়ে, আলোচনা করে — কীভাবে সমাজ বদলানো যায়। পূর্ণিমা এখন নাটকের অন্যতম লেখক, সে নাটকে নিজের জীবনের কথাই লেখে — “যখন আমি বলেছিলাম পড়তে চাই, তখন সবাই বলেছিল বিয়ে না হলে কী হবে জীবনে? কিন্তু আমি বলি — পড়তে পারলে জীবনটা হয় নিজের।”

তবে পরিবর্তনের পথে সাহসের যেমন জয়, তেমনি লেগে থাকে ভয়ও। সনাতন দাস এবার সরাসরি হুমকি দেয় — “নাটকের নামে যদি আর একটি কথাও ধর্ম বা সমাজের বিরুদ্ধে বলা হয়, তাহলে শাস্তির ব্যবস্থা আমরাই করব।” বিপ্লব তার ফোনে হুমকি পায়, নাজমা খাতুনের বইয়ের ঘরে আগুন লাগানোর চেষ্টা হয়। অভয়চরণ মণ্ডল একদিন নিজের গেটের সামনে ছেঁড়া পোস্টার খুঁজে পান — তাতে লেখা ছিল, “তোমার আলো নিভে যাবে, মাস্টার!” কিন্তু তবু তিনি ভেতরে ভেঙে পড়েন না। বরং, মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলেন — “যারা ভয় দেখায়, তারাই ভয় পায়। আমাদের পথ ঠিক হলে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।” এরপর “আলো” সিদ্ধান্ত নেয়, এবার নাটকের থিম হবে— “ভয়ের মুখোমুখি হওয়া।” নাটক লেখা শুরু হয়, যেখানে এক সাধারণ মেয়ে সাহস করে গ্রামের মোড়লকে প্রশ্ন করে — “তুমি ধর্ম বোঝো না, তুমি শাসন বোঝো।” সেই নাটক মঞ্চস্থ হয় হাটে, স্কুলে, মাদ্রাসার উঠোনে। মেয়েরা নিজেই চিৎকার করে ডায়লগ বলে — “আমি মানুষ, আমি বিবেকের কথা বলব, আমার শরীর নিয়ে কেউ কথা বলবে না।” নাটক শেষে কেউ হাততালি দেয়, কেউ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু কেউ আর আগের মতো হাসে না — কারণ বুঝে যায়, এই কথাগুলো আর শুধু নাটক নয়, এই এখনকার সত্যি।

এর মধ্যে আসে প্রশাসনিক এক স্বীকৃতি — পশ্চিমবঙ্গ মহিলা কমিশনের তরফ থেকে “আলো”কে সম্মান জানানো হয় একটি সামাজিক সচেতনতা পুরস্কারে। কলকাতার এক হলে অনুষ্ঠান হয়, যেখানে অভয়চরণ মণ্ডল, চৈতালী, বিপ্লব, নাজমা ও পূর্ণিমারা মঞ্চে ওঠেন। অভয়চরণ বলেন, “আমরা সাহস জোগাইনি, আমরা শুধু সাহসের জায়গাটা দেখিয়ে দিয়েছি। যে সমাজ মেয়েদের ভয় দেখিয়ে চালায়, সেই সমাজ সবচেয়ে দুর্বল।” সেই অনুষ্ঠানের ছবি, সংবাদ সব ভাইরাল হয়ে যায়। শহর থেকে সমাজকর্মীরা আসতে শুরু করেন কুন্দিলপুরে। এক প্রাক্তন আইএএস অফিসার এসে বলেন, “আমি এমন আন্দোলন গ্রামে কখনও দেখিনি।” কিন্তু অভয়চরণ মণ্ডল কেবল হাসেন — কারণ তিনি জানেন, এ কেবল শুরু। চৈতালী এখন কলেজে পড়ে, সমাজবিদ্যা নিয়ে। সে তার অভিজ্ঞতা নিয়ে বই লিখছে — নাম দিয়েছে “কুয়াশার ভিতর সত্যি।” মঞ্চ থেকে সমাজ, সমাজ থেকে আদালত — যে যাত্রা শুরু হয়েছিল একটি চিঠি দিয়ে, তা আজ এক নির্ভয়ের রূপ নিয়েছে। অভয়চরণ মণ্ডল প্রতিদিন সকালে হাঁটতে বেরিয়ে দেখেন, মেয়েরা সাইকেলে স্কুলে যাচ্ছে, কেউ মাদ্রাসা থেকে বেরিয়ে লাইব্রেরির দিকে হাঁটছে। তখন তিনি নিজের মনেই বলেন — “ভয় আর কুয়াশার ভেতর সত্যি হারায় না, বরং তার পথ তৈরি হয়, আলোয় ভিজে ওঠে।”

***

গ্রামের পুরনো স্কুলবাড়ির দেওয়ালটা অনেকটা সময় ধরে রোদ, বৃষ্টি, ধুলো আর চুপ করে থাকা মুখের সাক্ষী থেকেছে। সেই দেওয়ালে আজ রংতুলি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পূর্ণিমা, পাশেই হাসিমুখে রং মেশাচ্ছে বিপ্লব, আর একটু দূরে ব্রাশ নিয়ে রূদ্ধশ্বাস হয়ে দাঁড়িয়ে আছে নতুন সদস্য তনিমা — যে আগে কখনও ছবি আঁকেনি, কিন্তু আজ সাহস করে এসেছে। অভয়চরণ মণ্ডল নিজের চেয়ারে বসে তাকিয়ে আছেন, চোখে জলের কণা। এই দেওয়ালে অনেক বছর আগে “জাতীয় সঙ্গীত” লিখে রেখেছিলেন তিনি নিজে, তারপর সময়ের সঙ্গে কালি মুছে গেছিল, দেয়ালে জমেছিল ফাটল। কিন্তু আজ সেই ফাটলের ওপরেই আঁকা হচ্ছে নতুন ছবি — একটা কিশোরী, হাতে বই, পেছনে পুকুর আর স্কুলঘর, আর তার মুখ তুলে বলা — “আমার জীবন, আমার অধিকার”। এই চিত্রকল্প তৈরি হয়েছে বহু লড়াইয়ের ভিতর দিয়ে, বহু নিষেধ, বহু চোখরাঙানি আর অপমানের পর। গ্রামে এখন এই ছবি আঁকার খবর ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ কেউ দূর থেকে দেখে যায়, কেউ ভয় পায় কাছে যেতে, আবার কেউ পেছন থেকে ফিসফিস করে বলে — “ওরা এখন সমাজ গড়ছে বুঝি!” কিন্তু কারো মুখে আর সরাসরি প্রতিবাদ নেই, কারণ তারা বুঝেছে — এই দেয়ালে শুধু ছবি নয়, এই ছবিতে গাঁথা আছে সমাজের বদলে যাওয়ার ভবিষ্যৎ।

চিত্রাঙ্কনের দিন বিকেলে গ্রামের ছোটো ছোটো মেয়েরা স্কুলের মাঠে ভিড় করে। কেউ কেউ বলে — “দিদি, আমরাও আঁকতে চাই”, কেউ চুপ করে দাঁড়িয়ে দেখে। চৈতালী যেদিন ওদের সঙ্গে আঁকতে নামে, সেদিন ছবি আর শুধু শিল্প নয় — হয়ে ওঠে প্রতিরোধ। সে একটি মেয়ের মুখ আঁকে, যার একদিকে মুখে রক্তরেখা, অন্যদিকে— চোখে স্বপ্নের রং। সবাই বলে — “এটা কে?” চৈতালী হাসে — “এটা আমি, তুমিও, আমরা সবাই।” এরপর থেকে “আলো”-র কাজের আরেকটি শাখা তৈরি হয় — “দেয়ালচিত্র কর্মশালা”, যেখানে মেয়েরা নিজের জীবন, ভয়, স্বপ্ন নিয়ে ছবি আঁকে। স্কুলঘর, ক্লাবঘর, এমনকি মসজিদের পাশের পরিত্যক্ত ঘর — যেগুলো এতদিন ভাঙা, নষ্ট ছিল, সেগুলোতে আজ নতুন প্রাণ। কেউ আঁকে— ‘পড়তে চায় এমন মেয়ে’, কেউ— ‘বিয়ের ভয় পেয়ে পালানো মুখ’, আবার কেউ— ‘বইয়ের পাতা উল্টে সাহস খোঁজার ছবি’। গ্রামের পুরুষরাও কেউ কেউ এসে পাশে দাঁড়ায়, কেউ জল এনে দেয়, কেউ রঙ মেশায়। এইভাবে সমাজের ভিতরে ভিতরে গড়ে উঠতে থাকে নীরব বিপ্লব— যেখানে ছবি অস্ত্র, রং প্রতিবাদ, আর দেয়াল একেকটি ক্যানভাস।

তবে সনাতন দাসরা এখনও চুপ করেনি। তারা এবার বলে — “স্কুলকে পেইন্টিং করে শিবির বানানো হচ্ছে, ধর্ম-বিরোধী ছবি আঁকা হচ্ছে।” প্রশাসনের তরফ থেকে আবার তদন্ত আসে। এক দিন ক্লাস চলাকালীন স্কুলে আসে দুই আধিকারিক, তারা দেয়ালগুলো দেখে, ছবি দেখে, এবং শেষমেশ তারা বলেন — “এগুলো দেখে তো সাহসী হওয়ার কথা মনে হয়, কোনো বিদ্বেষ নেই।” সেই মন্তব্যে স্কুলে একটা চাপা উল্লাস তৈরি হয়। অভয়চরণ বলেন — “যা সত্য, তাকে চাপা দিলে সে আরও গর্জে ওঠে — আমাদের ছবিগুলো সেটাই প্রমাণ।” সেই রাতে পূর্ণিমা তার রংতুলিগুলো গোছাতে গোছাতে বলে — “স্যার, আমরা কি এগুলো দিয়ে একদিন একটা চিত্রপ্রদর্শনী করতে পারি?” অভয়চরণ মৃদু হেসে বলেন — “হয়তো একদিন শহরের গ্যালারিতেও তোমাদের ছবিগুলো ঝুলবে, আর মানুষ দেখবে — কুন্দিলপুর কীভাবে রং দিয়ে অন্ধকার কাটিয়ে দিয়েছিল।” সেই রাতে গ্রামের পুরনো চায়ের দোকানে কেউ কেউ চুপিচুপি বলে — “ওরা এখন দেয়ালে ছবি আঁকে, কাল হয়তো মনের ভিতরেও আঁকবে।” অভয়চরণ জানতেন, তারা ঠিকই বলছে — কারণ দেয়াল শুধু বাইরের নয়, সমাজের ভেতরের দেয়াল ভাঙাই এখন “আলো”-র লক্ষ্য।

***

পুজোর ছুটির ঠিক আগের দিন, সকালবেলা স্কুলঘরে পৌঁছেই অভয়চরণ মণ্ডল দেখতে পেলেন, তার টেবিলের ওপর রাখা এক চিঠি— পুরনো দিনের মতো ভাঁজ করা, সাদা খামে। চোখে চশমা টেনে নিয়ে তিনি যখন খাম খুলে চিঠিটা বের করলেন, ভেতরের হাতের লেখা চেনা লাগল— এটি চৈতালীর নয়, এটি ছিল তার বাবার। সেই লোক, যিনি একদিন নিজের মেয়েকে “বোঝা” ভেবে বিয়ের পাত্রী বানিয়ে ফেলেছিলেন, তিনিই আজ লিখেছেন— “স্যার, আমার ভুল হয়েছে। আমি বুঝিনি, মেয়ের স্বপ্ন কেমন হয়। এখন সে আমাকে জিজ্ঞেস করে, ‘বাবা, তুমি ছোটবেলায় কী হতে চেয়েছিলে?’ আমি কেমন যেন হয়ে যাই। আজ ওকে দেখে ভাবি— আমার চেয়ে মেয়েটাই বড় হয়েছে। আপনি যদি না থাকতেন, আজ আমি মেয়ের চোখে আলোর বদলে শূন্যতা দেখতাম। আমার কৃতজ্ঞতা আপনাকে জানানোই ছিল এই চিঠির উদ্দেশ্য।” চিঠি পড়ে অভয়চরণ চুপ করে থাকেন কিছুক্ষণ, চোখ দুটো কেমন ঝাপসা হয়ে আসে। শিক্ষকতা জীবনে তিনি অনেক চিঠি পেয়েছেন, অনেক অভিভাবকের ফোন, অনেক ছুটির আবেদন— কিন্তু এই চিঠিটা যেন এক সমাজের স্বীকৃতি। এটি একটি অজানাকে মেনে নেওয়া, এটি পরাজয়ের মধ্যেও পুনর্জন্মের চেষ্টা।

সেই দিন বিকেলে চৈতালী স্কুলে আসে, একটা বই হাতে— বইটা তার নিজের লেখা, ছোট্ট পুস্তিকা, নাম দিয়েছে: “আমি চুপ ছিলাম না।” তার মুখে একরাশ আত্মবিশ্বাস, আর চোখে উজ্জ্বল দীপ্তি। সে বলে, “স্যার, বইটা আপনাকে দিতে এসেছি। আপনার জন্যই আমি লিখতে পেরেছি।” অভয়চরণ বইটা হাতে নিয়ে বলেন, “তুমি আর শুধু আমার ছাত্রী নও, তুমি এই গ্রামের শিক্ষক হয়ে উঠেছো।” সেই মুহূর্তে পূর্ণিমা, বিপ্লব, নাজমা, অমরেশরা চারপাশে এসে দাঁড়ায়। একসঙ্গে একটা ছবি তোলা হয় স্কুলের সামনে — সবাই দাঁড়িয়ে, পেছনে সেই বিখ্যাত দেয়ালচিত্র, আর সামনে নতুন প্রজন্ম। ছবিটা পরে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে যায় — “কুয়াশার ভিতর সত্যি” নামেই ক্যাপশন। সেই ছবির নিচে কেউ কমেন্ট করে, “যদি প্রতিটি গ্রামে এমন এক অভয়চরণ মণ্ডল থাকতেন, তবে আরও অনেক মেয়ে বাঁচত।” চৈতালী পরে বলে, এই ছবিই নাকি তার বইয়ের শেষ পাতার প্রচ্ছদে থাকবে। স্কুল ছুটির আগের সন্ধ্যায় ক্লাসঘরে ছোট্ট একটা অনুষ্ঠান হয়— “আলো”র তরফ থেকে অভয়চরণ মণ্ডলকে সম্মাননা দেওয়া হয় “আলোকদাতা” হিসেবে। তিনি মঞ্চে দাঁড়িয়ে কেবল বলেন, “আমি কিছু করিনি। আমি শুধু কুয়াশার ভিতর কিছু মুখ চিনে নিয়েছিলাম, যারা নিজে থেকেই আলো হয়ে উঠেছে।”

ঠিক সেই রাতে, গ্রামের পঞ্চায়েত ভবনে নতুন সভা বসে। সনাতন দাসকে এবার সরিয়ে দেওয়ার দাবি ওঠে। নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা, যারা আগে রাজনীতি থেকে দূরে ছিল, তারা একত্রিত হয়ে বোঝাতে শুরু করেছে— “আমরা যাদের ভোট দিই, তারা আমাদের ভবিষ্যৎ তৈরি করতে না পারলে, তাদের প্রয়োজন নেই।” অভয়চরণ মণ্ডল সভায় থাকেন না, কিন্তু খবর পান। চৈতালীর বাবা সেই সভায় দাঁড়িয়ে বলে— “আমি একসময় অন্ধ ছিলাম, এখন দেখতে শিখেছি। এখন চাই, এই আলোকিত পথ আরও এগোক।” এরপর থেকে কুন্দিলপুরে নাটক হয় উৎসবে, মেয়েদের জন্য আলাদা লাইব্রেরি হয় সরকারি অনুদানে, এমনকি “আলো”-র সদস্যরা অন্য গ্রামেও গিয়ে সচেতনতা শিবির করে। অভয়চরণ মণ্ডল ধীরে ধীরে স্কুল থেকে সরে আসেন, তবে চুপ করে থাকেন না। তিনি এখন গ্রামের অন্য শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়ে “গ্রামীণ মানবাধিকার পাঠক্রম” শুরু করেন— ছোট্ট মেয়েদের জন্য, যারা এখনও জানে না কীভাবে “না” বলতে হয়। শেষ চিঠিটা তার জন্য কোনও বিদায় নয়, বরং এক শুরু — কুয়াশা যতই ঘন হোক, সত্যি যেন ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে, নিজের আলোর ভেতর দিয়ে।

***

কুন্দিলপুর আজ আর সেই আগের গ্রাম নয়। সকালে যখন চৈতালী সাইকেল চালিয়ে কলেজে যায়, পেছন থেকে ছোট ছোট মেয়েরা হাত নেড়ে বলে, “দিদি, নাটকে নেবে তো?” গ্রামের মোড়ে যে চায়ের দোকানে একসময় বলা হতো — “মেয়েরা বেশি পড়ে ফেললে বিয়ে হয় না”, আজ সেই দোকানের দেয়ালে লেখা — “পড়াশোনাই শক্তি।” স্কুলের বাইরে ঝুলছে নতুন ব্যানার — “শিশুবিবাহ প্রতিরোধ ইউনিট – কুন্দিলপুর”। লাইব্রেরি থেকে শুরু করে ক্লাবঘর, হাট থেকে মসজিদের পাশের গলিপথ — সবখানেই এখন চোখে পড়ে “আলো”র ছোঁয়া। সেই আলো যার জন্ম হয়েছিল অভয়চরণ মণ্ডলের একটি প্রশ্ন দিয়ে: “মেয়েরা মানুষ তো?” সেই প্রশ্ন আজ উত্তর পেয়েছে — গলার স্বরে, পোস্টারে, চিত্রকলায় আর জীবনের প্রতিটি ক্ষণে। নাটক এখন শুধু নাটক নয়, তা গ্রামবাসীর আত্মজিজ্ঞাসা। নাজমা খাতুন আজ মেয়েদের নিয়ে ধর্মপাঠ করান — যেখানে শেখানো হয়, “মানবতাই আসল ইমান।” পূর্ণিমা এখন স্কুলে শিল্প শিক্ষিকা — তার আঁকা ছবি সরকারি প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে। আর বিপ্লব — সে এখন পঞ্চায়েতের নবীন সদস্য, যাকে গ্রামবাসীরা নির্বাচিত করেছে এই বলে — “ওর চোখে সত্যি দেখেছি।”

অভয়চরণ মণ্ডল স্কুলের বারান্দায় বসে থাকেন প্রতিদিন, সঙ্গে কাগজ-কলম আর কিছু স্মৃতিচিহ্ন — পুরনো নাটকের চিত্রনাট্য, ছাত্রদের লেখা চিঠি, প্রথম পোস্টারের কালি ঝরানো কপি। চৈতালী মাঝে মাঝে আসে, কখনো বই দেয়, কখনো গল্প শোনায় — “স্যার, একদিন আমি নিজের স্কুল খুলব।” তিনি বলেন, “খুলতেই হবে — কারণ আরও অনেক চৈতালী জন্মাবে।” প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে রাজ্যস্তরে ‘জনশিক্ষা পুরস্কার’ দেওয়া হয়, কিন্তু তিনি বলেন, “আমার পুরস্কার আমার ছাত্ররাই।” একদিন বিকেলে, যখন মাধবী সেন আবার গ্রামে আসেন, তখন বলেন — “এই আন্দোলনটা আমি শুধু রিপোর্টে রাখব না, আমি এটা নিয়ে বই লিখব — যেন অন্যরাও জানে, কুয়াশার ভেতরেও আলো জ্বলে।” সেই সন্ধ্যায় ‘আলো’র সব সদস্যরা একসঙ্গে বসে এক নতুন উদ্যোগের সূচনা করে — “আলোর বিদ্যালয়” — যেখানে শুধু মেয়েদের নয়, ছেলেদেরও শেখানো হবে, কীভাবে সমানভাবে বাঁচা যায়। গ্রামে যেসব ছেলেরা আগে “মেয়েরা কথা বেশি বলে” বলে ঠাট্টা করত, তারাই আজ নাটকে অভিনয় করে বলে — “নারী না থাকলে সমাজ মরা।”

শেষ বিকেলে অভয়চরণ হাঁটতে বের হন, তার পাশে হাঁটে এখন নতুন প্রজন্ম — তারা প্রশ্ন করে, কথা বলে, হেসে উঠে বলে — “স্যার, আজ একটা নতুন নাটকের ভাবনা নিয়ে এসেছি।” তিনি চুপ করে শোনেন, মাথা নেড়ে বলেন — “লিখো, কারণ এই গল্প থামলে চলবে না। কুয়াশা বারবার আসবে, কিন্তু আলোও জ্বলে উঠবে — যতদিন তোমরা আছ।” মঞ্চে, মাঠে, হৃদয়ে — “আলো” এখন কেবল একটি সংগঠন নয়, এটি একটি দর্শন, একটি জীবনের ভাষা। অভয়চরণ জানেন, তিনি আজ নাও থাকতেন — কিন্তু তাঁর দেখানো পথ, তাঁর রোপা বীজ, তাঁর শিক্ষার্থীরা — তারা সেই আলো বয়ে নিয়ে যাবে ভবিষ্যতের দিকে। গল্প শেষ হয় না, গল্প বেঁচে থাকে — মানুষের ভিতর, প্রতিরোধে, ভালোবাসায়। শেষ লাইনটাও যেন একটা শুরু হয়ে থাকে —
আলো, তুমি বেঁচে থাক। যতদিন কুয়াশা থাকবে, ততদিন তোমার প্রয়োজন থাকবে।

___

WhatsApp-Image-2025-07-01-at-2.01.34-PM.jpeg

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *