Posted in

আলোকছায়া: অভিশপ্ত ইতিহাস

Spread the love

অভিমন্যু হেমব্রম


কুয়াশায় মোড়া ভোরবেলা। ট্রেন থেকে নামতেই ঝাড়গ্রাম স্টেশনের নির্জনতা অভিরূপকে চমকে দিল। সে চোখ মেলে তাকাল চারদিকে — স্টেশনের বাইরে একটা পুরনো চা দোকান, দু’একটা হ্যান্ডরিকশা, আর দূরে দেখা যাচ্ছে একগুচ্ছ শাল গাছের সারি, যেন পাহারাদারের মতো দাঁড়িয়ে আছে।

“স্যার, আমি ভবতোষ। কলকাতা থেকে ফোনে কথা হয়েছিল,” এক মাঝবয়সী লোক এগিয়ে এসে বলল। মুখে হালকা ধরণের গোঁফ, কাঁধে একটা মাফলার, হাতে জং ধরা অ্যাম্বাসাডর গাড়ির চাবি।

“ওহ, হ্যাঁ! ধন্যবাদ আপনি আসার জন্য,” অভিরূপ ব্যাগটা হাতে তুলে নিয়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।

কলকাতার ইন্ডিয়ান হেরিটেজ রিসার্চ ইনস্টিটিউটে কর্মরত প্রত্নতাত্ত্বিক অভিরূপ সেন, ৩২ বছর বয়স, জঙ্গলের ইতিহাস আর লোককথা নিয়ে কাজ করে। ঝাড়গ্রাম আসার উদ্দেশ্য — এক প্রাচীন লোকগাথা ও মানচিত্রে উল্লিখিত “জড়জঙ্গল দেবস্থান” নামে একটি রহস্যময় মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে বের করা।

পেছনের সিটে বসে সে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। শহর থেকে দূরে রাস্তাগুলো ধীরে ধীরে আরও ফাঁকা হতে লাগল, আর বনভূমির ঘন ছায়া গাড়িকে ঢেকে ফেলল।

“এই দিকটা এখনো কতোটা নির্জন,” বলল অভিরূপ। “বেশির ভাগ জায়গা তো পর্যটনে ভরে গেছে।”

ভবতোষ কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, “এই জায়গাটা মানুষ এড়িয়ে চলে, বাবু। জড়জঙ্গল… সে তো অভিশপ্ত জমি।”

সঙ্গে থাকা স্থানীয় ইতিহাসবিদ রুদ্রাংশু মুখার্জি গম্ভীর গলায় বললেন, “এই জায়গার নাম শুনলেই বয়স্ক লোকেরা পিছিয়ে যায়। আমি যে স্কুলে পড়াতাম, সেখানেও কিছু ছাত্র ছিল যারা বলত, তাদের ঠাকুরদা নাকি বলতেন — ‘ওখানে ছায়া নামে। যে ঢোকে, আর ফেরে না।’”

অভিরূপ হালকা হাসল। “লোককাহিনি যতই রহস্যময় হোক, তার পেছনে যুক্তি থাকে। মাটি সব মনে রাখে।”

গাড়ি থামল একটা ছোট্ট গ্রামে — নাম পথারকুমি। এখানেই থাকবে তারা, দু’দিন ধরে গবেষণা চালানোর জন্য।

পথারকুমি গ্রামের শেষে একটা পুরনো কুঁড়েঘরে তাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। গাইড হিসেবে এসেছে বিরসা হাঁসদা, বছর কুড়ির এক সাঁওতাল যুবক। বেঁটে চেহারা, ছিমছাম মুখে কৌতূহল ও সতর্কতা একসঙ্গে।

“আমাদের কাল ভোরে বেরোতে হবে,” বলল বিরসা। “জঙ্গলের ভেতরে একটা শুকনো নদীর ধারে ওই জায়গা আছে।”

“তুমি আগে গেছো?” জিজ্ঞেস করল অভিরূপ।

বিরসা মাথা নাড়ল। “না। আমরা ওইদিকে যাই না। আমার ঠাকুর্দা বলতেন, ‘ওখানে ছায়ামানুষ থাকে’। যারা গেল, তারা আর ফিরে আসেনি।”

“তোমার কি মনে হয়, ওটা সত্যি?” রুদ্রাংশু হাসতে হাসতে প্রশ্ন করল।

বিরসা কাঁধ ঝাঁকাল। “সত্যি-অসত্যি আমি জানি না। কিন্তু ছোটবেলা থেকে দেখেছি, ওই দিকের পাখিরাও নাকি গান গায় না।”

বাতাসটা একটু ভারি লাগছিল। চারপাশে রাতের ঝিঁঝিঁ ডাক, দূরে সোঁ সোঁ করে বয়ে চলা হাওয়া, আর আগুনের পাশে বসে থাকা গ্রামের দুই বৃদ্ধ — যাদের চোখে ছিল অতীতের ধ্বংসাবশেষ।

একজন ফিসফিস করে বলল, “আগে ওইখানে রাজা থাকত। তিনি এক তান্ত্রিককে মেরে ফেলেছিলেন। সেই তান্ত্রিক আজও ওখানে ছায়া হয়ে ঘুরে বেড়ায়।”

পরদিন ভোরে তারা বেরিয়ে পড়ল। অভিরূপ, রুদ্রাংশু, বিরসা ও ভবতোষ — চারজনের দল। তাদের সঙ্গে ছিল ক্যামেরা, ম্যাপ, ফিল্ড নোটবুক।

জঙ্গল ক্রমশ ঘন হতে থাকল। সূর্যের আলো গাছের পাতা ভেদ করে নিচে পড়ছে, কিন্তু যেন ঠিক স্পর্শ করছে না।

বিরসা ফিসফিস করে বলল, “এই জায়গাটা পেরোলেই ওই নদী… আর তার ধারে আছে শিবমন্দির।”

কিছুক্ষণ হাঁটার পর সামনে দেখা গেল একটি শিবলিঙ্গ — প্রায় মাটির সঙ্গে এক হয়ে গেছে। তার পাশেই, মাটিতে চাপা পড়া পাথরের সিঁড়ি। এমনভাবে তৈরি, যেন মন্দিরটা একসময় ছিল ভূগর্ভে।

অভিরূপ হাঁটু গেড়ে বসে দেখতে লাগল পাথরের খোদাই: মানুষের মুখ, সূর্য, একটা ত্রিশূল — কিন্তু তার নিচে খোদাই করা অদ্ভুত কিছু ছায়ার মতো চিহ্ন। যেন কেউ বা কিছু উঠে আসছে মাটির ভেতর থেকে।

হঠাৎ একটা ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপটা এল, আর সঙ্গে সঙ্গেই পাখির ডাক থেমে গেল।

“কিছু একটা আছে,” রুদ্রাংশু কাঁপা গলায় বলল।

“এটা অজানা কিছু নয়,” অভিরূপ গম্ভীর কণ্ঠে বলল। “এই চিহ্নগুলো একরকম তান্ত্রিক চক্র। খুব সম্ভবত এই জায়গা এক সময় শ্মশানতন্ত্রে ব্যবহৃত হতো।”

ভবতোষ হঠাৎ হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল। তার চোখে ভয়।

“কেউ ছিল… আমার পেছনে নিঃশব্দে হাঁটছিল!”

“ভবতোষবাবু, ওসব কল্পনা,” অভিরূপ বলল, কিন্তু তার কণ্ঠেও একটা চাপা অস্বস্তি ফুটে উঠল।

সন্ধ্যায় তারা ফিরে এলো গ্রামের কুঁড়েঘরে। সবাই চুপচাপ। বিরসা রাতের খাবার আনল — খিচুড়ি আর পোড়া আলু। বাইরে ঝিঁঝিঁ ডাক আরও জোরালো।

হঠাৎ একটা বয়স্ক মহিলা দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন। মুখটা অদ্ভুতভাবে অন্ধকারে ঢাকা।

“বেরিয়েছিলে?” তার গলায় ছিল না রাগ, ছিল কেবল শোক।

“হ্যাঁ মা, আমরা ওই মন্দিরটা দেখতে গিয়েছিলাম,” বলল বিরসা।

“ছায়া তোমাদের দেখে ফেলেছে,” মহিলাটি বললেন।

“কী বলেন আপনি?” রুদ্রাংশু অবাক।

“ছায়া নেমেছে। এখন কেউ আর বাঁচবে না যদি না রক্ত ফেরত না দেওয়া হয়,” বলে তিনি ঘুরে দাঁড়ালেন।

অভিরূপ দরজার দিকে এগিয়ে গেল, কিন্তু মহিলাটি কোথায় যেন মিলিয়ে গেছেন।

বাতাস থেমে গেছে। ঘরের ভেতরে শীত অনুভব হচ্ছে, জুন মাসের মধ্যেও।

ঘুমের মধ্যে অভিরূপ দেখতে পেল — সে এক অন্ধকার গুহার মধ্যে, তার চারদিকে ছায়া ঘুরছে। আর ছায়ার মুখে ছিল মানুষের মতোন চোখ। যেন চেনে অভিরূপকে।

রাত পেরিয়ে সকাল নামল, কিন্তু ঘরজুড়ে যেন কোনো উষ্ণতা এল না। কুয়াশা আর ঠান্ডা বাতাসে ঘরের ভেতরে একটা চাপা অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়েছিল।

অভিরূপ ঘুম ভাঙতেই দেখল, ঘরটা প্রায় ফাঁকা।

“রুদ্রাংশু?” সে ডাক দিল।

সাড়া নেই। বিছানার পাশে একটা থলে পড়ে আছে — ভবতোষের।

ঘরের বাইরে বেরিয়েই সে বিরসাকে দেখতে পেল, অস্থিরভাবে গ্রামের লোকদের সঙ্গে কথা বলছে।

“কি হয়েছে?” অভিরূপ জিজ্ঞেস করতেই বিরসা বলল, “ভবতোষবাবু নেই। ঘর থেকে বেরিয়ে গেছেন ভোররাতে… এখনো ফেরেননি।”

“কোথায় গেছেন কেউ জানে না?” রুদ্রাংশুও এসে দাঁড়াল পাশ থেকে।

একজন বয়স্ক লোক বলল, “কাল রাতে ওর নাম ধরে কে যেন ডেকেছিল। আমরাও শুনেছি। তবে ও যদি ছায়ার ডাকে সাড়া দিয়ে থাকে… তাহলে সে ফেরে না।”

রুদ্রাংশুর মুখে রং নেই। “তুমি তো বলেছিলে, লোককথা শুধু গাঁজাফুঁক। এখন?”

অভিরূপ ঠান্ডা গলায় বলল, “গল্প আর বাস্তবের সীমারেখা কোথায়, তা বোঝার সময় এসেছে।”

তারা তিনজন — অভিরূপ, রুদ্রাংশু, বিরসা — আবার জঙ্গলের দিকে গেল ভবতোষকে খুঁজতে। একই রাস্তায়, যেখানে আগের দিন তারা গিয়েছিল। এইবার জঙ্গল আরও নিঃশব্দ। যেন পাখিরাও পালিয়ে গেছে।

“তুমি কিছু শুনছো?” রুদ্রাংশু হঠাৎ ফিসফিস করে বলল।

“না,” বলল অভিরূপ। “তুমি?”

“হ্যাঁ। কারো হাঁটার শব্দ… কিন্তু আমাদের নয়।”

তারা থেমে গেল। চারপাশের শাল গাছের মাঝে এক মুহূর্তে একটা ছায়া নড়ে উঠল।

“ওই যে…!” চেঁচিয়ে উঠল বিরসা। কিন্তু কিছু নেই।

শুধু মাটিতে একটা হালকা পায়ের ছাপ — খালি পা, কিন্তু সাইজটা অস্বাভাবিক বড়।

মন্দিরের পাশে এক পুরনো পোড়া কুয়ার ধারে তারা খুঁজে পেল একটা কাঠের বাক্স। ভেতরে কয়েকটা ছেঁড়া পৃষ্ঠা, অক্ষর প্রায় মুছে গেছে।

অভিরূপ সাবধানে পৃষ্ঠা গুলো হাতে নিল।

“এটা সংস্কৃত নয়, প্রাচীন কোদা লিপি,” বলল রুদ্রাংশু। “আমি কিছুটা পড়তে পারি। এখানে বলা আছে — ‘অরুণতপ্ত চক্র’ নামক এক তান্ত্রিক সংঘের কথা, যারা ‘আত্মচ্ছায়া’ নামে এক সাধনার মাধ্যমে মরণজয়ী হওয়ার চেষ্টা করেছিল।”

“তাহলে তারা আত্মাকে দেহ থেকে ছায়ার রূপে বিচ্ছিন্ন করত?” জিজ্ঞেস করল অভিরূপ।

“সম্ভব। আর সেই ছায়াই আজও বেঁচে আছে।”

বিরসার এক আত্মীয় জানাল, এমন পুরনো কাহিনির মূল হদিস হয়ত পাওয়া যেতে পারে ঝাড়গ্রামের পুরনো রাজবাড়িতে — সেখানে এখনো বাস করেন শেষ জীবিত রাজপরিবারের উত্তরসূরী, রাজমাতা শৈলজাদেবী।

তারা বিকেলবেলা রওনা হল রাজবাড়ির দিকে।

রাজবাড়ির গেটটা ধ্বস্ত, কিন্তু ভিতরে এখনো এক বিরাট প্রাচীন স্থাপত্যের গাম্ভীর্য রয়েছে। ঘর থেকে এক বৃদ্ধা বেরিয়ে এলেন, লাঠিতে ভর দিয়ে।

“তোমরা… ওই ছায়ার পেছনে গেছ?” তিনি সরাসরি প্রশ্ন করলেন।

অভিরূপ মাথা নাড়ল। “আমি জানি ও অভিশাপ নয়, বরং ইতিহাস।”

“তাহলে শোনো,” বললেন রাজমাতা।

“আমার পূর্বপুরুষ, রাজা শীতলদেব, এক তান্ত্রিক সংঘের সঙ্গে চুক্তি ভেঙে তাদের নেতা অগ্নিভ যতিনকে জীবন্ত কবর দিয়েছিলেন জড়জঙ্গলের মন্দিরে। তার আগেই যতিন ছায়া রূপে নিজেকে অমর করে ফেলেছিল। মৃত্যুর আগে বলেছিল, ‘যে রক্ত বিশ্বাসঘাতকতা করে, তার বংশধর একদিন ফিরে আসবে — আর আমি তখন তার ছায়া হবো।’”

রুদ্রাংশু ফিসফিস করে বলল, “মানে, কেউ ওর রক্তবংশ থেকে এসেই আবার ফিরে এসেছে?”

রাজমাতা একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন অভিরূপের দিকে।

“তোমার দাদা ছিলেন রাজশ্রী সেন। সে একজন প্রত্নতাত্ত্বিকও ছিল। অদৃশ্য হয়েছিল এই জঙ্গলের মধ্যেই… ১৯৮৭ সালে।”

অভিরূপ যেন জমে গেল। তারা ফিরে এলো গ্রামে। রাত গভীর।

বিছানায় শুয়ে থাকা অবস্থায় অভিরূপের কানে এলো এক গলা: “অভি…রূপ… আমি এখানেই আছি… আমার ছায়া তোমার ভেতরে ঢুকছে…”

সে উঠে বসে দেখল জানালার পাশে একটা ছায়া। নিঃশব্দ। মানুষের মত অবয়ব, কিন্তু মুখ নেই। শুধু দুটো চোখ — গভীর, লালচে। ছায়া মাটি ছুঁয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে।

তারপর একটা মুহূর্তে সেটা মিলিয়ে গেল। অভিরূপ নিঃশ্বাস ফেলল। কিন্তু দরজার নিচ দিয়ে একটা কালো ধোঁয়ার রেখা ঢুকে পড়ল ঘরে।

পরদিন সকালে তারা সিদ্ধান্ত নিল — জড়জঙ্গলের গহীনে থাকা মূল গর্ভগৃহে ঢুকবে, যেখানে যতিন তান্ত্রিককে চাপা দেওয়া হয়েছিল। সেই ধ্বংসস্তূপেই লুকিয়ে আছে ইতিহাসের মূল।

“আমার রক্ত যদি উত্তরাধিকার হয়,” বলল অভিরূপ, “তাহলে আমাকেই তাকে মুক্তি দিতে হবে… অথবা শেষ করতে হবে।”

***

ঝাড়গ্রামের অরণ্যে রাতের পরদিন সকালে সূর্য উঠলেও তার আলো যেন ঢুকতেই চাইছিল না। গ্রামের কুয়াশাভেজা বাতাসে এক ধরনের অদৃশ্য গুমোট ভাব ছড়িয়ে ছিল। অভিরূপের চোখে ঘুম নেই। ছায়ামানুষের উপস্থিতি এখন কল্পনার অতীত নয়—সে নিজেই সেই অতীতের রক্তধারা বহন করছে।

রুদ্রাংশু হালকা ব্যাগ গুছিয়ে আনল — ভিতরে টর্চ, ক্যামেরা, দড়ি, নোটবুক, আর কিছু শুকনো খাবার। বিরসা চুপচাপ বসে ছিল ঘরের কোণে।

“তুমি চলো তো?” রুদ্রাংশু জিজ্ঞেস করল।

বিরসা মাথা নাড়ল না, শুধু বলল, “আমি জানি এই পথ একমুখী। ওখান থেকে সব ফিরে আসে না। কিন্তু আমি যাব। এই অভিশাপ শুধু তোমাদের নয়। আমাদের পূর্বপুরুষও ভোগ করেছে।”

অভিরূপ তাকাল। “তুমি কিছু জানো, তাই তো?”

বিরসা উঠে দাঁড়াল। “আমার ঠাকুরদা ছিলেন সেই তান্ত্রিকদের একজনের শিষ্য। ছোটবেলায় আমি একবার ওই মন্দিরে গিয়ে দেখতে পেয়েছিলাম গুহার ফাটলের ভেতর থেকে উঁকি মারছে এক জোড়া চোখ। তারপর থেকে আমি রাত জাগি। নিদ্রাহীন।”

তিনজন একসাথে রওনা হল। গন্তব্য — জড়জঙ্গল মন্দিরের গর্ভগৃহ।

মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ থেকে আরও প্রায় এক কিলোমিটার গভীরে জঙ্গলের মধ্যে ছিল সেই গর্ভগৃহ — বহু আগে ভূমিকম্প বা যজ্ঞের বিস্ফোরণে চাপা পড়েছিল। আজও কেউ ওদিক যায় না। কিন্তু প্রাচীন মানচিত্র আর পাণ্ডুলিপির ছেঁড়া অংশ মিলিয়ে অভিরূপ ঠিক চিনে নিল পথ।

একটি প্রাকৃতিক গুহার মুখ দেখা গেল — পাথরে ঢাকা, ঝোপঝাড়ে ঘেরা। বাতাস হঠাৎ কেমন হিম হয়ে এল।

রুদ্রাংশু নিচু গলায় বলল, “এটা প্রকৃতি নয়। কিছু ঠান্ডা এখানে গেঁথে আছে। যেন আত্মা থেমে আছে সময়ের বাইরে।”

বিরসা গাছের গোড়া থেকে সিঁড়ির মত একটা প্রাকৃতিক পাথুরে পথ দেখিয়ে দিল।

“এই পথ ধরে নামলেই গর্ভগৃহ,” সে বলল।

তারা নামতে লাগল — ধীরে ধীরে, গভীর অন্ধকারে। নিচে যত নামছে, আলো কমছে, শব্দ কমছে। চারদিকে ছায়া ঘন হচ্ছে।

অভিরূপের হাতের টর্চের আলোয় দেখা গেল — দেয়ালে খোদাই: বৃত্তের মাঝে চোখ, ত্রিশূলের গায়ে গেঁথে ছায়ার ছায়া
আর এক অদ্ভুত শব্দ: “জীভানকেতু”।

রুদ্রাংশু পড়ে শোনাল, “এই শব্দের অর্থ — ছায়ার জীবন বা অমর আত্মার কেন্দ্র।”

নিচে নেমেই একটা উঁচু গম্বুজযুক্ত চেম্বার। মেঝেতে চকচকে মণ্ডল — বৃত্তাকারে পাথর বসানো, তার মাঝখানে একটা পাথরের পাত্র, যার মধ্যে ছাই আর হাড়।

অভিরূপ বলল, “এটাই তান্ত্রিক যজ্ঞের স্থান। এখানেই জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছিল তান্ত্রিক যতিনকে।”

“তাহলে ছায়ামানুষ ওখানেই বন্দী?” রুদ্রাংশু জিজ্ঞেস করল।

বিরসা সোজা হয়ে দাঁড়াল। “সে বন্দী নয়, সে এখানে থাকে। যাদের মধ্যে ‘রক্ত’ আছে, সে তাদের ডাকে।”

হঠাৎ গুহার ভিতরে কেঁপে উঠল মাটি। পাথরের দেয়াল যেন একটু কেঁপে উঠল, এবং বাতাস ভারি হয়ে গেল ধোঁয়ার মত একধরনের অন্ধকারে।

পেছন থেকে এক গলা: “অভি…রূপ… রক্ত ফিরে এসো… রক্তে রক্ত ঢালো…”

তিনজনেই ফিরে তাকাল।

দেয়ালে এক ছায়া স্পষ্ট হয়ে উঠছে — মানুষের অবয়ব, কিন্তু মুখ নেই। কেবল দু’টি লাল আগুনের মত চোখ।

ছায়ামানুষ এগিয়ে এলো — ধোঁয়ার মতো গঠিত, মাটিতে তার ছায়া পড়ে না।

অভিরূপ সামনে এগিয়ে গেল। “তুমি কে?”

ছায়া থামল।

“আমি সেই রক্ত… যাকে খুন করেছিল বিশ্বাসঘাতক… আমি সেই আগুন… যে ছায়া হয়ে অপেক্ষা করে…”

“তুমি অগ্নিভ যতিন?” অভিরূপ জিজ্ঞেস করল।

“হ্যাঁ… আর তুমিই আমার উত্তরসূরি… তোমার রক্তে আমার ছায়া… আমি ফিরতে চাই… দেহে ঢুকতে চাই…”

রুদ্রাংশু চেঁচিয়ে উঠল, “না! এটা ফাঁদ!”

কিন্তু ছায়া এক ধাক্কায় তাকে ছুঁয়ে দিল — সঙ্গে সঙ্গে সে ছিটকে পড়ে গেল, নিঃশ্বাস আটকে যাচ্ছে।

বিরসা দৌড়ে এল, হাতে পাথরের এক ত্রিশূল নিয়ে।

“এই চিহ্ন,” সে বলল, “আমার ঠাকুরদা বলতেন — ছায়াকে বিদ্ধ করা যায় না, কিন্তু রক্তের মধ্যে থাকা ছায়াকে জাগানো যায়।”

সে ত্রিশূল এগিয়ে দিল অভিরূপের হাতে।

“তুই যদি সত্যিই সেই রক্তের উত্তরসূরি হস, তাহলে তুই-ই পারবি ওকে আটকাতে।”

অভিরূপ ত্রিশূল হাতে এগিয়ে গেল সেই পাত্রের কাছে। পাথরের বৃত্তের মাঝে সে দাঁড়িয়ে পড়ল।

ছায়া ঘুরছে তার চারদিকে।

“তুমি জানো না তুমি কি হতে পারো… আমি চাই দেহ… তুমি দাও অনুমতি…”

“না,” অভিরূপ বলল দৃঢ় গলায়। “আমি অতীতের ভুল ফেরাব না।”

সে ত্রিশূল মাটির মাঝে গেঁথে দিল। চারদিকে পাথরের চক্ৰে আগুন জ্বলে উঠল। ছায়া ছটফট করতে লাগল। গুহা কাঁপছে, দেয়াল থেকে পাথর খসে পড়ছে।

ছায়া চিৎকার করল:

“তাহলে তুমিও যাবে… যেভাবে তোমার দাদাও গিয়েছিল…”

“তুমি আমার দাদাকে মেরেছিলে?” অভিরূপ কাঁপা গলায় বলল।

“সে আমায় মুক্তি দিতে চেয়েছিল… কিন্তু শেষে প্রতারণা করেছিল… তাই সে রয়ে গেলো এখানে…”

হঠাৎ আগুনের মধ্য থেকে একটি হাত বেরিয়ে এল — কঙ্কালের হাত। আরেক ছায়া গঠিত হল — ছায়ামানুষের থেকে আলাদা।

রুদ্রাংশু বলল, “দেখ! এটা অভিজিৎ সেন… তোমার দাদা!”

দুই ছায়ার মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হল। গুহা ঝাঁকুনি দিচ্ছে। পাথরের তলদেশ ফেটে যাচ্ছে। মাটির তলা থেকে আওয়াজ: “সমাপ্তি চাই… মুক্তি চাই…”

ত্রিশূল হাতে অভিরূপ আগুনের মধ্য দিয়ে ছুটে গেল। সে নিজের হাতে পাথরের পাত্রে ত্রিশূল গেঁথে দিল, আর বলল:

“এই রক্তে শেষ হবে অভিশাপ!”

তার হাত কেটে গেল। রক্ত পড়ল পাত্রে।

হঠাৎ আলোয় ভরে উঠল গুহা। ছায়া ধীরে ধীরে পুড়ে গেল। অভিজিৎ সেনের ছায়াটাও তাকে সালাম জানিয়ে মিলিয়ে গেল আলোয়।

সবকিছু স্তব্ধ। গুহা যেন নিঃশ্বাস ফেলল। বাতাসে এখন আর শীত নেই।

তারা তিনজন — অভিরূপ, রুদ্রাংশু, বিরসা — ধীরে ধীরে গুহা থেকে বেরিয়ে এলো। রোদ উঠেছে। ঝাড়গ্রামের জঙ্গল যেন হালকা হাসছে।

পথারকুমি গ্রামে ফিরলে সবাই স্তব্ধ। বৃদ্ধা মহিলা এসে মাথা নোয়াল।

“অভিশাপ কেটে গেছে,” তিনি বললেন। “তুমি রক্ত দিয়েছ। এখন ছায়া ফিরে গেছে নিজের গর্ভে।”

সমাপ্তি, নাকি শুরু?

সন্ধ্যায় অভিরূপ একা বসে ছিল গ্রামের মাঠে।

আকাশে তারা জ্বলছে। কিন্তু হঠাৎ ঠান্ডা একটা বাতাস এল। পেছনে একটা ফিসফিস শব্দ:

“তুমি শুধু বন্ধ করেছ দরজা… কিন্তু চাবিটা এখনো তোমার পকেটে…”

অভিরূপ ঘুরে তাকাল — কেউ নেই। তবু ছায়া হয়তো সব জায়গায় শেষ হয় না…

কলকাতার বুকে অভিরূপ আবার ফিরে এসেছে — কিন্তু আর কিছুই আগের মতো স্বাভাবিক নয়।

যেদিন সে ঝাড়গ্রাম ছেড়ে ফিরছিল, তার ট্রেনের কামরায় বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। গাছ, মাঠ, নদী – সব পেরিয়ে এক মুহূর্তে সে দেখতে পায় জানালায় একটা প্রতিফলিত ছায়া, কিন্তু পাশের আসন খালি।

হাঁসফাঁস করে সে উঠে বসে। হয়তো ক্লান্তির প্রভাব, হয়তো কিছু… বেশি গভীর।

ফ্ল্যাটে ফিরে সে প্রথমেই দেখে দেয়ালের ঠিক মাঝখানে একটা কালচে দাগ — যেন ধোঁয়ার মতো, অথবা হাতের ছাপের মতো ছড়ানো।

সে হাত দিল। স্পর্শ পেল ঠান্ডা। হিমেল, শীতল… মৃত্যু-ঠান্ডা।

রাত্রিবেলা ঘুম আসে না। সে ঘুমোলেও, ঘুমের মধ্যে কানে বাজে সেই গলা:

“তোমার রক্ত, আমার অধিকার… তোমার চোখ, আমার জানালা…”

সকালে ঘুম ভেঙে দেখে, টেবিলের পাশে ছাই পড়ে আছে।
কিন্তু সে আগের রাতে কিছু পোড়ায়নি।

পরদিন সকালে রুদ্রাংশুর ফোন বন্ধ।
সারা দিন, দু’দিন, তিনদিন – কিছুই জানা যায় না।

অভিরূপ অফিসে যায় না। বাড়ি থেকে কাজ করার ছুতোয় সে শুধু পুরনো নথিপত্র ঘাঁটে।

একদিন সে পায় তার দাদুর পুরনো ডায়েরির ভিতরে গুঁজে রাখা একটা ছেঁড়া কাগজ।
তাতে একটা মানচিত্র আঁকা – এবং একটা কথা লেখা:

“সব ছায়া শুরু হয় অন্তর্ধান গুহা থেকে, শেষ হয় রক্তবন্ধে…”

আরেকটা নাম: “ডঃ শশাঙ্ক কর” – ইতিহাসবিদ ও ভূতত্ত্ববিদ, যিনি একসময় ঝাড়গ্রামের রহস্য নিয়ে গবেষণা করতেন।

অভিরূপ ফোন করে ডঃ কর-কে। তিনি এখন পুরুলিয়ায় থাকেন, প্রায় নিঃসঙ্গ এক পাহাড়ি গ্রামে। সেদিন সন্ধ্যায় অভিরূপ ভিডিও কল করে তাকে। ডঃ কর তাকে দেখে বলে:

“তোমার চেহারায় ছায়ার রেখা পড়ে গেছে, ছেলে। তুমি কি তাকে দেখেছ?”

“হ্যাঁ,” অভিরূপ জবাব দেয়। “আমি তার গর্ভগৃহে গিয়েছিলাম। আমি রক্ত দিয়েছিলাম। কিন্তু সে ফিরে এসেছে। আমার সঙ্গে।”

ডঃ কর মাথা হেলান দিয়ে বলেন, “ছায়ামানুষ যদি ফিরে আসে, তাহলে ছায়াস্ত্রীও চোখ মেলে। তারা যুগল — তন্ত্রমতে বলা হয় ‘ছায়যুগ্ম’। একা কেউ চিরকাল বন্দী থাকে না।”

অভিরূপ জিজ্ঞেস করে, “তাহলে আমি কি করব?”

“তোমাকে ফিরতে হবে — অন্তর্ধান গুহায়।
সেখানে প্রথম চুক্তিপত্র রচিত হয়েছিল — ছায়ামানব ও ঝাড়গ্রামের রাজবংশের মধ্যে। তুমি সেই রক্তের ধারক। এখন তুমি একমাত্র ব্যক্তি, যে চুক্তি ভেঙে নতুন ভবিষ্যৎ লিখতে পারে।”

সেই রাত। প্রচণ্ড বৃষ্টি। শহরের ওপর বজ্রপাত।
অভিরূপ বারান্দায় দাঁড়িয়ে। হঠাৎ সে দেখতে পায় – পাশের বিল্ডিং-এর ছাদে দাঁড়িয়ে আছে কেউ — লম্বা, ছায়ামূর্তি, মুখহীন। তার চোখ দুটি আগুনের মত জ্বলছে।

কিন্তু তার পাশে আরেকটি মূর্তি – একজন নারী, তার হাত ছড়ানো, গায়ে ঝুলে থাকা চুল, এবং তার ঠোঁটের কাছে লেখা:

“আমার নাম — ছায়াস্ত্রী। আমিও জেগে উঠেছি।”

ভোর হতেই অভিরূপ আবার ব্যাগ গুছিয়ে নেয়। সে জানে — এ যাত্রা শেষ নয়। এইবার রক্ত বন্ধনে কেবল অভিরূপই নয়, ছায়া, ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ মিলিয়ে যাচ্ছে একরাশ অন্ধকারে।

সে ট্রেনে ওঠে। এবার গন্তব্য — ঝাড়গ্রামের অন্তর্ধান গুহা।

***

ঝাড়গ্রামের মাটিতে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে অভিরূপ বুঝতে পারে — এবার সে অতিথি নয়, দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন।

স্টেশনের বাইরে দাঁড়িয়ে সে চারদিকে চেয়ে দেখে: যেন একই জায়গা, অথচ সবকিছু বদলে গেছে। রোদ নেই, হাওয়ায় শীতলতা, আর গাছেরা যেন ফিসফিস করছে।

তাকে নিতে আসে বিরসা। সে আর প্রশ্ন করে না — শুধু বলে,
“ওরা জানে তুমি ফিরেছো।”

অভিরূপ অবাক হয়, “ওরা মানে কারা?”

বিরসা জবাব দেয় না। শুধু গাড়িটা স্টার্ট দেয়।

ঝাড়গ্রামের পুরনো রাজবাড়ির কাছেই একটি জীর্ণ বাড়ি।
সেখানেই বাস করেন ডঃ শশাঙ্ক কর। সাদা দাড়ি, কাঁচের ফ্রেমে মোটা চশমা, চোখে একধরনের উন্মাদ প্রতিভার ঝলক।
অভিরূপ দেখে, ঘরের দেয়ালে একাধিক মানচিত্র, নথি, আর ছায়ার আঁকা প্রতিকৃতি।

ডঃ কর বলে, “তুমি জানো, রাজার সঙ্গে ছায়ার সম্পর্ক কেমন ছিল?”

অভিরূপ মাথা নাড়ে, “না।”

“ঝাড়গ্রামের রাজা শীতলদেব তন্ত্রবিদ ছিলেন।
তিনি ছায়ামানবকে বন্দি করেছিলেন একটি চুক্তির বিনিময়ে —
চুক্তির নাম ছিল ‘ছায়বন্ধন’। বিনিময়ে রাজবংশ পেত অজেয় শক্তি।

কিন্তু চুক্তির একটি শর্ত ছিল: প্রতি একশো বছরে ‘রক্ত-অর্ঘ্য’ দিতে হবে — রাজবংশের উত্তরাধিকারীর রক্ত। শেষ রক্ত-অর্ঘ্য হয়েছিল ১৯২২ সালে। এরপর উত্তরাধিকারী হারিয়ে গিয়েছিল। তোমার দাদু। তুমি সেই বংশের শেষ রক্ত।”

অভিরূপ স্তব্ধ হয়ে যায়। ডঃ কর অভিরূপকে নিয়ে যায় একটি গোপন কক্ষে। সেখানে কাঠের বাক্সের ভিতরে রাখা আছে তিনটি চুক্তিপত্র। হাত দিয়ে ছুঁতেই অভিরূপের শরীর ঠান্ডা হয়ে যায়।

প্রথম চুক্তি — বন্দনের চুক্তি
দ্বিতীয় চুক্তি — রক্ত-অর্ঘ্যের চুক্তি
তৃতীয় চুক্তি — ছায়াস্ত্রী-সম্বন্ধের চুক্তি

ডঃ কর বলেন,
“ছায়ামানব একা ছিল না। ছায়াস্ত্রী ছিল তার সঙ্গিনী।
রানী হেমপ্রভা — যিনি ১৭৩৫ সালে চক্রান্তে হত্যা হন।
মৃত্যুর পর তিনি মিশে যান ছায়ার সঙ্গে — চূড়ান্ত তন্ত্রবলে।”

“ছায়াস্ত্রী রক্ত চায় না — সে চায় উত্তরসূরিকে ছায়ায় পরিণত করতে। রুদ্রাংশু সেই পথে এগোচ্ছে।”

অভিরূপ চিৎকার করে ওঠে,
“তাহলে আমি কী করব?! বন্ধুকে মরতে দেবো?”

ডঃ কর বলে,
“তোমাকে ওকে ফিরিয়ে আনতে হবে —
কিন্তু তার মানে তুমি নিজেকে কিছুটা হারাতে পারো।

ডঃ কর ও বিরসা মিলে অভিরূপকে নিয়ে যায় জঙ্গলের গভীরে — যেখানে অতীতের চুক্তি হয়েছিল, আর যেখানে ছায়ামানব আজও অপেক্ষা করে।

একটা ক্ষয়ে যাওয়া মন্দির — দেবতা নেই, মাটির নিচে দরজা।
তার নিচেই অন্তর্ধান গুহা।

গুহার দরজায় লেখা — “জীবন্ত যে আসে, সে মৃত হয়ে ফেরে।”

অভিরূপ নিঃশব্দে বলে, “আর আমি মরে এসেই বাঁচব।”

গুহার ভেতরে নেমে একদম নিচে পৌঁছালে তারা দেখতে পায় — একটি শিলা, আর শিলার ওপর বসে আছে রুদ্রাংশু।
তার চোখ কালো, ঠোঁট রক্তবর্ণ, আর তার মুখ যেন হিম।

সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়।
“অভিরূপ,” সে বলে, “আমি ভুলে গেছি কে ছিলাম।
কিন্তু আমার ভেতর একটা আগুন জ্বলছে —
আর সেই আগুন বলছে, তোমার রক্ত চাই।”

অভিরূপ এগিয়ে যায়। সে বলে,
“তুমি আমার বন্ধু। আমি তোমাকে ফিরিয়ে আনব, তোমার সঙ্গে লড়ব না।”

রুদ্রাংশু কাঁপতে থাকে। তার শরীর থেকে ছায়া বেরিয়ে আসে।
আর সেই ছায়ার ভেতরে এক নারী কণ্ঠ বলে,

“বন্ধুত্ব হারায় সময়ে। ছায়া চিরকাল থাকে… অভিরূপ, তুমি তো আমার ছিলে!”

ডঃ কর চিৎকার করে বলে,
“ছায়াস্ত্রী তোমাকে ছায়ামানবের রূপ দিতে চাইছে।
এই রক্তবিন্দু যদি তুমি নিজে ছিঁড়ে ফেলো, তবে বন্ধন ছিন্ন হবে।”

অভিরূপ নিজের আঙুল কেটে দেয় — রক্ত গড়িয়ে পড়ে মাটিতে।

ছায়াস্ত্রী আর্তনাদ করে ওঠে।

রুদ্রাংশু হঠাৎ কাঁপে… কেঁদে ওঠে… তার চোখে আবার ফিরে আসে মানবিকতা।

সে বলে, “আমি কোথায় ছিলাম, অভি?”

অভিরূপ জড়িয়ে ধরে — “তুই ফিরে এসেছিস, এটাই যথেষ্ট।”

তারা বেরিয়ে আসে গুহা থেকে। মাটির উপর সূর্য উঠেছে।
তবুও পেছনে পড়ে রইল ছায়া… গুহার দেয়ালে তখন লেখা হয়ে গেছে নতুন একটি বাক্য: “ছায়া যায় না — সে রূপ বদলায়।”

ঝাড়গ্রামের জঙ্গলে হালকা কুয়াশা। গোধূলি ছুঁয়ে গেছে মাটির রং।

অভিরূপ ও রুদ্রাংশু, অন্তর্ধান গুহা থেকে ফেরার পর মনে করেছিল সব শেষ। কিন্তু শেষের চেয়ে ভয়ানক একটা “শুরু” তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল।

তাদের বেরোনোর কয়েক ঘণ্টা পরেই, গ্রামের এক প্রান্তে এক তরুণী নিখোঁজ হয়। পরদিন সকালে তার মৃতদেহ পাওয়া যায় — কিন্তু মৃতদেহটি যেন কিছু “টেনে” রেখেছে মাটির নিচে।
তার হাত-পা ছিন্ন, মুখ বিকৃত — কিন্তু চোখ… খোলা।
আর চোখে জমাট বাঁধা অন্ধকার।

দেহের পাশে লেখা এক ছায়ালিপি: “সে ফেরে, যে ছায়া ফেলে।”

রাত্রিবেলা অভিরূপের ঘুম ভেঙে যায়। দেয়ালে এক নারীর প্রতিচ্ছবি — চুল ছড়ানো, হাতে রক্ত, ঠোঁটে স্মিত হাসি।
সে এগিয়ে আসে… কিন্তু হঠাৎ অদৃশ্য।

রুদ্রাংশু দৌড়ে আসে পাশের ঘর থেকে, মুখ ফ্যাকাশে।

“আমি স্বপ্ন দেখেছি, ছায়াস্ত্রী আমাকে বলছে:
‘আমার রূপ যদি তুমি ফিরিয়ে না দাও, তোমার বন্ধুর দেহে আমি জন্ম নেব।’”

অভিরূপ ধীরে বলে, “তাহলে সে মরে যায়নি…
সে শুধু রূপ বদলে এখন আমাদের ভেতর ঢোকার চেষ্টা করছে।”

ডঃ কর খবর পেয়ে গ্রামে আসে। তার হাতে এক পুরনো পুঁথি — সেখানে ছায়াস্ত্রীর বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশ ছিল: “যদি ছায়ামানবের রক্ত দেওয়া হয়, সে ফিরে আসে।
যদি বন্ধন ছিন্ন হয়, ছায়াস্ত্রী রক্তহীন শরীরে প্রবেশ করে —
এবং তার কামনা থাকে একটাই: পূর্ণ রূপে মর্ত্যে ফিরে আসা।”

তিনি বলেন,
“ছায়াস্ত্রী এখন এক দেহ খুঁজছে —
আর তার সবচেয়ে পছন্দের দেহ হবে সেই ব্যক্তি, যার আত্মা ছায়ার সংস্পর্শে এসেছিল কিন্তু দুঃখ দিয়ে রক্ষা পেয়েছে।”

রুদ্রাংশু চিৎকার করে ওঠে,
“মানে… আমি?!”

ডঃ কর চুপচাপ বলে,
“হ্যাঁ। তুমি সেই ‘ধ্বংসের ধারক’।”

বিরসা জানায়, রাজবংশের আদি রানীদের জন্য এক গর্ভগৃহ ছিল, রাজমহলের নীচে —
সেখানে রানী হেমপ্রভা নিজের জীবন শেষ করেছিলেন।
সেই স্থানেই ছায়াস্ত্রী রূপান্তর লাভ করেছিল।

তারা সবাই সেই গর্ভগৃহে পৌঁছায় —
দেয়ালে আঁকা: নারী-পুরুষের ছায়া, চারপাশে আগুনের রেখা।
মাঝে এক চক্র — “ছায়বিন্দু”।

ডঃ কর বলে,
“এই চক্রে দাঁড়িয়ে যদি ছায়ার নাম ধরে তাকে আহ্বান করা যায়, তবে সে নিজের রূপে প্রকাশ পাবে।
কিন্তু… সে যদি নিজের শরীর পেয়ে যায়, তখন আর কিছুই থামানো যাবে না।”

রাত্রি। অভিরূপ দাঁড়ায় সেই চক্রে। সে উচ্চারণ করে:

“ছায়াস্ত্রী, তোমার রক্তপথ বন্ধ হয়েছে। আমাকে বলো, তুমি কি চাও?”

চারপাশে হাওয়ার ঝড় উঠে যায়। এক নারীমূর্তি আবির্ভূত হয় — অত্যন্ত সুন্দরী, বিষণ্ণ চোখ, রক্তমাখা নখ। তার কণ্ঠে করুণ শব্দ:

“আমি ছিলাম রানি। কিন্তু যখন আমার গর্ভে রাজ্যের ভবিষ্যৎ আসছিল, আমাকে হত্যা করা হয়। আমি প্রতিশোধ চাই না।
আমি ফিরে আসতে চাই… আবার একবার জন্ম নিতে চাই।”

অভিরূপ ধীরে বলে,
“তুমি যদি জন্ম নিতে চাও, তবে রক্ত নয়, ক্ষমা চাও।”

ছায়াস্ত্রী রেগে ওঠে:
“ক্ষমা? মৃত্যুর চেয়ে বড় যন্ত্রণা আমাকে দিয়েছে ইতিহাস!”

এবার সে রুদ্রাংশুর দিকে তাকায়।
সে চিৎকার করে ওঠে, ছায়াস্ত্রী তার শরীরে ঢুকতে চায়।

অভিরূপ রুদ্রকে ধরে চিৎকার করে: “তুই আমার বন্ধু! ওর জায়গা তোর শরীরে নয়!”

রুদ্র কাঁপছে, ছায়ার সঙ্গে লড়ছে নিজের ভিতরে।
অভিরূপ এবার নিজের বুকের উপর ছুরি চালাতে চায় — রক্তের গন্ধ ছড়ায়।

ছায়াস্ত্রী থমকে যায়।

“তুমি মরতে চাইছো আমার জন্য?”

অভিরূপ জবাব দেয়:
“না, আমি মরতে চাই যাতে তুমি জীবিত হয়ে উঠতে পারো — কিন্তু রক্তে নয়, স্মৃতিতে।”

ছায়াস্ত্রী কাঁদতে থাকে। ধীরে ধীরে তার দেহ হাওয়ার মতো গলে যায়।
শেষবার তার কণ্ঠে শোনা যায়:

“তুমি আমায় মুক্তি দিলে… আমি তোমায় ছায়া থেকে মুক্ত করলাম…”

পরদিন সকালে ঝাড়গ্রামের আকাশে প্রথম আলো ফুটে।

রুদ্রাংশু নিঃশব্দে বসে আছে।
সে এখন সম্পূর্ণ মানুষ — কিন্তু চোখে আছে সেই ছায়ার ছোঁয়া।

ডঃ কর বলেন,
“ছায়ার ইতিহাস শেষ হলো।
কিন্তু কেউ যদি আবার চুক্তি করতে চায়… ছায়া তখনও অপেক্ষায়।”

অভিরূপ মাথা নিচু করে শুধু বলে,
“আমি ইতিহাসকে লেখা নয়, অনুভব করেছি।”

ঝাড়গ্রামের আকাশে সকাল হলেও, রুদ্রাংশুর ভিতর থেকে অন্ধকার সরে না।
তার চোখে এক ধরনের চাপা ক্লান্তি।
একটা কিছু যেন জমাট বেঁধে আছে—একটা অজানা গ্লানি, যেটা সে নাম দিতে পারছে না।

ডঃ কর তাকে দেখে বলেন,
“ছায়ার ছোঁয়া যে একবার পায়, সে কখনও পুরোপুরি ছায়ামুক্ত হতে পারে না।
ছায়া বীজ রেখে যায় মনে… ঠিক যেমন রুদ্ররক্তের ভেতরে এখন সেই বীজ ঘুমিয়ে আছে।”

অভিরূপ বলে,
“তাহলে আমি কি সবটাই বৃথা করলাম?”

ডঃ কর জবাব দেন না।
শুধু বলেন:
“সময় দেবে উত্তর।”

রুদ্র এখন আর আগের মতো কথা বলে না। তার হাসি যেন জোড় করে টেনে আনা। সে রাত জেগে থাকে, চোখ মেলে চেয়ে থাকে ঝোপঝাড়ের দিকে। কখনো-কখনো কাঁধে হাত রেখে বলে, “অভি, তুমি জানো, ছায়া কখনও হারায় না।
ও শুধু অপেক্ষা করে, আর যারা ওর স্পর্শে এসেছে, তাদের ভিতরে নরম জায়গা গড়ে তোলে।”

অভিরূপ আতঙ্কিত।
সে ডঃ কর-এর কাছে গিয়ে বলে, “আমরা কি আবার শুরুতে ফিরে যাচ্ছি?”

ডঃ কর বলেন:
“না, এবার শুরু নয়… এটা শেষের ভিতরের শেষ।
এবার সব বন্ধ করতে হবে। একেবারে চিরতরে।”

ডঃ কর জানায়, রাজবংশের একজন উপেক্ষিত রাজপুত্র ছিল—রাজা শীতলদেবের ভ্রাতা রুদ্রপ্রতাপ।
তিনি বিশ্বাস করতেন, ছায়াকে মানুষের আত্মা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

রুদ্রাংশু সেই বংশধর।

অভিরূপ জানতে পারে—তার বন্ধুর রক্তে এখন সেই “ছায়ামন্ত্র” কাজ করছে।
যদি এই রক্ত আবার এক নির্দিষ্ট ছায়াযজ্ঞে ব্যবহার হয়,
তবে ছায়ামানব নিজে নতুন রূপে ফিরে আসবে—এবার আর তন্ত্র নয়, আত্মার মাধ্যমে।

ডঃ কর বলেন:
“এই বার আমি আর থামাতে পারবো না।
তুমি পারবে, যদি বন্ধুকে হারাতে প্রস্তুত হও।”

অভিরূপ জবাব দেয় না।
শুধু চোখে জল নিয়ে বলে,
“তবে শুরু হোক শেষের শুরু।”

পুরনো রাজমহলের নিচে, এক ত্রিভুজ চিহ্ন আঁকা মাটি।

রাত্রির ঠিক মাঝখানে, অভিরূপ রুদ্রকে নিয়ে আসে সেখানে।
রুদ্র নিজে জানে না সে কী করতে চলেছে—তার ভেতর অদ্ভুত উত্তেজনা।

হঠাৎ করে সে চিৎকার করে ওঠে:
“অভি! আমি দেখছি… আমার ভেতরে একটা ছায়া হাঁটছে!”

সে পড়ে যায়, কাঁপতে থাকে।
তার চোখ কালো হয়ে যায়, ঠোঁটে ছায়ার মন্ত্র।

“তব আত্মা দেহে, তব ছায়া বাহিরে,
আমি পুনর্জন্ম চাই, রক্তে, শ্বাসে, স্মৃতিতে!”

অভিরূপ কাঁদতে কাঁদতে বলে,
“বন্ধু, তুই যদি হারাস… আমি আর কিছু রাখব না!”

সে একটি ছুরি তুলে নেয়। রুদ্র চিৎকার করে বলে,
“মার আমাকে, অভি! এখনই শেষ কর, যতক্ষণ না আমি সম্পূর্ণ ওর দখলে যাই!”

অভিরূপ ছুরিটা তোলে। কাঁপছে তার হাত।
ভিতর থেকে চিৎকার আসে —
“এই আমি শেষ করি, না ছায়া শেষ করে আমাদের?”

শেষ মুহূর্তে অভিরূপ ছুরিটা নিজের হাতে চালিয়ে দেয়।

তার রক্ত ছিটিয়ে পড়ে রুদ্রর মুখে।

ছায়া চিৎকার করে ওঠে: “এ রক্ত আত্মত্যাগের। এ রক্ত আমাকে বাঁধে, মুক্তি নয়।”

রুদ্র হঠাৎ নিঃশব্দ হয়ে যায়। ছায়া গলে যায় বাতাসে, চিরতরে।

রুদ্র আবার জ্ঞান ফিরে পায়। সে নিঃশব্দে বলে,
“আমি কোথায় ছিলাম?”

অভিরূপ হাসে —
“এখানেই। আমার পাশে। ছায়া থেকে দূরে। কিন্তু নিজের ভিতরে।”

ডঃ কর এসে বলে,
“ছায়া শেষ। এবার সত্যি শেষ।”

রক্তানুশীলনের চক্র আর কখনও দেখা যাবে না। তবে অভিরূপ জানে,
যে জায়গায় ছায়া একবার পা রাখে, সে জায়গা আর আগের মতো থাকে না।

ঝাড়গ্রামের আকাশে একদিন হঠাৎ এক বাচ্চা ছেলেকে দেখা যায় —
সে খেলছে, ছায়ার সঙ্গে কথা বলছে।

এক বৃদ্ধ মহিলা বলে,
“ও তো একা খেলে না। ওর একটা কালো বন্ধু আছে।”

নাম কী ছেলেটার?

“রুদ্র…”

ঝাড়গ্রাম, ১০ বছর পরে। গ্রাম বদলে গেছে, আধুনিকতা এসেছে। মোবাইল টাওয়ার, কাঁচা রাস্তার বদলে পিচ, স্কুল-হাসপাতাল।

কিন্তু কিছু জায়গা অক্ষত—পুরনো রাজমহল, সেই গভীর জঙ্গল… আর এক নির্দিষ্ট পরিবার। রুদ্র এখন এক স্কুলশিক্ষক। নিরীহ, ভদ্র, স্ত্রী ও এক পুত্রের পিতা।

পুত্রের নাম? অভিরুদ্ধ।

রাত হলে সে ছেলেটিকে গল্প শোনায়— রাজাদের, রানীদের, আর ছায়াদের গল্প। একদিন ছেলেটি জিজ্ঞেস করে, “বাবা, ছায়া কি কখনো ফেরে?”

রুদ্র মুচকি হাসে: “ফিরে, কিন্তু সবাই তা দেখতে পায় না।”

অভিরূপ আর ঝাড়গ্রামে নেই। সে এখন কলকাতার এক পুরাতাত্ত্বিক মিউজিয়ামের ডিরেক্টর। নিজেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছে অতীত থেকে। একদিন এক চিঠি আসে ডাকঘরে।

প্যাকে মোড়া, পুরোনো কালি দিয়ে লেখা: “ছায়ার বন্ধন চিরতরে মুক্ত হয় না। ও শুধু প্রজন্ম বদলায়।”

নিচে স্বাক্ষর: R.P. (রুদ্রপ্রতাপ?)

অভিরূপ চমকে যায়। সে বুঝতে পারে, কিছু এখনো শেষ হয়নি।

ছেলেটা এখন দশ বছরের। সে নিজে নিজে কথা বলে।
মাঝে মাঝে সে রাত ৩টেয় উঠে দাড়িয়ে থাকে জানালার সামনে। মা একদিন জিজ্ঞেস করে: “তুই কার সঙ্গে কথা বলিস রে?”

ছেলেটা বলে: “আমার বন্ধু। ওর নাম ছায়া। ও বলে, আমি ওকে মুক্তি দিতে পারব।”

রুদ্র স্তব্ধ। সে জানে—একটি চক্র আবার শুরু হয়েছে। রুদ্র একরাতে অভিরূপকে ফোন করে।

“ভাই, আমার ছেলের ভেতর আমি নিজের ছায়া দেখতে পাচ্ছি। তুই পারলে আসিস… শেষবারের মতো।”

অভিরূপ ফিরে আসে ঝাড়গ্রামে। পুরোনো গন্ধ, পুরোনো কষ্ট।

তারা সিদ্ধান্ত নেয়:
এই বার ছায়াকে মুক্তি দিতে হবে একেবারে আলোর মাধ্যমে।

ডঃ কর-এর পুরনো নোট ঘেঁটে তারা জানতে পারে:
ছায়াকে বন্ধ করা যায় না।
কিন্তু তাকে আলোকগ্রন্থে আবদ্ধ করা যায়—এক ধরনের মন্ত্রপাঠ যা “ছায়ার সত্য রূপ” প্রকাশ করে।
ছায়া যেটা গোপন করে—অপরাধ, হত্যা, প্রতিশোধ—
সেই সব প্রকাশিত হলে ছায়া নিজের ভিতরেই ভেঙে পড়ে।

রাত্রি। চন্দ্রগ্রহণ। অভিরুদ্ধ জঙ্গলের দিকে হেঁটে যাচ্ছে, হাত ছুঁয়ে দিচ্ছে পাতাকে, পাথরকে। তার ঠোঁটে ছায়ার মন্ত্র।

রুদ্র ও অভিরূপ পৌঁছে যায় ঠিক সময়ে। অভিরূপ চিৎকার করে: “অভিরুদ্ধ! তুই মানুষ! ছায়া নয়! সত্য তোর শক্তি, ছায়া নয়!”

রুদ্র কান্নায় ভেঙে পড়ে: “তুই যদি ওর দেহ হয়ে যাস… আমি তোকে ফেরাব না পারি।”

তখনই আকাশে বজ্রপাত হয়। ছেলেটার চারপাশে কালো কুয়াশা।

সে বলে: “ওরা আমায় বলেছে, আমি ‘নতুন ছায়াপুরুষ’।
আমি তোদের মুক্ত করব না—তোমাদের বদলে আমি ছায়াকে বাঁচাব!”

অভিরূপ নিজের পকেট থেকে একটা তামার পাত বের করে।
তাতে লেখা মন্ত্র: “আলোতে যা ঢাকা ছিল, সত্যে তা জ্বলে উঠে। ছায়া যা চায়, তা প্রতিচ্ছবি, কিন্তু আমি দিই প্রকৃত রূপ।”

সে পাঠ করে চলে। আকাশে আলো ছড়ায়। অভিরুদ্ধ ছিটকে পড়ে যায়।

চারপাশে ছায়া যেন এক মুহূর্তের জন্য মানুষী রূপ পায়—এক নারী, এক পুরুষ, এক শিশু…
তারা সবাই বলে: “আমরা চাই শুধু স্মরণ… প্রতিশোধ নয়।”

অভিরুদ্ধের চোখ দিয়ে জল পড়ে। সে জ্ঞান ফিরে পায়।

“বাবা… আমি ছিলাম না ওদের… ওরা আমায় মুক্তি চেয়েছিল, আমি শুধু দেহ ছিলাম।”

পরদিন, ঝাড়গ্রামের আকাশে সোনালি রোদ। রুদ্র হাঁটে নিজের ছেলের পাশে। অভিরূপ বিদায় নিতে গিয়ে বলে: “এবার সত্যি শেষ, ভাই।”

রুদ্র উত্তর দেয়: “হয়তো। কিন্তু ছায়া থাকবে, যতদিন আমরা ইতিহাস ভুলে যাই।”

অভিরূপ হেসে যায়। তার চোখে এবার কোনো ছায়া নেই,
শুধু আলো।

 

-সমাপ্ত-

1000023499.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *