ঐশী ভট্টাচার্য
অধ্যায় ১:
শহর কলকাতা, জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ। দুপুরের আলো ছাদের কার্নিশে হেলে পড়েছে, অথচ আন্বেষার ঘরের ভেতর যেন সব রঙ ফিকে হয়ে গেছে। ড্রয়িংরুমে মা’র পুরোনো পিয়ানোটা চুপচাপ দাঁড়িয়ে, দেয়ালের ধুলো জমা ফটোফ্রেমে এককালের হাসিমুখ এখন কেবল নীরব স্মৃতি। বিছানার পাশে খোলা স্যুটকেস, পাশে ছড়িয়ে পড়া পোশাক, চার্জারে লাগানো মোবাইল—সবকিছুই যেন বিদায়ের পূর্ব মুহূর্তের নিস্তব্ধ প্রস্তুতি। মা নেই, অনেকগুলো দিন কেটে গেছে, তবুও ঘরের প্রতিটি কোণে তাঁর উপস্থিতি এতটাই গাঢ় যে আন্বেষা কখনও কখনও হাঁপিয়ে ওঠে।
আন্বেষা চ্যাটার্জি, ৩৪ বছর বয়সী, পেশায় ট্র্যাভেল ব্লগার, অথচ গত ছ’মাসে কোথাও বেরোনো হয়নি। ক্লায়েন্টদের কাজ ফিরিয়ে দিয়েছে, স্পনসরদের মেইল পড়েও জবাব দেয়নি, এমনকি নিজের ইনস্টাগ্রাম পেজেও ছবি আপলোড করা বন্ধ। হঠাৎ হঠাৎ মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে যায়—মায়ের গলার আওয়াজ যেন পাশের ঘর থেকে আসছে, অথচ বাড়ি এখন ভীষণ নির্জন। এক বিকেলে পুরোনো ড্রয়ার ঘাঁটতে গিয়ে খুঁজে পায় একটি হলুদ হয়ে যাওয়া ছবি—সাদা-কালো প্রিন্ট, পাহাড়ি পেছনভূমিতে মা দাঁড়িয়ে আছেন, মাথায় লাল টিপ, গায়ে হালকা শাল, পেছনে একটা ছোট্ট গুম্ফা। পিছনে পেন দিয়ে লেখা: “Tinchuley, 1979।” আন্বেষা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে ছবিটার দিকে। “টিঞ্চুলে?” সে কোনোদিন শোনেনি এই নামটা, মা-ও কখনও বলেননি।
সেদিন সন্ধ্যেতেই সে বুক করে ফেলে—শিলিগুড়ি অবধি ট্রেন, তারপর কারে করে পাহাড় বেয়ে টিঞ্চুলে। কোনো রিসর্ট নয়, বুক করে এক পাহাড়ি হোমস্টে—”হিমজোছনা”। অপশন ছিল অনেক, কিন্তু ঠিক এই নামটাতে একটা টান অনুভব করে। বেছে নেওয়ার পিছনে কোনো যৌক্তিক কারণ ছিল না, কেবল এক ধরনের ডাকে সাড়া দেওয়া।
পরদিন সকালে বাবার কাছে খবর দিতে গিয়ে, উত্তর আসে কড়া কিন্তু নির্লিপ্ত: “যাও, যদি মনে শান্তি পাও।” বাবা-মেয়ের মধ্যে সম্পর্ক বরাবরই স্নায়ুবদ্ধ, এখন তো আরও দুরত্ব তৈরি হয়েছে মায়ের মৃত্যুর পর। মা-ই ছিলেন মাঝখানের সেতু। সেই সেতু ভেঙে পড়ার পর যেন দুজন আলাদা দ্বীপে রয়ে গিয়েছে।
রাত্রিবেলা আন্বেষা একটা ছোট নীল ডায়েরি ব্যাগে ভরে নেয়। সেই ডায়েরি যে মা তাঁকে দিয়েছিলেন কলেজে পড়ার সময়। প্রথম পাতায় মা’র হাতের লেখা—“নিজেকে খুঁজে পেতে বেরিয়ে পড়া চাই।” এ যেন কোনো বার্তা ছিল ভবিষ্যতের জন্য। আন্বেষার চোখ ভিজে আসে, কিন্তু সে নিজেকে শক্ত করে, ব্যাগে ডায়েরিটা রেখে স্যুটকেস বন্ধ করে দেয়।
ট্রেন ছাড়বে ভোর ছটায়—শিয়ালদহ থেকে। ঘুম না এসে আন্বেষা রাত তিনটের সময় উঠে পড়ে। গরম চায়ের কাপে ঠোঁট ছোঁয়ায়, আর একবার জানলার বাইরে তাকায়—শহরের আলো যেন স্থবির হয়ে গেছে, একটা দীর্ঘশ্বাসের মতো স্থিরতা। মোবাইলটা হাতে নেয়—না, কেউ মেসেজ করেনি, বাবাও নয়।
ভোরবেলায় ট্যাক্সির ভিতর বসে আন্বেষা দেখে, শহর এখনও ঘুমন্ত। পার্কস্ট্রিট পেরিয়ে যাওয়ার সময় সে জানে না, এই শহরের থেকে এই মুহূর্তে সে ঠিক কী খুঁজে নিচ্ছে—না কি কী ফেলে রেখে যাচ্ছে। শুধু জানে, আর বেশিদিন এখানে আটকে থাকলে সে হয়তো নিজেকেই হারিয়ে ফেলবে।
স্টেশনে পৌঁছে যায় সময়মতো। ট্রেনে ওঠার আগে সে স্লিং ব্যাগ থেকে ছবিটা বার করে আবার একবার দেখে। মা হেসে আছেন, চোখে এক ধরনের নির্ভীকতা, যেন কোনও বিপদের মধ্যেও শান্তি খুঁজে নিতে জানতেন। আন্বেষা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, নিজের আসনে বসে পড়ে।
ট্রেন ছাড়ে ঠিক সময়ে। কলকাতার কুয়াশা ঢাকা ভোরটাকে পেছনে ফেলে গাড়ি এগিয়ে যায় উত্তরবঙ্গের দিকে। আন্বেষা জানলার পাশে বসে দেখে, আলো ধীরে ধীরে উঠছে, ফসলের মাঠ জেগে উঠছে। গার্ডেনরিচ, বর্ধমান, মালদা—স্টেশনগুলো পিছনে পড়ে যায়, সঙ্গে সঙ্গে কেটে যেতে থাকে তার মনের গুছিয়ে রাখা একেকটা স্তর। কানে হেডফোন গুঁজে সে শুনতে থাকে রবীন্দ্রসংগীত—”জীবনের পরাজয় কোথায়…”
কোনো এক জায়গায় পৌঁছে মনে হয়, হয়তো ঠিকই করছে সে। হয়তো এই টিঞ্চুলে যাত্রা কেবল একটা ট্রিপ নয়—একটা নীরব আহ্বান, একটাই পথ যেখানে কেউ তার অপেক্ষায় ছিল অনেক বছর ধরে।
দুপুর নাগাদ ট্রেন পৌঁছায় নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন। সেখান থেকে আগে ঠিক করা ড্রাইভার “পেমা” নাম লিখে প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে। গাড়িটা ছোট, কিন্তু পরিচ্ছন্ন। ড্রাইভার, প্রায় পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের ছেলে, হেসে বলে, “দিদি, চলুন পাহাড়ে! টিঞ্চুলেতে আজ কুয়াশা বেশি।”
আন্বেষা ব্যাগ তুলে গাড়িতে বসে পড়ে। শহরের ধোঁয়াটে বাতাস ছেড়ে সে যেন এক অনুচ্চারিত নিঃশ্বাস ফেলে।
গাড়ি ছুটতে থাকে চা বাগানের ফাঁকে, পাহাড়ের আঁকাবাঁকা রাস্তায়। জানালার বাইরে তখন সবুজের নানা শেড, মাঝে মাঝে কমলা গাছের নিচে বসে থাকা বাচ্চারা, দূরে নদী যেন রূপোর সুতোর মতো। আন্বেষা নীরবে দেখে যায়, কিছু নেয় না, কেবল গ্রহণ করে।
“আপনি প্রথমবার আসছেন টিঞ্চুলেতে?”—ড্রাইভার হঠাৎ জিজ্ঞেস করে।
“হ্যাঁ,” বলে আন্বেষা।
“একটা কথা আছে এখানে… এই পাহাড়ে সময় থেমে থাকে। আপনি বুঝবেন, কয়েকদিন পর,” পেমা বলে হালকা হেসে।
আন্বেষা উত্তর দেয় না। তার মন তখন অন্যখানে—ছবিটার পেছনের সেই গুম্ফা কোথায়, কেমন ছিল মা সেই সময়ে, কী এমন ঘটেছিল যে এত বছরেও এই জায়গার কথা তিনি মুখে আনেননি?
সন্ধ্যে ছ’টা নাগাদ গাড়ি পৌঁছে যায় “হিমজোছনা” হোমস্টের সামনে। কাঠের তৈরি পুরোনো বাড়ি, রেলিংয়ে লতা গাছ, গেটে লেখা নীল রঙে—“Himjochhona Homestay – Feel the Silence”।
সামনে এসে দাঁড়ান এক বৃদ্ধা, লাল শাল জড়ানো, চোখে মমতার রেখা। “আপনি আন্বেষা তো? আপনাকে দেখতে আমার এক আত্মীয়ের কথা মনে পড়ে গেল,” বলে তিনি।
আন্বেষা ভেবে পায় না কী বলবে। ভিতরে ঢুকে সে দেখে, বসার ঘরটা কাঠের মেঝেতে কার্পেট পাতা, দেয়ালে থাঙ্গা পুরোনো ছবি আর এক কোণে একটা ছোট লাইব্রেরি।
রাতের খাবারে সিম্পল ভাত, ডাল, আলু ভাজি, আর পেপারমিন্ট চা। খাওয়া শেষ করে আন্বেষা জানলার পাশে দাঁড়িয়ে দেখে—পাহাড়ের গা বেয়ে কুয়াশা নামছে। অদূরে এক পাহাড়ের মাথায় লাল আলো জ্বলছে—হয়তো কোনো গুম্ফা।
সেই মুহূর্তে মনে পড়ে যায়, মা বলতেন, “শান্তি শব্দে নয়, নীরবতায় খুঁজে পাওয়া যায়।”
আন্বেষা বুঝতে পারে, এই যাত্রা কেবল পাহাড়ের দিকে নয়, তার নিজের ভিতরের গহন অরণ্যের দিকেও। এবং এই প্রথমবার, সে সত্যিই একা—but not lonely.
অধ্যায় ২:
ঘুম ভেঙেছিলো পাখির ডাকে, কিন্তু তা ছিল কোনো কলকাতার চড়ুই কিংবা কাকের আওয়াজ নয়—এ এক নতুন সুর, অচেনা, নরম, যেন পাহাড়ের বুকে বয়ে যাওয়া এক অনুচ্চারিত সকাল। আন্বেষা চোখ মেলে প্রথমেই জানালার দিকে তাকায়। সাদা কুয়াশার পর্দার ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে গাছের ডাল, তার ওপরে শিশিরবিন্দুতে ঝলমল করছে প্রথম আলো। হিমজোছনার কাঠের ঘর যেন কুয়াশার ভিতর এক দেহাতি রাজপ্রাসাদ, যেখান থেকে বাস্তব জগত অনেক দূরের কোনো গল্প বলে মনে হয়।
রাত্রে আসার পরে খুব বেশি কিছু দেখার সুযোগ হয়নি, তাই সকালে উঠে আন্বেষা ধীরে ধীরে উঠে বসে। চা হাতে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। সামনে যে দৃশ্য সে দেখে—তা কোনো ফটোগ্রাফে, কোনো ব্লগে, এমনকি কল্পনাতেও ধরা পড়েনি। দূরে ধোঁয়া ওঠা পাহাড়ের মাথা, মাঝখানে চা বাগানের নিখুঁত সবুজ প্যাচ, আর নিচে নদীটা যেন রূপোর ফিতে হয়ে কুয়াশার ফাঁকে ঢুকে পড়েছে গহীন অরণ্যে।
সে ডায়েরি খুলে প্রথম পাতায় বড় করে লিখে ফেলে:
“Tinchuley – প্রথম সকাল: পাহাড়ের নীরবতা শ্রুতিমধুর”
পাশে এসে দাঁড়ান পেমা দিদি—হোমস্টের মালিক। সাদা ধুতি, লাল শাল আর হাতে গরম থার্মাস। “ঘুম ভালো হয়েছে তো? এখানের সকাল একটু অন্যরকম,” বলেন তিনি।
আন্বেষা মাথা নাড়ে। “এখানে ঘড়ির সময় যেন কাজ করে না। কেবল মনে হচ্ছে, একটা অনন্ত সকাল শুরু হয়েছে।”
পেমা দিদি হেসে বলেন, “এই পাহাড়ে সময় থেমে থাকে—বহু পুরনো একটা কথা। সবাই বিশ্বাস করে না, কিন্তু কেউ কেউ ঠিক বুঝে ফেলে।”
সকালের জলখাবারে ছিল তাজা ব্রেড, অর্গানিক জাম, আর একটা মেথি-চা—দার্জিলিংয়ের টুইস্ট। আন্বেষা খেতে খেতে জানতে চায়, “এই হোমস্টেটা কতদিন হলো?”
পেমা বলেন, “প্রায় কুড়ি বছর। আমার স্বামী মারা যাওয়ার পর এই বাড়িটাকেই অন্যরকমভাবে সাজালাম। আর অনেকে আসে, কেউ ঘুরে যায়, কেউ থেকে যায় নিজের ভেতরের খোঁজে।”
এই কথাটা শুনে আন্বেষার বুকের মধ্যে কোথায় যেন কিছুটা কাঁপে। সে জানে না, সে কোনটা হতে চলেছে—যে ঘুরে চলে যাবে, না যে থেকে যাবে নিজের খোঁজে।
বিকেলের দিকে আন্বেষা রওনা দেয় পাহাড়ি পথ ধরে হাঁটতে। হোমস্টের পাশ দিয়ে একটা সরু রাস্তা নামছে, দু’পাশে কমলা গাছ আর বাঁশঝাড়। পেছনে ড্রাইভার পেমা ছেলেটি হেঁটে আসে কিছুদূর পর্যন্ত।
“ওইদিকে গেলে একজায়গায় একটা পুরোনো লাইব্রেরি আছে, একটা তিব্বতি পরিবার দেখাশোনা করে। খুব অদ্ভুত জায়গা—বইয়ের ভিতরে লোকেদের ফেলে যাওয়া জিনিস পাওয়া যায় মাঝে মাঝে,” সে বলে।
আন্বেষা কৌতূহল নিয়ে হাঁটতে থাকে। পাথরের রাস্তা কখনও চড়াই, কখনও নামা। হাঁটার সময় তার মনের মধ্যে এক অদ্ভুত শান্তি অনুভব হয়—কলকাতার ঘনবসতি, গাড়ির হর্ন, ফ্ল্যাটের ভিতর চার দেওয়ালের ক্লান্তি যেন কোথাও নেই। সে যেন নতুন একটা পৃথিবীর মুখোমুখি।
লাল গেটওয়ালা একটা পুরোনো কাঠের বাড়ি—এই লাইব্রেরি। ভেতরে ঢুকে সে দেখে, বাঁ দিকের দেওয়ালে অগণিত পুরোনো বই সাজানো, কাঠের তাকের পাশে ছোট্ট জানলা দিয়ে আলো এসে পড়ছে। বাতাসে হালকা মিশ্র গন্ধ—পুরোনো পৃষ্ঠা আর কোনো অজানা ধূপের। এক কোণে একটা লোক বসে আছে—চশমা পড়া, পাতলা গোঁফ, মাথায় টুপি।
“আমি একটু বই দেখতে পারি?” জিজ্ঞেস করে আন্বেষা।
লোকটি মাথা নাড়ে। “এখানে বেশিরভাগই পুরোনো বই, কেউ কেউ রেখে গেছে, কেউ কেউ ফেলে গেছে। আপনার ভাগ্য থাকলে কিছু পেয়ে যাবেন,” হেসে বলে সে।
আন্বেষা বই ঘাঁটতে থাকে। হঠাৎ এক পুরোনো বাংলা কবিতার বই খুলতেই তার ভিতর থেকে একটা ছোট্ট চিঠি বেরিয়ে পড়ে—হলুদ হয়ে যাওয়া কাগজে হাতের লেখা, কালি ঝাপসা, কিছুটা অক্ষর অস্পষ্ট।
সে পড়ে:
“এই পাহাড়ে আমার রোদ-ছায়ার গল্প লেখা রইলো। তুমি যদি ফিরে আসো, হয়তো ঠিক খুঁজে পাবে। সময় নয়, স্পর্শই সাক্ষী রাখে এই পাহাড়ে।”
চিঠির নিচে লেখা আছে: “—M।”
আন্বেষা কাঁপা হাতে চিঠিটা নিয়ে আবার পড়ে। ‘M’? কে? কার জন্য লেখা? এই কি সেই M যার সঙ্গে তার মা’র কোনো সম্পর্ক ছিল? কোনো সূত্র? কোনো ক্লু?
সে চিঠিটা নিয়ে বুকের কাছে ধরে রাখে। চারপাশের সব শব্দ মুছে যায় যেন। লাইব্রেরির বৃদ্ধ তখন চুপচাপ তাকিয়ে থাকে তার দিকে, চোখে এক রহস্যময় দৃষ্টি।
“চিঠিটা আপনি চিনেন?”—আন্বেষা জিজ্ঞেস করে।
লোকটি কাঁধ ঝাঁকায়। “অনেক বছর আগে কেউ রেখে গেছে। নাম জানি না, শুধু মনে আছে, লোকটা পাহাড়ে ঘুরে বেড়াত, মাঝে মাঝে এখানে এসে বই পড়ত। তারপর একদিন আর এল না।”
আন্বেষা তখনো স্থির দাঁড়িয়ে। মনে হচ্ছে, কোনো এক অতীতের দরজা হঠাৎ খোলা পড়েছে। সেই দরজার মধ্যে দিয়ে ঢুকলে হয়তো তার মায়ের অজানা এক অধ্যায় উন্মুক্ত হবে।
সন্ধের সময় সে আবার ফিরে আসে হিমজোছনায়। পেমা দিদি তখন বারান্দায় বসে উল বুনছেন।
“আপনি কি চেনেন কাউকে যার নাম শুরু হয় ‘M’ দিয়ে?”—আন্বেষা জিজ্ঞেস করে।
পেমা তাকান কিছুক্ষণ, তারপর ধীরে মাথা নাড়েন। “এখানে তো অনেকেই এসেছে, কেউ কেউ রয়ে গেছে নামহীন। নাম দিয়ে সবকিছু চেনা যায় না। মানুষ নিজেই একটা গল্প।”
রাত বাড়ে, আকাশে অসংখ্য তারা দেখা যায়—কলকাতার কৃত্রিম আলোর আড়ালে যে তারা হারিয়ে যায়, তারা এখানে যেন ফিরে এসেছে। আন্বেষা চিঠিটা বিছানায় ছড়িয়ে রাখে, ডায়েরিতে লিখে ফেলে:
“এই চিঠি আমার ভেতরের একটা দরজা খুলে দিল। কে ছিল সে? মা কি তাকে চিনতেন? আমি কি তারই খোঁজে এখানে?”
ঘুমের আগে জানলার কাচে হাত রাখে। বাইরের কুয়াশা ধীরে ধীরে ঘরের দিকে এগোচ্ছে, যেন তার মনের সব জিজ্ঞাসাকে জড়িয়ে ধরতে চাইছে।
সে জানে না এই যাত্রা তাকে কোথায় নিয়ে যাবে। কিন্তু সে অনুভব করে—এই পাহাড় কিছু জানে, এই নীরবতা অনেক কথা বলে। শুধু দরকার, সেই ভাষা বোঝার ধৈর্য।
অধ্যায় ৩:
রাতের স্বপ্নে আন্বেষা নিজেকে দেখেছিল একটি পুরনো ঘরে, জানালাবিহীন, দরজা বন্ধ, অথচ তাতে আলো আছে—একটা মৃদু সোনালি আলো, যেন স্মৃতির দীপ্তি। ঘরের ভেতর একটি চেয়ার, তাতে বসে এক মহিলা, চুল খোলা, পেছন ফিরেই আছে। আন্বেষা হাত বাড়িয়ে তাকে ডাকতে চায়, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বেরোয় না। ঘুম ভাঙে সেই নিঃশব্দ কান্নার মতো একটা অদ্ভুত অনুভূতিতে—অপরিচিত কিছু হারিয়ে ফেলার বেদনা, অথচ হারানো জিনিসটা ঠিক কী, তা বোঝা যায় না।
সকালটাও ছিলো নিঃশব্দে ঢাকা। পাহাড়ের নরম বাতাস জানলার পর্দা উড়িয়ে আনছিল হালকা চায়ের গন্ধ। পেমা দিদি তখন রান্নাঘরে ব্যস্ত, আর আন্বেষা হাতে সেই পুরনো চিঠিটা নিয়ে বারান্দায় এসে বসল। সাদা কাগজে লেখা কালো অক্ষরগুলো যেন আজ একটু বেশি পরিষ্কার, একটু বেশি জীবন্ত।
তারপর অনেকক্ষণ বসে থেকে সে নিজের মোবাইল খুলে ক্যামেরায় তুলে রাখল সেই চিঠিটা—প্রমাণ রাখার জন্য নয়, বরং যেন সেটা একধরনের সুরক্ষা কবচ। যেন হারিয়ে গেলে আবার খুঁজে পাওয়া যায় সেই অনুভব।
বেলা বাড়তেই সে বেরিয়ে পড়ে নতুন পথের খোঁজে। আজ সে যাবে এক ছোট্ট গ্রামে—লামাহাট্টা, তিনচুলের একটু ওপরে, যেখানে স্থানীয় মানুষজন নিজেদের জীবনের ছন্দে এখনও প্রকৃতির মতোই সহজ, ধীর। রাস্তা ধরে হাঁটার সময় আন্বেষা দেখে, বাঁশের জঙ্গল থেকে মাঝেমাঝেই বেরিয়ে আসে ছোট ছেলেমেয়েরা, হাতে বাঁশের ঝুড়ি, মুখে চিরকালের হাসি।
সে পথ হারায় বারবার—কিন্তু কোনো অস্বস্তি হয় না। বরং মনে হয়, প্রতিবার হারানোই যেন নতুন কিছু পাওয়ার এক সুযোগ। দূরে, পাহাড়ের গায়ে বাঁধা একটা ছোট্ট গুম্ফা দেখা যায়, তার চারপাশে প্রার্থনার চাকা ঘুরছে হাওয়ায় ভেসে। আন্বেষা ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়।
গুম্ফার কাছে পৌঁছে দেখে, একজন বৃদ্ধ সন্ন্যাসী বসে আছেন, চোখ বুজে। আশপাশে কেউ নেই। তার গলায় লাল পোড়া মালা, হাতে পুঁথির মালা ঘুরছে ধীরে ধীরে। আন্বেষা চুপচাপ গিয়ে তার পাশে বসে।
অনেকক্ষণ পরে তিনি চোখ খুলে আন্বেষার দিকে তাকালেন। তাতে কোনো প্রশ্ন নেই, শুধু একটা নির্ভরতা।
“আপনি কি এই পাহাড়ে অনেকদিন ধরে আছেন?”—আন্বেষা মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল।
“অনেক বছর। কিন্তু পাহাড়ে কত বছর থাকা যায়, সেটা মুখ্য নয়। আপনি কতটা শুনেছেন পাহাড়কে—সেটা বড় কথা।”
আন্বেষা অবাক হয়। সে বুঝতে পারে, এই বৃদ্ধ যেন তার ভিতরের প্রশ্নগুলো পড়ে ফেলছেন একে একে।
সে বলল, “আমার মায়ের কিছু অতীত আমি জানি না। একটা পুরোনো চিঠি পেয়েছি এখানে, যেটা আমার কাছে একধরনের পথনির্দেশ। কিন্তু তার মানে আমি বুঝতে পারছি না।”
সন্ন্যাসী হেসে বলেন, “সব চিঠির মানে মুখে বলা যায় না। কখনও কখনও পাহাড়ই উত্তর দেয়—আপনাকে শুধু থেমে শুনতে হবে।”
আন্বেষা তার পাশে বসে চুপ করে থাকে। বাতাসে তখন ধূপের গন্ধ, গুম্ফার চাকার শব্দ, আর দূরের পাখির ডাক মিলেমিশে এক ধ্রুপদী নিস্তব্ধতা তৈরি করেছে। তার মনে হয়, এই মুহূর্তটা যেন বহুদিন পর নিজের ভেতরের কণ্ঠস্বর শুনতে পাওয়ার মতো।
বিকেলের দিকে সে নামে লামাহাট্টা গ্রামের দিকে। পথে এক দোকানে বসে সিঙাড়া আর লেমন-গ্রাস চা খেতে খেতে সে খাতা খুলে আবার লেখে—
“এই পাহাড় কোনো শব্দে কথা বলে না, কিন্তু তার নিঃশব্দে এক অদ্ভুত ঘ্রাণ আছে—যা স্পষ্ট বলে দেয়, কোথাও কিছু লুকিয়ে আছে। হয়তো আমার খোঁজ এখানেই সঠিক।”
সন্ধ্যা নামার আগে সে হিমজোছনায় ফিরে আসে। পেমা দিদি চুপচাপ তার চেহারা দেখে বলেন, “তুমি আজ বদলে গেছ।”
আন্বেষা হেসে ফেলে। “হয়তো একটু। আজ আমার মনে হলো, আমার ভিতরের শব্দগুলো একটু কমে এসেছে। অনেকদিন পর এমন শান্তি অনুভব করলাম।”
পেমা দিদি তখন তাকে একটা ছোট বাক্স দেন। “এটা আমার মায়ের জিনিস ছিল। এক পর্যটক রেখে গেছিল বহু বছর আগে। আমি কেন জানি না, তোমার হাতে দিতে মন চাইছে।”
আন্বেষা অবাক হয়ে বাক্সটা খোলে। ভেতরে একটি ক্ষুদ্র চামড়ার নোটবুক, কিছু সাদা পাথর, আর একজোড়া পুরোনো কানের দুল। নোটবুক খুলতেই দেখল, প্রথম পাতায় ইংরেজিতে লেখা—
“For the one who seeks silence, not noise.”
নাম নেই, ঠিকানা নেই। শুধু কিছু পাতায় অদ্ভুত আঁকিবুঁকি, পাহাড়ের রেখা, একটা লেকের নকশা, আর কিছু অসমাপ্ত বাক্য—
“She waited there… near the lake… where time dissolves…”
আন্বেষার শরীরে তখন কাঁটার মতো সাড়া জাগে। কানের দুলদুটো তার মায়ের অলংকারের মতোই দেখতে। তবে নিশ্চিত নয়।
সে চুপচাপ ব্যাগে তুলে রাখে সব। জানে না ঠিক কী করবে—কিন্তু বুঝতে পারে, কোনো এক গল্প ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে।
রাতের খাওয়ার পর সে বারান্দায় বসে, মাথার উপর তারাভরা আকাশ। বাতাসে তখন একধরনের মধুর শীত, যেন আঙুলের মাথা ছুঁয়ে দেয় নরম শব্দে। তার ডায়েরিতে সে লেখে:
“আজ অনুভব করলাম, শব্দ যত না বলে, তার চেয়েও বেশি বলে নৈঃশব্দ্য। এই পাহাড়ে সেই নৈঃশব্দ্যের ঘ্রাণ আছে—যা অনুভব করলে মানুষ আর কখনও আগের মতো থাকে না।”
অধ্যায় ৪:
আন্বেষা খুব সকালে উঠে পড়ে, যেন কোনো অদৃশ্য ঘড়ি তাকে ডেকে তুলেছে। কুয়াশার চাদরে ঢাকা পাহাড় তখনও নিঃশব্দ, অথচ ভেতরে একটা সঙ্গীত যেন বয়ে চলেছে। গত রাতের সেই ছোট বাক্সের ভেতরকার নোটবুক, আঁকা রেখা, আর “where time dissolves” কথাটা আজ যেন তার গায়ে লেগে রয়েছে। সে জানে, আজ তাকে যেতে হবে কোথাও—কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নয়, বরং একটা টান, একটা ঘ্রাণ, একটা ডাক।
পেমা দিদি তাকে একটি মানচিত্র দেয়—পুরনো, ভাঁজে ভাঁজে ছিঁড়ে যাওয়া, কিন্তু তার মাঝেই একজায়গায় হাতে আঁকা একটি নীল গোল চিহ্ন। নাম লেখা নেই, কেবল এক কোণায় লেখা আছে—“Blue Mirror”। পেমা বলেন, “এই জায়গাটার কথা অনেকেই বলে, কিন্তু কেউ ঠিকঠাক রাস্তা খুঁজে পায় না। শুনেছি একঝাঁক চিল যেখানে চক্কর কাটে, সেখানেই তার দিকনির্দেশ।”
আন্বেষা ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়ে। পায়ে একজোড়া আরামদায়ক বুট, সঙ্গে জল, চকলেট, ডায়েরি, আর সেই নোটবুক। পাথরের রাস্তা ধরে সে উঠে চলে পূর্বদিকে। পথের দুপাশে আজ যেন অদ্ভুত কিছু গন্ধ—বাঁশপাতা আর জোনাকি মিশ্রিত হাওয়া। মাঝে মাঝে দূরে দেখা যায় পাহাড়ি গ্রামের ছাদ, তার ধোঁয়া, আর কোথাও একটা কুকুরের ডাক।
প্রায় তিন ঘণ্টা হাঁটার পর সে পৌঁছে যায় এক উঁচু চূড়ায়, যেখানে দাঁড়িয়ে চারপাশে শুধু নীল আর সবুজ। তখন হঠাৎ করে আকাশের মধ্যে একঝাঁক চিল চক্কর কাটে। তাদের সোনালি ডানায় সূর্য পড়ে একরকম জ্যোতির রেখা তৈরি করে। আন্বেষা সেই দিকেই এগোয়।
রাস্তা ক্রমে সরু হয়, তারপর একসময় ঝোপঝাড়ের মধ্যে ঢুকে যায়। সে নোটবুকের আঁকা রেখা দেখে বুঝতে পারে, এখন তাকে বাঁদিকে নামতে হবে। একসময় নিচে নেমেই তার সামনে খুলে যায় এক অলৌকিক দৃশ্য—দু’পাহাড়ের মাঝখানে একটি ছোট হ্রদ, তার জলের রং গাঢ় নীল, যেন কালি গুলে রাখা হয়েছে। হাওয়া একদম নেই, ফলে হ্রদের জলে প্রতিফলিত হচ্ছে সম্পূর্ণ আকাশ আর তারার মতো পাহাড়চূড়া।
আন্বেষা থেমে যায়। এতটা নিঃশব্দ সে জীবনে খুব কম পেয়েছে। এই নীল হ্রদ যেন কথা বলছে না, অথচ তার সমস্ত প্রশ্নের জবাব দিচ্ছে। সে ধীরে ধীরে হ্রদের ধারে এসে বসে, পাথরে হাত রেখে চোখ বন্ধ করে। তার মনে পড়ে মা’র সঙ্গে ছোটবেলায় দেখা স্বপ্নগুলো—রান্নাঘরে গল্প শোনা, বই পড়ে শোনানো, আর একটা অদ্ভুত ভয়, যা সে বোঝেনি—মা’র মাঝে মাঝে চুপ হয়ে যাওয়া, দীর্ঘশ্বাসে হারিয়ে যাওয়া কোনো গল্প।
হঠাৎ তার মনে পড়ে, একবার মা বলেছিলেন, “তুই জানিস না, আনু, নির্জনতাও কথা বলে।” তখন সে হেসে বলেছিল, “কী করে?” মা বলেছিলেন, “শুধু শুনতে জানতে হয়।” আজ, এত বছর পর, এই হ্রদের ধারে বসে, আন্বেষা সেই কথার মানে বোঝে।
সে নোটবুকের পাতাগুলো উলটে দেখতে থাকে। একজায়গায় সে খুঁজে পায় এক অস্পষ্ট শব্দ: “মেঘের বাঁকে দেখা সেই চোখজোড়া—ভুলিনি।” শব্দটা যেন তার মায়ের হাতের লেখা। কিন্তু সেই সঙ্গে আরও দুটি শব্দ, যা আগেও চোখে পড়েনি:
“Anaya. April. Mirror.”
আন্বেষা স্তব্ধ হয়ে যায়। আনয়া? কে সে? এপ্রিল মাসে কী ঘটেছিল? আর এই ‘মিরর’ কি এই হ্রদই?
সে উঠে দাঁড়ায়, হ্রদের জলে চোখ রাখে। নিজের প্রতিবিম্বে সে খুঁজে পায় এক অদ্ভুত ক্লান্তি, কিন্তু তার সঙ্গে একটা প্রত্যয়ের রেখাও—যা এই পাহাড়ে এসেই জন্ম নিয়েছে। তার মনে হয়, এই হ্রদে কেউ অপেক্ষা করে চলেছে বছরের পর বছর। কেউ হয়তো এখানেই বসে ছিল একদিন, তার মায়ের মতো, নাকি তার মা-ই?
পেছন থেকে হঠাৎ একটা শব্দ আসে—পাতা নড়ে ওঠে, যেন কারও পায়ের চাপ। সে ঘুরে তাকায়, কেউ নেই। কিন্তু বাতাস হঠাৎ একফোঁটা ঘ্রাণ বয়ে আনে—মা’র প্রিয় আতরের গন্ধ। তার দেহ কাঁপে। সে জানে, এটা কাকতালীয় নয়।
সে হ্রদের ধারে একটা ছোট পাথর খুঁজে পায়, তার নিচে চাপা একটা চিঠি। কাগজ নষ্ট, তবে শব্দগুলো এখনও স্পষ্ট—
“I waited by the mirror, every April, for the one who knew silence. Time stood still. I saw her eyes once—from afar—but I knew she wasn’t ready then. Maybe now she is.”
চিঠির নিচে শুধুই একটা চিহ্ন—“—M”
আন্বেষার দেহে তখন এক শীতল স্পর্শ বয়ে যায়। সে বোঝে, এই যাত্রার শুরুতে যাকে সে কেবল কৌতূহল বলে ভেবেছিল, তা এখন এক গভীর আত্মীয়তার পথ হয়ে উঠেছে। এই ‘M’ কে? কী সম্পর্ক তার মায়ের সঙ্গে? কেন এই হ্রদ?
রাত নামার আগে সে বসে হ্রদের ধারে, ডায়েরি খুলে লেখে—
“এই হ্রদ শুধু জল নয়—এ এক আয়না, যা আমার মায়ের অতীতকে প্রতিফলিত করছে। আমি জানি না শেষ কোথায়, কিন্তু এখন আমি আর একা নই। আমার সঙ্গে আছে সেই নৈঃশব্দ্য, যা কথা বলে।”
তারপর সে মাথা নিচু করে বসে থাকে অনেকক্ষণ। রাতের তারা একে একে উঠে আসে আকাশে। হ্রদের জলে তারা যেন নেমে আসে। এবং সেই জলে আন্বেষা নিজের নতুন পদচিহ্ন দেখতে পায়।
অধ্যায় ৫:
পাহাড়ি সকালের আলো যখন হিমজোছনার খোলা জানালায় ঢুকছে, আন্বেষা তখনও জেগে। ঘুম আসেনি রাতে—নীল হ্রদের সেই আয়না, সেই চিঠি, ‘M’-এর রহস্য আর মায়ের অতীত যেন এক গভীর জালের মতো জড়িয়ে গেছে তার ভাবনার মধ্যে। তার মনে হচ্ছে, একটা অদৃশ্য ছায়া তাকে অনুসরণ করছে, এবং সেই ছায়ার ভেতরে লুকিয়ে আছে বহু পুরোনো এক নামহীন অধ্যায়।
পেমা দিদি যখন কফি নিয়ে আসে, আন্বেষা তাকিয়ে থাকে হিমজোছনার ছায়াগুলোতে। দেয়ালে লাগা রোদ আর পাতার নাচন আজ অন্যরকম লাগছে—কেমন যেন একটি সংকেত লুকিয়ে আছে তার আঁচড়ে। সে পেমাকে জিজ্ঞেস করে, “তুমি কখনো শুনেছ ‘M’ নামে কারও কথা? যিনি এই পাহাড়ে থাকতেন?” পেমা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, “একটা গল্প শুনেছিলাম, খুব ছোটবেলায়। মা বলত, এক সময় এখানে এক বাঙালি মহিলা এসেছিলেন, যিনি খুব কম কথা বলতেন, কিন্তু সবাই বলত, তার চোখে নাকি একধরনের অনন্ত দুঃখ ছিল। নাম ঠিক কেউ জানত না, কিন্তু পাহাড়ি ছেলেমেয়েরা তাকে ডাকে ‘মায়া দিদি’।”
মায়া—M? আন্বেষা বুঝে যায়, তার সামনে যে ছায়ার দরজা খুলছে, তার চাবিটা বোধহয় এই মায়া নামেই গাঁথা। সে স্থির করে, আজ সে বেরোবে পাহাড়ের আরও গভীরে, সেই জায়গাগুলোর খোঁজে যেখানে মায়া হয়তো থেকেছেন। সেখানেই হয়তো তার মায়ের জীবন থেকে খসে যাওয়া পাতাগুলো খুঁজে পাবে সে।
রাস্তা ধরে সে নামে রিনচেন ওয়াংদি নামে এক বৃদ্ধের বাড়ি, যিনি পেমার কথায় একসময় এই অঞ্চলের ডাকবাক্স ও চিঠিপত্র সামলাতেন। রিনচেনের চোখে আজও ছেলেমানুষের ঝিলিক, যদিও বয়স তাকে অনেকখানি নিচু করে দিয়েছে। আন্বেষা চিঠিটার কথা বলে, আর সেই ‘M’-এর পরিচয় জানতে চায়। রিনচেন মৃদু হেসে বলে, “তুমি সেই পুরোনো মেয়েটার খোঁজ করছ? একদিন একটা চিঠি হাতে এসেছিল, ঠিকানা ছিল না, প্রাপক ছিল ‘তাকে, যে নিজেকেই হারিয়েছে’। সেই চিঠিটা কেউ নিতে আসেনি। পরে শুনলাম, সেই মহিলা—মায়া—বহুদিন হিমালয়ের ধারে এক পরিত্যক্ত কাঠের কুঁড়েতে থাকতেন। তারপর একদিন উধাও হয়ে গেলেন, যেন বাতাসের মতো।”
আন্বেষা অনুরোধ করে, সেই কুঁড়ে ঘরের পথ তাকে দেখাতে। রিনচেন একটি পুরনো খামে হাতে আঁকা মানচিত্র তুলে দেয়, তার কোণায় লেখা—“ছায়ার পাতা”।
দুপুরের ঠিক পরে সে হাঁটতে শুরু করে। পাহাড়ের সেই অংশে পৌঁছাতে হলে অনেক নিচে নামতে হয়, যেখানে সূর্যের আলোও গিয়ে পড়ে না ঠিকঠাক, আর গাছের পাতাগুলো সবুজ নয়—ম্লান ধূসর, যেন ছায়া মাখানো। হাঁটতে হাঁটতে সে টের পায়, এখানে বাতাস ঘন, আর সময় যেন স্থির।
শেষে সে পৌঁছায় এক কাঠের ঘরের সামনে। ঘরটি ভেঙে পড়েছে কিছুটা, জানালা বন্ধ, অথচ দরজাটা একটু খোলা। সে ধীরে ধীরে ভেতরে ঢোকে। ভেতরে আলো খুব কম, কিন্তু চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কিছু চিঠি, পুরনো ছবি, আর পাতার মণ্ডে বাঁধানো কিছু ডায়েরি।
আন্বেষা কাঁপা হাতে ডায়েরির প্রথম পাতায় চোখ রাখে—হাতে লেখা বাংলা ভাষায়:
“আমি নিজের ছায়ার ভেতর লুকিয়ে থাকি। পৃথিবী যখন বেশি জোরে কথা বলে, আমি পাতার শব্দে শান্তি খুঁজি।”
এই ডায়েরিগুলোর পাতায় সে খুঁজে পায় এমন সব অনুভব, যা তার নিজের সঙ্গে মিল খায়। এক জায়গায় লেখা—
“সে এসেছিল একবার। তাকিয়েছিল শুধু। মুখ বলেনি কিছু, কিন্তু আমি বুঝেছিলাম, এই চোখদুটি একদিন সব বুঝবে।”
আন্বেষা বুঝতে পারে, এই ডায়েরি তার মায়ের কথা বলছে—নাকি তাকে? সে ডায়েরির ভেতরে আরও একটি কাগজ খুঁজে পায়—ছোট, হলুদ, নরম হয়ে যাওয়া—তাতে লেখা—
“ছায়ার পাতায় যারা হাঁটে, তারা আলোয় ফিরে যেতে পারে না। আমি চাই, তুই অন্যরকম হ।”
চিঠির নিচে আবার সেই চিহ্ন—“—M”
আন্বেষা জানে না, তার চোখের জল কখন গড়িয়ে পড়ল। এই পাহাড়ে, এই ছায়ায়, এই পাতার নীচে, সে যেন নিজের আর মায়ের মাঝের পুরনো দেয়ালটাকে গলিয়ে দিতে পারছে। সে অনুভব করে, তার মা শুধু একজন মানুষ ছিলেন না—একটা অন্বেষণ, একটা অতীতের ধ্বনি, এক অসমাপ্ত গান।
সূর্য ডুবে যাওয়ার আগেই সে সেই কুঁড়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসে, কিন্তু তার সঙ্গে আজ একরাশ ছায়া ফিরে আসে—না, তা অন্ধকার নয়। বরং, এই ছায়া আলোর বিপরীতে দাঁড়ানো এক সত্যান্বেষণ।
রাতে হিমজোছনায় ফিরে এসে সে বারান্দায় বসে লেখে—
“আজ আমি ছায়ার পাতা থেকে আলোয় ফিরিনি, কিন্তু তাতে কোনও দুঃখ নেই। কারণ আমি জানি, ছায়ার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে সবচেয়ে গভীর সত্য। আমার মায়া দিদি ছিলেন একজন সাঁকো—আমার অতীত আর বর্তমানের মাঝখানে। আর আমি ধীরে ধীরে সেই সাঁকো পেরিয়ে যাচ্ছি।”
অধ্যায় ৬:
পাহাড়ের মেঘ তখন হেঁটে চলেছে উপত্যকার মাথার ওপর দিয়ে, যেন হাজারো মন খারাপ করা স্মৃতি হাওয়ার দোলায় ছায়া ফেলছে। আন্বেষা বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখে, কুয়াশার ভেতর দিয়ে রাস্তা যেন কোথাও চলে যাচ্ছে, অথচ শেষ দেখা যায় না। কাল রাতের ছায়া-পাতার ঘর, সেই ডায়েরি, সেই কাগজে লেখা ‘তুই অন্যরকম হ’—সব মিলিয়ে আজ তার মনে হচ্ছে, সে যেন আর নিজের শহরের আন্বেষা নয়। এই পাহাড়ে সে অন্য একজন হয়ে উঠছে, যার কাছে নাম আর ঠিকানা সব হারিয়ে গেছে।
সে সকালে বেরিয়ে পড়ে। পেমা দিদি তাকে বলে, “তুমি যদি সত্যিই সবটা জানতে চাও, তবে ‘চিরন্তন গলির’ খোঁজ করো। ওটা একটা পুরোনো পথ, এখন আর কেউ যায় না, কিন্তু শোনা যায়, অনেক বছর আগে সেখান দিয়ে চলত চিঠি, দুঃখ আর চুপচাপ চলে যাওয়া লোকেরা।”
আন্বেষা পায়ে হেঁটে বেরোয়। পাথরের পথ ধরে, পাহাড়ের গা বেয়ে, ঝোপের ফাঁকে ফাঁকে তাকিয়ে সে দেখে একেকটা নাম লেখা পাথর। কিন্তু সেই নামগুলো ঘোলাটে, কিছু মুছে গেছে, কিছু অদ্ভুত ভাষায় লেখা—যেমন ‘তপতী’, ‘উন্মেষ’, ‘নিমেষ’, ‘আলোয় একা’, ‘চন্দ্রশালা’। প্রতিটা শব্দ যেন একটা গল্প, অথচ অসমাপ্ত। এই পথের প্রতিটি পদক্ষেপ তাকে মনে করায়, সে কোনও বইয়ের পাতার মধ্য দিয়ে হাঁটছে, যার লেখক কেউ ছিল, কিন্তু পাঠক ছিল না।
চিরন্তন গলি আসে একসময়। সরু, একদিকে পাথরের পাহাড়, অন্যদিকে খাদ। ঝোপের ফাঁকে শুকনো পাতায় ঢাকা এক পথ, যেখানে কোনও আধুনিক ছোঁয়া নেই। আন্বেষা সেই পথে হাঁটে। প্রথমে সাহসী মনে হলেও, ধীরে ধীরে সে বুঝতে পারে—এই রাস্তা শুধুই পা ফেলবার নয়, মন দিয়ে শোনার। তার কানে ভেসে আসে চিঠির শব্দ, জীর্ণ খামে আটকে থাকা কান্না, কিংবা কখনো শিস দিয়ে ডাক পড়া অতীতের ছায়া।
একজায়গায় সে দেখতে পায় এক পুরোনো বেঞ্চ—ঝরে যাওয়া, তবু স্থির। তার পেছনে লেখা—“এখানে কেউ বসেছিল, যে একদিন চিঠি ছাড়া চলে গিয়েছিল।” আন্বেষা সেই বেঞ্চে বসে। তার মনে পড়ে নিজের জীবনের চিঠিগুলো—ছোটবেলায় বন্ধুদের লেখা নোট, নিজের মায়ের বকুনি লেখা লাইন, আর সেইসব কথা যা সে নিজেকেও কখনো লেখেনি।
সে হঠাৎ পায়ের কাছে খুঁজে পায় এক পাথরের ফাঁকে গুঁজে রাখা খাম। খাম ময়লা, কিন্তু ভেতরে কাগজ এখনো বেঁচে। খুলে পড়ে—
“আমি জানতাম, কেউ একদিন এখানে আসবে। নাম মুখস্থ না থেকেও আমরা পরস্পরকে চিনে ফেলি—চোখে, পদচিহ্নে, অথবা শ্বাসের দোলায়। আমি অপেক্ষা করব না, কিন্তু ছেড়ে যেতেও পারব না।”
কোনো নাম নেই। কেবল পেছনে লেখা—“For the seeker who walks the forgotten names.”
আন্বেষা মনে মনে বলে, “আমি-ই সে, আমি-ই সেই ‘seeker’।” তার মনে পড়ে, কবে শেষবার নিজের নাম উচ্চারণ করেছিল সে? এই পাহাড়ে কেউ তাকে ডাকে না কোনও নাম ধরে। আর তবু সে জানে, এই হারিয়ে যাওয়া নামগুলোর মধ্যে লুকিয়ে আছে মায়ের, মায়া’র, এমনকি তার নিজের অজানা কোনো অতীত।
চিরন্তন গলি একসময় মিশে যায় একটা খোলা মাঠে। মাঠের মাঝখানে এক প্রাচীন ঘন্টা—অচল, কিন্তু দণ্ডায়মান। তাতে ধরা রয়েছে ধাতব ক্ষয়, সময়ের আঁচড়, আর একটা লেখা—“এটি বাজে না, তবু তার শব্দ শুনতে পায় যে, সে ফিরে যেতে পারে না।”
আন্বেষা দাঁড়িয়ে থাকে অনেকক্ষণ। বাতাস আসে, চলে যায়, তার গায়ে লেগে থাকে কিছু নামহীন শব্দ—যেমন ‘সময়’, ‘অপেক্ষা’, ‘নীরবতা’। সে বোঝে, এই রাস্তায় হেঁটে যাওয়া মানে শুধু চেনা পথ পেরোনো নয়—এটা আত্মার একটা অন্বেষণ, যেখানে সমস্ত নাম একে একে ভুলে যেতে হয়, শুধু নিজেকে চিনে নিতে।
ফিরে এসে সে তার ডায়েরিতে লেখে—
“পুরনো নামের রাস্তায় আমি নিজের নাম খুঁজতে গিয়েছিলাম। পেলাম না, তবু নিজের আওয়াজ শুনলাম—যেটা এতদিনে চুপ ছিল। সেই আওয়াজে আছে মায়ের গান, মায়ার লেখা, আর আমার নিজের নিঃশব্দ প্রশ্ন।”
তার কলম থামে না। সে জানে, এখনও অনেক পথ বাকি। কিন্তু আজ সে আর আগের মতো একা নয়—কারণ পুরনো নামেরা তাকে আলিঙ্গন করেছে, ছায়ার মতো পেছনে দাঁড়িয়ে।
অধ্যায় ৭:
পাহাড়ে সূর্য ওঠার শব্দ নেই, শুধু আলোয় ধীরে ধীরে পাল্টে যাওয়া রং থাকে, যেমন নীলচে ছায়া গড়িয়ে পড়ে সোনালি কুয়াশায়। আন্বেষা অনেকদিন পর সকালে উঠে নিজেকে থেমে থাকতে দেখে—কোনো ব্যস্ততা নেই, না মোবাইলের টোকার শব্দ, না কোনো গন্তব্যের তাড়া। যেন জীবনের সব ছাপ মুছে ফেলেও সে একটা নতুন পাতায় পা ফেলছে, এক নিঃশব্দ শূন্যতায়। গতকালের চিরন্তন গলি, বেঞ্চে পড়ে থাকা সেই চিঠি, নামহীন শব্দে ঢাকা সব অনুভব যেন এখন তারই শরীরের ভিতরে মিশে আছে। সে জানে, আজ তাকে যেতে হবে সেই স্থানে, যেখান থেকে শূন্যতা জন্ম নেয়, যেখান থেকে নৈঃশব্দ্যের অর্থ শুরু হয়।
পেমা দিদি তাকে জানায়, “তুমি যদি সত্যিই সেই সমস্ত উত্তর খুঁজতে চাও, যা শব্দে ধরা যায় না, তবে যেতে হবে ‘তিসারি পাস’-এ। সেখানেই আছে নৈঃশব্দ্যের সাঁকো। সকলে জানে না পথটা, কারণ সেখানে গিয়ে ফিরে আসে খুব কমজনই।” আন্বেষার চোখে কোনো ভয় নেই, শুধু একরাশ বিস্ময়। নৈঃশব্দ্য তার কাছে আর অচেনা নয়, বরং যেন পুরনো কোনো বন্ধুর মতো ডাকছে তাকে—“এসো, এবার কথা হোক।”
তিসারি পাস যেতে হলে পায়ে হেঁটে পাহাড় পেরোতে হয়, মাটির সরু পথ ধরে, যেখানে একপাশে খাদ আর অন্যপাশে বিশাল পাথরের স্তম্ভ, যেগুলো হাজার বছর ধরে দাঁড়িয়ে শুধু নীরব দর্শক। আন্বেষা এক ঝোলা কাঁধে নিয়ে, মাথায় টুপি চাপিয়ে, জুতো শক্ত করে বেঁধে শুরু করে পথচলা। প্রথম কয়েক ঘণ্টা কিছুই বোঝা যায় না—শুধু ক্লান্তি, কিছু নাম না জানা পাখির ডাক, আর থেমে থেমে পায়ের শব্দ। কিন্তু যত গভীরে সে ঢোকে, আশপাশের শব্দগুলো কমতে থাকে, গাছের পাতাগুলোর কাঁপুনিও যেন থেমে যায়, এমনকি বাতাসও যেন নিঃশব্দে চলে যায় তার পাশ ঘেঁষে।
একসময় সে পৌঁছে যায় এক ফাঁকা প্রান্তরে—মাটি ফেটে চৌচির, পাহাড়ের শরীরে সাদা লবণের দাগ, চারপাশে কোনোরকম গাছপালা নেই। এ যেন এক মরুভূমি, অথচ তুষারছাওয়া। সেই শূন্যতার ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে একটি কাঠের সাঁকো—দীর্ঘ, সরু, ঝুলন্ত, নিচে কিছুই নেই, শুধু কুয়াশায় ঢাকা খাদ, আর ওপারে দেখা যায় না কিছুই—শুধু এক ধূসর রেখা, যেখানে পৃথিবীর শেষ কিনা বোঝা যায় না।
সাঁকোর মুখে একটি ফলক—ঝাপসা হিন্দি আর ইংরেজিতে লেখা:
“This is the Bridge of Silence. To cross it, you must shed your voice.”
আন্বেষা থেমে যায়। এর মানে কী? সে ভাবতে চায়, কিন্তু মাথার ভিতরে এখন কোনও প্রশ্ন উঠছে না। যেন সমস্ত ভাষা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে তার ভেতরে, শুধু এক অপূর্ব নীরবতা দখল করে বসেছে মনে। সে এগিয়ে যায়। কাঠের সাঁকোয় পা রাখার সাথে সাথে কিছু অদ্ভুত হয়—সে শুনতে পায় না নিজের পায়ের আওয়াজ, বাতাসের শিস, এমনকি নিজের নিঃশ্বাসও যেন নিঃশব্দ। পুরো পৃথিবী থেমে যায় শব্দহীন এক চাদরের নিচে। সে হাঁটে ধীরে ধীরে, পা ফেলে—চোখ দিয়ে দেখে, কিন্তু কান কিছু শোনে না। এই সাঁকো যেন এক পরীক্ষার জায়গা, যেখানে মনে হয়, তুমি যদি নিজের ভেতরের সবচেয়ে গোপন শব্দটাকেও ফেলে আসতে পারো, তবেই তুমি পেরোতে পারো ওপারে।
মাঝপথে দাঁড়িয়ে সে হঠাৎ টের পায়—পেছনের জীবনটা কতখানি শব্দে পূর্ণ ছিল। ফোনের রিংটোন, মায়ের কণ্ঠস্বর, রাস্তায় হর্ণ, ট্রেনের আওয়াজ, শহরের কোলাহল, এমনকি নিজের মনের অস্থির গুঞ্জন—সবকিছু এখন যেন অপ্রয়োজনীয় মনে হচ্ছে। সে বুঝতে পারে, এই নিঃশব্দতার মধ্যে সে প্রথমবার নিজের সঙ্গে দেখা করছে, কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই। এই সাঁকো তাকে জিজ্ঞাসা করছে, “তুমি কে? যদি নাম না থাকে, কণ্ঠ না থাকে, মুখ না থাকে, তুমি কাকে বলো নিজেকে?”
সে চোখ বন্ধ করে। মনে পড়ে যায় ছোটবেলার ছবি—মাঠে দৌড়ানো, গাছের নিচে বসে মা’র মুখে গল্প শোনা, বৃষ্টির দিনে কাঁদতে কাঁদতে স্কুল থেকে ফেরা। মনে পড়ে যায় সেই রাতে, মা হারিয়ে গেলেন—শব্দ ছাড়াই। মনে পড়ে যায়, মা’র চিঠি—যা ছিল শব্দে লেখা, অথচ ভিতরে ছিল গভীর নৈঃশব্দ্য। সে বুঝে যায়, তার এই একাকীত্ব আসলে মা’র রেখে যাওয়া উত্তর। সেই মায়া, সেই চিঠি, সেই ‘M’—সব মিলিয়ে আজ সে নিজেই একটি উত্তর হয়ে উঠছে।
সাঁকোর শেষপ্রান্তে পৌঁছে সে দেখে, সেখানে দাঁড়িয়ে একটি পাথর, তাতে লেখা—
“Those who reach here must leave one thing behind.”
আন্বেষা ভাবে, কী ফেলে যাবে সে? তার ডায়েরি? মায়ের চিঠি? নাকি নিজের নাম? কিন্তু হঠাৎ তার মনে হয়, সে ফেলে যেতে চায় সেই ‘চুপ’ শব্দটা—যা এতদিন ধরে তার ভিতরে জমে ছিল, যা সে কাউকে বলতে পারেনি, এমনকি নিজেকেও না। সে মাটিতে বসে, চোখ বন্ধ করে নিঃশব্দে বলে—“আমি তোকে ক্ষমা করেছি, মা।” তার বুকটা হালকা লাগে। এতদিন পর, সে যেন বুঝতে পারে—মা’র চলে যাওয়াটা ছিল কোনও বিদায় নয়, বরং তাকে এই পথে পাঠানোর সূচনা।
নৈঃশব্দ্যের সাঁকো পেরিয়ে সে আর যেভাবে এসেছিল, সেভাবে ফিরে যায় না। তার চোখে এখন দৃঢ়তা, পায়ে স্থিরতা, আর মনে গভীর শান্তি। পাহাড় তাকে আগেও দেখেছে, কিন্তু আজ সে যেন পাহাড়ের ভাষা বুঝতে পারছে।
হিমজোছনায় ফিরে এসে সে আর কোনও প্রশ্ন করে না। পেমা তাকে দেখে শুধু বলে, “তোমার চোখ বদলে গেছে।” সে হাসে।
সেই রাতে ডায়েরির পাতায় সে লেখে—
“আমি নৈঃশব্দ্যের সাঁকো পেরিয়ে এসেছি। শব্দ ছেড়ে, ভাষা ছেড়ে, ভয় ছেড়ে। আমার আর কিছু লাগবে না—শুধু এই নিঃশব্দতা, যা বলে না, কিন্তু সব বোঝায়।”
অধ্যায় ৮:
সকালটা কেমন যেন স্থির, পাথরের ওপর জমে থাকা বরফেও আজ আর নেই হিমশীতল হুমকি, যেন প্রতিটি কণা বলছে—“তুমি পার করে এসেছ সবচেয়ে কঠিন সাঁকো, এখন সময় অনুভবের।” আন্বেষা বসে ছিল পেমার পুরোনো কাঠের ঘরের পাশে একটা ঢালে, যেখানে ভোরবেলা সূর্য উঠে এসে আলোর চাদর বিছিয়ে দেয় পাহাড়ের বুকে। তার ডায়েরির পাতাগুলো হালকা হাওয়ায় উড়ে যায়—কিছু লিখিত, কিছু ফাঁকা। ঠিক তার মতোই, কিছু স্মৃতি আঁকা, কিছু এখনও জন্ম নেয়নি।
গতরাতের সাঁকো পেরোনোর অভিজ্ঞতা তার শরীরের প্রতিটি কোষে গেঁথে গেছে। সে ঘুমিয়েছিল না, বরং তাকিয়ে ছিল জানালার বাইরের অন্ধকারে, যেখানে পাহাড় ঘুমায় না, কেবল অপেক্ষা করে নিঃশব্দ জাগরণের। পেমা আজ কিছু বলে না, শুধু এক কাপ মাখন-চা আন silently দিয়ে যায়। আন্বেষা চুমুক দেয়, আর ভাবে—আজকের দিনটা যেন কোনও অশ্রুত সঙ্গীতের মতো, যার মধ্যে গলিয়ে আছে বরফের স্তব্ধতা, আর আগুনের আর্দ্র স্পন্দন।
সে বেরিয়ে পড়ে আজকের নতুন গন্তব্যের দিকে—যেখানে সে শুনেছে, আছে এক পুরোনো আগ্নেয়গিরির গুহা, যেটা এখন ঠান্ডায় জমে থাকা এক বরফের চোরা অরণ্য। স্থানীয়রা বলে, ওখানে এখনও মাঝে মাঝে আগুনের গন্ধ পাওয়া যায়—অদ্ভুত, কিন্তু সত্যি। ও জায়গাটার নাম—লুংদ্রা ফুং। আক্ষরিক অনুবাদে, ‘যেখানে বরফের নিচে আগুন থাকে’। আন্বেষা ভাবে, এই জায়গাটার ভেতরেই আছে তার উত্তর—কেন সে এতদিন ধরে দ্বন্দ্বে ভুগছিল, নিজের শান্তি খুঁজতে গিয়ে নিজেকে আরও হারিয়ে ফেলছিল।
পথটা মসৃণ নয়—ঝরনার পাশ দিয়ে সিঁড়ি, একপাশে বরফে জমে থাকা পাথর, আর অন্যপাশে হিম-হাওয়া কামড়ানো গাছের কঙ্কাল। আন্বেষা ধীরে ধীরে ওঠে, থামে, ফের হাঁটে। তার মনে হয়, পথটা যেন কোনও গল্পের মতো—প্রথমে অন্ধকার, তারপর আলো; প্রথমে জমে যাওয়া, তারপর গলে যাওয়া।
শেষমেশ সে পৌঁছয় লুংদ্রা ফুং-এর মুখে—এক গুহা, যেটা পাহাড়ের বুকে খোদাই করা। ভিতরে ঢুকতেই কুয়াশা জমাট হয়ে গিয়ে ঠোঁট আর চোখে বাষ্প জমতে থাকে। আশপাশে নীরবতা, তবে তা মৃত নয়—বরং শ্বাস নিচ্ছে যেন। গুহার ভেতরটা অদ্ভুতভাবে শীতল, তবু একটা উষ্ণতা আছে, যা ঠোঁটে নয়, অনুভবে ছুঁয়ে যায়। দেয়ালে আগ্নেয়গিরির পোড়া পাথরের দাগ, মেঝেতে বরফের পাতলা স্তর, আর মাঝখানে একটা গভীর কুন্ড—যেখানে গলিত বরফ জমে তৈরি হয়েছে অদ্ভুত এক পুল।
আন্বেষা সেই পুলের পাশে বসে। মাথার ভেতর শব্দ ওঠে না, বরং ছবি আসে—মায়ের মুখ, একটি পুরনো রেলস্টেশনের স্মৃতি, রাত্রির নিঃসঙ্গতা, আর নিজের আত্মার সেই টুকরোগুলো, যেগুলো এতদিন অবহেলায় রয়ে গিয়েছিল। হঠাৎই গুহার গভীর থেকে উঠে আসে একটা শব্দ—না, শব্দ নয়, যেন গন্ধ। পোড়া কাঠ, মাটি, পুরোনো বইয়ের পাতার মত। সে এগিয়ে যায় কুন্ডের এক পাশে, দেখে—সেখানে একদিকে জমে থাকা বরফ, আর অন্যদিকে ধোঁয়া উঠছে এক ক্ষীণ ফাটল থেকে।
গুহা যেন বলে, “আমার ভেতরে বরফ আছে, কিন্তু আমি আগুনকেও ভুলিনি।” আন্বেষা হঠাৎ উপলব্ধি করে—এই তো তার নিজেরও অবস্থা। বাইরে থেকে সে ঠান্ডা, সংযত, নিঃশব্দ। কিন্তু ভেতরে এখনও জ্বলছে কিছু—মায়ের অনুত্তর প্রশ্ন, জীবনের পরিত্যক্ত স্বপ্ন, নিজের অজানা শক্তি। সে হাত বাড়ায় বরফের দিকে, ছুঁয়ে দেখে—কঠিন, তবে গলনশীল। অন্যদিকে আগুনের গন্ধ, যা পাথর ফুঁড়ে বেরিয়ে আসতে চায়।
সে চোখ বন্ধ করে, নিজের সমস্ত ভয়, ক্ষোভ, শূন্যতা এই দুইয়ের মাঝে রেখে বলে—“আমি আগুনকে ভয় পাই না, আমি বরফকে ঘৃণা করি না। আমি শুধু চাই, এই দুইয়ে আমার সত্য হোক।”
সেই মুহূর্তে গুহার ছাদ থেকে কয়েকটা বরফের দানা পড়ে যায় পুলে, আর একসাথে একটু ধোঁয়া উঠতে থাকে। আন্বেষা যেন অনুভব করে—গুহা সাড়া দিয়েছে তার কথায়। এটা কোনও অলৌকিকতা নয়, বরং এমন এক মুহূর্ত, যেখানে প্রকৃতি আর আত্মা একসাথে সুর মেলায়।
সে ডায়েরি বের করে, লিখে—
“আমার ভেতরে বরফ আছে—যেটা জমেছিল ভয় থেকে। আর আছে আগুন—যেটা জ্বলছিল চুপ করে। আজ আমি সেই সঙ্গীত শুনেছি, যা এই দুই বিপরীতের মিলনে তৈরি হয়। আমি এখন জানি, আমার হৃদয় কোথায়।”
গুহা থেকে বেরিয়ে আসার পথে সে দেখে, বরফ গলে একটা সরু ধারা বয়ে গেছে পাহাড়ের নিচে। সে তাকিয়ে থাকে, যেমন করে কেউ নিজের চোখের জল দেখতে পারে অন্যের চোখে। পেমার কাছে ফিরে এসে সে কিছু বলে না। এবার তার চোখেই লেখা থাকে কথাগুলো—“আমি ফিরিনি, আমি বদলে গেছি।”
রাতে সে আগুনের পাশে বসে ডায়েরির শেষ পাতায় লেখে—
“এই পাহাড় আমাকে শিখিয়েছে, কখনও শব্দের ভেতরেও নৈঃশব্দ্য থাকে, আর নৈঃশব্দ্যের মাঝেও গান বাজে। আমি সেই গান শুনেছি আজ—বরফ ও অগ্নির সুরে, নিজের হৃদয়ের তালের সঙ্গে।”
অধ্যায় ৯:
আকাশটা আজ অদ্ভুত রকমের ধূসর—না বৃষ্টি, না রোদ। যেন আকাশ নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না, সে কাঁদবে না হাসবে। আন্বেষা দাঁড়িয়ে ছিল এক বিশাল খোলা প্রান্তরে—পাহাড় আর পাহাড়ের মাঝখানে ছড়িয়ে থাকা এক সমতল মালভূমি, যেখানে ঘাস নেই, গাছ নেই, কেবল পাথরের অদ্ভুত বিন্যাস, ছড়ানো ছিটানো যেমন খুশি। তার পায়ের নিচে শক্ত মাটি, মাথার ওপরে ঝুলে থাকা মেঘ, আর তার ভিতরে এক অনিশ্চিত মানচিত্র, যার কোনও গন্তব্য নেই। এখানে পৌঁছনোর জন্য কোনও গাইড ছিল না, কোনও দিশা চিহ্ন নয়—শুধু অনুভব।
এই জায়গাটার নাম কেউ জানে না, এমনকি পেমাও বলেছিল, “এখানে মানুষ আসে না, কারণ এখানে কিছু নেই।” কিন্তু আন্বেষার কাছে ‘কিছু নেই’ মানেই সম্ভাবনার সূচনা। গত কয়েকদিনে সে যেসব স্তর পেরিয়ে এসেছে—নৈঃশব্দ্যের সাঁকো, বরফ ও অগ্নির গান—সব মিলিয়ে সে এখন আর খুঁজছে না কোনও উত্তর, বরং সে হাঁটছে সেইসব প্রশ্নের পিছনে, যাদের জন্ম হয়েছে হৃদয়ের ভিতরে। তার ডায়েরির পাতাগুলো এবার হাওয়ায় আর উড়ছে না, যেন তারা বুঝেছে, গন্তব্য বলতে কিছুই নেই, শুধু পথ থাকে, আর পথের মধ্যে থাকে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা।
আন্বেষা হাঁটতে থাকে সেই পাথুরে সমতলে। কিছু পাথর অদ্ভুতভাবে সাজানো—একটা বৃত্তে, কোথাও তিনকোনা, কোথাও আবার সোজা লাইন ধরে। কেউ বানিয়েছে কি না, জানা যায় না। তার মনে হয়, এই পাথরগুলো একেকটা মানচিত্র, কিন্তু যেগুলো পড়ার জন্য দরকার হয় না কোনও ভাষা, দরকার হয় চোখ বুজে অনুভব করার সাহস। সে থেমে যায় একখণ্ড পাথরের পাশে, যেটা ঠিক একটা হৃদয়ের মতো দেখতে—ভাঙা, তবু পূর্ণ। পাথরটায় হাত রেখে চোখ বন্ধ করে সে শুনতে পায় নিজেরই বুকের স্পন্দন—শুধু শব্দ না, বরং ছন্দ, যেটা বলে দেয়, “তুমি বেঁচে আছো, কারণ তুমি খুঁজছো।”
সেই নির্জনতার মধ্যে হঠাৎ সে শুনতে পায় একটা মৃদু সুর—কোনও বাঁশির মতো, কোনও পাখির মতো না, যেন বাতাস নিজেই একটা সুর বাজাচ্ছে। সে এগিয়ে যায়, সুরের উৎস খুঁজতে। কয়েক কদম পরে সে দেখতে পায় একটা প্রাচীন পাথরের স্তম্ভ, তার গায়ে খোদাই—অচেনা লিপিতে লেখা কিছু, যেটা পড়া যায় না, কিন্তু ছুঁয়ে দিলে মনে হয়, কেউ বলছে—“এই পথ তোমার জন্যই ছিল।”
স্তম্ভটার পেছনে হঠাৎ খুলে যায় এক সরু গুহা, যেন পৃথিবীর বুক চিরে বেরিয়ে আসা এক গোপন করিডোর। ভিতরে ঢুকে সে দেখতে পায়—দেয়ালে দেয়ালে আঁকা আছে অসংখ্য পদচিহ্ন—ছোট, বড়, পায়ের ছাপ, হাতের ছাপ, কারও কারও নাম খোদাই করা, আবার কোথাও শুধু একটা লাইন—“আমি এখানে এসেছিলাম, কিন্তু কে ছিলাম জানতাম না।” আন্বেষা এগিয়ে যায়। প্রতিটি ছাপ তার হৃদয়কে ছুঁয়ে যায়। কারা এসেছিল এখানে? তারা কী খুঁজেছিল? কী ফেলে গিয়েছিল?
গুহার একদম শেষ মাথায়, এক মসৃণ পাথরের উপর, সে দেখে একটি বড় খালি মানচিত্র। তাতে কোনও দেশ নেই, নদী নেই, শহর নেই—শুধু রেখা, গোলক, ছায়া, আর একদিকে লেখা—“Fill this with your truth.” সে বুঝে যায়, এই মানচিত্র তার নিজের—তার ভেতরের মানচিত্র।
সে ব্যাগ থেকে ডায়েরির শেষ পাতাটা ছিঁড়ে নেয়। সেটার মাঝখানে আঁকে একটা ছোট্ট বৃত্ত—তিসারি পাস, সাঁকো। তারপাশে আঁকে একটা আগুনের প্রতীক—লুংদ্রা ফুং। আর তারপর আঁকে আজকের এই প্রান্তরের একটা রেখা—চিহ্নহীন। এরপর সে পাতাটা রাখে সেই পাথরের গায়ে, যেন বলছে, “আমি এখানে ছিলাম, আমি খুঁজেছি, আমি এখনও খুঁজি।”
ফিরে আসার পথে তার পায়ে বাধে এক ছোট পাথর। সে সেটিকে হাতে তুলে নেয়। তাতে লেখা—“তুমি হয়তো হারিয়ে যাবে, কিন্তু ভুলে যেও না, তুমিই তোমার দিশার শেষ আশ্রয়।”
পেমার কাছে ফিরে এলে সে দেখে, পেমা তাকে দেখেও কিছু বলে না। শুধু একবার মাথা নোয়ায়। আন্বেষা হাসে। এই গল্প এখন কারও বোঝানোর নয়, এই গল্প শুধু অনুভবের।
রাতে আন্বেষা আগুনের পাশে বসে ডায়েরির নতুন পাতা খুলে লেখে—
“আজ আমি পা রাখলাম এক মানচিত্রে, যেটার কোনও দেশ নেই, শুধু অনুভব আছে। আমি পথ চিনে নিচ্ছি, পাথরের ছায়া, বাতাসের ছন্দ, আর হৃদয়ের ছোঁয়া দিয়ে। আমি হয়তো পৌঁছব না কোনও গন্তব্যে, কিন্তু আমি চলতে থাকব। এই তো যাত্রা।”
অধ্যায় ১০:
ভোরের আলো পাহাড়ের গায়ে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছিল, যেন প্রকৃতিই আজ এক চূড়ান্ত পরিণতির রং তুলিতে শেষ আঁচড় দিচ্ছে। আন্বেষা বসে ছিল সেই পুরনো ঝর্ণার ধারে, যেখানে একসময় সে প্রথম শুনেছিল নিজের নিঃশব্দতার ভাষা। আজ আর তার চোখে অস্থিরতা নেই, শুধু একধরনের গভীর নির্ভারতা, যেন সমস্ত প্রশ্ন, সমস্ত দ্বিধা, সমস্ত হারিয়ে যাওয়ার ভয় অদৃশ্য হয়ে গেছে কোনও অলিখিত কবিতার মতো।
গত নয়টি দিন যেন এক-একটা জন্ম ছিল তার ভেতরের কোনও না কোনও সত্তার। সে ভেঙেছে, গড়েছে, হেঁটেছে, থেমেছে, আবার হেঁটেছে। সে আবিষ্কার করেছে এমন এক মানচিত্র, যা বইয়ের পাতায় মেলে না—যা খোঁজে হৃদয়ের ভাঁজে ভাঁজে। আর আজ, আজকের সকালটা যেন সেই মানচিত্রের শেষ বিন্দুতে দাঁড়িয়ে শেষ শ্বাস টেনে নেওয়ার মুহূর্ত।
পেমা তাকে এক কাপ গরম লবসাং চা দিয়ে চুপচাপ বসে পড়ে পাশে। কোনো কথা নেই, কোনো প্রশ্ন নেই। দীর্ঘদিনের নীরব সঙ্গী হওয়াটাও যে কী গভীর এক সম্পর্ক, আন্বেষা আজ তা বুঝতে পারছিল।
“তুমি আজ নিচে নামছ?” পেমা হঠাৎ জিজ্ঞাসা করে।
আন্বেষা মাথা নাড়ে। হ্যাঁ, আজ সে ফিরবে। তবে তার ফেরা মানে পালানো নয়, বরং পূর্ণ হয়ে ফিরে যাওয়া।
সে গুটিয়ে নেয় তার ডায়েরি, ব্যাগে রাখে সেই ছোট মানচিত্রটা—যেটা আঁকা ছিল তার অনুভব দিয়ে, এবং সেই পাথরখানি, যেখানে লেখা ছিল: “তুমিই তোমার দিশার শেষ আশ্রয়।”
পাহাড় থেকে নামার পথটা আজ তাকে আর ভয় দেখায় না। প্রতিটি মোড়, প্রতিটি ধ্বংসপ্রায় সিঁড়ি, প্রতিটি ঝর্ণার শব্দ—সব কিছু আজ তার চেনা। এগুলো এখন আর কোনো গন্তব্যের বাহক নয়, বরং সাক্ষ্য তার হাঁটার।
পথে নামার সময় সে থেমে দাঁড়ায় সেই সাঁকোটার কাছে—যেটার ওপর দিয়ে সে এক সন্ধ্যায় মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছিল। আজ সে হেঁটে যায় তা পার হয়ে, নির্ভয়ে, স্বচ্ছন্দে, যেন এক পুরোনো বন্ধু আবার দেখা করতে এসেছে।
নিচের ছোট্ট গ্রামটা ঝিমিয়ে পড়া সকালের গন্ধে মোড়া। বাচ্চারা খেলছে, এক বৃদ্ধা জানলার ধারে বসে উল বুনছে, আর আন্বেষা এগিয়ে আসে সেই চেনা রেলস্টেশনের দিকে—যেখানে এই পুরো গল্পের সূচনা হয়েছিল।
স্টেশনে পৌঁছে সে একটা পুরোনো বেঞ্চে বসে পড়ে। ট্রেন এখনও আসেনি। মাথার উপরে জীর্ণ ছাউনি, পাশে এক গাছ, যেটার নিচে একটি কুকুর ঘুমোচ্ছে। সে ব্যাগ খুলে ডায়েরির শেষ পাতাটা বের করে, লিখতে শুরু করে—
“আমার যাত্রা শেষ হয়নি, আমি শুধু থেমেছি একটু। আমি ফিরে যাচ্ছি, কিন্তু আর সেই পুরোনো আমি হয়ে নয়। আমার পদচিহ্ন যেখানে থেমে গেছে, সেখান থেকেই নতুন কারও পথ শুরু হোক। এই নীরবতা, এই পাহাড়, এই অচেনা মানুষেরা—তারা সবাই আমার গল্পের অংশ। আর আমি তাদের হৃদয়ে রেখে যাচ্ছি সেই মানচিত্র, যেটার গন্তব্য নেই, কিন্তু পথ আছে—ভীষণ সত্যিকারের পথ।”
দূর থেকে ট্রেনের বাঁশি শোনা যায়। সে উঠে দাঁড়ায়, ব্যাগ কাঁধে তোলে, শেষবারের মতো চারপাশটা দেখে। রেললাইনের ওপার থেকে সূর্যের আলো ছায়া ফেলে তার মুখে। আন্বেষা এগিয়ে যায় ট্রেনের দিকে।
পদচিহ্ন শেষ হয় ঠিক এখানেই, কিন্তু সেই পদচিহ্নই একদিন অন্য কোনও একা পথিকের জন্য হয়ে উঠবে দিশা।
সমাপ্ত




