Bangla - প্রেমের গল্প

অরণ্যের প্রতিধ্বনি

Spread the love

অরুণিমা বসু


শিলিগুড়ির শহুরে আলোর ঠিক সীমারেখা পেরিয়ে, যেখানে পিচঢালা রাস্তা কাঁকরবিছানো পথের সঙ্গে হাত বদল করে, সেখানেই শুরু হয় জলদাপাড়ার রেঞ্জ—প্রায় ছয় হাজার হেক্টর জুড়ে বিস্তৃত এক জীবন্ত নিঃশব্দতা। অরিন্দম সরকার এখানে নতুন পোস্টিং পেয়েছে তিন মাস হল। ছোটবেলা থেকেই তার প্রকৃতির প্রতি অনুরাগ, কিন্তু সেটা কখনো উচ্চস্বরে বলা হয়নি। শান্ত, অল্পভাষী, সাদামাটা এই মানুষটা সদ্য কলকাতা থেকে বদলি হয়ে এসে একেবারে জঙ্গলের মাঝখানে এসে বসবাস শুরু করেছে—যেখানে সন্ধে নেমে এলে মানুষের অস্তিত্ব হারিয়ে যায়, আর কেবল গাছেদের ফিসফাস শোনা যায় হাওয়ার সঙ্গে। অরিন্দমের দিন শুরু হয় সূর্য ওঠার আগে। নিজের কঞ্চির তৈরি চায়ের কাপ হাতে করে সে বনপথ ধরে হাঁটতে বেরোয়। তার চলাফেরা যেন এক নির্দিষ্ট ছন্দে বাঁধা—প্রতিটি গাছের সঙ্গে তার পরিচয়, প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি পাখির কণ্ঠ তার চেনা। সে মুখে কিছু না বললেও, চোখে থাকে এক ধরনের সন্তুষ্টি, যেন সে কোথাও পালিয়ে এসে ঠিক জায়গায় এসে পৌঁছেছে।

বন দপ্তরের লোকজন তাকে বেশ শ্রদ্ধা করে, যদিও শহর থেকে আসা আধিকারিকদের প্রতি সাধারণত এই শ্রদ্ধা দেখা যায় না। কিন্তু অরিন্দম কারো ওপর কর্তৃত্ব ফলায় না। সে কাজ করে নিয়ম মেনে, আর সবচেয়ে বেশি যত্ন নেয় কর্ণ নামের এক বয়স্ক হাতির। কর্ণ এই রেঞ্জের প্রবীণতম বাসিন্দা—তার দাঁত ভেঙে গেছে, এক কানে শুনতে পায় না, আর চোখে রোদ পড়লে কুঁচকে যায়। কিন্তু অরিন্দমের উপস্থিতি সে টের পায় দূর থেকেই। প্রতি সকালে, হাতিটা বনাঞ্চলের একটা বিশেষ জায়গায় এসে দাঁড়িয়ে থাকে, আর অরিন্দম তাকে কলাপাতা আর জলে ভরা ছোট পাত্র দিয়ে আপ্যায়িত করে। দুজনে যেন একে অন্যের নিঃসঙ্গতা ভাগ করে নেয়। মাঝে মাঝে কর্ণের শরীরে হাত বুলিয়ে অরিন্দম বলে ওঠে, “তুইও হয়তো কারো জন্য অপেক্ষা করিস, কর্ণ… যেমন আমি।” তার এই কথা কেউ শোনে না, শুধু পাতা-ঝরা শব্দটা একটু জোরে বেজে ওঠে যেন। অফিসের কাজের বাইরে সে নিজের হাতে তৈরি করেছে একটা ছোট্ট হার্ব গার্ডেন, যেখানে তুলসী, নীম, বনলেবু, অর্কিডের মতো গাছের সঙ্গে কথা বলে সে—শব্দে নয়, নিঃশ্বাসে।

তবে অরণ্যের এই নিঃশব্দ ছন্দ একদিন খানিকটা বদলে গেল, যখন এক সকালে অরিন্দম শুনল এক অচেনা শব্দ—না, কোনো পশু বা পাখির না, বরং মানুষের পায়ের আওয়াজ, ক্যামেরার ক্লিক, আর ফিসফিস করে বলা কিছু বিদেশি শব্দের মতো। সে এগিয়ে গিয়ে দেখে এক তরুণী, মাথায় ক্যাপ, হাতে একটা লম্বা লেন্সের ক্যামেরা, চোখে দৃঢ় দৃষ্টি—জঙ্গলের ভেতরে ঢুকে ছবি তুলছে কর্ণকে। অরিন্দম প্রথমে খানিক রাগে ফেটে পড়ে—“এখানে অনুমতি ছাড়া কেউ ঢুকতে পারে না! জানেন আপনি কোথায় দাঁড়িয়ে আছেন?” তরুণীটি একটু চমকে গিয়েও শান্তভাবে বলে, “আমি মায়া রায়, ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার। পারমিশন আছে, কালকেই বন অফিস থেকে সাইন করিয়েছি। আমি বাঁকুড়ে পাখির একটা সিরিজে কাজ করছি।” অরিন্দম সন্দেহের চোখে দেখে তার কাগজপত্র, কিন্তু ভুল ধরা যায় না। তবুও কিছু একটা অস্থিরতা তৈরি হয় তার ভিতরে—হয়তো কর্ণের নিঃসঙ্গতা ভাগ করার অন্য কেউ চলে এসেছে, কিংবা নিজেরই ভেতরকার নীরবতার মধ্যেই এই অচেনা শব্দের অনুপ্রবেশ তাকে অস্বস্তিকর করে তুলেছে। মায়া ক্যামেরা কাঁধে তুলে হাঁটা শুরু করে, পিছনে রেখে যায় কিছু ধুলোর রেখা আর অরিন্দমের কৌতূহল—এই নারী কার, কেমন করে এত নিঃসঙ্গ জঙ্গলে একা এসেছে, আর কীসের ছবি সে ধরে রাখতে চায়? অরণ্য হয়তো নিজের ভাষায় উত্তর দিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু অরিন্দম তখনও শুনতে শেখেনি সেই প্রতিধ্বনি।

পরদিন ভোরেই অরিন্দম ছায়াঘন বনপথ ধরে হাঁটছিল, রোজকার মতোই নিরবিচারে, মাথার ভেতর মায়ার আগমনের অদ্ভুত অনুরণন। আগেও ফটোগ্রাফার এসেছে, গবেষক এসেছে, কিন্তু এত আত্মবিশ্বাস আর নির্লিপ্ত অভিব্যক্তি নিয়ে কেউ তাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেনি। সে ভাবছিল, মেয়েটি শহরের মানুষ, অথচ একা জঙ্গলের গভীরে ঘুরে বেড়ানোর সাহস কোথা থেকে পায়? তার চলার ছন্দেই ছিল শহরের ছায়া, কিন্তু চোখে ছিল প্রাচীন গাছের মতো ধৈর্য। কর্ণ সেইদিন অন্যরকম আচরণ করছিল, যেন গজরাজ অনুভব করেছে নতুন কারো গন্ধ, এক চিরপরিচিত অচেনা উপস্থিতি। অরিন্দম কর্ণের গা চুলকে দিতে দিতে জিজ্ঞাসা করে, “কালকে কি ভালো লাগল তোর? নতুন কেউ তোর ছবি তুলেছে, বুঝলি?” হাতিটি ধীরে ধীরে শুঁড় তুলে যেন সম্মতিসূচক ভঙ্গি করল। ওদের মধ্যে এই ভাষাহীন কথোপকথন দিনের প্রথম আলোয় মিশে থাকল।

বেলা দশটা নাগাদ বন অফিসে এসে পৌঁছায় মায়া। এবার আর ভেতরে প্রবেশ নয়, সে সোজা চলে আসে অরিন্দমের কেবিনে, হাতে একটা ড্রাইভ, চোখে লেন্সে ধরা বনভূমির দীপ্তি। “আপনাকে কিছু দেখাতে চাই,” বলে সে অরিন্দমের ডেস্কের সামনে বসে। ড্রাইভ খুলতেই পর্দায় ভেসে ওঠে কর্ণের এক বিশাল প্রতিকৃতি—মায়ার ক্যামেরায় তার চোখের মধ্যে যেটা ধরা পড়েছে, সেটা শুধু একটি হাতির ছবি নয়, সেটা যেন এক ইতিহাস, এক চুপচাপ শোক, এক ব্যক্তিত্ব। তারপর আসে বনের মেঘলা আকাশ, হালকা বৃষ্টির ফোঁটায় ঘাসের নাচ, আর বাঁকুড়ের উড়ান—যার জন্য সে এখানে এসেছে। অরিন্দমের মুখ কেমন যেন স্থির হয়ে যায়—এই সব সে প্রতিদিন দেখে, কিন্তু কখনও এভাবে চিনেছে না। “তুমি এগুলো কবে তুললে?” মায়া বলে, “গতকাল দুপুরে। আমি বনের ভাষা বোঝার চেষ্টা করি। আপনি তো তার একেবারে আপন লোক। আপনাকে নিয়ে একটা লেখা ভাবছি—‘The Man Who Listens to Leaves’।” অরিন্দম হালকা হেসে বলে, “আমি শুধু নিয়ম মানি। এ জঙ্গলে সবাই নিয়ম মেনে চলে—পাখি, হাতি, মানুষ, আমি। ভাষা বোঝা আর নিয়ম মানা এক নয়।” মায়া তখন বলে ওঠে, “তবে আপনি নিয়মের মধ্যে থেকেও বুঝতে পারেন ভাষাকে। এই ছবিগুলো তারই প্রমাণ।”

তারপরের কয়েকদিন অদ্ভুত এক ভারসাম্যে এগোতে থাকে তাদের সম্পর্ক—যেখানে ব্যক্তিগত প্রশ্ন নেই, কিন্তু প্রতিদিন সকাল-বিকেল দেখা হয়; যেখানে লাঞ্চের সময় ভাগ করে নেওয়া হয় গরম লুচি আর বনজ মধু, কিন্তু তাতে কোন সামাজিক প্রথা নেই। মায়া ক্যামেরা হাতে একা একা বেরিয়ে পড়ে, আর অরিন্দম দূর থেকে লক্ষ্য রাখে—যেন পাখির ছোটাছুটিতে যদি কিছু অস্বাভাবিকতা থাকে, মায়া যেন বিপদে না পড়ে। একদিন মায়া এসে জিজ্ঞাসা করে, “আপনার চোখ এত প্রশান্ত থাকে কীভাবে?” অরিন্দম উত্তর দেয় না, শুধু বলে, “প্রকৃতি চোখের মধ্যে ঢুকে গেলে বাইরে কিছু থাকে না।” তখন মায়া হঠাৎ বলে ওঠে, “আপনি জানেন, শহরে কেউ কারও চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলে না।” কথাটা শুনে অরিন্দম প্রথমবার নিজের দিকে একটু ফিরে তাকায়, যেন তার দীর্ঘকালীন একাকীত্বকে কেউ ডাকছে। বাঁকুড়ে এখনও ধরা পড়েনি ঠিকভাবে, কিন্তু তার আগেই যেন কিছু একটা গেঁথে যাচ্ছে দুজনের ভেতর—একটা না বলা সংলাপ, যেটা ক্যামেরার ফ্রেমের বাইরেও টিকে থাকে। এই বন, এই অরণ্য, এই ঘুমন্ত বিকেল—সবকিছু তাদের নিঃশব্দ বন্ধনের মতোই, যা স্পষ্ট নয়, কিন্তু অনুভবে গভীর।

সেদিন ভোরবেলা কর্ণ আর মায়া—দুজনকেই যেন অরণ্য অন্যভাবে স্বাগত জানাল। পাখিদের কণ্ঠে ছিল আরও তীক্ষ্ণ সতর্কতা, ঝোপের আড়াল থেকে হরিণের দল দেখে পিছু হটল অরিন্দম, যেন তাদের সকালটা খুব শান্ত নয়। মায়া তখন বনের এক নির্জন জায়গায় ক্যাম্প করেছে—বন দপ্তরের অনুমোদিত এলাকা হলেও জঙ্গল সেখানকার নিজের নিয়মে চলে। অরিন্দম নিজের অভিজ্ঞতায় জানে, বনের নির্জনতাও মাঝে মাঝে খুব জোরে কথা বলে। সে হেঁটে পৌঁছে গেল মায়ার তাঁবুর কাছে। হালকা কুয়াশার ফাঁকে দেখা গেল মায়া ক্যামেরা হাতে গাছের ছায়ায় বসে আছে, মাথায় ঝাঁকড়া চুল এলোমেলো, চোখ দুটো স্থির। “আপনি এখানে?” মায়া অবাক হয় না, কেবল মাথা নেড়ে বলে, “আপনার শিখিয়ে দেওয়া সেই বাঁশঝাড়ের পাশের ঝরনার শব্দটা শুনছিলাম। রেকর্ড করছি। কখনও কখনও মনে হয়, শব্দই একমাত্র পথ অনুভব করার।” অরিন্দম তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ—তার জানা বনে কেউ এভাবে কথা বলে না। তার মুখ থেকে বেরিয়ে এলো, “সবাই শব্দ শুনতে পায় না, বুঝতেও পারে না। আপনি ঠিক কোথা থেকে এলেন?” মায়া হাসে, “শহর থেকে। কিন্তু আমার মন তো বহু আগেই বনে এসে পড়েছিল।”

তাদের মধ্যে শুরু হয় এক নীরব শিক্ষালয়—প্রকৃতিকে কেন্দ্র করে, শব্দ আর দৃষ্টিকে হাতিয়ার করে। অরিন্দম শিখিয়ে দেয় কিভাবে হরিণের পায়ের ছাপ দেখে বোঝা যায় কতটা পুরোনো, কোন গাছের পাতা বৃষ্টির পরে ঝরে পড়ে, কোনটার পাতা কখনও মাটিতে পড়ে না—যেমন শাল গাছ। আর মায়া শিখিয়ে দেয় অরিন্দমকে কীভাবে একটি দৃশ্যকে শুধু চোখ দিয়ে নয়, হৃদয়ের মাধ্যমে বন্দি করতে হয়। এক বিকেলে, তারা দুজনে গিয়ে দাঁড়ায় একটা গাছের নিচে, যেখানে কর্ণ প্রায়ই এসে দাঁড়িয়ে থাকে। সেখানে মায়া বলে, “এই গাছটা কি তোমার কাছে জীবন্ত?” অরিন্দম একটু চমকে ওঠে—”তুমি ‘তুমি’ করে বললে?” মায়া বলে, “প্রকৃতির মধ্যে তো ‘আপনি’ চলে না। এখানে সবাই সমান, সবাই প্রাচীন।” অরিন্দম চোখ নামিয়ে নেয়, যেন একটা প্রাচীন বন্ধ দরজা খুলে গেল তার ভিতরে। সে জবাব দেয় না, কেবল গাছের গায়ে হাত রেখে দাঁড়িয়ে থাকে—শব্দহীন, কিন্তু অনুভবে পরিপূর্ণ।

রাতের দিকে হঠাৎ করে বনাঞ্চলে ঝোড়ো হাওয়া ওঠে। মায়ার তাঁবু খানিকটা কেঁপে ওঠে। অরিন্দম দ্রুত সেখানে পৌঁছে গিয়ে দেখে, তাঁবুর একপাশ ছিঁড়ে গেছে। সে চুপচাপ তাঁবু ঠিক করে দেয়, কিছু না বলে মায়াকে নিজের কেবিনে নিয়ে আসে। কেবিনে মোমবাতির আলোয় তারা দুজন বসে থাকে কিছুক্ষণ, কোনও শব্দ নেই, শুধু বাইরের ঝড়ের গর্জন। মোমের আলোয় মায়া হঠাৎ করে বলে ওঠে, “আপনি জানেন, এই জঙ্গলের সঙ্গে আপনার চেহারার একরকম মিল আছে। অন্ধকার, অথচ গভীরভাবে সুরক্ষিত।” অরিন্দম হালকা হেসে বলে, “আর আপনার চোখে এই অন্ধকারের ভেতরেও আলো খুঁজে পেতে জানে।” সেই মুহূর্তে মনে হয়, পুরো জঙ্গলটা যেন এক নিঃশব্দ প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে—দুজন মানুষ, যারা শব্দে নয়, অনুভবে কথা বলে, যারা ভালবাসা শব্দটা না বলেও তার প্রতিটি অভিঘাত অনুভব করে। আর অরণ্য, সে শুধু তাদের কথাগুলো প্রতিধ্বনির মতো ফিরিয়ে দেয়, এক বার বার ফিরে আসা মৃদু কানাকানি, যে ভালোবাসা গাছের পাতার মতো নড়ে ওঠে, কিন্তু কখনও ভাঙে না।

বর্ষা নামার ঠিক আগের সময়টা ছিল, যখন বনের আলো সবচেয়ে বেশি রহস্যময় হয়ে ওঠে—কখনও রোদের দাগ পাতা ছুঁয়ে পড়ে, কখনও মেঘ ছায়া ফেলে গাঢ় অন্ধকার। সেই সময়টাই যেন এক বিশেষ রূপক—নয়ন ও মন, আলো ও ছায়ার মধ্যে লুকোনো ভালোবাসার। অরিন্দমের কাছে এসময়টা ছিল কাজের চাপ আর হিসেব কষার দিন। নতুন একটা কেস এসেছে—বেআইনি কাঠ কাটার গন্ধ পাওয়া গেছে দক্ষিণ-পূর্ব কোণের কাছাকাছি। কিন্তু তার মনটা ছিল অন্যদিকে টানাটানি করা—মায়া সেই অঞ্চলের কাছাকাছি রুটে ছবি তুলছিল। ভেতরে এক অজানা অস্থিরতা কাজ করছিল, যা সে নিজের অভ্যাস বা দায়িত্ব বলে ভুলিয়ে রাখছিল। কিন্তু প্রকৃতি তো মানুষের আত্মপ্রতারণার ভাষা বোঝে না। তাই সেদিন দুপুরে, কাজ ফেলে সে বাইনোকুলার কাঁধে নিয়ে সরাসরি মায়ার ক্যাম্পের দিকেই হাঁটা দেয়।

মায়া তখন ক্যামেরা ট্রাইপডে বসিয়ে এক বিরল দৃশ্যের অপেক্ষায়—জোড়া কাঠঠোকরা পাখির একটি যৌথ আচরণ সে অনেকদিন ধরে অনুসরণ করছে। অরিন্দম চুপচাপ দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখে, মায়ার লেন্স যেমন স্থির, তেমনই তার দৃষ্টি। এই মেয়েটি শুধু ফ্রেম বানায় না—প্রকৃতিকে স্পর্শ করে। সেদিন সে ছবির পাশাপাশি অরিন্দমের সঙ্গে নিজের কিছু কথা ভাগ করে নেয়। “আমি আগে কোলকাতার এক নিউজ চ্যানেলে কাজ করতাম,” বলে সে, “কিন্তু একটা রিপোর্টিং ট্রিপে উত্তরাখণ্ডে গিয়ে একটা পাহাড়ি বাচ্চার চোখে প্রকৃতির প্রথম স্পর্শ দেখেছিলাম। সেই চোখটাই আমার জীবন ঘুরিয়ে দিল।” অরিন্দম কিছু বলে না, শুধু শোনে। তারপর হঠাৎ করে মায়া বলে, “আপনার কি কেউ নেই? কোনও স্ত্রী, সন্তান, পরিবার?” প্রশ্নটা তীক্ষ্ণ ছিল, কিন্তু কৌতূহলের চেয়ে যেন সহমর্মিতায় ভরা। অরিন্দম বলে, “ছিল, একসময়। কলেজে একটা সম্পর্ক ছিল… শেষ পর্যন্ত কেউ কারো ভাষা বুঝে উঠতে পারিনি।” তার চোখ চলে যায় দূরে, বাঁশঝাড়ের ফাঁক দিয়ে দেখা একটা ছোট নদীর দিকে। মায়া তখন ধীরে বলে, “ভাষা না বোঝা থেকেই তো সম্পর্ক তৈরি হয়। বোঝা হয়ে গেলে তো আর কিছু বাকি থাকে না।”

সন্ধে গাঢ় হতে হতে আকাশে মেঘ জমে। হঠাৎ এক ঝলকে বৃষ্টি নামে। মায়া তড়িঘড়ি ক্যামেরা ঢেকে নেয়, অরিন্দম হাত বাড়িয়ে তাঁবুর দড়ি শক্ত করে ধরে রাখে যাতে ভেঙে না পড়ে। দুজনে ছুটে আসে কাঠের কেবিনে। ভিজে চুল, কাঁপা হাত আর অদ্ভুত এক ঘন নিরবতা তাদের চারপাশে। ভেতরে মোম জ্বলছে, জানালায় বৃষ্টির টিপটিপ শব্দ। সেই অদ্ভুত পরিবেশে অরিন্দম বলে, “এই বৃষ্টিতে আমার খুব ঘুম পায়, কিন্তু আজ মনে হচ্ছে, ঘুম আসবে না।” মায়া তাকিয়ে থাকে, তার ঠোঁটে হালকা হাসি, “আমি একটা গান শুনতাম, ‘বৃষ্টির শব্দে যে গল্প লুকিয়ে থাকে, তা শুধু নিঃশব্দরাই শুনতে পায়।’ আপনি সেই নিঃশব্দ মানুষ। আপনি শুনতে পান, তাই তো এতদিন বনের মধ্যে থেকেও একা নন।” অরিন্দম প্রথমবার তার দিকে তাকিয়ে বলে, “তুমিও একা ছিলে, তাই না?” মায়া মাথা নাড়ে, তার চোখে জল জমে কিন্তু সে সামলায়। কেবিনের জানালার বাইরে গাঢ় বন, ঝমঝম বৃষ্টি, আর ভিতরে দুটো মন—ছায়া আর আলোয় নিজেদের খুঁজে নিচ্ছে। প্রেম তখনও উচ্চারিত হয়নি, কিন্তু তার উপস্থিতি যেন অরণ্যের মাটিতে পা ফেলে ফেলেছে, নরম শব্দে, ধীরে ধীরে।

জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে, এক ভোরে অরিন্দম একটা পাখির ডাক শুনল—একটা দীর্ঘ, বাঁকা সুরে উঠেই নিমেষে মিলিয়ে গেল। সে মুহূর্তেই বুঝে ফেলল, এ সাধারণ ডাক নয়। অনেকদিন আগেই সে শিখেছিল এই ডাকটিই বাঁকুড়ের—বহুদিন ধরে খোঁজে পাওয়া যাচ্ছে না এমন এক দুর্লভ প্রজাতির পাহাড়ি পাখি, যার ডাক একবার শোনা মানে, তার উপস্থিতি নিশ্চিত। সেদিনই সকালেই সে মায়াকে খবর পাঠাল। মায়া তড়িঘড়ি ক্যামেরা আর ড্রোন রিগ নিয়ে বন অফিসে এসে হাজির। “আপনি নিশ্চিত?”—তার চোখে কৌতূহল, উত্তেজনা, আর অদ্ভুত এক আশঙ্কা। অরিন্দম হালকা মাথা নাড়িয়ে বলল, “ডাকটা আমি শুনেছি। উত্তর-পূর্ব জোনে, যেখানে সাঁকোটা আছে পাহাড়ি ঝরনার উপরে—সেখানেই।”

সেইদিন দুপুরের আগেই দুজনে রওনা দেয়। পথটা ছিল দুর্গম, কিছু অংশ পায়ে হেঁটে, কিছুটা জিপে। চারপাশে ঘন সবুজে ঢাকা বনভূমি, মাঝেমাঝে কাঠের সাঁকো, নিচে পাথরঘেরা জলধারা। এই অভিযানে কর্ণ তাদের অদৃশ্য সঙ্গী হয়ে ওঠে—পিছনের ঘন জঙ্গলে তার চলার শব্দ যেন দিক নির্দেশ করে। পথ চলতে চলতে মায়া আর অরিন্দমের কথার বিষয় জঙ্গলের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। মায়া বলে, “আপনার কাছে বেঁচে থাকা মানে কী?” অরিন্দম থেমে যায় কিছুক্ষণ, তারপর বলে, “শব্দহীনতার সঙ্গে সহবাস। যেখানে কিছু বলার নেই, কিন্তু অনুভব প্রচণ্ড।” মায়া জবাব দেয়, “তাহলে আমার ছবি আর আপনার নিরবতা হয়তো একই ভাষায় কথা বলে।” কথাটা বলে সে চুপ করে যায়, যেন একটু বেশি বলে ফেলেছে। অরিন্দম কিছু বলে না, শুধু হাঁটতে হাঁটতে পাশে থাকা বাঁশঝাড় থেকে একটা পাতা ছিঁড়ে নেয়, ঘোরায় হাতে—তার চোখে তখন আকাশ, মাটির ফাঁকে ভালোবাসা, আর তার অনুচ্চারিত ভার।

ঝরনার ধারে এসে দুজনে থামে। মায়া ড্রোন ওড়ায়, ক্যামেরা সেট করে অপেক্ষা করে। কয়েক ঘন্টা কেটে যায়, বাঁকুড়ের সুর আবার শোনা যায় না। সূর্য হেলে পড়েছে পশ্চিমে, আলো ঝিমিয়ে আসছে পাতার গায়ে। এমন সময় হঠাৎ একটা নীল-ধূসর ঝলক ভেসে ওঠে ঝরনার ওপারে—এক সেকেন্ডের কম, তারপর মিলিয়ে যায়। মায়া শ্বাসরুদ্ধ হয়ে বলে, “দেখলেন?” অরিন্দম বলে, “হ্যাঁ। এবার সত্যিই সে এসেছে।” এরপরের কিছুটা সময় ছিল ঘোরের মতো—মায়া নিজের জীবনবোধ ভুলে শুধু ক্যামেরার লেন্সে বন্দি করতে থাকে সেই অদৃশ্য পাখির উপস্থিতি, তার পাখা নড়ার শব্দ, তার ঝরনার ওপারে উড়াল। অরিন্দম তাকে দেখে, যেন প্রথমবার এক মানুষের চোখে পূর্ণতা দেখতে পাচ্ছে। সেই সন্ধ্যায় তারা বনবিট অফিসে ফিরল ধূলোমাখা, ক্লান্ত, কিন্তু এক অনির্বচনীয় প্রশান্তি নিয়ে। মায়া তার ছবির মধ্যে খুঁজে পেল সেই পুরোনো, হারানো আত্মবিশ্বাস, আর অরিন্দম তার নীরব জীবনের এক ক্ষণিক শব্দ—যা হয়তো প্রেম নয়, তবে প্রেমের প্রতিধ্বনি।

সেই রাতে চাঁদ উঠেছিল দেরি করে। অরিন্দম বসেছিল কর্ণের পাশে, মায়া চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল কেবিনের বারান্দায়। দূর থেকে বাঁকুড়ের সুর আবার একবার ভেসে এলো—আবার হারিয়ে গেল। মায়া আস্তে করে বলল, “আমার মনে হচ্ছে, ও আমাদের ডেকে বলে গেল—সব কিছু ধরে রাখতে হয় না, কিছু কিছু শুধু অনুভব করতে হয়।” অরিন্দম একবার তার দিকে তাকাল, তারপর কর্ণের শুঁড়ে হাত বুলিয়ে বলল, “হয়তো ওরাই আমাদের শিখিয়ে দেয় ভালোবাসা মানে আসলে উপস্থিতি নয়, উপলব্ধি।” ওই গভীর রাতে, বনভূমির ঘন অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা দুটি মানুষ, কেউ কিছু বলেনি আর—তারা কেবল শুনেছিল বাতাসের শব্দ, পাতার কাঁপন, আর হৃদয়ের নিঃশব্দ তর্জমা।

বৃষ্টিভেজা সকালটা শিলিগুড়ির অরণ্যে এক অদ্ভুত আবেশে ঘুম ভাঙায় অনিন্দিতার। লজের জানালায় বড় বড় জলের ফোঁটাগুলো পড়ে ছন্দে ছন্দে বাজছে। বাইরে বৃষ্টি কমে এসেছে, কিন্তু মাটি থেকে উঠে আসা সোঁদা গন্ধে ভরে আছে গোটা বনাঞ্চল। সে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকে দূরের আকাশপানে, যেখানে মেঘ ফুঁড়ে একটু একটু করে সূর্যের আলো নামছে পাতার ফাঁক গলে। গতকালের কথোপকথন আজও তার মনে রয়ে গেছে—অরিত্রর চোখের চাহনি, সেই গভীর নিঃশব্দ ভাষা। অনিন্দিতা বুঝে ফেলেছিল, এই লোকটা যেন শুধু বনের গন্ধ নয়, তার ভেতরের নির্জনতাও পড়তে পারে। কিন্তু সে কি নিজের ভালোবাসার অনুভব সত্যিই বুঝেছে? নাকি এটাও তার ক্যামেরার ফ্রেমে ধরা পড়া অন্য এক দৃশ্যমাত্র? তার মনের এই দ্বিধার মাঝেও, সে ঠিক করে আজ আবার বেরোবে, এইবার অরিত্রর সঙ্গে, অরণ্যের আরও গভীরে।

অরিত্র সকালে বন দপ্তরের ছাউনির দিকে যাচ্ছিল, হঠাৎ দেখে অনিন্দিতা তার জিপ নিয়ে অপেক্ষা করছে, এক গাছগাছালিতে ঘেরা মোড়ের ধারে। ছাতা নেই, শুধু একটা রেইনজ্যাকেট, চোখে সেই পুরোনো আত্মবিশ্বাস। “আজ আমি গাইড হব,” অনিন্দিতা বলে হেসে। অরিত্রর চোখে খেলে যায় প্রশ্রয় মেশানো বিস্ময়। তারা আজ হাঁটা শুরু করে পশ্চিম বোলসন গহ্বরের দিকে, যেটা শিলিগুড়ির গভীরতর অরণ্যের মধ্যে অবস্থিত। রাস্তায় কথা হয় অল্প, কিন্তু প্রতিটি শব্দ যেন গাছের পাতায় জমা হয়ে থেকেছে অনেককাল—আজ শুধু তাদের ছুঁয়ে যাচ্ছে। অরণ্য যেন খুলে দিতে শুরু করে তার নিজের অজানা অধ্যায়; এক বুনো ফুলের গন্ধ, পাখির অব্যক্ত গান, মাটির খাঁজে জমে থাকা ছাপ। তারা এক ঝর্ণার ধারে বসে, দুজনে চুপ করে তাকিয়ে থাকে জলের স্রোতের দিকে। অরিত্র বলে ওঠে, “এই ঝর্ণাটা আমার খুব প্রিয়—জীবনের মত, সব বাধা কেটে এগিয়ে যায়, নিজের পথ নিজে খুঁজে নেয়।” অনিন্দিতা শুধু শুনে যায়, মনে মনে ভাবে—তবে কি তিনিও এমনই? একা পথ খুঁজে নেওয়া মানুষ?

বিকেলের দিকে বৃষ্টি ফের নামে। তারা কাছেই একটা কাঠের পুরনো ফাঁড়িতে আশ্রয় নেয়, যা এখন পরিত্যক্ত। জানালার ফাঁক দিয়ে আলো পড়ে অরিত্রর মুখে, তার গালে জমা পুরোনো ক্লান্তি আজ যেন অনিন্দিতা পড়তে পারে। সে জিজ্ঞেস করে, “তুমি কেন এই নির্জনে থাকো? তোমার কি একাকীত্ব লাগে না?” অরিত্র কিছুক্ষণ চুপ থাকে, তারপর বলে, “অরণ্য কখনো একা রাখে না, যদি তুমি তার ভাষা বোঝো। কিন্তু মানুষ… মানুষ বড় নিষ্ঠুর, তারা প্রায়ই ভুলে যায় শুনতে। তাই আমি এই বনকে বেছে নিয়েছি।” অনিন্দিতার চোখে জল আসে, অরিত্র দেখতে পায়, কিন্তু কিছু বলে না। তারাও চুপ করে বসে থাকে, কাঁপা আলোয় আলো-অন্ধকারে গলে যায় দূরত্বের সব রেখা। সেই রাতে অনিন্দিতা তার ডায়েরিতে লেখে, “আমি আজ প্রকৃতির ভাষা একটু বেশি বুঝতে পেরেছি, কারণ তার প্রতিধ্বনি আজ আমার হৃদয়ে ধরা পড়েছে।”

শিলিগুড়ির অরণ্য তখনও শান্ত, কিন্তু সেই নিস্তব্ধতার মধ্যে যেন জমে ছিল এক অজানা অপেক্ষা। নীলয়ের সঙ্গে অরণীর সম্পর্ক এখন অনেকটাই স্পষ্ট, অনেকটাই গাঢ়। কিন্তু এই নিঃশব্দতা, এই বন্ধন—তা কি প্রকৃতির ছায়ায় জন্ম নেওয়া এক মুহূর্তিক অনুভব, না কি দীর্ঘস্থায়ী কিছু? নীলয় এই প্রশ্নেই জর্জরিত। অরণী, তার ক্যামেরার লেন্সে জীবনের প্রতিচ্ছবি খুঁজতে গিয়ে এক অদ্ভুত প্রেমের আবিষ্কারে আস্থাবান হয়ে উঠেছে। কিন্তু সে জানে, এই প্রেমের ভিত্তি অনিশ্চিত। কারণ অরণী এখানে নেই স্থায়ী ভাবে, সে চিরকাল শহরের সন্তান, আর নীলয় বন বিভাগের স্থায়ী কর্মী—তাঁর জীবন ছায়া ও সবুজের গহ্বরে বাঁধা।

একদিন, সকালবেলা গহীন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে একটি পুরোনো ট্রেল ধরেই নীলয় ও অরণী হাঁটছিল। সেখানে একটি বিরল পাখির সন্ধান পেয়েছে অরণী—’ভুতকাক’, যে এখানে খুব কম দেখা যায়। ক্যামেরা হাতে নিয়ে সে সাবধানে এগোচ্ছিল, আর নীলয়, তার ঠিক পাশে পাশে, গাছপালার আড়াল থেকে আগত যে কোনও বিপদ ঠেকাতে প্রস্তুত। কিন্তু হঠাৎ একটা শব্দ—ভেঙে পড়ল শাখা। অরণী পা পিছলে পড়ে গেল এক সরু গিরিখাতে। মুহূর্তে সব ওলটপালট। নীলয় ঝাঁপ দিল। তার কাঁধে চোট লাগলেও সে অরণীকে তুলে আনতে পারল। রক্তাক্ত হাত আর কাদায় মাখামাখি শরীর নিয়ে দুজনে বসে পড়ল এক জায়গায়। সেই মুহূর্তেই অরণী কাঁপতে কাঁপতে বলে উঠল, “আমি ভেবেছিলাম… হয়তো আমি আর উঠতে পারব না… আর তোকে দেখতে পাব না…” নীলয় তাঁর কাঁধে মাথা রাখল। এই নীরবতায় যেন প্রকৃতির মাঝখানে হৃদয়ের অনুরণন ভেসে উঠল।

এই ঘটনার পর দুজনের মধ্যে আর কোনও দূরত্ব রইল না, কিন্তু বাস্তবের কাঁটাতার ফের ফিরে এলো অরণীর এক ফোনকলের মাধ্যমে। কলকাতা থেকে ফোন এসেছে—তার শহুরে জীবন, একটি আন্তর্জাতিক ন্যাচার ফটোগ্রাফি পুরস্কারের মনোনয়ন, আর সঙ্গে একটি ইউরোপ-ভিত্তিক জার্নাল থেকে স্থায়ী কাজের প্রস্তাব। এক সপ্তাহের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে তাকে। রাতে, শিবিরের আগুনের পাশে বসে দুজনে চুপচাপ ছিল। অরণী বলে, “আমি তোকে ছেড়ে যেতে চাই না… কিন্তু জানিসই তো, আমার স্বপ্নটা কতদিনের…” নীলয় চোখ নামিয়ে বলল, “আমি জানি, তোর স্বপ্ন ডানাওয়ালা… কিন্তু জানিস, আমি এই অরণ্যের শিকড়।” অরণী চুপ করে রইল। আগুনের শিখায় তাদের মুখের ছায়া এক মুহূর্তের জন্য জ্বলজ্বল করল—তারপর নিভে গেল, ঠিক যেমন করে তাদের ভালবাসার ভবিষ্যৎ এক অনিশ্চিত ছায়ায় ঢেকে গেল।

সকালের আলো যখন পত্রপল্লব ছুঁয়ে শিলিগুড়ির ঘন জঙ্গলে সোনালি রেখা ফেলে, তখন মাধব একটি নতুন নোটিশ বোর্ডের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। ‘সুন্দরী জলপ্রপাত অভয়ারণ্য – পর্যটকদের জন্য বন্ধ, সংরক্ষিত এলাকা’। তার হৃদয় জুড়ে এক অদ্ভুত প্রশান্তি, যেন এই অরণ্য তার নিজের রক্তমাংসের শরীরের মতো। গত কয়েক সপ্তাহে মাধব ও অরণ্যার বন্ধন নতুন রূপ নিয়েছে—নতুন এক বোঝাপড়া, নতুন এক সম্পর্ক, যা শব্দহীন অথচ গভীর। প্রতিদিন সকালে তারা একসাথে জঙ্গলে যায়, ক্যামেরা আর ডায়েরি হাতে অরণ্যা, আর নিরাপত্তা সরঞ্জাম নিয়ে মাধব। পাহাড়ি বাঁকে বসে জলখাবার ভাগ করে নেওয়া, ঝর্ণার নিচে দাঁড়িয়ে চুপ করে মেঘে ঢাকা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা—এভাবেই তারা খুঁজে নিচ্ছে একান্ত নিজস্ব এক জীবনের ছায়াপথ।

একদিন ভোরে, তারা যায় হাওয়াঘাটা পেরিয়ে পাহাড়ি নদীর ওপারে এক বিরলপ্রজাতির পাখির খোঁজে। অরণ্যা চুপচাপ বসে ক্যামেরা তাক করে, আর মাধব পাহারা দেয়। হঠাৎ হঠাৎ একে অপরের চোখে চোখ পড়ে, অথচ কেউ কিছু বলে না—সেই না বলা কথাগুলোই যেন সবচেয়ে স্পষ্ট, সবচেয়ে নিবিড়। কিন্তু সেই নিঃশব্দ শান্তিকে ভেঙে দেয় হঠাৎ বনদপ্তরের এক চিঠি—অরণ্যাকে নতুন একটি আন্তর্জাতিক প্রজেক্টে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব এসেছে, আফ্রিকার কেনিয়ার এক সাফারি অঞ্চলে। দু’জনেই জানে, এ প্রস্তাব অস্বীকার করার মতো নয়—কিন্তু একে মানাও সহজ নয়। চুপ করে বসে থাকা অরণ্যার পাশে মাধব বলে, “তুমি যাবে, আমি জানি। তোমার জগতটা বিশাল, আর আমারটা এই বনেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু আমি অপেক্ষা করব, প্রতিদিন, এই ঝর্ণার নিচে।” অরণ্যার চোখে জল আসে, সে বলে, “তুমি বুঝলে, তাই তো ভালোবাসা এমন নিঃশব্দে বড় হয়।”

অরণ্যা চলে যায় ঠিক এক সপ্তাহ পর। শিলিগুড়ি স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে মাধব তাকে বিদায় জানায় না, শুধু দূর থেকে দেখে একবার। ট্রেন চলে যায়, অরণ্যা চোখ নামিয়ে ফেলে। কিন্তু তার ডায়েরির পাতায় লেখা থাকে—“মাধব, আমি ফিরব। এই অরণ্য, এই ঝর্ণা, আর তোমার প্রতীক্ষা—সবকিছুই আমার ফিরে আসার প্রতিধ্বনি।” পাঁচ বছর পর, এক বর্ষার সকালে সেই একই জলপ্রপাতের নিচে বসে থাকা মাধব দেখে, এক নারী ক্যামেরা হাতে ফিরে এসেছে। দুজনের চোখে আর কোন প্রশ্ন নেই, উত্তরও নেই—শুধু একটাই প্রতিধ্বনি, সেই প্রথম ভালোবাসার যা কখনো হারায়নি, শুধু অপেক্ষা করেছিল প্রকৃতির ভাষায় ফিরে আসার জন্য।

সমাপ্ত

1000044043.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *