Bangla - অনুপ্রেরণামূলক গল্প - সামাজিক গল্প

এক মুঠো চাল

Spread the love

সায়ন্তন বসু


ধনেখালির একচালা ছোট্ট প্রাইমারি স্কুলটার ক্লাসঘরে তখন দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে, সূর্যের আলো বেখেয়ালে মেঝেতে খেলছে, কিন্তু সুধাংশু বেরা বুঝতে পারছিলেন, আজকের শিক্ষার আলো যেন কেমন ম্লান। ক্লাসরুমে মাত্র ন’জন ছাত্র—হাজিরার খাতা বলছে তেইশজন আছে রোল কল-এ। যাদের এসেছে, তাদের চোখে ঘুম নেই, আছে কেমন এক শূন্যতা। ছোট ছোট ছেলেমেয়েগুলো মাথা নিচু করে বসে আছে, যেমনভাবে গরিব সংসারের শিশুরা বসে থাকে কোনো বড়লোক আত্মীয়ের সামনে—ভয়ে নয়, লজ্জায়। হঠাৎ চিন্ময় হালদার, চতুর্থ শ্রেণির সবচেয়ে শান্ত ছেলেটা, ধীরে ধীরে হেলে পড়ে। সুধাংশু ছুটে গিয়ে তাকে ধরে ফেলেন। ছেলেটার নিঃশ্বাস ঠিক আছে, জ্বর নেই, কিন্তু সে সংজ্ঞাহীন। মাথায় জল দিতে দিতে তিনি বলেন, “চিন্ময়, কী হয়েছে রে? কিছু খাসনি?” পাশে বসা ছাত্র বলল, “স্যার, ও তো কাল দুপুর থেকে কিছু খায়নি। ওর মা বলেছে চাল নেই।” শব্দটা—“চাল নেই”—কানের মধ্যে যেন বোমার শব্দ করে বাজল। একজন শিক্ষক কতখানি অসহায় হতে পারেন, তা সুধাংশু তখন প্রথম অনুভব করলেন। সকালবেলা স্কুলে এসে তিনি এক কাপ চা খেয়ে উঠেছিলেন, কিন্তু এই ক্ষুধার সামনে নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছিল। চিন্ময়ের মা অসুস্থ, বাবা তিন বছর আগে নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ। সুধাংশু তার মায়ের ঘরে গিয়েছিলেন বিকেলে। মাটির ঘরের কোণে ভাঙা হাঁড়ি, উনুনে ছাই, জীর্ণ বিছানা, আর এক শিশুর ক্ষুধারত চোখ। কোনও কান্না নেই, শুধু চোখ। তিনি বুঝলেন, এই শিশুদের শেখানোর আগে তাদের পেট ভরাতে হবে।

পরের দিন সকালে সুধাংশু স্কুলে এলেন পকেটে পুরনো খাতা আর কলম নিয়ে, কিন্তু আজ ক্লাস নেওয়ার মন নেই। প্রথম ক্লাসেই তিনি সবাইকে বসতে বলেন, আর নিজে ব্ল্যাকবোর্ডে বড় বড় করে লেখেন—“তোমরা সকলে কী খেয়ে এসেছো আজ?” শিক্ষার্থীদের মধ্যে গুঞ্জন ওঠে। কেউ বলে—লবণভাত, কেউ বলে—ভাতই জোটেনি। একমাত্র রবিকান্ত বলে—“আমি চিরতা খেয়ে এসেছি মা জ্বরের ওষুধ বলে খাওয়ায়।” সুধাংশুর চোখ চলে যায় সেই ছেলেটির দিকে, যে কালও একই কথা বলেছিল। কেমন লাগছিল তাঁর? যেমন লাগে একজন বাগানের মালি যখন দেখে তার গাছের মূলে জল নেই অথচ ফুল চাইছে সবাই। তিনি কাঁপা গলায় বলেন, “তোমরা জানো, একটা মুঠো চাল দিয়েও অনেক কিছু হতে পারে?” শিক্ষার্থীরা ঘাড় হেলায় উত্তর দেয়—“না স্যার।” তিনি বোঝাতে থাকেন—যদি প্রত্যেকের বাড়ি থেকে এক মুঠো করে চাল স্কুলে আনা হয়, তাহলে অনেকটা চাল জমে। সেটা রান্না হলে অন্তত দুই-তিনজন অভুক্ত ছাত্রকে খাওয়ানো যাবে। একটা স্কুল, একটা উঠোন, একটা উনুন আর কিছু ইচ্ছাশক্তি—এইটুকু থাকলেই তো কিছু শুরু করা যায়। কথা বলতে বলতে তিনি হঠাৎ ভাবলেন—এভাবে না বললে চলবে না। অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। পরদিন তিনি গ্রামের পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়ালেন, পকেটে খালি কাগজ, খাতা ও একটা লাল বলপেন। গিয়ে বললেন, “দিদি, শুধু এক মুঠো চাল—রোজ না, সপ্তাহে একবার দিলেই চলবে। আপনাদের হাতে পায়ে ধরছি, এটা চাল নয়, এটা কারও আগামী।” কেউ বলল, “আমাদের সংসারই চলে না”, কেউ বলল “সুধাংশুবাবু, আপনিও পাগল হয়ে গেলেন নাকি?” কেউ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। আবার কেউ কেউ বলল, “আমরা দেব। চুপিচুপি দেব। কেউ যেন না জানে।” সুধাংশুর চোখে তখন জ্বলজ্বল করছিল এক রকম স্বপ্ন—যা আসলে ক্ষুধার বিরুদ্ধে এক মাটির যুদ্ধের সূচনা।

দিন কাটতে লাগল, সুধাংশু রোজ স্কুলে গিয়ে প্রথমেই একটা পিতলের বাটিতে চাল রাখার জন্য জায়গা করলেন। নাম দিলেন—“ভাতের বীজ।” প্রথম সপ্তাহে মাত্র তিন মুঠো চাল জমেছিল। রেখা সাঁতরা, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী, এগিয়ে এলেন—বললেন, “আমার উঠোনে একটা উনুন আছে, স্যার। আপনি চাল দেন, আমি রান্না করি।” সুধাংশু হাত জোড় করে বললেন, “আপনি রান্না করুন, আমি থালা মাজি।” প্রথম দিন তারা তিনজন ছাত্রকে খাওয়ালেন। পরদিন পাঁচজন। সপ্তাহান্তে দশজন। চাল জমতে থাকল। কেউ মুঠো করে দেয়, কেউ গোপনে চটিজোড়া চাল রেখে যায় স্কুলের বারান্দায়। কেউ চালের সঙ্গে কিছু আলুও দেয়, কেউ কখনও একটি ডিম। এইভাবে ধীরে ধীরে ‘খালি পাত’ হয়ে উঠতে লাগল ‘ভরা পাত’। স্থানীয় কেউ কেউ বলল, “এ তো ভিখারির ভাত।” আবার কেউ কেউ এসে বলল, “ভিখারি হলে আমরা সবাই ভিখারি, কারণ ক্ষুধা সবাইকেই খায়।” সুধাংশু হাসলেন। তাঁর ছাত্রেরা এখন ক্লাসে মন দেয়, পেট ভরলে মনও শোনে কথা। এখন আর শুধু বই পড়ানো নয়, সুধাংশুর হাতে গড়ে উঠছে একটা সমাজ—যেখানে এক মুঠো চাল মানে শুধু খাদ্য নয়, এক অপার সহানুভূতি, যার গন্ধে উঠোন ভরে যায়, পেটও।

সপ্তাহখানেক কেটে গেছে। ধনেখালির সেই ছোট্ট স্কুলে এখন প্রতিদিন সকালবেলায় একটা নতুন দৃশ্য দেখা যায়—একটা পিতলের বাটি, তার পাশে লাল রঙের কালি দিয়ে লেখা—“ভাতের বীজ রাখো এখানে”। স্কুলে ঢোকার মুখেই রাখা আছে বাটিটা। ছোট ছোট ছাত্রীরা, যাদের নরম হাতে খড়ি ধরা হয়েছে মাত্র বছর কয়েক হলো, তারা এখন সেই হাতে তাদের মায়ের দেওয়া চাল রেখে যায়। কখনও এক মুঠো, কখনও দু’মুঠো—কখনও এমনও হয়, কারও হাতে শুধু খালি, কিন্তু চোখে অনুরোধ। সুধাংশু বেরা বলেন, “তুমি চাইলেও দিয়েছে, না পারলেও দিয়েছে। তুমি হাসি দিয়েছো।” সেইসব শিশুদের মাথায় তিনি হাত বুলিয়ে দেন। বাচ্চারা বোঝে না সমাজনীতি, বোঝে না শ্রেণি-বিভাজন, কিন্তু এই ছোট ছোট দেওয়ার অভ্যাসের মধ্য দিয়ে তারা শিখছে, কীভাবে মানুষকে ভালোবাসতে হয়। সুধাংশুর এই সহজ ও সৎ প্রচেষ্টা গ্রামের একাংশে কৌতূহলের জন্ম দেয়। কেউ কেউ মনে করে এটা এক ধরনের নাটক, কেউ ভাবেন এটি সরকারি প্রকল্প। কিন্তু বাস্তবটা হল—এটা ছিল এক নিঃশব্দ জেদ, যে জেদ ক্ষুধার চেয়ে শক্তিশালী।

একদিন বিকেলে সুধাংশু বেরা গ্রামের খোলা মাঠে একটি সভার আয়োজন করেন। সেখানে ডেকে এনেছিলেন ছাত্রদের মা-বাবাদের, পাড়ার বুড়োবুড়ি, দোকানদার, কৃষক, এমনকি ক্লাবের ছেলেদেরও। তাঁর সামনে টেবিলে রাখা একটা মাটির হাঁড়ি। তিনি বললেন, “আপনারা হয়তো জানেন না, এই হাঁড়ির ভিতরে আপনারা সবাই আছেন। এই হাঁড়ি প্রতিদিন একটা নতুন স্বপ্ন রাঁধে।” উপস্থিত সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। তিনি ব্যাখ্যা করলেন, “যখন একটা পরিবার থেকে এক মুঠো চাল আসে, তখন সেটা কিছুই মনে হয় না। কিন্তু যদি একশো পরিবার থেকে আসে, তবে সেটা হয় এক হাঁড়ি ভাত। সেই ভাতে খেতে পারে পনেরোটা খুদে প্রাণ, যাদের ঘরে চুলা জ্বলে না।” তিনি থামলেন। চারপাশে নিঃশব্দতা। তারপর এক বৃদ্ধ বলেন, “আমার বউ তো বলে, সুধাংশু বাবু পাগল হয়ে গেছেন। চাল দিয়ে পেটের আগুন নাকি নিভে!” সুধাংশু মৃদু হেসে বললেন, “হ্যাঁ কাকু, আমি একটু পাগল হয়েছি। এই পাগলামিতেই তো শিশুদের ঘুমে ভাতের স্বপ্ন আসে।” ওইদিনই প্রথমবার গ্রামের চারজন কৃষক একসঙ্গে দাঁড়িয়ে বলেন, “আমরা প্রতি সপ্তাহে ৫ কেজি করে চাল দেব।” ক্লাবের ছেলেরা বলে, “স্যার, চাল তোলার কাজে আমরা সাইকেলে করে গ্রামে ঘুরে চাল আনব।” সুধাংশু বুঝলেন, এই প্রচেষ্টা আর কেবল তাঁর একার নয়, এটি একটি ছোট্ট আন্দোলনের আকার নিচ্ছে—যার নেতৃত্ব দিচ্ছে গ্রামের মানুষ, যারা বছরের পর বছর ধরে নিজেদের ক্ষুধা লুকিয়ে রাখে।

এইসব ঘটনার কয়েকদিন পরে, এক সকালে সুধাংশু স্কুলে পৌঁছে দেখলেন বাটিটা উপচে পড়ছে চালে। পাশে পড়ে আছে একটা ছোট্ট খামে লেখা চিঠি—“স্যার, আমি চাল দিতে পারি না, কিন্তু আমি প্রতিদিন সকালবেলা এই চালগুলো বাটিতে ঢেলে রাখব। মা বারণ করেছে আমার নাম বলতে, তবুও জানবেন—আমি ক্লাস থ্রি-তে পড়ি।” সুধাংশুর চোখ ভিজে উঠল। এমনভাবে কেউ নাম না জানিয়ে সাহায্য করতে চায়—এটাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা। তিনি বুঝলেন, এই স্কুল আর শুধু জ্ঞান শেখায় না, এটি মানবিকতা শেখায়। এরপর তিনি ব্ল্যাকবোর্ডে একটা নতুন বাক্য লিখলেন—“তোমার ছোট্ট মুঠো বদলাতে পারে কারও দুপুর।” শিক্ষার্থীরা এখন প্রতিদিন অপেক্ষা করে দুপুরের সেই আহারের, না শুধু খাওয়ার জন্য, বরং তার পিছনের ভালোবাসা বোঝার জন্য। গ্রামের পাশের পাড়ার লোকজনও জানতে চায়—এই স্কুলে এমন কী হচ্ছে, যেখানে বাচ্চারা হাসে, গুনগুন করে। তারা জানে না, এখানে চালে মিশে থাকে আত্মীয়তা, মুঠোয় লুকিয়ে থাকে বন্ধুত্ব। ‘এক মুঠো চাল’ এখন আর শুধুই খাদ্য নয়, সে এক কাহিনি—গ্রামের এক নিঃশব্দ আন্দোলনের, যেখানে নেতৃত্ব দিচ্ছে ক্ষুধার্ত শিশুরা, বিধবা মায়েরা, আর একজন শিক্ষক—যিনি কালির কলম ফেলে চালের হাঁড়ির ধ্বনি শুনতে শিখেছেন।

রেখা সাঁতরার উঠোনটা আগে ছিল একটা নির্জন জায়গা—তিনটে বালতি, একটা পুরনো উনুন আর এক কোণে শুকনো কাঠের গাদা। স্বামী বছর সাতেক আগে মারা যাওয়ার পর তিনি নিজের অঙ্গনওয়াড়ির কাজেই জীবন চালাতেন, আর উঠোনে বসে মাঝে মাঝে শিশুদের খাবার বানাতেন। কিন্তু এখন সেই উঠোন যেন গ্রামের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন সকাল সাড়ে দশটায় সুধাংশু বেরা স্কুল থেকে কিছু চাল নিয়ে আসেন, সঙ্গে হয়তো দুটো আলু বা একটা কুমড়ো। রেখা বরণ করে নেন সেই উপহার, যেন সে চাল নয়—একটি বার্তা। উনুনে আগুন জ্বলে, পাতিল চড়ে, আর আশেপাশে ছুটে বেড়ায় ছেলেমেয়েরা। কেউ কুমড়োর খোসা ছাড়ায়, কেউ চামচ ধোয়, কেউ প্লেট গুনে দেখে। প্রথমে সবাই একটু লজ্জায় থাকত, ভাবত এটা ‘অভাবের খাওয়া’। কিন্তু সুধাংশু বেরা স্পষ্ট করে বলে দিয়েছিলেন—“এটা কোনো দয়া নয়, এটা উৎসব। যেখানে ভাত আর ভালোবাসা একসঙ্গে ফোটে।” রেখা রান্না করেন, গন্ধে আশেপাশের বাড়ির জানলা খুলে যায়। পাড়ার মেয়েরা রান্না দেখতে আসে, কেউ কেউ এসে সাহায্য করে। কেউ বলেন, “রেখাদি, আজ আমি মুড়ো এনেছি।” কেউ বলেন, “আজ একটু ঘি দিলাম রাঁধতে।” এমন করে একটা রান্নাঘর হয়ে উঠল এক গ্রামের আশ্রয়, যেখানে খিদে পায় না লজ্জা, বরং খিদেই হয় এক হওয়ার কারণ।

এই রান্নার প্রথম সপ্তাহেই সুধাংশু দেখেন, শিশুরা স্কুলে আসতে শুরু করেছে সময়মতো। পেট ভরলে মনোযোগ আসে—এই প্রাচীন কথাটার সত্যতা যেন চোখের সামনে মেলে ধরে শিশুগুলো। একদিন তিনি লক্ষ্য করেন, রবিকান্ত বলে ছেলেটি, যে একসময় বই ছিঁড়ে ফেলার জন্য কুখ্যাত ছিল, সে এখন প্রতিদিন প্রথমে স্কুলে আসে আর রেজিস্টারে সবার নাম লেখে। সে যেন দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছে চালের বাটির পাহারা দেওয়ার। আরেকদিকে, চিন্ময় হালদার, যে একদিন ক্লাসে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল, এখন অন্যদের নিয়ে এসে বলে—“স্যার, ওরাও খায় না, ওদেরও ভাত দিতে হবে।” এই শিশুগুলোর মধ্যে যেন এমন এক মানবিক বোধ গড়ে উঠেছে, যা বইয়ে শেখানো যায় না। দুপুরের ভাত খাওয়ার সময় কেউ আগে খায় না—সবাই অপেক্ষা করে সবাই এলে তবে খায়। কেউ বেশি পেলে বলে—“ওরটা কম হয়েছে স্যার।” সুধাংশু বুঝতে পারেন, এই এক প্লেট ভাত, এই এক হাঁড়ি তরকারি—তা কেবল খিদে মেটায় না, সমাজ গড়ার পাঠও দিয়ে যায়। তিনি একদিন লিখে রাখেন তাঁর নোটবুকে—“এই শিশুদের চোখে আমি দেখেছি স্বাধীনতা, যেখানে পেটের জন্য লড়াই হয় না, হয় ভাগ করে খাওয়ার জন্য।”

এই উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়ে মন্দিরপাড়ায়, তারপর ধীরে ধীরে অন্য গ্রামেও কথাটা ছড়িয়ে যায়। কেউ বলে, “ধনেখালিতে নাকি এক চুলায় পুরো গ্রামের ভাত রাঁধে।” কেউ সন্দেহ করে, “সরকার টাকা দিচ্ছে না তো?” কিন্তু আসল সত্যিটা জানলে অনেকেই অবাক হয়ে যায়। একদিন সকালে পাশের গ্রামের এক বৃদ্ধা এসে বলে, “আমার নাতি তো এখন নিয়ম করে স্কুল যায়। আগের মত পেট ধরে বসে থাকে না। আমিও এক মুঠো চাল দিচি স্যার।” রেখা তখন বলেন, “এই যে, দেখলেন তো—এই চালের গন্ধেই মানুষ আবার হাঁটে একসাথে।” এখন তার উঠোনে রান্না হয় শুধু ভাত নয়, রান্না হয় বিশ্বাস। বৃষ্টির দিনে কাঁদা জমে গেলে ছেলেরা নিজের হাতে মাটি শুকিয়ে রাখে উনুনের নিচে। শীতকালে আগুনের পাশে বসে গরম হয় সবাই—না শুধু শরীর, মনও। একদিন সন্ধ্যায়, যখন সবাই চলে গেছে, সুধাংশু চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন সেই উঠোনে। রেখা বললেন, “স্যার, আপনি তো স্কুলে পড়ান, কিন্তু এই রান্নাঘরে আপনি আমাদের স্বপ্ন শিখিয়ে দিলেন।” সুধাংশু হেসে বললেন, “এই স্বপ্নটা আসলে তোমার চুলার ধোঁয়া থেকে উঠে এসেছে।” সেই সন্ধ্যার আলোয় দু’জন মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল, যাদের হাতে ছিল না কোনও ধনসম্পদ, ছিল কেবল ইচ্ছে, আর এক মুঠো চাল।

উদ্যোগটা যত ছড়িয়ে পড়তে লাগল, ততই ধনেখালির গ্রাম্য সমাজের গভীর স্তরে আলোড়ন শুরু হলো। কেউ কেউ আত্মসমর্পণ করল ভালোবাসায়, আবার কেউ দাঁত চেপে বিরোধিতা করল। প্রাক্তন গ্রামপ্রধান নিমাই কোলে, যিনি দীর্ঘদিন ধরে পঞ্চায়েতে একচ্ছত্র আধিপত্য চালিয়েছেন, এই উদ্যোগের প্রসারে খানিকটা অস্বস্তি অনুভব করলেন। তাঁর চোখে ‘এক মুঠো চাল’ ছিল এক ধরনের জনমত গঠনের সূক্ষ্ম খেলা—যেখানে সুধাংশু আর রেখার মতো কিছু সাধারণ মানুষ জনপ্রিয়তা পাচ্ছে বিনা অনুমতিতে। একদিন পাড়ার মোড়ে চায়ের দোকানে বসে তিনি বললেন, “এইসব চাল-টাল দিয়ে সমাজ পালটে যাবে নাকি? চাল দিয়ে পেট ভরে, মাথা ভরে না। স্কুলে পড়াশোনা হোক, ভাতের হোটেল না হোক।” কথাগুলো দোকানে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন শুনল, কিন্তু কেউ প্রতিবাদ করল না। কিছুক্ষণ চুপচাপ চা চুমুক দিয়ে রেখা সাঁতরার প্রতিবেশী রত্না বলল, “কিন্তু কাকু, সেই ভাত তো আপনার নাতিও খায় মাঝে মাঝে। তখন তো মাথা ঝুঁকিয়ে বলে না—আমারটা বাড়িতে রেখে দাও।” নিমাই চুপ করে গেলেন। তিনি জানতেন কথাটা মিথ্যে নয়। তাঁর নাতি অনিক, যাকে সুধাংশু বিশেষভাবে খাওয়ায়, কারণ সে অনাথ, সেই সেই ভাতের ঘ্রাণেই ক্লাসে আসতে শেখে। এইসব ছোট ছোট সত্য, ছোট ছোট মানবতা ধীরে ধীরে বড় বড় দেয়াল ভাঙতে শুরু করে।

তবে বাধা শুধু নিমাই কোলের মতো রক্ষণশীল ব্যক্তিত্ব নয়—সমাজের ভেতরে থাকা এক ধরনের সংকোচও রুখে দাঁড়ায়। কেউ কেউ লজ্জা পায় চাল দিতে, ভাবে—‘মানুষ কী বলবে?’ কেউ কেউ ভাবে—‘আজ না দিলে কাল কী মুখ দেখাবো?’ এই লজ্জা আর অহংবোধের দ্বন্দ্ব কাটিয়ে ওঠার কাজটা নিয়েছিল স্কুলের ছোট ছোট ছাত্ররা। রবিকান্ত, বিকাশ আর চিন্ময়েরা চাল সংগ্রহে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বলতে লাগল, “এক মুঠো চাল দিলেই একটা বাচ্চা খেতে পায়। আর যদি না পারেন, তাহলে শুধু বলুন—আজ পারলাম না, তাও ভালোবাসা দিলাম।” এই ভাষাটা বদলাল গাঁয়ের মনোভাব। এক মুঠো চালের বদলে একরাশ সম্মান পেতে শুরু করল মানুষ। চাল দিয়ে কেউ বড়লোক বা গরিব প্রমাণ করছে না—এটা সবাই বুঝতে শুরু করল। এমনকি কালীপদ চৌধুরী, যিনি আগে বলতেন “এইসব নাটক চলবে না, চাল দিলে লোক অলস হয়ে যাবে”—তিনিও একদিন স্কুলে এসে সুধাংশুকে বললেন, “আমার পুকুরের পাড়ে কিছু কচুর লতি হয়েছে, যদি রান্না হয়, তো আমি দিয়ে দিই।” সুধাংশু তখন শুধু হাসলেন, কিছু বললেন না। এভাবে সমাজের তীক্ষ্ণ চোখের নিচে গড়ে উঠতে থাকল এক নীরব সেতু—যার পিলার ছিল শ্রদ্ধা, সহানুভূতি আর দারিদ্র্যের প্রতি সম্মান।

এই অধ্যায়ের শেষে দেখা গেল—সুধাংশুর এই চাল সংগ্রহ কেবল পেটের ভাত জোগাচ্ছে না, বদলে দিচ্ছে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি। একদিন সন্ধ্যায় স্কুলের উঠোনে একটা গোল সভা হয়। সেখানে উপস্থিত ছিল ক্লাস ফোর-এর ছাত্র থেকে ষাট বছরের বৃদ্ধ, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী থেকে কৃষক। আলোচনার মূল বিষয় ছিল—‘এখন এই ভাত রান্নার দায়িত্ব কে নেবে, যখন রেখাদির ছেলে অসুস্থ?’ সবাই একসাথে বলল, “আমরা ভাগ করে নেব।” কেউ বলল—“আমি চাল ধোবো।” কেউ বলল—“আমি চুলার কাঠ আনব।” তখনই সুধাংশু বললেন, “তাহলে এই উদ্যোগ কার?” সবাই একসঙ্গে বলল—“আমাদের!” এই ‘আমরা’ শব্দটাই ছিল সমাজের বিজয়। যে সমাজ আগে শুধুই আত্মরক্ষায় বিশ্বাস করত, সে এখন শিখছে সহযোগিতা। ‘এক মুঠো চাল’ তখন আর নিছক খাদ্যসংগ্রহ নয়—তা এক শিক্ষার পদ্ধতি, যা কাগজে লেখা নয়, হৃদয়ে গাঁথা। সেই রাতের আকাশে চাঁদ উঠেছিল একটু বেশি উজ্জ্বল হয়ে, যেন তাকেও এই উঠোনের আলোয় ডাকা হয়েছিল।

একদিন সকালবেলায় যখন শ্যামল বাবু স্কুলে প্রবেশ করছিলেন, তখন তিনি দেখতে পেলেন—গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটি বৃদ্ধা, হাতে একটি পুরোনো কাপড়ের থলে। তার চোখে ছিল কৃতজ্ঞতার জল, ঠোঁটে মৃদু হাসি। “স্যার, এই নিন, আমার পক্ষ থেকে এক মুঠো চাল,” বলেই তিনি থলেটি এগিয়ে দিলেন। শ্যামল বাবু স্তব্ধ হয়ে গেলেন। এই বৃদ্ধা, চন্দ্রবালাদেবী, ছিলেন এক বিধবা যিনি গ্রামে মানুষের বাড়িতে কাজ করে সামান্য পয়সায় বাঁচতেন। তাঁর দেওয়া চালের পরিমাণ খুব বড় ছিল না, কিন্তু তার গভীরতায় ছিল পাহাড় সমান শ্রদ্ধা। এই মুহূর্তটাই যেন “এক মুঠো চাল” আন্দোলনের প্রকৃত ব্যাখ্যা হয়ে উঠল। এর পরে ঘটতে শুরু করল একের পর এক ঘটনা—গ্রামের মোড়ের চায়ের দোকানদার, গৃহবধূ, এমনকি কয়েকজন মদ্যপ কৃষকও নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী চাল দিতে এগিয়ে এলেন। “যেটুকু পারো, সেটুকুই দাও”—এই কথাটাই হয়ে উঠল গ্রামের নতুন মন্ত্র। এক সময় সেই চাল রাখার জন্য আলাদা ঘর তৈরি করতে হল স্কুলের পাশেই। আর শ্যামল বাবুর ছোট ছেলেটা, অর্ঘ্য, প্রতিদিন স্কুল ছুটির পর চাল গোনার কাজ করত মজা করে। দেখতে দেখতে ছ’মাস পেরিয়ে গেল। সেদিন সকালে স্কুলে একটা ট্রাক এসে দাঁড়াল। ভিতরে দুটো বড় ড্রাম, একটা গ্যাস সিলিন্ডার, আর কিছু প্রাথমিক কিচেন সামগ্রী। শ্যামল বাবু নিজে দাঁড়িয়ে থেকে একটি ছোট রান্নাঘর তৈরি করালেন স্কুল মাঠের এক কোণে।

রান্নাঘরটির নাম রাখা হল “অন্নঘণ্টা”—একটি নাম যা প্রতীক হয়ে দাঁড়াল সহানুভূতির, সহমর্মিতার, এবং গ্রামীণ সংহতির। প্রথম দিন যখন রান্না শুরু হয়, তখন গ্রামের সমস্ত বাচ্চাদের চোখে মুখে এক অদ্ভুত আলো দেখা যায়। তারা বুঝতে পারল—এটা শুধুই খাওয়াদাওয়ার কথা নয়, এটা তাদের জন্য তৈরি এক নতুন আশ্রয়। স্কুলে আসা মানেই এখন শুধু পড়াশোনা নয়, দুপুরবেলায় একটি পেটপুরে খাবারও। প্রথমদিন মেনুতে ছিল খিচুড়ি আর ডিম, পরের সপ্তাহে কখনও মুগডাল-ভাত, কখনও সবজি পোলাও। রান্নার দায়িত্ব নিয়েছিলেন গ্রামেরই কয়েকজন মা ও কাকিমা, যাঁদের আগে কর্মসংস্থান বলতে কিছু ছিল না। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সুরুচি বৌদি, যিনি আগে শুধু লোকের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করতেন। এখন তিনিই রান্নাঘরের মূল সংগঠক। “স্যার, এই রান্নাঘরটা আমাদেরও সম্মান দিল,” বলেছিলেন তিনি একদিন। স্কুলের পাশের পুকুর ঘাটে এখন রোজ সকালের দৃশ্যটাই বদলে গেছে—মেয়েরা জল তুলছে, হাসছে, রান্নাঘরের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই সবকিছুই যেন একটা সামাজিক আন্দোলনের চেহারা নিচ্ছিল, যা শিক্ষার বাইরে গিয়ে সমাজের ভরকেন্দ্র হয়ে উঠছিল।

এরই মধ্যে একদিন “সামাজিক শিক্ষা ও বিকাশ পর্ষদ”-এর তরফে এক আধিকারিক এসে হাজির হন স্কুলে। তিনি “অন্নঘণ্টা”-র কর্মকাণ্ড দেখে চমৎকৃত হন। ছবি তোলা, ভিডিও করা, ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলা—সবই করেন তিনি। তারপর বলেন, “এই উদ্যোগটা শুধু একটা স্কুল নয়, একটা দৃষ্টান্ত। যদি আপনারা রাজি থাকেন, তাহলে আমরা আশেপাশের জেলাতেও এমন রান্নাঘর গড়ে তুলতে চাই।” শ্যামল বাবু মৃদু হেসে বলেন, “আমরা কিছু চাইনি, শুধু চোখে দেখেছিলাম খালি পেট আর আশা ছাড়া কিছু না। তাই চাল জোগাড় করেছিলাম। আপনারা যদি এগিয়ে আসেন, আরও অনেক বাচ্চা হয়তো হাসতে পারবে।” সেই সপ্তাহেই প্রশাসনের তরফ থেকে একটি সরকারি চিঠি আসে, যাতে বলা হয়—“এক মুঠো চাল” প্রকল্পকে জেলা-পর্যায়ে রূপান্তরিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আর তখনই শুরু হয় দ্বিতীয় ধাপ—চাল সংগ্রহের পাশাপাশি স্থানীয় স্কুল শিক্ষক ও স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে প্রশিক্ষণ শিবির, রান্নাঘর স্থাপন, খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে পরিকল্পনা। “অন্নঘণ্টা” এখন আর শুধু একটি রান্নাঘর নয়, এটি হয়ে উঠল এক আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র, যা গ্রামীণ বাংলায় ক্ষুধার বিরুদ্ধে এক চুপচাপ কিন্তু প্রবল প্রতিবাদ।

শীতের সকালে গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে ধোঁয়াটে কুয়াশা, কিন্তু সেই কুয়াশা ভেদ করে চলেছে একটানা ধোঁয়া—শুধু এবার আগুনের নয়, ইচ্ছার। স্কুলের পেছনের মাঠে যে অস্থায়ী ছাউনি তৈরি করা হয়েছিল, তার নিচে এখন বড়সড় একটি ভাতের হাঁড়ি ফুটছে। চালগুলো যারা দিয়েছে, তাদের অধিকাংশই নিজের বাসার চাল কমিয়ে রেখেছে সেই মুঠোটা। প্রতিদিন সকালে গ্রামের কিছু মা ও দিদিমণিরা এসে একসাথে রান্না করেন, অন্যদিকে ছাত্রছাত্রীরা স্কুলে পড়ে। দুপুর গড়ালেই সেই ভাত আর ডাল, কোন দিন সবজি বা কোন দিন একফোঁটা ঘি—নিয়মিত বিতরণ হচ্ছে। সেই হাঁড়ি শুধু ক্ষুধা মেটাচ্ছে না, আত্মবিশ্বাসও জোগাচ্ছে যে একসাথে কিছু করলে সমাজ পাল্টে যায়। যত দিন যাচ্ছে, এই কর্মকাণ্ডে যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন স্বেচ্ছাসেবক—কেউ কলেজ পড়ুয়া, কেউ স্কুল পাশ করা তরুণ, কেউ আবার অবসরপ্রাপ্ত বৃদ্ধ। শিক্ষক হরিপদবাবু সকালে হাঁটতে বেরিয়ে এখনো চাল সংগ্রহ করেন, তবে এখন সেটা ‘সহযোগিতা’র প্রতীক। আর তিনি প্রতিদিন সেই হাঁড়ির পাশে দাঁড়িয়ে দেখেন, কীভাবে একটুকরো মাটি, একমুঠো চাল, আর একগুচ্ছ মন—একসাথে স্বপ্ন জাগায়।

এই অধ্যায়ে হরিপদবাবুর ভিতরে এক অনন্য পরিবর্তন ঘটে। তিনি এখন আর শুধু স্কুলের শিক্ষক নন—তিনি এক আন্দোলনের প্রাণপুরুষ। প্রথমদিকে যে ভয় বা সংশয় ছিল, এখন তা নেই; বরং তাঁকে দেখে অন্য গ্রাম থেকেও মানুষ এসে জানতে চাইছে, “এই রান্নাঘর কীভাবে তৈরি হলো?” একদিন পাশের জয়নগর গ্রামের প্রধান এসে নিজের হাতেই এক বালতি চাল দিয়ে গেলেন। এই ছোট্ট সাহায্য গড়ে তুললো আরেকটি কেন্দ্র। এমনই দিনে চিত্রা—সেই ছাত্রী যার মুখে হাসি ফিরেছিল প্রথম খাওয়ার পরে—সে এসে বলল, “স্যার, আমি বড় হয়ে আপনাদের মতো রান্না করবো। আমাকে শিখিয়ে দিন।” হরিপদবাবুর চোখ চিকচিক করে উঠল। এই এক বাক্যে তিনি বুঝলেন—এই প্রকল্প শুধু খাবারের নয়, ভবিষ্যতেরও বীজ বপন করছে। সমাজের অবহেলিত অংশের শিশুরা এখন জানে, তারা শুধু গ্রহণকারী নয়, তারা একদিন দাতা হবে—জ্ঞান, ভালোবাসা, আর প্রয়োজনে একমুঠো চাল দিয়েই।

এদিকে মিডিয়ার দৃষ্টি পড়েছে এই ব্যতিক্রমী কর্মকাণ্ডে। স্থানীয় পত্রিকা “চাষার কণ্ঠ” একদিন ছবি তোলে এই কমিউনিটি কিচেনের; কয়েকদিন পর জেলা প্রশাসন থেকে এক প্রতিনিধি আসেন সব কিছু দেখতে। তাঁরা বলেন, এই মডেল যেন অন্য ব্লকে ছড়িয়ে পড়ে। প্রশাসনের সেই সাড়া এনে দেয় আশার এক নতুন দিগন্ত। শিক্ষক, ছাত্র, অভিভাবক—সবার সম্মিলিত প্রয়াস এখন চারপাশে উদাহরণ হিসেবে ধরা দিচ্ছে। হরিপদবাবু কিছুটা অবাক, কিছুটা গর্বিত, কিন্তু সবচেয়ে বেশি হয়ে উঠেছেন দায়িত্ববান। তিনি এখন বুঝেছেন—এই আন্দোলন থেমে গেলে চলবে না। চালের মুঠো যেমন একে একে জমে পাহাড় হয়, তেমনি মানুষের ইচ্ছা আর ভালোবাসাও একদিন গড়ে তোলে সমাজের নতুন কাঠামো। সেই কাঠামোয় কেউ অনাহারে থাকে না, কেউ একাকী থাকে না। এক মুঠো চাল—হ্যাঁ, এতেই জ্বলে উঠেছে সেই আঁচ যার তাপে ভবিষ্যতের স্বপ্ন ফুটছে ধীরে ধীরে।

গ্রীষ্মের দাবদাহ তখন কৃষ্ণনগরের আকাশে, কিন্তু রঞ্জনের মাথায় তখন এক অদম্য আগুন। পূর্ব বর্ধমান, নদীয়া, দক্ষিণ ২৪ পরগনার পর এবার মুর্শিদাবাদে ‘এক মুঠো চাল’ কর্মসূচির বীজ বপনের চেষ্টা চলছে। কিন্তু মুর্শিদাবাদে অবস্থা একটু আলাদা। এখানে একদিকে রাজনৈতিক প্রভাব প্রবল, আবার সমাজের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি এই রকম ক্ষুদ্র উদ্যোগকে হেয় চোখে দেখেন। রঞ্জন প্রথমবার গিয়ে ফিরে আসে খালি হাতে। পরের বার স্থানীয় এক যুবক — আশিক শেখ — তার সাথে হাত মেলায়। আশিক নিজে এক সময় দিনমজুর ছিল, পরে নিজ চেষ্টায় উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে স্থানীয় এক কোচিং সেন্টারে পড়ায়। তার বাবার মৃত্যুর পর সে নিজেই সংসারের হাল ধরে। খিদের যন্ত্রণা সে নিজে অনুভব করেছে বলে রঞ্জনের উদ্যোগে তার ভরসা জন্মে। দু’জনে মিলে গ্রামের হাটে, স্কুলে, মসজিদের বাইরে এক মুঠো চালের থলে নিয়ে দাঁড়ায়। প্রথম ক’দিন আশিককে শুনতে হয়, “চাল দিয়ে কী হবে, লুটপাটই হবে,” “লোক দেখানো কাজ,” “বড়রা তো চাল নিয়ে যাবে।” কিন্তু আশিক নরম গলায়, গরিবদের ভাষায় বোঝায় — “তোমার এক মুঠো চাল হয়তো কাল কোনো বৃদ্ধার দুপুরের ভাত হবে।” ধীরে ধীরে চাল জমতে থাকে, আর আশিক হয়ে ওঠে মুর্শিদাবাদের রঞ্জন।

এদিকে রঞ্জনের মাথায় তখন আরেক চিন্তা — এতগুলো জেলা জুড়ে চাল সংগ্রহ হচ্ছে, কিন্তু এই চালের গন্তব্য কোথায় হবে? স্থানীয় কমিউনিটি কিচেন তৈরির পাশাপাশি সে এবার একটি বৃহৎ কেন্দ্রীয় রন্ধনাগার গড়ার কথা ভাবে, যেখানে একসাথে পাঁচশো মানুষের খাবার তৈরি হতে পারে। এই প্রকল্পের জন্য প্রয়োজন জায়গা, অর্থ এবং স্বেচ্ছাসেবক। নদীয়ার এক কলেজের অধ্যাপক তার বাড়ির পেছনের ফাঁকা জমি বিনামূল্যে দিতে রাজি হন। অথচ অর্থ জোগাড় সহজ ছিল না। রঞ্জন প্রথমে কিছু পুরোনো ছাত্রকে ফোন করে — যাঁরা আজ নানা জায়গায় কাজ করছেন। সবাই মিলে এক চাঁদা গড়ে তোলেন। সেই অর্থেই শুরু হয় কেন্দ্রীয় কিচেন নির্মাণের কাজ। একদিকে স্বেচ্ছাসেবকরা বাঁশ কাটছে, অন্যদিকে কয়েকজন মাস্টারমশাই রাঁধতে শেখার প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। স্কুলের ছাত্রীরা রুটি বেলতে শিখছে, আর বৃদ্ধারা ডাল বেছে, চাল ধুচ্ছে। এই অস্থায়ী কেন্দ্র হয়ে ওঠে যেন একটি চলমান পরিবার, যেখানে বয়স, জাত, ধর্ম সব মিলেমিশে গেছে ‘খিদে’ নামক এক শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে।

এই সময় মিডিয়ার চোখ পড়ে এই উদ্যোগে। একটি বাংলা সংবাদপত্রে ‘এক মুঠো চাল’ নিয়ে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয় — “রঞ্জনবাবুর চালের আঁচলে আশার আলো।” খবরটি ভাইরাল হয়ে যায়। শহর কলকাতা থেকে শুরু করে দার্জিলিং, ঝাড়গ্রাম, মালদা — সব জায়গা থেকে লোকজন ফোন করতে শুরু করে। কেউ জানতে চায় কীভাবে তারা সাহায্য করতে পারে, কেউ আবার নিজের এলাকায় এই উদ্যোগ শুরু করতে চায়। এমন সময় রঞ্জনের কাছে ফোন আসে কলকাতার এক নামকরা রেস্তোরাঁর শেফ সৌমিক রায়ের — তিনি চান তার রেস্তোরাঁয় সপ্তাহে একদিন ‘কমিউনিটি থালি’ চালু করতে, যার লাভ পুরোটা ‘এক মুঠো চাল’-এ যাবে। রঞ্জন প্রথমে অবাক, তারপর কৃতজ্ঞ। উদ্যোগ এখন যেন কেবল গ্রাম নয়, শহরের হৃৎপিণ্ডেও সাড়া ফেলেছে। কিন্তু তার চোখে জল আসে তখনই, যখন এক ছাত্রী — নাম সীমা — তার নিজের স্কুলে দাঁড়িয়ে মাইকে ঘোষণা করে, “আমি আজ থেকে প্রতি শুক্রবার আমার টিফিনের খাবার না খেয়ে এক মুঠো চাল দেব।” সীমার সেই ঘোষণা যেন রঞ্জনের অন্তরের ভিতরকার চিৎকার — “এই পথ আমার একার নয়, এ পথ আমাদের সবার।”

কমিউনিটি কিচেনের গন্ধ তখন শুধুমাত্র চাল-ডালের নয়, স্বপ্নের, আত্মবিশ্বাসের, সহানুভূতিরও। ছ’মাসের বেশি কেটে গেছে “এক মুঠো চাল” প্রকল্প শুরু হয়েছে। এখন চারটি জেলার ছড়ানো স্কুলে সপ্তাহে অন্তত দু’দিন করে বিনামূল্যে দুপুরের খাবার দেওয়া হয়। এক একটি স্কুল যেন নিজস্ব রান্নাঘরে পরিণত হয়েছে — যেখানে শিক্ষকরা শুধু পড়ান না, বরং মানুষের হৃদয়েও আগুন জ্বালান, চুলোর উষ্ণতা দিয়ে নয়, ভালোবাসা দিয়ে। অর্পিতা এখন আর শুধু হাটতলার স্কুলের শিক্ষিকা নন, বরং অনেকের কাছে “রাইস মাদাম”, কেউ বলে “চালের দিদি”, কেউ বলে “অন্নদাত্রী”। কিন্তু অর্পিতা এসব সংজ্ঞার মধ্যে নিজেকে খুঁজে পান না। তিনি মনে মনে বলেন — “আমি তো শুধু অনাহার দেখেছিলাম, আর সহ্য করতে পারিনি।”

এই প্রকল্পের প্রভাব পড়েছে স্থানীয় প্রশাসন, মিডিয়া এবং শিক্ষামন্ত্রী পর্যন্ত। একদিন হঠাৎই এক জেলা কালেক্টর এসে হাজির হলেন বেলবাড়ি প্রাইমারিতে। খুদে ছাত্র-ছাত্রীদের রান্নাঘরে ঢুঁ মেরে তিনি স্বচক্ষে দেখলেন — একটি লাইন করে দাঁড়ানো শিশুর দল, যার চোখে ক্ষুধার আলো নয়, বরং ভরপুর তৃপ্তি। শিক্ষক অভিজিৎ তখন আলুর দমে নুন ঠিকঠাক আছে কি না তা চেখে দেখছেন, শারমিন ম্যাডাম পেঁয়াজ কাটছেন, আর অর্পিতা কড়াইয়ে ডাল নাড়ছেন। কালেক্টর চোখ মুছলেন — “এটা তো নীতির বাইরে এক আন্দোলন, যেটা প্রকৃত শিক্ষা কী হতে পারে, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে।” কিছুদিনের মধ্যেই এই প্রকল্প রাজ্যস্তরে একটি পাইলট মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পেল। অর্পিতার কাঁধে পড়ল আরও দায়িত্ব — অন্যান্য স্কুলগুলিতে গিয়ে তাদের পথ দেখানো, কিভাবে শিক্ষক, অভিভাবক ও ছাত্রদের নিয়ে একটি কিচেন গড়ে তোলা যায়।

এই অধ্যায়ের শেষটুকু যেন একটি মৌন প্রতিজ্ঞার মতো। এক শীতের সকালে অর্পিতা একটি নতুন স্কুলে গিয়ে দাঁড়ালেন — কোথাও বাঁশের বেড়া, কোথাও মাটির মেঝে, কোথাও আবার ভাঙা বেঞ্চ। কিন্তু যেখানেই যান, তিনি সঙ্গে করে নিয়ে যান একটি ঝোলা — তাতে কিছু চারা ধান, কিছু শুকনো চাল, কিছু চিঠি — যেগুলো তাঁকে লিখেছে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা। “দিদিমণি, তোমার রান্নার গন্ধ আমার মায়ের কোলে ঘুম পাড়িয়ে দেয়”, “আপু, আমি এখন আর ভয় পাই না, আমার পেটে খাবার আছে।” অর্পিতা জানেন, এই পথ হয়তো সহজ নয়, হয়তো অনেক প্রতিকূলতা আসবে, হয়তো আগামী বর্ষায় কারও চাল ভিজে যাবে, আগুন নিভে যাবে, পেট খালি থাকবে। তবু তিনি হাঁটছেন, কারণ তিনি জানেন — এক মুঠো চাল দিয়ে যেমন খিদে মেটে না, ঠিক তেমনি এক জনের স্বপ্নেই সমাজ বদলে যায় না। কিন্তু একজন শুরু করলে, একদিন সবাই হাঁটবে।

— সমাপ্ত —

1000043065.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *