মৌসুমী চাকী
জলপাইগুড়ির উত্তর প্রান্তে, টেলিপাড়া থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে একটা পুরনো চা-বাগানের পাশে দাঁড়িয়ে আছে সেই বাড়িটা। স্থানীয় লোকেরা একে বলে—”হানা বাড়ি”। লোকে সন্ধ্যার পর ওদিক মাড়ায় না। কেউ কেউ বলেছে, রাতের আঁধারে বাড়ির জানালা দিয়ে ধোঁয়ার মতো সাদা ছায়া উঁকি মারে, কেউ আবার বলেছে পুরনো ঘড়ির টিকটিক শব্দ রাত ৩টার পরেও শোনা যায়, যদিও ঘড়িটা নাকি বহু আগেই বন্ধ।
বাড়িটায় এখন কেউ থাকে না। তবে প্রায় এক দশক আগে এখানে থাকতেন এক রহস্যময় মানুষ—অরিন্দম বসু। কলকাতা থেকে এসেছিলেন। শহুরে ভঙ্গি, অথচ চোখে ছিল কেমন অদ্ভুত বিষণ্ণতা। তিনি চা-বাগানের কাছে বাড়িটা কিনে বেশ কিছুকাল একা একা থেকেছিলেন। লোকমুখে শোনা যায়, তাঁর স্ত্রী দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার পরই তিনি সব ছেড়েছুড়ে জলপাইগুড়ি চলে আসেন।
গল্পটা শুরু হয় যখন শঙ্খ মুখার্জি নামে এক তরুণ গবেষক কলকাতা থেকে জলপাইগুড়ি আসে। তার গবেষণার বিষয় ছিল: উত্তরবঙ্গের লোককথা ও প্রেতচর্চার প্রভাব। সে বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে একটা প্রজেক্ট পেয়েছে, আর সেজন্যই সে খুঁজতে থাকে এমন এক জায়গা যেখানে সে বাস্তব অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করতে পারে। একজন বৃদ্ধ অধ্যাপক তাকে বলেন—”যদি সাহস থাকে, হানা বাড়িটায় গিয়ে কিছুদিন থাকো।” শঙ্খর কৌতূহল চরমে ওঠে।
শঙ্খ বাড়িটা দেখতে যায় এক দুপুরে। মেঘলা আকাশ, বাতাসে চা পাতার গন্ধ, আর ঝিম ধরা বিকেল। বাড়িটা দেখতেই গা ছমছম করে। সামনে বাঁধানো উঠোন, চারপাশে ঝোপঝাড়। লোহার গেটটা আধা খোলা, যেন কেউ বা কিছু তাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। দরজাটা ভারী, কাঠের, আর তার ওপর লাল রঙের পুরনো তালা ঝুলছে।
বাড়ির কেয়ারটেকার সলেমান হালদার, যিনি মূলত বাগানের কাজ দেখেন, বলেন, “সাহেব, আপনারা শহরের লোক। সাহস থাকলে থাকুন, কিন্তু আমি সন্ধ্যার পর পা দিই না ওখানে।”
শঙ্খ হাসে, “ভূতের ভয় পাই না আমি।”
সলেমান নিচু স্বরে বলে, “ভূত মানেই ভয় না। কিছু কিছু জায়গা ‘জেগে থাকে’ সাহেব। মানুষ ঘুমায়, কিন্তু কিছু জেগে থাকে।”
শঙ্খ বাড়িতে ঢোকে পরদিন সকালে। সঙ্গে একটা ব্যাগ, ল্যাপটপ, ক্যামেরা আর নোটবুক। সে প্ল্যান করে এক সপ্তাহ থাকবে। প্রথম দু’দিন খুব কিছু ঘটে না। সে বাগান ঘুরে দেখে, গ্রামের লোকেদের সঙ্গে কথা বলে। সবাই হানা বাড়ির নাম শুনলেই চুপ হয়ে যায়।
তৃতীয় রাতে কিছু একটা ঘটে।
সেই রাতটা ছিল অমাবস্যা। সন্ধ্যা থেকেই বৃষ্টি পড়ছিল, হালকা বাতাসে জানালার পাল্লাগুলো দুলছিল। শঙ্খ ডায়েরি লিখছিল, হঠাৎ একটা শব্দে চমকে ওঠে। থামা দরজার আড়ালে যেন কেউ ধীরে ধীরে হাঁটছে—চপ… চপ… চপ…
সে উঠে গিয়ে দরজাটা খুলে দেখে, কেউ নেই। কিন্তু সিঁড়ির ধাপে জল পড়া পায়ের ছাপ। গেট বন্ধ ছিল, দরজা বন্ধ ছিল। তাহলে?
সে নোট নিতে শুরু করে। ‘৩য় রাত—জুতোর শব্দ ও জলযুক্ত পায়ের ছাপ। বিকল্প ব্যাখ্যা: কেয়ারটেকার? কিন্তু গেট বন্ধ ছিল।’
পরদিন সকালটা অস্বাভাবিক ঠান্ডা। এমনকি গ্রীষ্মের এই দিনে সকাল ১০টায়ও কুয়াশা জমে আছে। শঙ্খ দেখে, ঘরের এক কোণে সাদা কাপড়ের মধ্যে কি যেন পড়ে আছে। সে হাত দিয়ে তুলতে গিয়ে দেখে—একটা পুরনো মেয়েলি চুড়ি। রুপোর তৈরি। কিছু একটা লেখা আছে—”আরু”।
সে ভাবতে থাকে—এটা কোথা থেকে এলো?
সে সলেমানকে দেখায়।
সলেমান পিছু হটে, কাঁপতে কাঁপতে বলে, “এই চুড়ি আমি চিনি। ওটা ওর স্ত্রী’র। যেদিন উনি বাড়ির ভেতরে আত্মহত্যা করেন, সেদিনই এই চুড়ি গায়েব হয়েছিল। আপনি কোথা থেকে পেলেন?”
“বাড়ির ভিতরেই তো!”—শঙ্খর গলা শুকিয়ে আসে।
রাত বাড়ে। এবার শঙ্খ ক্যামেরা সেট করে দেয় ঘরের এক কোণে। ইনফ্রারেড মোডে। সে ঠিক করে এবার সে প্রমাণ পাবে। রেকর্ডিং চালু রেখে সে শুয়ে পড়ে।
রাত আড়াইটার সময় ঘুম ভেঙে যায় হঠাৎ। ঘরের মধ্যে একটা কাঁপা কাঁপা গলায় কেউ যেন গান গাইছে—
“আলো না-আলো মাঝে, কারা ডাকে রে”…
ঘর অন্ধকার, কিন্তু গানটা ঘরের ভেতর থেকে আসছে।
শঙ্খ গলা শুকনো মুখে ক্যামেরার দিকে তাকায়—লাল আলো জ্বলছে, মানে ভিডিও চলছে। সে উঠে খোঁজ করে—ঘরে কেউ নেই। কিন্তু বাতাস কেমন ভারি। যেন কোনো প্রাচীন অভিমান ছড়িয়ে আছে দেয়াল জুড়ে।
সকালে ক্যামেরা দেখে শঙ্খ হতবাক। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে—রাত ২:৩৭-এ জানালার পর্দা নিজে থেকেই সরে যাচ্ছে। তারপর এক হালকা ধোঁয়ার মতো অবয়ব ধীরে ধীরে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করছে। তারপরে কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। আর তারপর সে নিচু গলায় গান শুরু করে।
আরও ভয়াবহ ব্যাপার হলো—ঘরের এক কোণে রাখা ডায়েরির পাতা আপনি আপনি উলটে যাচ্ছে, যেন কেউ তা পড়ছে।
শঙ্খ ভাবে—এটা যদি প্রমাণিত হয়, তাহলে সে তার গবেষণায় সোনা পেয়ে যাবে।
কিন্তু সে বোঝে না—এই বাড়ির ছায়া ধীরে ধীরে তার শরীর আর মনকে গ্রাস করছে।
রাত গভীর হলেই তার মাথায় কেমন ধোঁয়া জমে, কানে বাজে ভেসে আসা এক নারীকণ্ঠ—”তুমি এলেই বা কেন?”
***
জলপাইগুড়ির হানা বাড়ি যেন অদৃশ্য দেয়ালে ধরা পড়া এক আদি অভিশাপ। শঙ্খর দেহে এখন ভয় নেই—কিন্তু আছে এমন এক কৌতূহল, যা মৃত্যু পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে।
তিন দিন হয়ে গেছে শঙ্খ হানা বাড়িতে। গত রাতের রেকর্ডিং তার গবেষণার সবচেয়ে বড় আবিষ্কার হতে পারত, কিন্তু তার চেয়েও বড় প্রশ্ন এখন তার মাথায় ঘুরছে—“আরু কে?”
শঙ্খ ক্যামেরার ফুটেজ আবার বারবার দেখে। সেই ধোঁয়ার মত নারীমূর্তি গান গাইছে—
“আলো না-আলো মাঝে, কারা ডাকে রে”…
তার কণ্ঠে করুণ অনুরোধ, গলার কাঁপুনি যেন বাতাস কাঁপায়। শঙ্খ তার ক্যামেরা, ডায়েরি ও সেই রুপোর চুড়ি নিয়ে ছুটে যায় জলপাইগুড়ি মহাবিদ্যালয়ের লোকসাহিত্য বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক সুধাংশু চক্রবর্তীর কাছে।
সুধাংশু বাবু একসময় প্রেততত্ত্ব নিয়ে বহু কাজ করেছেন। বয়স আশির কোঠায়, কিন্তু চোখে আগুনের মত ঝিলিক।
শঙ্খ চুড়িটা দেখায়। অধ্যাপক একটুখানি থেমে বলেন,
— “এই চিহ্নটা দেখেছো? এই যে ছোট্ট ‘অ’, তারপরে ‘রু’, এটা আগের যুগের নকশা। জলপাইগুড়ির চা-বাগান অঞ্চলে একসময় এক মেয়ে ছিল—আরুন্ধতী সেনগুপ্ত, ডাকনাম ‘আরু’। তার সঙ্গে এই বাড়ির প্রথম বাসিন্দা অরিন্দম বসুর সম্পর্ক ছিল। কিন্তু ব্যাপারটা সহজ প্রেমের গল্প নয়।”
শঙ্খ থমকে যায়, “তাহলে?”
— “আরু ছিল এখানকার এক চা-বাগানের ডাক্তার কন্যা। অরিন্দম ওকে বিয়ে করতে চেয়েছিল, কিন্তু ওর বাবার আপত্তি ছিল—কারণ অরিন্দমের স্ত্রীর মৃত্যু রহস্যজনক। কেউ কেউ বলে, স্ত্রীর মৃত্যু আসলে আত্মহত্যা নয়, বরং… হত্যা। আরু তা বিশ্বাস করেনি, কিন্তু তারপর হঠাৎ এক রাতে, আরু গায়েব হয়ে যায়।”
শঙ্খর কাঁধ কেঁপে ওঠে, “আরু… মারা যান?”
— “মিলল না কখনও। শুধু সেই চুড়ি টা… ওটাই পাওয়া গেছিল বাড়ির পশ্চিম ঘরের পেছনের কুয়োর ধারে। তারপর থেকেই বাড়িটা খালি হয়ে যায়। অরিন্দম হঠাৎ উধাও, তার মৃত্যুর খবর কখনও আসেনি, কিন্তু কেউ দেখে না ওকে।”
শঙ্খ ধীরে ধীরে বুঝতে পারে—এই বাড়ির দেয়ালে মৃত্যু আটকে নেই, আটকে আছে অসমাপ্ত ভালোবাসা, অনাচার, প্রতারণা।
চতুর্থ রাতে শঙ্খ ঘুমাতে পারে না। সে নিজে থেকেই যায় বাড়ির পেছনের কুয়োর দিকে। রাত ২:১৫।
আকাশে চাঁদ নেই। বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে পাতায় পাতায়, আর কুয়োর ধারে থমকে থাকে হাওয়ার নিঃশ্বাস। সে দেখল—কুয়োর ধারে কাদা মাটিতে আবার সেই পায়ের ছাপ। সরু, মেয়েলি গড়নের, ঠিক যেন কেউ পায়ের পাতায় জল নিয়ে হাঁটছে।
হঠাৎ কুয়োর জলে যেন একটা মুখ ভেসে ওঠে। সাদা, ফ্যাকাশে মুখ, চোখদুটো হা করে তাকিয়ে আছে। শঙ্খ চিৎকার করতে গিয়েও পারে না, গলা আটকে যায়। পেছন থেকে যেন এক হাত তার কাঁধে ছোঁয়—
“তুমি বুঝতে পারো না কেন?… আমাকে খুঁজে বের করো। আমাকে তুলে আনো।”
সে ছিটকে পড়ে যায় কাদার মধ্যে।
সকালে তার জ্বর আসে। ১০৩ ডিগ্রি। সলেমান এসে তাকে উদ্ধার করে, বিছানায় শুইয়ে রাখে। শঙ্খের জ্বরের ঘোরে সে শুধু একটাই কথা বলছে—
“আরু… কুয়ো… তলদেশে কিছু আছে…”
জ্বর কিছুটা কমলে, শঙ্খ উঠে বসে। সে স্থির সিদ্ধান্ত নেয়—কুয়োটা খুঁড়বে। যদি কিছু থেকে থাকে, যদি কোনো প্রমাণ… যদি সত্যিই মৃত্যুর পরে কেউ আটকে পড়ে, তাহলে সে তা জানতে চায়।
পরদিন সকালে সে গ্রামের একজন মিস্ত্রি আর কুয়োর পাড় কাটার লোক ডেকে আনে। তারা ভয় পায়, কিন্তু শঙ্খ বলে, “আমি দায়িত্ব নিচ্ছি। তোমরা শুধু কাজটা করো।”
দুপুরে কাজ শুরু হয়।
প্রায় ছ’ফুট গভীরে গিয়েই প্রথম পাওয়া যায় একটা কাপড়ের টুকরো। পুরনো কাঁচি দিয়ে কাটা হয়েছিল, রক্তের দাগ তখনো বিবর্ণভাবে লেগে আছে। সঙ্গে একটা ছেঁড়া ডায়েরির পাতা—লেখা ছিল জলে ভিজে ঝাপসা:
“আমি বাঁচতে চাই। আমি জানতাম না ও এমন করবে। যদি কেউ পায়, জানিও আমি একা মরিনি…”
শঙ্খর হাত ঠান্ডা হয়ে যায়।
রাত ৩টায় সে আবার ঘুম থেকে ওঠে।
বাড়ির পশ্চিম দিকের জানালায় দাঁড়িয়ে কেউ—একজন মেয়ে।
সে জানে—এইবার ভয় পেলে চলবে না।
সে ধীরে ধীরে জানালার দিকে এগোয়।
মেয়েটি বলে,
“তুমি যদি আমার সত্যিটা বের করো, আমি মুক্তি পাব। এই দেয়ালের ভেতর আমি আটকে পড়েছি… বলো, তুমি পারবে?”
শঙ্খর চোখে জল আসে, সে বলে, “পারব…”
মেয়েটি জানালার দিকে হাত বাড়ায়, আর হঠাৎ ঘরের বাতাস ভারি হয়ে যায়। একসাথে পেছনের ঘড়ির কাঁটা বেজে ওঠে—“ঠং… ঠং… ঠং…”
ঠিক তিনবার।
ঘড়িটা তো বন্ধ ছিল বহু বছর ধরে।
শেষ দৃশ্য: শঙ্খ নিজের নোটবুকে লিখছে— “এই বাড়ির দেয়াল কথা বলে না। তবে এদের অভিমান আছে। প্রেম এখানে আত্মহত্যা নয়, হত্যা। আরু আমাকে খুঁজে পেয়েছে, এখন আমি তাকেও খুঁজে আনব।”
***
ঘুম আসে না শঙ্খর। গতরাতে জানালার ধারে যে ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে ছিল, সে ছিল আরু—এটা এখন তার নিশ্চিত। কিন্তু শুধু নিশ্চিত জেনে থেমে গেলে চলে না। তাকে মুক্ত করতে হবে, আর সেই মুক্তির চাবি লুকিয়ে আছে কুয়োর নিচে—যেখানে হয়তো শতাব্দীর জমে থাকা মিথ্যে আর অপরাধ আজও ফিসফিস করে।
সকালে উঠে শঙ্খ ভেজা ডায়েরির পাতাগুলো রোদে শুকিয়ে একটা একটা করে পেন্সিল স্কেচ করে পড়ে। লেখাগুলো ভাঙা ভাঙা, তবে কিছু জায়গায় স্পষ্ট:
“অরিন্দম আমার প্রতি একঘেয়ে হয়ে উঠেছে। এখন শুধু তার গবেষণাই সব। আমার দমবন্ধ লাগে এই বাড়িতে…”
আরেক পৃষ্ঠায়:
“গতরাতে ও আমাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিল। বলল আমি শুধু তার কাজে বাধা… আমি যদি মরে যাই, ও যেন খুশি হয়।”
শঙ্খর বুকের ভেতর ধড়ফড় করে ওঠে। পেছনের পাতায় রক্তের মতো লালচে দাগ। তার নিচে লেখা—
“জানি না বাঁচব কি না। যদি কেউ পায়… আমি ছিলাম, ভালোবেসেছিলাম।”
এটা স্পষ্ট—আরু শুধু নিখোঁজ নয়, তাকে কেউ সরিয়েছে। এবং কুয়ো সেই সত্যের কবর।
সন্ধেবেলা শঙ্খ আবার সেই মিস্ত্রিদের ডেকে আনে, এবার অন্য দুজনকে। সে জানে, গ্রামের লোক ভয়ে ভীত—তবুও সে প্রতিজ্ঞা করে আজ কুয়োর তলদেশ পর্যন্ত নামবে।
লোহার মই জোগাড় করে সে নামতে শুরু করে। পাশে একটা হেডল্যাম্প, কোমরে বাধা দড়ি, আর বুকের কাছে সেই রুপোর চুড়িটা।
কুয়োটা গভীর, ঠান্ডা, স্যাঁতসেঁতে। পনেরো ফুট নামার পর সে দেখে একটা গর্ত, যেন মানুষের বানানো চেম্বার। এটা তো কুয়ো নয়, এটা একটা আস্ত ঘর!
চেম্বারের ভিতরে ভাঙা কফিনের মতো কিছু কাঠের বাক্স, অর্ধগলা পোড়া জামাকাপড়। একপাশে পড়ে আছে একটা ছোট রুপোর আয়না। আয়নার গায়ে খোদাই: “A.S.”
আরুন্ধতী সেনগুপ্ত।
হঠাৎ একধরনের শীতল বাতাস এসে পড়ে তার পেছনে। কে যেন বলছে, “আমি এখানে… আমি এখানেই…”
হেডল্যাম্পের আলোয় সে দেখতে পায় দেয়ালে আঁচড়ের দাগ, লেখা—
“ও আমাকে এখানে রেখেছে… আমি বাঁচতে চাই… আমি আলো দেখতে চাই…”
শঙ্খ হকচকিয়ে ওঠে। এখানেই আরু বন্দি ছিল—জ্যান্ত?
নাকি… মৃত হয়ে আটকে?
এক কোণে একটা ছোটো টিনের বাক্স। সেটার মুখে মরচে পড়া তালা ভাঙতেই বেরিয়ে আসে পুরনো কাগজের বান্ডিল। চিঠির বান্ডিল।
চিঠিগুলোর মধ্যে কিছুটা অরিন্দম বসুর হাতে লেখা:
“আমি জানতাম ও চলে যাবে। আমি জানতাম ও আমায় ছেড়ে যাবে, যেমন ছেড়েছিল প্রথম স্ত্রীও। আমি পারিনি… আমি পারিনি তাকে যেতে দিতে।”
আর এক জায়গায়:
“ওর কণ্ঠস্বর রাতে এখনো শুনি। সে বলে—‘আমি বাঁচতে চাই’। ও জানে না, ওর জন্যই আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি।”
শঙ্খর কাছে এটা আর গবেষণা নয়—এটা এখন এক আত্মার মুক্তির অনুরোধ।
সে ভাবে—এইসব প্রমাণ, এই চিঠি, এই লেখা—সবকিছু তাকে জমা দিতে হবে, রেকর্ড করতে হবে। ইতিহাসকে পাল্টাতে হবে।
রাতে ঘরে ফিরে শঙ্খ সেই আয়নাটা সামনে রেখে বসে। আয়নার প্রতিফলনে হঠাৎ আবার দেখা যায় আরুর মুখ—কিন্তু এবার চোখে ভয় নেই, আছে শান্তি।
সে বলে—
“তুমি আমার কথা শুনেছো… তুমি আমার কণ্ঠ রেকর্ড করেছো, আমার কাহিনি জেনেছো… এখন বলো, তুমি কী করবে?”
শঙ্খ ধীরে ধীরে মাথা নাড়ে।
“তোমার জন্য আমি একটা বই লিখব। একটা চলচ্চিত্র বানাবো। তোমার নামে একটা সত্যি থাকবে। তুমি হারিয়ে যাবে না।”
আরু হাসে। খোলা জানালায় বাতাস ঢোকে, মিষ্টি নারকেল গন্ধ, হালকা হাসির সুর ভেসে আসে—আরু যেন ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে।
তার শেষ কথাগুলো বাতাসে ভেসে ওঠে—
“আমি আলোতে ফিরছি… আর কেউ যেন আমার মত অন্ধকারে না পড়ে।”
পরদিন শঙ্খ থানায় যোগাযোগ করে, স্থানীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগকেও জানায়। হানা বাড়ি এখন সংরক্ষণের তালিকায়। কুয়ো সিল করে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু চিঠি, ডায়েরি, চুড়ি আর আয়না শহরের মিউজিয়ামে জায়গা পেয়েছে—নাম দেওয়া হয়েছে:
“আরুন্ধতী গ্যালারি: এক হারিয়ে যাওয়া কণ্ঠের গল্প”
গল্প শেষ হয়নি—গল্প এখন শুরু হয়েছে।
শঙ্খ বাড়ি ফেরে। ডায়েরির শেষ পাতায় লিখে রাখে—
“সব ইতিহাসের গলা থাকে না। কিন্তু কিছু ইতিহাস চিৎকার করে। জলপাইগুড়ির হানা বাড়ি সেই চিৎকার।”
***
“আরুন্ধতী সেনগুপ্ত নামে কেউ ছিল না। এই নামের কোনো মৃত্যুর খবর রেকর্ডে নেই।”
সংবাদপত্রে, টিভির খবরে একটার পর একটা বিতর্ক:
“গল্প না সত্যি?”
“হানা বাড়ির ইতিহাস কী আদৌ বাস্তব?”
“একজন লেখক ও গবেষকের মিডিয়া স্টান্ট?”
শঙ্খর উপর চাপ আসতে থাকে। প্রকাশক জানায়—এই বই যদি বাজারে আসে, মানহানির মামলা হতে পারে। লোকজন বলতে শুরু করে—শঙ্খ মনগড়া ইতিহাস বানিয়েছে।
তবু সে পিছিয়ে যায় না। সে জানে, আরুর আত্মা এখনো মুক্ত হয়নি—কারণ বাড়ি আবার ডাকছে।
জ্যৈষ্ঠের এক গা ছমছমে রাত। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামছে। হানা বাড়ির বারান্দায় বসে শঙ্খ তার রেকর্ডারটা নিয়ে আবার অপেক্ষা করে।
হঠাৎ—একটা আওয়াজ:
“তারা আমাকে ভুলে যাচ্ছে…”
শঙ্খ চমকে উঠে। শব্দটা কার ছিল? সে বাইরে তাকায়—কেউ নেই। ঘরটা আবার ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। জানালার কাঁচের উপর ভিজে হাতের ছাপ।
রেকর্ডারে স্পষ্ট শুনতে পাওয়া যায় সেই কণ্ঠস্বর:
“আমার নাম ছিল, আমার স্বপ্ন ছিল। এখন আমি কেবল হাওয়া হয়ে গেছি… কেউ কি শুনছে?”
শঙ্খ চোখ বন্ধ করে বলে—
“শুনছি, আরু। আমি শুনছি। আমি চুপ করব না।
দু’দিন পর, বাড়ির বাইরে এসে গ্রামবাসীরা চিৎকার করতে থাকে।
“ভূতের গল্প বানিয়ে আমাদের গ্রামকে কলঙ্কিত করছো!”
“এই বাড়ি শান্ত ছিল! তুমি এসে সব উসকে দিলে!”
একজন পাথর ছোঁড়ে জানালার দিকে। স্থানীয় নেতারা হুঁশিয়ারি দেয়—“বাড়ি ছেড়ে চলে যাও।”
শঙ্খ ভয় পায় না। কিন্তু সে বুঝে, যদি কিছু না করে, লোকজন সত্যকে মাটিচাপা দেবে।
সে ঠিক করে, সব প্রমাণ জনসমক্ষে আনবে—সামাজিক মাধ্যমে, প্রকাশনায়, ফিল্মে।
শঙ্খ রাতভর কাজ করে ডায়েরির পাতাগুলো ডিজিটাল করে রাখছে। হঠাৎ, এক পাতায় চোখ পড়ে—যেটা আগে নজরে আসেনি।
পাতাটা তেলে-পুড়ে আধখানা ছিল। স্পষ্ট লেখা:
“যদি কেউ আমাকে পায়… আমি চাই তারা জানুক, আমি কাউকে দোষ দিই না। শুধু চাই, সত্যিটা বেঁচে থাকুক…”
“আমি আরুন্ধতী, আমি ভালোবাসতে চেয়েছিলাম। আর সেই ভালবাসাই আমার কারাগার হয়ে উঠল।”
শঙ্খর চোখ ভিজে যায়। সে জানে, এটা কেবল এক নারীর নয়—এই দেশের অগণিত নারী, প্রেমিকা, স্ত্রী, কন্যার ইতিহাস—যাদের কণ্ঠস্বর চিরকাল অদৃশ্য হয়ে থাকে।
এক রাতে, শঙ্খ দেখে তার রেকর্ডারে আপনা থেকে শব্দ বাজছে—যেখানে কোনো ফাইল নেই। আরুর কণ্ঠ ভেসে আসে:
“তুমি আমার কথা বলেছো… এবার আমি যাচ্ছি…”
ঘরটা কেঁপে ওঠে। আয়নাটা নিজে থেকেই মেঝেতে পড়ে গিয়ে চুরমার হয়। বাতাসে ভেসে আসে শেষ গন্ধ—মিষ্টি নারকেলের মতো, শান্ত, যেন কেউ এখন মুক্ত।
তারপর হানা বাড়ি আর কিছু বলে না।
শঙ্খ জানে—গল্প শেষ হয়েছে।
অন্তত এইজন্য।
শেষে সংক্ষিপ্ত নোট
শঙ্খর লেখা বই “হানা বাড়ির আত্মকথন” প্রকাশিত হয় স্বাধীন প্রকাশনায়। পাঠকেরা কেঁপে ওঠে। কেউ বিশ্বাস করে, কেউ বিতর্ক করে। কিন্তু একদিন, একজন প্রবীণ মহিলা এসে বলে—
“আরুন্ধতী আমার দিদি ছিল। ওর গল্প কেউ জানত না। তুমি বলে দিলে। ও এখন শান্তি পেয়েছে।”
শঙ্খ জানে—লেখকের কাজ শুধু গল্প বলা নয়, সেইসব কণ্ঠকে বাঁচিয়ে রাখা যাদের হারিয়ে দেওয়া হয়।
***
জলপাইগুড়ির ভেতরঘেঁষা গ্রামে হানা বাড়ি এখন ঘন সবুজে ঢাকা। বাড়ির দেয়ালগুলো মস ছাওয়া, জানালায় জংধরা শিক। কিন্তু একদিন, একটা গাড়ি এসে দাঁড়ায়।
নেমে আসে একজন তরুণী—ইরা। কলকাতা থেকে এসেছেন, চিত্রকর। শহুরে জীবনের কোলাহল ছেড়ে নির্জনে থাকার আশায় Airbnb-তে খুঁজে পেয়েছেন এই বাড়ি।
লোকজন তাকে সাবধান করে দেয়—“ও বাড়ি অভিশপ্ত।”
ইরা হেসে বলে, “গল্পে আমি ভয় পাই না।”
কিন্তু এই গল্প তার বিশ্বাসকে কাঁপিয়ে দেবে।
ইরা যখন প্রথম রাতটা কাটায়, তখনই অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে:
সে একটা লালপাড় সাদা শাড়ি পরা মেয়েকে দেখছে—সে দাঁড়িয়ে আছে কুয়োর ধারে।
মেয়েটা বলে, “আমার ছবি আঁকো, কেউ আমার মুখ মনে রাখেনি…”
ইরা ঘুম ভেঙে দেখে, তার ক্যানভাসে আঁকা মুখটা সেই মেয়েটির। কিন্তু সে তো চোখে দেখেনি তাকে, তবে কীভাবে?
সে ভাবে: কল্পনা। কিন্তু ঘরের দেয়াল থেকে যেন কেউ ফিসফিস করে—“আমার মুখ… আমার মুখ…”
ইরা বাড়ির ঘরদোর ঘাঁটতে গিয়ে পায় একটি কৌটো, যার ভিতরে পুরোনো চিঠি ও একটা ডায়েরি।
ডায়েরির উপরের পাতায় লেখা—“আরুন্ধতী সেনগুপ্ত”।
ইরা নামটা আগে শুনেছে। অনেক আগে একটা পডকাস্ট শুনেছিল—‘হানা বাড়ির আত্মকথন’, যেটা এক লেখক বানিয়েছিলেন এক মৃত নারীর কাহিনি নিয়ে।
ইরা ডায়েরি পড়তে শুরু করে। পাতায় পাতায় শুধু যন্ত্রণা নয়, প্রেম, নির্যাতন, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা।
তাকে কাঁপিয়ে দেয় এক লাইন—
“যদি কেউ কখনো ফিরে আসে, আমি তার কণ্ঠে কথা বলব…”
রাত নামলে, বাড়ি আবার কথা বলা শুরু করে।
ইরা যোগাযোগ করে লেখক শঙ্খর সঙ্গে।
এখন তিনি নির্জনে থাকেন, বই লিখেন না।
ইরা তাকে বলে—“আরুন্ধতী এখনো এই বাড়িতে আছে।”
শঙ্খ ফিরে আসেন।
দু’জনে মিলে সেই কুয়োর ধারে বসে। কুয়োর ভিতর এখনো হাওয়া খেলে যায়, যেন কারো দীর্ঘশ্বাস।
তখনই হঠাৎ বাতাস জোরে বইতে থাকে। ইরা বলে—
“ও বলছে—আমার মুখ খুঁজে পেয়েছে কেউ। এবার আমি যেতে পারি।”
শঙ্খ চোখ বন্ধ করে বলে—
“তুমি যেতে পারো, আরু।”
এক মুহূর্তে বাড়ি নিস্তব্ধ হয়ে যায়। যেন সময় থেমে গেছে।
ইরা নিজের আঁকা সেই ছবি নিয়ে একটি প্রদর্শনী করে কলকাতায়—“চিরন্তন নীরবতা” নামে।
ছবির পাশে লেখা একটাই লাইন—
“এই মুখ হারিয়ে গিয়েছিল ইতিহাসে। আমরা তা ফিরিয়ে এনেছি।”
শঙ্খ সেই ছবি দেখে চুপ করে থাকেন।
আরুন্ধতী চলে গেছে—কিন্তু তার কণ্ঠ, তার যন্ত্রণা, তার প্রেম—চিরদিনের জন্য জায়গা করে নিয়েছে শিল্পে, সাহিত্যে।
হানা বাড়ি এখন নির্জন নয়। তার নীরবতা এখন চিরন্তন নয়।
তার কণ্ঠ এখন আমাদের ভিতরেই বেঁচে থাকে।
।। শেষ।।




