Bangla - প্রেমের গল্প

অন্য এক গল্প

Spread the love

সোহিনী বসু


এক

কলকাতার গরমটা যেন সেই বছরটা একটু বেশি ঘামঝরা ছিল। দক্ষিণ কলকাতার গলির ভেতর অবস্থিত একটা ছোট থিয়েটার ওয়ার্কশপ—চৌধুরি লেনের পুরনো ভবনটা—গ্রীষ্মের বিকেলগুলিতে রিহার্সালের শব্দে যেন হাঁপিয়ে উঠছিল। সেই ওয়ার্কশপেই প্রথম দেখা হয়েছিল রিয়া সেন ও ঐশী রায়ের। দুজনেই ছিল নতুন—রিয়া মূলত স্ক্রিপ্ট লিখত, মাঝে মাঝে অভিনয়েও নামত, আর ঐশী—একজন স্কুলশিক্ষিকা হলেও থিয়েটারের প্রতি দুর্নিবার টান টের পেয়ে ঢুকে পড়েছিল এই নাটকের জগতে। প্রথম দিনেই এক জায়গায় বসে দুজনেই হাত ফোল্ড করে চুপচাপ দেখছিল অনুশীলন চলতে। চোখাচোখি হয়েছিল একবার, কিন্তু কোনো আলাপ তখনও হয়নি। রিয়া বেশ কিছুদিন ধরে নিজের মধ্যে এক অজানা আবেগ খুঁজে চলেছে—একটা চোরা আকর্ষণ, যা সমাজ তাকে বলতে শেখায়নি। ঐশী তার চেয়ে একটু বেশি সংযত, কিন্তু চোখে ছিল চিন্তার রেখা—জীবনের এক গভীর প্রশ্ন, যার উত্তর সে খুঁজে পায়নি এখনও। এই দুটো ছায়ার মতো চলা মানুষ যখন মুখোমুখি হয়, তখন তাদের চোখে পড়ে যায় এক অপরিচিত চেনাচেনা ধরণের প্রতিচ্ছবি।

দ্বিতীয় দিনেই তাদের দুজনকে একসঙ্গে একটি দৃশ্যে কাজ করতে বলা হয়। সেটি ছিল দুজন নারী চরিত্রের একটি দৃশ্য, যেখানে একজন অন্যজনকে তার কষ্ট শোনাচ্ছে। রিয়া চরিত্রে ছিল রাধা, আর ঐশী ছিল মীরা। শুরুতে সংলাপ মুখস্থ করার ফাঁকে ফাঁকে দুজনেই একে অপরকে বোঝার চেষ্টা করছিল। তবে দৃশ্যটি যখন পারফর্ম করতে শুরু করে, তখন পুরো ঘর যেন চুপ করে যায়। ঐশী তার সংলাপে এমন এক কম্পন নিয়ে আসে, যা রিয়ার গায়ে বিদ্যুতের মতো লাগে। সেই মুহূর্তে রিয়ার মনে হয়, এই মেয়েটার ভেতরে এমন কিছু আছে যা সে বহুদিন ধরে অনুভব করছিল কিন্তু নাম দিতে পারেনি। অভিনয় শেষে যখন দুজন বাইরে এসে চা খাচ্ছিল, রিয়া বলল, “তুই অনেক ভেতরের জায়গা থেকে অভিনয় করিস, কোথা থেকে আসে এতটা অনুভব?” ঐশী একটু হেসে বলল, “শুধু অভিনয় না রে, কিছু অনুভব আমাদের গায়ে লেগে থাকে, শুধু ভাষা পাই না বলেই বলতে পারি না।” কথাটি শুনে রিয়া আর কথা বলতে পারেনি, শুধু গলা অবধি উঠে আসা কাঁটার মতো এক চাপা সত্যি আটকে গিয়েছিল।

ওয়ার্কশপের পর দিনগুলো ধীরে ধীরে কেটে যেতে লাগল, আর দুজনের মধ্যেও এক নির্ভরশীল সম্পর্ক গড়ে উঠতে থাকল। রিহার্সাল শেষে তারা অনেকক্ষণ ধরে একসঙ্গে বসত, সিনেমা, বই, আর নিজের নিজের জীবনের কথা বলত। একদিন শহরের বাইরে থেকে ফেরার পথে ঐশী বাসে হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়ে রিয়ার কাঁধে মাথা রেখে। রিয়া চুপচাপ বসে থাকে, সেই মুহূর্তে তার মনে হয়, সে যেন কোনও চেনা সুর শুনছে বহুদিন পরে—এক ধরনের ঘরবাড়ির মতো অনুভব, যা আগে কখনও হয়নি। ঐশী ঘুম থেকে উঠে কিছু না বলে শুধু হালকা একটা হাসি দিয়ে বলে, “তুই কি বিরক্ত হলি?” রিয়া মাথা নেড়ে না করে। দুজনের চোখে তখন এক ধরনের অস্বস্তিকর স্পষ্টতা। তারা বুঝতে পারছিল—এই সম্পর্ক শুধুই বন্ধুত্বের পরিধিতে আটকে নেই। অথচ মুখে কেউই কিছু বলছিল না, কারণ যা বলার, সেটা সমাজে বলার ভাষা নেই, বললে প্রশ্ন ওঠে, বললে একঘরে হতে হয়।

একদিন, বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যায়, থিয়েটার থেকে বেরিয়ে দুজনে একটা গলির মোড়ে ছাতা ভাগ করে দাঁড়িয়েছিল। চারপাশে রাস্তার আলো জ্বলছে, কিন্তু সেই ছাতার নিচে যেন এক নিজস্ব গাঢ় ছায়া ছিল। ঐশী হঠাৎ বলল, “রিয়া, তোর কখনও হয়েছে, কারও দিকে তাকিয়ে এমন লেগেছে যেন… নিজেকেই দেখছিস?” রিয়া একটু থেমে, গলার স্বর শুকনো করে জবাব দিল, “হয়েছে… আর সেই মানুষটা এখন আমার পাশে ছাতার নিচে দাঁড়িয়ে।” ঐশী কিছু বলল না, শুধু রিয়ার হাতটা ধীরে করে ধরল। মুহূর্তটা যেন কোনও শব্দ চাইল না, চাইল শুধু সাহস। ওরা জানত না এই পথ কতটা কঠিন, কত কাঁটা বিছানো, কিন্তু এতদিন পর প্রথমবার ওরা একটা গল্পের শুরু দেখেছিল—একটা অন্যরকম গল্প, যেখানে কোনো ছক নেই, নেই কোনও মুখস্থ সংজ্ঞা, আছে শুধু হৃদয়ের স্পষ্ট অনুরণন।

দুই

রিয়া আর ঐশীর বন্ধুত্ব তখন ঠিক প্রেম আর স্বীকারোক্তির মাঝামাঝি এক অস্পষ্ট জায়গায় দাঁড়িয়ে। বাইরে থেকে দেখলে সেটা নিছকই দুটি মেয়ের বন্ধুত্ব, কিন্তু ভেতরে, গভীর থেকে গভীরে, তাদের সম্পর্ক তৈরি হচ্ছিল অজস্র সংবেদনশীল মুহূর্তে, কিছু অপ্রকাশ্য ছোঁয়ায়, কিছু চাওয়া-পাওয়ার ইশারায়। রিয়া মাঝে মাঝেই নিজের ডায়রিতে কিছু অদ্ভুত লাইন লিখে রাখত— “ওর চোখের দিকে তাকিয়ে মনে হয় আমি নিরাপদ”, কিংবা “ঐশী পাশে থাকলে আর মুখোশ পরার দরকার পড়ে না।” এক বিকেলে, ওয়ার্কশপ শেষ করে তারা দক্ষিণ কলকাতার এক ছোট্ট ক্যাফেতে বসেছিল। ঐশী অর্ডার করেছিল দার্জিলিং টি, আর রিয়া কালো কফি। দুজনে নীরব ছিল। হঠাৎ ঐশী বলল, “রিয়া, কখনও কি ভেবেছিস, আমাদের এই… যা হচ্ছে, ওটা কেমন?” রিয়া একটু অবাক হয়ে বলল, “মানে?” ঐশী চোখ নামিয়ে চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, “বন্ধুত্ব? নাকি… তার চেয়ে কিছু বেশি?” প্রশ্নটা খুব নরমভাবে করা হলেও, তার প্রভাব ছিল প্রবল। রিয়া কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে শুধু বলেছিল, “আমি বুঝি না, তবে তুই থাকলে বুকটা একটু হালকা লাগে।” ঐশী হেসেছিল, সেই হাসি ছিল খোলা, কিন্তু চোখে জমে থাকা দ্বিধা স্পষ্ট।

দিনগুলো বদলাতে শুরু করেছিল। ওরা একে অপরের কথা ভাবত, ওদের ফোনের মেসেজে দেখা যেত “ঘুমোতে পারছিস?” কিংবা “আজ সকালটা তোর মুখ না দেখে শুরু করতে ইচ্ছে করছে না” এমন সব বাক্য। ঐশী একদিন হঠাৎ একটা বই উপহার দিল রিয়াকে—ভার্জিনিয়া উলফ-এর “Orlando”। রিয়া বইয়ের ভাঁজে একটা ছোট নোট পায়: “কখনও যদি নিজের পরিচয় হারিয়ে ফেলিস, আমি তোকে খুঁজে আনব।” রিয়ার গা দিয়ে হিমশীতল স্রোত বয়ে যায়। একদিকে ভালো লাগার শিহরণ, আরেকদিকে ভয়—সমাজ, পরিবার, বন্ধু—এই ভালোবাসা কি মানবে কেউ? ঐশী নিজের মনের ভিতরে প্রতিদিন একটা দ্বন্দ্ব চালাত। সে বুঝে গিয়েছিল রিয়ার জন্য তার টান কেবল বন্ধুত্ব নয়, কিন্তু সে সাহস পাচ্ছিল না মুখ ফুটে কিছু বলার। কলকাতা শহরের রাস্তাগুলো, যেগুলো এতদিন ছিল শুধুই যাতায়াতের পথ, এখন যেন নতুন গল্পের ছাপ রেখে যাচ্ছিল তাদের প্রতিটি পায়ে চলায়।

এক বিকেলে, ওরা প্রিন্সেপ ঘাটে বসেছিল গঙ্গার ধারে। আকাশে হালকা মেঘ, হাওয়ায় জল গন্ধ। অনেকক্ষণ চুপচাপ থাকার পর রিয়া বলল, “ঐশী, তুই জানিস তো, আমি ছোটবেলায় ভাবতাম আমি অন্যরকম… মানে, আমার বন্ধুরা যখন ছেলেদের কথা বলত, আমি তখন চুপ থাকতাম।” ঐশী বলল, “আমারও তাই। মনে হত, আমি যেন ঠিক সোজাসুজি লাইন ধরে চলতে পারছি না। মাঝপথে বারবার থেমে যাচ্ছি।” রিয়া হেসে বলল, “তাহলে তো আমরা দুই পথহারা!” ঐশী ওর দিকে তাকিয়ে বলল, “না রে… আমরা দুইজন, যারা একসঙ্গে হাঁটতে চাই।” এই মুহূর্তে প্রথমবার ওরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে, কোনও শব্দ ছাড়া। সেই আলিঙ্গনে ছিল স্বীকারোক্তি, সাহস, আর এক নতুন জীবনের সম্ভাবনা। কেউ কিছু বলেনি, কিন্তু সব যেন বলা হয়ে গিয়েছিল।

ওই রাতেই রিয়া নিজের ডায়রিতে লেখে, “আজ আর নিজেকে লুকোতে ইচ্ছে করছে না। ওর বাহুর মধ্যে আমি খুঁজে পাই নিজেকে।” ঐশী বাড়ি ফিরে অনেকক্ষণ নিজের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, ভাবছিল—এই ভালোবাসা নিয়ে ঘরে ঢোকা যাবে তো? সমাজ যেটাকে “ব্যতিক্রমী” বলে দাগিয়ে দেয়, সেই প্রেম যদি নিজের জীবন হয়ে ওঠে, তখন কী হয়? কিন্তু একটাও উত্তর পায়নি সে, শুধু বুকের ভেতরে এক আশ্চর্য সাহস জমে উঠছিল। সেই দিন থেকেই ওদের সম্পর্ক ছিল চোখে না পড়া একটা শব্দের মতো—নীরব, অথচ অনুপস্থিত নয়। ওরা বুঝে গিয়েছিল, ভালোবাসা কখনও চিৎকার করে না, ওর ভাষা খুবই মৃদু, কিন্তু ওর ওজন পাহাড়ের মতো। এবং সেই ভালোবাসাই আস্তে আস্তে ছায়া সরিয়ে দিচ্ছিল তাদের উপর থেকে, যেন সত্যিটা ধীরে ধীরে আলোয় উঠে আসছে।

তিন

ঐশীর ঘরটা যেন দিনদিন ছোট হয়ে আসছিল। চারদিকে বইয়ের তাক, স্কুলের খাতা-পত্র, আর এককোনে রাখা সেই সব পুরোনো ছবি—যেখানে সে একটা সাজানো চেনা জীবনের মধ্যে দাঁড়িয়ে হাসছে, অথচ সেই হাসির পেছনে কতটা নিঃসঙ্গতা ছিল, সেটা এখন সে বুঝতে পারে। রিয়ার সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো তার ভেতরের এক অজানা ভূগোল জাগিয়ে তুলেছিল, যার মানচিত্র সে আগে কখনও আঁকেনি। কিন্তু সমাজ, পরিবার, নিজের বিশ্বাস—সবকিছু যেন একটা অদৃশ্য দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে ছিল তার সামনে। প্রতিদিন সকালে আয়নায় নিজেকে দেখে ভাবত, “আমি কি সত্যিই অন্যরকম? না কি আমি শুধু স্বীকার করে ফেলেছি যা কেউ বলতে সাহস পায় না?” তার ভেতরে এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব চলছিল—একদিকে রিয়ার চোখে নিজের আসল সত্তাকে খুঁজে পাওয়ার আনন্দ, অন্যদিকে জীবনের বাস্তবতা, যা মেনে নিতে চায় না কিছুই।

রিয়া ঠিক ততটাই দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। যদিও তার জীবনটা শিল্প আর স্বাধীনতার মিশেলে তৈরি, তবু এই সম্পর্ককে নিয়ে যে দ্বন্দ্ব সে অনুভব করছিল, তা সহজ ছিল না। ছোটবেলায় মা-বাবার কড়া শাসনের মধ্যে বড় হওয়া রিয়া একসময় একটি মেয়ের প্রতি টান অনুভব করেছিল, কিন্তু সেই সম্পর্ক আবিষ্কৃত হওয়ার পর যেভাবে তাকে অপমান, গালমন্দ ও একঘরে করা হয়েছিল, তার ক্ষত আজও শুকায়নি। সেই অভিজ্ঞতার পর সে প্রতিজ্ঞা করেছিল—আর কখনও নিজের সত্যিটা প্রকাশ করবে না। কিন্তু ঐশীর উপস্থিতি যেন তার সেই পুরনো প্রতিজ্ঞার ভিত নড়িয়ে দিয়েছে। রিয়ার মনে হচ্ছিল, সে যদি নিজেকে বারবার লুকিয়ে রাখে, তাহলে তার ভালোবাসাও তো একদিন ক্লান্ত হয়ে পড়বে। একদিন সন্ধ্যায়, রিয়া তার ছোট্ট ফ্ল্যাটে বসে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে বলেছিল, “আমি কী চাই, নিজেকে বাঁচাতে অন্যকে হারাতে? নাকি, হারানোর ভয়কে উপেক্ষা করে ভালোবাসাকে আঁকড়ে ধরা?”

তাদের এই ভালোবাসা যত গভীর হচ্ছিল, তত বেশি করে চারপাশের দৃষ্টি বদলাতে শুরু করেছিল। বন্ধুরা মজা করে জিজ্ঞেস করত, “তোমাদের কেমিস্ট্রি কেমন জমছে?” কেউ কেউ আবার সন্দেহ করতেও শুরু করেছিল—তারা কি কেবল বন্ধু, না কি এর চেয়েও বেশি কিছু? স্কুলে সহকর্মীরা ঐশীর পেছনে ফিসফিস করত, কেউ তার ব্যাকুল চোখে দেখত, কেউ ঠাট্টা করত। একদিন একজন সহশিক্ষিকা সরাসরি বলে ফেলে, “তুমি কি সত্যিই… মানে, ছেলেদের প্রতি আগ্রহ নেই?” ঐশী শুধু চুপ করে তাকিয়ে ছিল, উত্তর দেয়নি। কিন্তু তার ভিতরে এক আগুন জ্বলছিল—সে জানত, সমাজের চোখে এ প্রেম ভুল, কিন্তু তার নিজের চোখে এই প্রেমই ছিল একমাত্র সত্যি। ঐশী রাতে রিয়াকে ফোন করে বলেছিল, “আমি ক্লান্ত রে, প্রতিদিন নিজেকে মিথ্যে সাজিয়ে চলতে। আমি তো তোকে ভালোবাসি, কিন্তু তোর পাশে দাঁড়ানোর সাহস আমার হয় না সবসময়।” রিয়া ধীরে বলেছিল, “তুই আমার পাশে থাকলেই হয়, মুখ না হোক, হাতটা শক্ত করে ধর।”

এই অধ্যায়ের শেষভাগে, তারা দুজন একটা সন্ধ্যায় আবার সেই পুরনো থিয়েটার হলে ফিরে যায়—যেখানে তাদের প্রথম দেখা, প্রথম সংলাপ, আর প্রথম চোখাচোখি হয়েছিল। রিহার্সাল চলছিল না, পুরো হলটা ফাঁকা। ঐশী মঞ্চে উঠে দাঁড়ায়, হাতে ধরে রিয়ার স্ক্রিপ্টের একটা পাতা। পড়তে পড়তে হঠাৎ থেমে যায় সে, চোখে জল। রিয়া ধীরে ধীরে উঠে এসে ওর পাশে দাঁড়ায়। দুই হাত এক করে বলে, “তুই যদি ভয় পাস, তবে আমি ভয়কে দুই ভাগে ভাগ করে নেব—এক ভাগ আমার, এক ভাগ তোর।” ঐশী মাথা নেড়ে বলে, “আজ আয়নায় তাকিয়ে প্রথমবার আমি কাউকে লুকোতে চাইনি।” সেই মুহূর্তে, দুটি আত্মা একসঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিল সমাজের বিরুদ্ধে নয়, নিজেদের পক্ষে—একটি ভালোবাসার পাশে, যা শর্তহীন, নির্ভেজাল, আর আয়নার সামনে সম্পূর্ণ সত্য।

চার

ঐশীর জীবনে সবচেয়ে কঠিন ছিল ‘বাড়ি ফেরা’। প্রতিদিন কাজ শেষে বাসে বা অটোতে করে সে যখন বাড়ির দিকে যেত, মনে হত যেন একেকটা জানালা, দেওয়াল, ছাদ—সব তার ওপরে চেপে বসছে। মা এখনো সকালে উঠে তুলসীতলায় জল দেয়, সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বালে, এবং বিশ্বাস করে মেয়ের বিয়ের স্বপ্ন। বাড়ির ভেতরটায় যেন সময় থেমে আছে, যেখানে ‘ভালো মেয়ে’ মানে—সুন্দর করে শাড়ি পরা, সংসারপ্রীত, এবং অবশ্যই, একজন পুরুষকে স্বামী হিসেবে বরণ করতে রাজি। ঐশী জানে, তার ভালোলাগা, ভালোবাসা, সবকিছুই এই গৃহকোণ থেকে আলাদা সুরে বাঁধা। কিন্তু সেই সুর কারো কানে পৌঁছায় না। বহুদিন ধরে সে বিষয়টা এড়িয়ে চলছিল, কিন্তু রিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ধীরে ধীরে এমন এক জায়গায় পৌঁছেছিল, যেখানে আর না বলা মানে নিজের ভালোবাসাকে অপমান করা। অবশেষে এক রাতে সাহস করে মাকে বলে, “মা, আমি কাউকে ভালোবাসি… কিন্তু সে ছেলে নয়।” মা যেন বুঝতে চেয়েও বুঝতে পারেননি, শুধু তাকিয়ে ছিলেন স্তব্ধ হয়ে। তারপর ধীরে ধীরে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বলেছিলেন, “এ কথা যেন কারও কানে না যায়।”

রিয়া তখন অন্য এক লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েছে। তার থিয়েটার দলের মিতা একদিন তাকে বলে, “তুই আর ঐশী ঠিক কোন সম্পর্কে আছিস?” রিয়া একটু চুপ করে থেকে জবাব দেয়, “ভালোবাসার মধ্যে, বাকিটা নাম দিয়ে বোঝানো যাবে না।” মিতা ওর দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “তুই জানিস, আমি তোকে জাজ করব না। আমি জানি তোর লড়াইটা কেমন কঠিন। কিন্তু সবাই তো তেমন হবে না রে।” রিয়া তখন বুঝেছিল, কিছু মানুষ পাশে দাঁড়াতে পারে, তবে তাদের সংখ্যা অতি সামান্য। তারপরও সাহস করে সে এক সন্ধ্যায় এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সামনে ঐশীর সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা বলে। সেদিন সন্ধ্যায় রিয়ার ফ্ল্যাটে আলো জ্বলছিল কম, কিন্তু মানসিক আলো অনেক বেশি উজ্জ্বল ছিল। রিয়া আর ঐশী নিজেদের হাতে হাত রেখে বসে ছিল, কেউ কথা বলছিল না, কারণ তাদের চারপাশের নীরবতা ভয়ভয়ানক হয়ে উঠছিল। সেই বন্ধুটি খুব শান্তভাবে বলেছিল, “তোমাদের মুখে আমি ভালোবাসারই ছায়া দেখছি, কিছু অন্যায় নয়।” সেই প্রথম একজন বাইরের মানুষ তাদের সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে না দেখে ভালোবাসা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

ঐশীর দাদা অনিমেষ, বরাবরই ছিল প্রথাগত দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ। সে যখন ছোট ছিল, ঐশীকে আদর করত, স্কুলে পৌঁছে দিত, পরীক্ষার সময় রাত জেগে পাশে বসত। কিন্তু বড় হয়ে সেই সম্পর্কটা বদলে গিয়েছিল, দায়িত্ব আর শাসনের মধ্যে আটকে। ঐশী ভেবেছিল অনিমেষকে বলবে না, কিন্তু মা যখন একদিন কান্নাকাটি করে বললেন, “তোর দাদাকে যা বলেছিস, সে শুনলে হার্ট অ্যাটাক করবে,” তখন তার মনে হল—তাকে বলাটা জরুরি। একদিন ডাইনিং টেবিলের এক কোণে বসে সে অনিমেষকে বলে, “ভাইয়া, তুই কি ভাবিস, ভালোবাসা মানেই ছেলে-মেয়ে?” অনিমেষ বিরক্ত হয়ে বলল, “আর কী হতে পারে?” ঐশী একটু থেমে বলেছিল, “তাহলে ধর, আমি যদি একটা মেয়েকে ভালোবাসি?” সেদিন ঘরে ঘণ্টাখানেক একটা শব্দ ছিল না, শুধু অসহ্য এক চাপা বিদ্বেষ যেন বাতাসে ঘুরছিল। অনিমেষ হঠাৎ বলে উঠেছিল, “তুই পাগল হয়ে যাচ্ছিস। এসব বিকৃতি!” ঐশী কেঁদে ফেলেছিল, কিন্তু সেই কান্না দুর্বলতার নয়, বরং নিজের পরিচয়ের পক্ষে দাঁড়ানোর প্রথম স্বীকারোক্তি।

সেই রাতে রিয়া আর ঐশী দুই প্রান্তে আলাদা শুয়ে ছিল, কিন্তু ফোনের ভেতর যেন দুই আত্মা জড়িয়ে ছিল আরও শক্তভাবে। রিয়া বলেছিল, “তুই জানিস, তোর কান্না আমার বুক ফাটিয়ে দেয়, কিন্তু আমার গর্ব হয় রে… তুই মুখ তুলেছিস।” ঐশী বলেছিল, “ভালোবাসা জেতার আগে কষ্ট দেয়, তাই না?” রিয়া জবাব দেয়, “ভালোবাসা কখনও হার মানে না, শুধু সময় চায়।” বন্ধ দরজার ভেতর, সমাজের গ্লানির শব্দ ভেসে আসছে ঠিকই, কিন্তু সেই দরজার আড়ালে দুটো মেয়ে তৈরি করে চলেছে এক নতুন দুনিয়া—যেখানে ভালোবাসা লুকিয়ে নয়, মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শিখছে। এবং সেই লড়াইয়ের প্রতিটি পদক্ষেপ তাদের আরও কাছে এনে দিচ্ছে, সত্যিকারের ভালোবাসার পক্ষে এক শক্ত স্বর হয়ে উঠছে প্রতিটি অশ্রু, প্রতিটি নীরব চুম্বন।

পাঁচ

ঐশীর মধ্যে এক ধরনের পরিবর্তন আসছিল। সকালবেলা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখে তাকিয়ে সে যেন নিজের মধ্যে একটা অজানা শক্তির ঝলক খুঁজে পেত। স্কুলে যাওয়ার পথে সে এখন আর মাথা নিচু করে হাঁটে না, বরং বুক সোজা করে শহরের অলিগলি পেরিয়ে যায়। সহকর্মী রত্নাদেবী যখন বলেছিলেন, “আজকাল তোমাকে যেন একদম বদলে গেছে মনে হয় ঐশী”, তখন ঐশী শুধু মৃদু হাসি দিয়ে বলেছিল, “হয়তো একটু সাহস পেয়েছি।” কিন্তু এই সাহসটা কেবল রিয়া’র জন্যই নয়, বরং নিজের ভেতরের সত্যিটাকে গ্রহণ করার জন্য। দিনের শেষে বাড়িতে ফিরে সে জানলার পাশে দাঁড়িয়ে থাকত, রিয়ার সঙ্গে ফোনে কথা বলত, আর ভাবত – সত্যিই কি ওরা সমাজের কাছে এত অপরাধী? ঐশীর জীবনের এই পর্যায়টা ছিল এক অদ্ভুত টানাপোড়েনের – সে যেমন ভালোবাসার গভীরতায় ডুবে যাচ্ছিল, তেমনি সমাজের কাঁটা যেন ক্রমশ পা বেঁধে ধরছিল।

রিয়া, তার বিপরীতে, একটু বেশিই প্রকাশ্য ছিল। সে স্পষ্ট করে জানত, তার ভালোবাসা কোনো লুকোচুরি নয়। কলেজে যখন কিছু ছাত্র তার পেছনে ফিসফিস করত, রিয়া ততটাই গর্ব নিয়ে হাত ধরে ঐশীকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে পড়ত। এক সন্ধ্যায় তারা নিউ আলিপুরের একটি ছোট ক্যাফেতে বসে ছিল, সেই ক্যাফেটি যেখানে যুগলেরা নির্ভয়ে একে অপরের চোখে চোখ রাখে। ওদের পাশের টেবিলে এক দম্পতি কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল, তারপর নিঃশব্দে উঠে গিয়ে বসে পড়েছিল অন্য টেবিলে। ঐশী প্রথমে মাথা নিচু করে ফেলেছিল, কিন্তু রিয়া তার কাঁধে হাত রেখে বলেছিল, “তারা যদি তাদের ভালোবাসা নিয়ে গর্ব করতে পারে, তবে আমরা কেন পারব না?” ঐশী চুপ করে ছিল, কিন্তু তার ভেতরের দ্বিধার সাথে একটা ধাক্কা লেগেছিল সেই মুহূর্তে। সত্যি, সমাজে ভালোবাসার সংজ্ঞা কে ঠিক করে দেয়?

এইসব মুহূর্তে ঐশী নিজেকে আরো বেশি প্রশ্ন করতে শুরু করেছিল। সে জানত, তার বাবা-মা – যারা এখনো গ্রামের বাড়িতে থাকেন – কিছু জানেন না তার এই সম্পর্কের কথা। মা মাঝে মাঝে ফোনে বলতেন, “তোকে এই বয়সে একটা ভালো পাত্রের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেব, চাকরি করিস আর সংসার করিস।” ঐশী কোনোদিনই স্পষ্ট করে বলেনি কিছু, শুধু কথা ঘুরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু একদিন, সন্ধ্যায় রিয়ার সঙ্গে সময় কাটিয়ে ফিরে এসে তার মনে হয়েছিল, সে আর বেশিদিন লুকিয়ে থাকতে পারবে না। সে নিজেকে প্রশ্ন করেছিল – এই ভালোবাসা কি সত্যিই এত অপরাধের মতো, যাতে মা-বাবার চোখে সে ‘ভাল মেয়ে’ থেকে ‘অচেনা মেয়ে’ হয়ে যাবে? ঐশী ভয় পেত, কিন্তু সেই ভয়ের পাশে একটা নতুন আলোও জ্বলছিল – রিয়া। সে জানত, রিয়া পাশে থাকলে সে এই সমাজের কাঁটাগুলোকে পার করে সামনে এগোতে পারবে। অথচ, ভিতরে ভিতরে ঐশীর এক ধরণের দ্বন্দ্ব চলছিল – সমাজের কাছে আত্মসমর্পণ না কি নিজের কাছে সত্য থাকা?

এই প্রশ্নগুলো নিয়ে একদিন ঐশী আর রিয়া কলকাতার এক ছোট্ট এলজিবিটিকিউ+ সাপোর্ট গ্রুপে গিয়েছিল। সেখানে তারা কয়েকজনের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিল, যারা কেউ কেউ অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে – কেউ পরিবার হারিয়ে ভালোবাসা রক্ষা করেছে, কেউ আবার সমাজকে জয় করে পেয়েছে স্বীকৃতি। একজন প্রবীণ নারী বলেছিলেন, “ভালোবাসা, এই সমাজে সবসময় সাহস চায়। কারণ আমরা ‘নিয়ম’ ভাঙি – যে নিয়ম সমাজ বানিয়েছে।” ঐশী তার কথা শুনে অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল। তার মনে হয়েছিল, সে নিজেও সেই নিয়মের ভাঙন – এবং তার ভেতরে একটা গোপন গর্বের জন্ম হয়েছিল। এরপর যখন ঐশী আর রিয়া একসাথে বাড়ি ফিরছিল, ঐশী হঠাৎ বলেছিল, “আমি মাকে সব বলব। যেটা সত্যি, সেটা আর লুকিয়ে রাখার কোনো মানে নেই।” রিয়া তার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “তুই যা ঠিক মনে করিস, আমি তোকে সবসময় ভালোবাসব, সমাজ যা-ই বলুক না কেন।” ঐশী মাথা নেড়েছিল, এবং সেই রাতে, জানলার ধারে দাঁড়িয়ে থেকে সে তার জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তটা নিয়েছিল – সত্যিটাকে আর ছায়ার আড়ালে রাখবে না।

ছয়

কলকাতার আকাশে তখন গভীর শীতের শেষ বাঁশি। ফেব্রুয়ারির হাওয়ায় বসন্তের ইঙ্গিত, কিন্তু ঐশীর মনে যেন এখনও কুয়াশার ঘোর। সে আর রিয়া দু’জনে মিলে অনেকটা পথ অতিক্রম করেছে, কিন্তু এখনও সমাজের দৃষ্টির সামনে নিজেদের স্বাভাবিকভাবে প্রকাশ করার সাহসটুকু অর্জন করা হয়নি। স্কুলে এখন ঐশীকে নিয়ে কানাঘুষো শুরু হয়েছে—কেউ বলেছে, সে একা থাকে বলেই এমন “উল্টো রাস্তায়” হাঁটছে; কেউ আবার বলেছে, রিয়া নাকি তার “রুমমেট”-এরও বেশি কিছু। ঐশী এসব শুনেও চুপ করে থাকে, কিন্তু ভিতরে ভিতরে আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরতে থাকে। রাতে রিয়ার কাঁধে মাথা রেখে সে শুধু বলে, “সবকিছু কীভাবে বোঝাই, রিয়া? যাদের ভাষায় আমাদের জন্য কোনো শব্দই নেই, তাদের সামনে নিজের মানে কীভাবে খুঁজে পাই?” রিয়া তখন তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, “ভাষা আমরা গড়ব, ঐশী। তুমি আর আমি। যদি প্রয়োজন পড়ে, ভালোবাসাকেই আমাদের অভিধান বানাব।” ঐশীর চোখে তখন জল, কিন্তু ঠোঁটে একটা শান্ত হাসি।

পরদিন সকালে তারা দু’জনে গিয়েছিল একটি এনজিওর ছোট ইভেন্টে—যেখানে LGBTQ+ মানুষদের নিয়ে সচেতনতা ছড়ানোর কাজ হয়। ঐশী একটু সংকোচে ছিল, এতদিন বাইরের দুনিয়ায় এইভাবে নিজেদের “পরিচয়” নিয়ে হাজির হওয়ার অভ্যাস হয়নি। কিন্তু রিয়া সাহস দিয়ে বলেছিল, “এই প্রথম নয়, শেষও নয়। এগুলো শুধুই পথ। আমরা যদি নিজেদের না বলি, অন্য কেউ তো বলবে না।” মঞ্চে ঐশী প্রথম যখন দাঁড়ায়, তার কণ্ঠ কেঁপে ওঠে। কিন্তু তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করে নিজের গল্প—একজন শিক্ষিকার, একজন নারী হিসেবে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার, সমাজের বাইরে দাঁড়িয়ে ভিতরে ঢোকার মরিয়া চেষ্টার গল্প। হাততালির বদলে ছিল নীরবতা, একধরনের সম্মানের। ঐশীর মনে হয়, এই নীরবতা যেন সমাজের প্রথম শোনা।

তারা ফিরছিল একটি অটোয়—পেছনের সিটে পাশাপাশি বসে। কলকাতার রাত তখন সাড়ে দশটা, বাতাসে জুঁই ফুলের গন্ধ। হঠাৎই রিয়া ঐশীর হাত ধরে বলে, “তুই জানিস? আজ তোর কথা শুনে মনে হচ্ছিল তুই শুধু তোর কথা বলছিস না, যেন আমার আর হাজার হাজার মানুষের কথা একসাথে উঠে আসছে।” ঐশী চুপচাপ তাকিয়ে থাকে তার দিকে, বলে, “তুই না থাকলে কিছুই বলা হত না, রিয়া।” সেই রাতে তারা একসাথে রান্না করেছিল—সাজানো পাতে মুগ ডাল, আলুভাজা আর ভাত। ঐশীর ঠোঁটে তখন কেবল একটাই কথা ছিল: “ভালোবাসা মানে তো শুধু শরীরের কাছে আসা নয়, মানে তো প্রতিদিনের মানে খোঁজা, প্রতিদিন দাঁড়িয়ে থাকার কথা বলা। সেই সাহসের নামই তো তুই।” রিয়া কোনো উত্তর দেয় না, শুধু তার হাত ধরে রাখে।

কিন্তু পরদিনই একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে। ঐশীর স্কুলে এক অভিভাবক সভায় একজন অভিভাবক সরাসরি অভিযোগ তোলে—“আমরা আমাদের সন্তানদের এমন শিক্ষিকার হাতে দিতে চাই না, যিনি নিজের চরিত্র নিয়েই দ্বিধাগ্রস্ত।” স্কুলের পরিচালন কমিটি ঐশীকে ডেকে পাঠায়, এবং অবচেতনে একরকম চাপ দেয় যেন সে “নিজের জীবনব্যবস্থা” নিয়ে স্বচ্ছতা বজায় রাখে। ঐশী সোজা উঠে দাঁড়ায়, চোখে কোনও ভয় নেই। সে বলে, “আমি আমার কাজ ভালোবাসি। আমার পরিচয় আমার পেশার অন্তরায় নয়। আমি যেমন, তেমন থাকি বলেই আপনাদের সন্তানেরা একজন সৎ মানুষ হতে শেখে।” কিন্তু ভিতরে ভিতরে সে কাঁপতে থাকে। সেদিন বাড়ি ফিরে সে কাঁদে, দীর্ঘ সময় ধরে। রিয়া তাকে জড়িয়ে ধরে রাখে, বলে, “তুই আজ শুধু নিজেকে নয়, অনেককে রক্ষা করেছিস।” ঐশী বলে, “ভাষার বাইরে গিয়েই যদি কথা বলা যায়, তবে আমাদের ভালোবাসাও ভাষার বাইরে গিয়েই মানে খোঁজে।”

সাত

ঐশী এবং রিয়া – এই দুই নারীর জীবনের বাঁক আজ এমন এক স্থানে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে প্রত্যেকটি সিদ্ধান্ত যেন সমাজের চোখে বিদ্রোহ। কলকাতার এক সন্ধ্যায়, রিয়া হঠাৎ করেই ঐশীকে বলে, “চলো না একদিন সবকিছু ফেলে বেরিয়ে পড়ি কোথাও, যেখানেই হোক, যেখানে কেউ আমাদের চিনবে না, আমাদের সম্পর্কে প্রশ্ন তুলবে না।” ঐশী হেসে উঠেছিল, কিন্তু সে হাসির আড়ালে যে কী রকম দ্বিধা, আতঙ্ক আর অজানা ভবিষ্যতের আশঙ্কা লুকিয়ে ছিল, তা কেবল ঐশীর হৃদয়ই জানত। তাদের ভালোবাসা অনেক দূর এগিয়েছে, একে অপরের মধ্যে তারা যে আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে, তা কোনো বাহ্যিক চোখ বুঝতে পারবে না। কিন্তু এই শহর, এই সমাজ, যেখানে সমকামীতা এখনো গোপনের, ভয়ের, আর অনেক সময় ঘৃণার বিষয় – সেখানে তাদের সম্পর্ককে সামনে আনা মানে নিজেকে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া।

রিয়ার মধ্যে সাহসটা বেশি। সে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে চায় না, বরং সে চায়, তারা দুজনে একদিন সবাইকে জানিয়ে দিক – “হ্যাঁ, আমরা প্রেম করি।” কিন্তু ঐশী সেই সাহসে পৌঁছাতে পারে না। তার স্কুল, ছাত্রছাত্রী, সহকর্মীরা, এমনকি পরিবার – সবাইকে সে ভয় পায়। রাতগুলোতে যখন তারা একে অপরকে জড়িয়ে ঘুমায়, ঐশীর বুকের ভেতর তখনও কোনো এক শূন্যতা কুঁকড়ে থাকে, এক অপরাধবোধ, যেন সে রিয়ার ভালোবাসার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তার নিজস্ব ভালোবাসার ওজনটা দিতে পারছে না। এক রাতে ঐশী চুপিচুপি বলে, “রিয়া, যদি একদিন আমাদের কেউ দেখে ফেলে? যদি স্কুলে খবর ছড়িয়ে পড়ে?” রিয়া স্নিগ্ধভাবে মাথা ঠেকিয়ে দেয় ঐশীর কাঁধে, “দেখুক না, শুনুক না… আমি তো লুকোতে চাই না কিছু।”

সেই কথার কয়েকদিনের মধ্যেই প্রথম ঝড়টা এল। ঐশীর স্কুলে এক অভিভাবক তাকে বাইরে রিয়ার সঙ্গে রেস্তোরাঁয় হাত ধরে বসে থাকতে দেখেছে – এবং সে বিষয়টা নিয়ে অভিযোগও করেছে কর্তৃপক্ষের কাছে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা ঐশীকে আলাদা করে ডেকে পাঠিয়ে বললেন, “আপনার ব্যক্তিগত জীবন আপনার বিষয়, তবে স্কুলের ভাবমূর্তি রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব।” ঐশীর বুক কেঁপে উঠল। সে বুঝে গেল, এটাই সেই মুহূর্ত যার জন্য এতদিন সে ভয় পাচ্ছিল। একদিকে তার শিক্ষকতা, যেটা শুধু তার জীবিকা নয় – তার আত্মপরিচয়, আর অন্যদিকে তার সম্পর্ক, তার ভালোবাসা – রিয়া। ঐশী দ্বিধায় পড়ে যায়, রিয়াকে কিছু না বলেই সে সেই দিন স্কুল থেকে ফিরে আসে, নিরব, নিঃসাড়।

রাতের বেলা রিয়া সব বুঝতে পারে ঐশীর চোখের ভাষা দেখে। “তুমি আবার দূরে সরে যাচ্ছ?”, প্রশ্ন করে সে। ঐশী ভেঙে পড়ে, চোখে জল নিয়ে বলে, “আমি বুঝতে পারছি না রিয়া, দুটো পৃথিবী একসঙ্গে চলবে কী করে?” তখন রিয়া অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলে, “আমাদের ভালোবাসা যদি শুধু আড়ালেই বাঁচে, তবে সেটা ভালোবাসাই না। আমি তো চাই তোমার পাশে দাঁড়িয়ে গর্ব করে বলতে – এ আমার মানুষ। তুমি পারবে না?” ঐশী জানে, সে চায়, সে পারতে চায়… কিন্তু সমাজের চোখে ভালোবাসা এখনো এত সহজ নয়। কিন্তু সেই রাতে, ঐশী প্রথমবার রিয়ার গালে হাত রেখে বলে, “আমি চেষ্টা করব, রিয়া… নিজের ভয় কাটাতে। কারণ তুমিই আমার সত্য।”

আট

কলকাতার বসন্ত অনেক কিছুর সাক্ষী থাকে—প্রেম, বিদ্রোহ, ভাঙন কিংবা পুনর্জন্ম। ঐশী ও রিয়ার জীবনে সেই বসন্ত এক নতুন মোড় এনে দিয়েছে। শহরের পুরোনো কফিশপের এক কোণে বসে তারা দুজন চুপচাপ চা খাচ্ছে, অথচ চোখে মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। এতদিনের না বলা কথা, লুকিয়ে থাকা ভালোবাসা, সমাজের ভয়—সব কিছু যেন ধীরে ধীরে পিছু হটেছে। ঐশী প্রথম মুখ খোলে, “রিয়া, আমরা কি এবার সত্যিই সামনে এগোব?” রিয়া হাসে, “আমরা তো অনেক আগেই এগিয়ে গেছি, ঐশী। শুধু দুনিয়াটা একটু পিছিয়ে আছে।” সেই মুহূর্তে ঐশী অনুভব করে, যত বাধাই থাকুক, মানুষ হিসেবে ভালোবাসার অধিকার তারও আছে। তাদের চারপাশে বসে থাকা মানুষদের কৌতূহলী দৃষ্টি উপেক্ষা করে তারা হাত ধরলো একে অপরের। এই ছোট্ট দৃশ্য হয়তো কারো চোখে ‘অস্বাভাবিক’, কিন্তু ঐশী ও রিয়ার কাছে এই ছোঁয়া মুক্তির প্রতীক।

দিন দিন পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। রিয়ার অফিসে কিছু সহকর্মী মুখ ফিরিয়ে নিলেও বেশ কিছু মানুষ পাশে দাঁড়ায়। কেউ কেউ রিয়াকে বলে, “তুমি সাহস দেখিয়েছো, অভিনন্দন।” ঐশীর স্কুলে অবশ্য এখনও কড়া নজর, গুজব আর কানাঘুষো। কিন্তু এবার সে চুপ করে না। একদিন স্টাফরুমে সহকর্মীদের সামনে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট ভাষায় বলে, “আমি একজন মানুষ, একজন শিক্ষক, আর আমি একজন নারীকে ভালোবাসি। এটা লজ্জার কিছু নয়, বরং আত্মসম্মানের।” এই বক্তব্যের পর হয়তো কেউ কটূক্তি করে, কেউ মুখ ফিরিয়ে নেয়, কিন্তু ঐশী নিজেকে আর লুকায় না। সে বুঝে গেছে, যে জীবন সে কাটিয়েছে আত্মসংযমে, তার চাইতে এই সত্যের মুখোমুখি হওয়াটা অনেক বেশি মানবিক।

তাদের সম্পর্ক ধীরে ধীরে পরিবারেও আলো ফেলে। রিয়ার মা একদিন চুপিচুপি ফোন করে বলে, “আমি তোকে বুঝিনি রে রিয়া, কিন্তু তুই যেভাবে দাঁড়িয়ে আছিস, তাতে গর্ব হয়।” ঐশীর বাবাও ধীরে ধীরে নরম হন। এক সন্ধ্যায় বলেন, “তুই সুখী থাক, ঐশী, আর যাকেই ভালোবাসিস, তাকে নিয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচ।” এই স্বীকৃতি শুধু ব্যক্তিগত নয়, যেন সমাজেরই এক ছোট্ট ভাঙা গর্ত দিয়ে আলো ঢুকে পড়েছে। তাদের জীবনে কোনও সিনেমার মতো ম্যাজিক নেই, নেই নাটকীয় সমাপ্তি। কিন্তু তাদের হাতে এখন সত্য, সাহস, ও একে অপরের জন্য গভীর ভালোবাসা—এই তিনটি অস্ত্র যা সময়, সমাজ ও সংকোচের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকতে সাহায্য করে।

বছর ঘুরে যায়। ঐশী ও রিয়া এখন একটি ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টে থাকে, যেখানে দেয়ালে রং করা—‘Love is Love’। তারা প্রতি রবিবার চা বানিয়ে জানালার পাশে বসে গান শোনে, বই পড়ে, আর মাঝে মাঝে নিজেদের অতীত নিয়ে হেসে ওঠে। তাদের এই সম্পর্ক শুধুই প্রেম নয়, এটি প্রতিবাদের ভাষা, সাহসের চিহ্ন এবং স্বপ্ন দেখার অধিকার। কোনও এক বিকেলে, ঐশী লিখে রাখে ডায়েরিতে—“ভালোবাসা লুকিয়ে রাখার নয়, ভালোবাসা প্রকাশ করার সাহসেই তার পরিপূর্ণতা।” গল্প শেষ হয় না, বরং শুরু হয় একটি নতুন জীবনের, যেখানে ‘অন্য এক প্রেম’ আর ‘অন্য এক সমাজ’ পরস্পরকে স্পর্শ করার চেষ্টা চালিয়ে যায়—ধৈর্য, লড়াই আর ভালোবাসার আলোয়।

1000045309.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *