Bangla - প্রেমের গল্প

অন্তরালে

Spread the love

দেবিকা সেনগুপ্ত


অধ্যায় ১: প্রথম দেখার দিন

শীতের সকালগুলো কলকাতার শহুরে ব্যস্ততার মধ্যেও এক অদ্ভুত শান্তির সুর বয়ে আনে। ডিসেম্বরের কুয়াশায় মোড়া সেই সকালে, কলকাতার সেই প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর যেন নীরবতার চাদরে ঢাকা পড়েছিল। মেন বিল্ডিং-এর পাশের লাল ইটের করিডর, বটগাছের শিকড় ছাওয়া পায়েচলা পথ আর পাতা ঝরা কুয়াশা ভেজা মাঠ তখনও ঘুমিয়ে ছিল আধো জাগরণে। এই চেনা অথচ প্রতিদিন নতুন করে জাগ্রত হওয়া শহরের প্রাণকেন্দ্রে পা রেখেছিল রিয়া—একটা রোদ্দুর-ছোঁয়া স্বপ্নের মতো মেয়ে। তার পরনে ছিল নীল-সাদা কটন শাড়ি, কপালে ছোট্ট এক ফোঁটা লাল টিপ। চোখে ছিল এক অদ্ভুত কৌতূহল আর প্রাণের দীপ্তি, যা প্রথম দেখাতেই কারও মন কাড়তে পারত। সে সকাল সকাল লাইব্রেরির দিকে যাচ্ছিল, হাতে কবিতার নোটবুক। হঠাৎ করেই লাইব্রেরির গম্ভীর করিডরে বইয়ের তাকের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে সৌমিক—একটি চশমা চোখে, কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ, অগোছালো চুলের মধ্যে কবিতার আভা লুকিয়ে রাখা এক যুবক। চোখাচোখি হতেই মুহূর্তের জন্য সময়টা যেন থেমে যায়। বাইরে ট্রামের ঘণ্টার শব্দ মিলিয়ে গিয়ে, সেই করিডরের নীরবতা আরও ঘনিয়ে আসে। সৌমিক তখন ‘জীবনানন্দের কবিতা সংগ্রহ’ এর পাতায় ডুবে ছিল, কিন্তু রিয়ার চোখে চোখ পড়তেই সেই পাতার অক্ষরগুলো যেন অস্পষ্ট হয়ে যায়। রিয়ার ঠোঁটে ফুটে ওঠে এক লাজুক হাসি। সৌমিক কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। তাদের মধ্যে প্রথম কথোপকথন শুরু হয় একেবারে সহজ ভাষায়—”আপনি কি জীবনানন্দের বইটা নেবেন?” রিয়া জিজ্ঞাসা করে। সৌমিক চমকে উঠে বলে, “না, আপনি নিন। আপনার হাতেই মানায় বোধহয় কবিতা।” এই সহজ অথচ হৃদয়ছোঁয়া বাক্যেই শুরু হয় তাদের জীবনের সেই নতুন অধ্যায়, যা লিখে যেতে থাকবে অজস্র চিঠি, স্বপ্ন আর প্রতীক্ষার গল্প।

সেই দিনের দুপুরে কফি হাউসের ভিড়ের মধ্যে এক চিলতে জানালার পাশে বসেছিল তারা দু’জন। রোদ ফেলে আসা জানালার ওপারে ভেসে আসছিল কলেজ স্ট্রিটের ব্যস্ততা, ট্রামের ছাতার নিচ দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষেরা, আর চায়ের দোকান থেকে ভেসে আসা মাটির ভাঁড়ের চায়ের গন্ধ। কফির কাপে ধোঁয়া উঠতে উঠতে গল্প জমে উঠেছিল সাহিত্যের, সঙ্গীতের, আর জীবনের অনিশ্চিত স্বপ্নগুলো নিয়ে। সৌমিক জানিয়েছিল তার ইচ্ছে বিদেশে পড়তে যাওয়ার, প্যারিসের রাস্তায় বসে শিল্প আর সাহিত্যের গল্প লিখতে চাওয়ার কথা। রিয়া শুনে হেসেছিল, বলেছিল, “তুমি যাবে, কিন্তু আমার কলকাতার রাস্তা তো তোমারই অপেক্ষায় থাকবে একদিন।” সেই হাসির মধ্যে লুকিয়ে ছিল এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কা, আর সেই আশঙ্কাকে ঢেকে রাখার চেষ্টায় এক রোদের মতো উজ্জ্বল নির্ভীকতা। চা-চক্র শেষে তারা হেঁটে গিয়েছিল লেকের ধারে, লাল পাতা ঝরা পথ দিয়ে, আর সেখানে দাঁড়িয়ে দেখেছিল সূর্যাস্তের শেষ লালচে আভা। সেই আভায় দুই অচেনা মানুষ একে অপরের মনের জানালায় উঁকি দিতে শুরু করেছিল, অজানা টান অনুভব করেছিল। নদীর হাওয়ায় ওড়া রিয়ার চুলের গোছা একবারে সৌমিকের গাল ছুঁয়ে যায়, আর সেই স্পর্শে সে অনুভব করে এক নীরব প্রতিজ্ঞা—কোনো একদিন এই মেয়েটির জন্য চিঠির ভাষায় সে তার মনের সব কথা লিখবে, দূর থেকেও তার কাছে থাকবে।

পরের কয়েক সপ্তাহ ছিল সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোর নরম, কুয়াশায় মিশে থাকা গল্পের মতো। সকালে একসাথে লাইব্রেরি যাওয়া, দুপুরে ফটকের চায়ের দোকানে কবিতার লাইন বদলানো, বিকেলে কলেজ স্ট্রিটের পুরনো বইয়ের দোকান ঘুরে একে অপরের জন্য প্রিয় বই খুঁজে আনা—সবই যেন এক অলিখিত প্রেমপত্রের মতো জমা হতে থাকে। তারা দু’জনই বুঝতে পারে, এই সম্পর্ক শুধুই বন্ধুত্বের সীমায় আটকে নেই। কিন্তু কোনো প্রকাশের তাড়া ছিল না—ছিল শুধু অনুভবের গভীরতা। শীতের শেষ বিকেলে লেকের ধারে দাঁড়িয়ে তারা একসাথে সূর্যাস্তের দিকে চেয়ে থাকে। সৌমিক তখন বলে, “রিয়া, যদি একদিন দূরে চলে যাই, তখনও কি তুমি চিঠি লিখবে আমাকে?” রিয়া মুচকি হেসে উত্তর দেয়, “তুমি যদি চলে যাও, আমি কাগজে তোমার জন্য কলকাতার গল্প লিখে পাঠাবো। তোমার জন্য প্রতিটি শীতের সকালে কুয়াশা, প্রতিটি বসন্তের ফুল, সব চিঠিতে ভরে পাঠাবো।” সেই প্রতিজ্ঞার মধ্য দিয়েই শুরু হয় তাদের জীবনের এক নীরব চুক্তি—যার সাক্ষী ছিল শুধু বইয়ের পাতা, লেকের জলের নীল আভা আর কলকাতার সেই চিরচেনা গলিগুলি। সময়ের স্রোত বয়ে যেতে থাকে, আর সেই স্রোতে গড়িয়ে যেতে থাকে রিয়া-সৌমিকের মনের না বলা কথা, যা পরবর্তী অধ্যায়ে চিঠির অক্ষরে অক্ষরে ফুটে উঠবে।

অধ্যায় ২: প্রেমের পরশ ও চিঠির শুরু

কলকাতার শীত আস্তে আস্তে গলতে শুরু করেছিল। বসন্তের হালকা বাতাস শহরের রাস্তায় ফুলের গন্ধ ছড়িয়ে দিচ্ছিল, আর সেই গন্ধ যেন রিয়া আর সৌমিকের সম্পর্কের আবেশ বাড়িয়ে তুলছিল দিনে দিনে। লাইব্রেরির করিডর, কলেজ স্ট্রিটের পুরনো বইয়ের দোকান, কফি হাউসের জানালার ধারে বসা প্রতিটি মুহূর্তে ওদের সম্পর্কের না বলা ভাষা আরও গভীর হচ্ছিল। সৌমিকের চোখে ছিল এক অদ্ভুত স্বপ্নের আভা। সে প্রায়ই বলত, “রিয়া, জানো, প্যারিসের নদীর ধারে বসে লেখা কবিতার স্বাদই আলাদা। জীবনানন্দের কবিতায় যে অদ্ভুত দূরত্বের টান, তা বোধহয় ওই দূর শহরেই সত্যি বোঝা যায়।” রিয়া প্রথমে হাসত, ঠাট্টা করত, “তাহলে আমাকে এখানে রেখে তুমি সেই স্বপ্নের পেছনে ছুটবে?” কিন্তু তারপর চুপ করে থাকত, কারণ তার মনের গভীরে সে জানত—সৌমিকের চোখে সেই দূরত্বের ডাক এক অমোঘ সত্য। কলেজের স্নাতকোত্তর পরীক্ষা শেষ হতেই একদিন সৌমিক জানিয়ে দিল—সে বিদেশে পড়তে যাচ্ছে। চেনা লেকের ধারে, সেই সন্ধ্যায় দু’জনে বসেছিল চুপচাপ। গোধূলির আলো লেকের জলে পড়ে সোনালি রেখা তৈরি করেছিল। পাখিরা ঘরে ফিরছিল, আর শহরের কোলাহল দূর থেকে ভেসে আসছিল। রিয়া খুব আস্তে বলল, “যাও, সৌমিক। কিন্তু কলকাতার এই গলি, এই লেক, এই বইয়ের গন্ধ—সবকিছু নিয়ে আমি তোমার জন্য লিখে পাঠাবো। তুমি দূরে থাকলেও, চিঠির অক্ষরে আমি তোমার পাশে থাকব।” সেই রাতে রিয়ার জানালার ধারে বসে প্রথম চিঠি লেখা শুরু হয়। কুয়াশার রাতে, কাগজের পাতায় কলমের অক্ষর হয়ে ঝরে পড়ে তার মনের গভীর অনুভূতি—প্রেম, আশঙ্কা আর এক অজানা দূরত্বের যন্ত্রণা।

চিঠি লেখা রিয়ার কাছে যেন প্রিয় অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। প্রতিটি চিঠিতে সে তার দিনলিপি লিখত—সকালের কলকাতা, ট্রামের টুং টাং, চায়ের দোকানের আড্ডা, কলেজ স্ট্রিটের ভিড়, বইয়ের দোকানের নতুন সংগ্রহ। সে লিখত কফি হাউসের নতুন কোনো কবিতার আলোচনা, লেকের জলে পড়া বিকেলের ছায়া, বা বৃষ্টিভেজা রাস্তায় হেঁটে আসা একলা পথের গল্প। প্রতিটি চিঠি ছিল যেন এক জীবন্ত ছবি, যা সৌমিকের কাছে পৌঁছাত ডাকবাক্সের ভেতর দিয়ে হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে। সৌমিক প্রথমদিকে নিয়মিত উত্তর দিত। তার চিঠিতে থাকত বিদেশের নতুন শহরের গল্প, প্যারিসের রাস্তায় বসে লেখা কবিতার লাইন, বা কোনও ছোট্ট ক্যাফের কোণের টেবিলের গল্প, যেখানে সে বসে রিয়ার চিঠি পড়ত। তাদের চিঠিগুলো যেন দুই শহরকে, দুই জীবনকে, এক অদৃশ্য সুতোয় বেঁধে রাখত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সৌমিকের চিঠির ব্যবধান বড় হতে থাকে। প্রথমে সপ্তাহে একবার চিঠি আসত, পরে মাসে একবার, আর একসময় দুই-তিন মাস পেরিয়ে যেত কোনো উত্তর না পেয়ে। রিয়া জানালার ধারে বসে থাকত প্রতিদিন সকালবেলা, পোস্টম্যানের সাইকেলের ঘণ্টার শব্দ শুনে ছুটে যেত দরজার দিকে। কিন্তু বারবার সে ফিরে আসত শূন্য হাতে। তবুও রিয়া লেখা থামাত না। তার চিঠিগুলোতে আরও গভীর হয়ে উঠত তার অপেক্ষা, অভিমান আর ভালোবাসার টান।

মাসের পর মাস কেটে যাচ্ছিল, আর সেই চিঠির অক্ষরগুলো যেন হয়ে উঠছিল রিয়ার বেঁচে থাকার প্রেরণা। সে প্রতিদিন রাতে নিজের চিঠির কপি পড়ত, যেন সৌমিকের সাথে কথা বলছে। সে চিঠিগুলো রাখত এক লাল রঙের বাক্সে, যেখানে ছিল তাদের প্রথম কফি হাউসের বিল, বইমেলার থেকে কেনা এক পুরনো বুকমার্ক আর লেকের ধারের শুকনো পাতা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের মানুষজন বলতে শুরু করল—“আর কতদিন ওই ছেলেটার জন্য বসে থাকবে? জীবন তো থেমে থাকে না।” কিন্তু রিয়া কারও কথা কানে নিত না। তার বিশ্বাস ছিল, চিঠির সেই অদৃশ্য সুতো একদিন সৌমিককে ফিরিয়ে আনবে। চিঠির প্রতিটি অক্ষর তার কাছে ছিল এক প্রেমের প্রতিজ্ঞার মতন, যে প্রতিজ্ঞা সময় বা দূরত্ব মুছে ফেলতে পারবে না। আর ঠিক সেই বিশ্বাস নিয়েই সে নতুন করে প্রতিটি ভোরের আলোয় চিঠি লিখে যেত, জানালার ধারে বসে থাকত আর মনে মনে বলত—“যেখানেই থাকো, সৌমিক, তুমি তো আমার চিঠির অক্ষরে লুকিয়ে আছো…”

 অধ্যায় ৩: দূরত্ব ও ব্যস্ততার ফাঁদ

সময় কখনও স্থির থাকে না। কলকাতার চেনা আকাশে যেমন ঋতু বদলে যায়, ঠিক তেমনি রিয়া আর সৌমিকের জীবনের গল্পের ছন্দও বদলাতে শুরু করে। প্রথম প্রথম সৌমিকের চিঠি ঠিকমতো আসত। প্যারিসের বৃষ্টিভেজা বিকেল, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসের ব্যস্ততা, সাইন নদীর ধারে বসে পড়া কবিতা—সব তার চিঠিতে আঁকা থাকত। রিয়া সেই চিঠি হাতে পেয়ে জানালার ধারে বসে পড়ত প্রতিটি অক্ষর, যেন সে সৌমিকের কণ্ঠস্বর শুনছে। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই চিঠির ফাঁক বড় হতে শুরু করল। প্রথমে সপ্তাহ দুই কেটে যেত, তারপর মাস পেরিয়ে যেত। রিয়া রোজ সকালে পোষ্টম্যানের সাইকেলের ঘণ্টা শুনে ছুটে গিয়ে দাঁড়াত। যখন দেখত তার নামের কোনো খাম নেই, তখন বুকের ভিতরটা হালকা কেঁপে উঠত। সে জানত না, সৌমিক ব্যস্ততার ফাঁদে জড়িয়ে পড়েছে। নতুন দেশের নতুন জীবনের চাপে, নাকি দূরত্বের ব্যবধানে মন ঘোলাটে হয়ে গেছে—সে বুঝতে পারত না। রিয়া ভেবে নিত, হয়তো কোনো ভুল ঠিকানায় চিঠি হারিয়ে গেছে, হয়তো সৌমিক ব্যস্ত, লিখে উঠতে পারেনি। তাই সে লেখা থামাত না। একেকটা চিঠি যেন তার নিজের জীবনের রোজনামা হয়ে উঠেছিল। চিঠির পাতায় সে লিখত—“আজ কলকাতার আকাশ খুব মেঘলা। তোমার মতোই চুপচাপ বসে আছি জানালার ধারে। জানো, তোমার প্রিয় লেকটার পাশ দিয়ে হেঁটে এলাম। একলা। খুব তোমার কথা মনে পড়ল।”

সৌমিকের না লেখা চিঠিগুলো একসময় রিয়ার বুকের ভিতরে এক অদৃশ্য শূন্যতার জমা হতে শুরু করল। এক সময়ের সেই প্রাণবন্ত মেয়ে, যে কবিতা লিখত, ছবি আঁকত, বন্ধুর আড্ডায় হাসত, সে যেন ধীরে ধীরে নিঃশব্দ এক প্রতীক্ষার মূর্তিতে রূপান্তরিত হচ্ছিল। বন্ধুরা বলতে শুরু করেছিল—“রিয়া, এখনো কি চিঠির আশায় বসে আছিস? ওই ছেলে হয়তো ভুলেই গেছে!” কিন্তু রিয়া মাথা নেড়ে মৃদু হেসে বলত, “না, সৌমিক এমন নয়। সে কথা দিয়েছে। সে আসবেই।” কিন্তু তার বুকের গভীরে এক চাপা কষ্ট যেন কুঁকড়ে থাকত, যা সে প্রকাশ করত না কারও কাছে। রাতগুলো হয়ে উঠেছিল আরও নিঃসঙ্গ। জানালার ধারে বসে, শহরের দূরের ট্রামের ঘণ্টার শব্দ শোনার মধ্যে দিয়ে, সে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করত—যেখানে থাকুক, সৌমিকও নিশ্চয় তার কথা ভাবে। চিঠির সেই বাক্সটা, যেখানে সে প্রতিটি চিঠি যত্ন করে রাখত, দিনে দিনে যেন তার একমাত্র সঙ্গী হয়ে উঠেছিল। রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে সে সেই বাক্স খুলে চিঠিগুলো পড়ত। পাতার গন্ধ মলিন হয়ে যাচ্ছিল, কালি ফিকে হয়ে আসছিল, কিন্তু স্মৃতি যেন আরও তীব্র হয়ে উঠছিল। কলকাতার শহরটার মতোই, রিয়াও প্রতীক্ষার আলো-ছায়ায় জড়িয়ে পড়ছিল।

আর অন্যদিকে, সৌমিকের জীবনে ব্যস্ততার স্রোত বয়ে যাচ্ছিল। বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়, নতুন বন্ধু, নতুন স্বপ্ন, নতুন ব্যস্ততা—সবকিছু মিলে সে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছিল সেই চিঠির অক্ষরগুলোর মধ্য থেকে। প্রথমদিকে সে লিখতে চাইলেই লিখতে পারত, কিন্তু সময়ের অজুহাত, ক্লাসের চাপ, বা নিজের অজানা দ্বিধা তাকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছিল। হয়তো তার মনের ভিতরে প্রশ্ন জেগেছিল—এই দূরত্বের সম্পর্ক টিকবে তো? কিংবা সে নিজের স্বপ্নের পেছনে ছুটতে ছুটতে একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়ছিল, আর চিঠি লেখা তার কাছে হারিয়ে যাচ্ছিল। তবু, মাঝে মাঝে রাতের নীরবতায়, একলা ঘরে, সৌমিক চুপচাপ বসে রিয়ার সেই পুরনো চিঠিগুলো পড়ত। রিয়ার হাতের লেখা দেখে, কলকাতার কথা পড়ে, তার চোখ ভিজে উঠত। কিন্তু পরের দিন আবার ব্যস্ততা তাকে গিলে ফেলত। আর চিঠি লেখা থেকে আরও একদিন পিছিয়ে যেত সে। সেই ফাঁক, সেই দূরত্ব আর অভিমান দিনের পর দিন জমে যেতে লাগল। আর রিয়ার জীবনে শুরু হল এক লম্বা প্রতীক্ষার রাত, যা শুধু চিঠির খামে ভর করে প্রতিটি ভোরে আশার রং খুঁজে বেড়াত, আর শেষে নিঃশব্দে মিলিয়ে যেত শহরের কোলাহলের মধ্যে।

🌸 অধ্যায় ৪: নিঃসঙ্গতার দিনলিপি

রিয়ার জীবনের দিনগুলো যেন এক অদ্ভুত নৈঃশব্দ্যের গভীরে তলিয়ে যেতে লাগল। সময়ের চাকা এগিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু তার মনে দিনগুলো আটকে পড়েছিল সেই শেষ চিঠির দিনটিতে। সকাল হোক বা বিকেল, তার চোখ জুড়ে ছিল সেই জানালার বাইরে রাস্তার দিকে চেয়ে থাকা দৃশ্য। সেই রাস্তা দিয়ে একদিন যে পোষ্টম্যানের সাইকেলের ঘণ্টা বাজত, সেই শব্দ এখন নিঃশব্দ হয়ে গিয়েছে। পাড়ার মানুষ, বন্ধুরা, এমনকি ঘরের আপনজনেরা সবাই তাকে বোঝাতে চেয়েছিল—“রিয়া, জীবনের গতি অন্য দিকে নিতে হবে। কতদিন তুমি এই ফাঁকা আশার ভরসায় বসে থাকবে?” কিন্তু সে কারও কথা কানে নিত না। অফিসের চাকরিতে সে জড়িয়ে পড়েছিল, প্রয়োজনে অর্থ উপার্জনের জন্য, কিন্তু কাজ শেষে ঘরে ফিরে রাতের নিঃসঙ্গতা তাকে তাড়া করে ফিরত। জানালার ধারে সেই ছোট্ট টেবিল, যেখানে বসে সে চিঠি লিখত, সেই টেবিলের ওপরে আজও পড়ে থাকত শূন্য খাতা আর শুকনো কলম। প্রতিটি রাতেই সে ঠিক করত, আর একখানা চিঠি লিখবে। কিন্তু কলম কাগজে নামার আগেই চোখের কোণে জমা জল শব্দহীনভাবে পৃষ্ঠার ওপরে ঝরে পড়ত। শহরের রাতের নিস্তব্ধতায় ট্রামের টুং টাং দূরে মিলিয়ে যেত, আর সেই নীরবতার মাঝখানে সে খুঁজে বেড়াত সৌমিকের উত্তরহীন চিঠির প্রতিধ্বনি।

তার কক্ষে একপাশে রাখা লাল কাঠের চিঠির বাক্সটি যেন তার জীবনের একমাত্র সাথী হয়ে উঠেছিল। রাতের নিরালায় সে সেই বাক্স খুলত, একে একে চিঠিগুলো বের করত, আঙুল বুলিয়ে যেত প্রতিটি অক্ষরের ওপর দিয়ে। চিঠির কালি ফিকে হয়ে আসছিল, পত্রের কাগজে সময়ের হলদেটে ছাপ পড়েছিল, কিন্তু সেই অক্ষরগুলো আজও যেন জীবন্ত, আজও যেন সৌমিকের কণ্ঠস্বর বয়ে আনত। রিয়া কখনও কখনও সেই চিঠির বাক্সের পাশে বসে ফিসফিস করে কথা বলত, যেমন কথা বলত সেই প্রথম কফি হাউসের জানালার ধারে বসে। শহরের ব্যস্ততা, অফিসের ক্লান্তি, চারপাশের জীবনের গতি তার মনের সেই স্থির প্রতীক্ষার সামনে ব্যর্থ হয়ে যেত। বন্ধুরা বলত—“বিয়ে করো, জীবনকে নতুন করে সাজাও।” পরিবারের লোকজন বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে এগিয়ে আসত, কিন্তু রিয়া নীরবে জানিয়ে দিত, “আমার সময় আসেনি।” আসলে তার সময় থেমে ছিল সেই শেষ চিঠির দিনে। প্রতিটি শীতের সকালে সে লেকের ধারে হেঁটে যেত একা, যেখানে একদিন সৌমিকের সাথে বসেছিল। লেকের জলে সূর্যের রশ্মি পড়ে যে সোনালি রেখা তৈরি হতো, সেটাই যেন আজও তার কাছে আশার প্রতীক হয়ে থাকত।

সময় পেরিয়ে যেতে যেতে রিয়ার জীবনে নিঃসঙ্গতার ছাপ আরও গাঢ় হয়ে উঠল। অফিস থেকে ফিরে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সে শহরের আলো-আঁধারি দেখত, দূরের হর্নের শব্দ, ভাঙা রাস্তার ধুলো, ট্রামের ক্লান্ত ঘণ্টা—সব যেন তাকে প্রতি রাতে মনে করিয়ে দিত সেই না-ফেরা চিঠির গল্প। সে রাতের পর রাত লিখে ফেলত অজস্র অসমাপ্ত চিঠি—যা ডাকবাক্সে আর ফেলা হতো না। সেই চিঠির পাতাগুলো শোবার ঘরের টেবিলের এক কোণে জমা হতো। সেখানে সে লিখত নিজের একলা থাকার কথা, তার কষ্টের কথা, আর শেষ আশাটুকু আঁকড়ে ধরা অনুভূতির কথা। সে জানত না সৌমিক সেই চিঠি পড়বে কি না, ফিরে আসবে কি না। তবু, প্রতিটি ভোরে নতুন আশার আলো তাকে আবার কাগজ-কলমের দিকে টানত। আর কলকাতার শহর, তার চেনা রাস্তা-ঘাট-লেকের ধারে হেঁটে যাওয়া পা-ফেলা পথগুলো সাক্ষী থাকত তার নিঃসঙ্গ প্রেমের এই অন্তরালের কাহিনির। আর রাতের গভীরে চিঠির বাক্সের ঢাকনা খুলে সে বলত—“শোনো, সৌমিক, আমি আজও অপেক্ষায় আছি… ঠিক যেমন প্রথম চিঠির দিনটিতে ছিলাম।”

 অধ্যায় ৫: দশ বছর পরের শহর

দশটি বছর! এক দশক যেন এক চোখের পলকে উড়ে গেছে। সৌমিকের কাছে এই সময়ের মাপটা ছিল এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বে ভরা। বিদেশের শহরে কংক্রিটের দেয়ালে গড়া জীবন, অফিসের সভা, ক্লাসের লেকচার, আর অনন্ত ব্যস্ততার মধ্যে সে কখন যে নিজের মনের গভীরে সেই পুরনো চিঠির অক্ষরগুলোকে হারিয়ে ফেলেছিল, তা সে নিজেই টের পায়নি। কিন্তু জীবনের এই বহমান স্রোতে হঠাৎ একদিন ক্লান্তি তাকে গ্রাস করল। বিদেশের রঙিন আলো, প্যারিসের চকের গন্ধ, আর নদীর ধারের ঠাণ্ডা বাতাস সবই যেন এক ঝলকে ফিকে হয়ে গেল। সৌমিক মনে মনে বারবার শুনতে পেল রিয়ার লেখা সেই চিঠিগুলোর লাইন—”তুমি দূরে থেকেও আমার কাছে আছো, জানালার পাশের চাঁদের আলোয় তোমার মুখ দেখি আমি।” সেই ডাক অগ্রাহ্য করতে না পেরে একদিন সমস্ত কিছু ছেড়ে দিয়ে সে ফিরল কলকাতায়। বিমানবন্দরে পা রেখে প্রথম শ্বাসে শহরের সেই চেনা ধুলো-হাওয়ার গন্ধ তার বুকের মধ্যে যেন ঝড় তোলে। শহর বদলেছে, রাস্তার মোড়ে নতুন দোকান, উড়ালপুল, মেট্রোর নতুন স্টেশন, কিন্তু বাতাসের গন্ধে, ভাঙা রাস্তার ধারে বিকেলের আলোয় এখনও লুকিয়ে আছে সেই পুরনো দিনগুলো। ট্রাম চলে যাচ্ছে আলতো ঝংকারে, চায়ের দোকান থেকে ভেসে আসছে চেনা মাটির ভাঁড়ের চায়ের সুবাস। সৌমিক চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে, মনে হয় এই শহরই তার মনের প্রতিটি শূন্যতা বুঝে যাচ্ছে।

শহরের পথে পথে হেঁটে বেড়াতে বেড়াতে সৌমিক খুঁজতে থাকে সেই ফেলে আসা মুহূর্তগুলো। কলেজ স্ট্রিটের বইয়ের দোকানের ধুলো ভরা পাতা, কফি হাউসের সেই কোণের টেবিল, লেকের ধারে সেই পুরনো বেঞ্চ—সবই আছে, কিন্তু কেমন যেন বদলে গেছে। সময় তার ছাপ ফেলে গেছে চারপাশে। কফি হাউসে বসে সে এক কাপ কফির অর্ডার দেয়, আর চুপচাপ জানালার ধারে বসে বাইরে তাকিয়ে থাকে। ভিড়ের মধ্যে সে খুঁজে পেতে চায় সেই পুরনো পরিচিত মুখ, যার হাসি একদিন তার জীবনের আলো ছিল। প্রতিটি মুখ যেন ভেসে আসে, মিলিয়ে যায়। সন্ধ্যা নামছে, রাস্তার লাইটগুলো জ্বলছে একে একে। হঠাৎ কফির কাপে চুমুক দিতে গিয়ে তার চোখ ভিজে ওঠে। সে ভাবে—এত দিন পর এই শহরে ফিরেও সে কি পারবে রিয়াকে খুঁজে পেতে? সে কি আজও অপেক্ষা করে আছে? নাকি জীবনের স্রোতে সে এগিয়ে গেছে অন্য কারও হাত ধরে? এই প্রশ্নগুলো বুকের ভিতর তীব্র কাঁপন তোলে। রাতে সে হেঁটে যায় লেকের ধারে, যেখানে শেষবার রিয়ার সাথে বসেছিল। সেই জায়গাটা যেন আরও নিঃসঙ্গ হয়ে গেছে। লেকের জলে চাঁদের ছায়া পড়ছে, বাতাসে হালকা শীতল স্পর্শ। সৌমিক মনে মনে ফিসফিস করে বলে, “রিয়া, আমি ফিরেছি।”

সৌমিক শেষমেশ খুঁজে পায় সেই পুরনো পাড়ার বাড়িটা, যেখানে রিয়া থাকত। বাড়ির রঙ ফিকে হয়েছে, বারান্দার রেলিং ভাঙা, তবু সেই বাড়িটা এখনও দাঁড়িয়ে আছে এক পুরনো সাক্ষীর মতো। সাহস করে সে বাড়ির গেটে গিয়ে দাঁড়ায়। সেখানে এক বৃদ্ধা কাজের মহিলা দরজা খোলে। সৌমিক ধীরে ধীরে রিয়ার নাম উচ্চারণ করে। মহিলা তাকে চিনতে না পেরে বলে, “মেমসাহেব এখন এখানে থাকেন না। পাশের পাড়ায় নতুন ফ্ল্যাটে গেছেন। কিন্তু তার বন্ধুবান্ধব এখনো এই ঠিকানায় খোঁজ করতে আসে।” মহিলা সৌমিককে রিয়ার নতুন ঠিকানার খবর দেয় না, কিন্তু বলে—“আপনি যদি চিঠির খোঁজে এসে থাকেন, মেমসাহেব সেই লাল বাক্সটা অনেক যত্ন করে রেখেছেন। কেউ ফিরে আসবে বলেই সে আজও সেই চিঠির বাক্স খুলে দেখেন।” এই কথায় সৌমিকের বুক কেঁপে ওঠে। সে বুঝতে পারে, যত দূরেই থাকুক, রিয়ার সেই চিঠির অক্ষরগুলো তাকে আজও তাড়া করে ফেরে। রাতে সে ফিরে যায় নিজের ছোট্ট হোটেল রুমে। সারা রাত জানালার ধারে বসে থাকে, আর ভাবে—কাল সকালেই খুঁজে বের করবে রিয়াকে, সেই চিঠির অক্ষরে লেখা ভালোবাসার উত্তর দিতে হবে। শহরের বাতাসে ভেসে আসে রাতের নিস্তব্ধতা, আর তার মনে হয়, পুরনো শহর তাকে ডেকে বলছে—”তুমি ফিরেছ, এবার যা হারিয়েছিলে তা খুঁজে নাও।”

অধ্যায় ৬: পুরনো চিঠির খোঁজে

সকালের মৃদু রোদে শহরটা যেন নতুন আলোয় ধোয়া এক পুরনো চিত্রপটের মতো মনে হলো সৌমিকের। রাতের নির্ঘুম অস্থিরতার পর সকালবেলার বাতাসে এক অদ্ভুত শক্তি খুঁজে পেল সে। সে ঠিক করল, আজ সে থামবে না। শহরের বুক চিরে সে বেরিয়ে পড়ল সেই চেনা রাস্তা ধরে—যেখানে প্রতিটি গলির মোড়ে, প্রতিটি চায়ের দোকানে রিয়াকে খুঁজেছে সে একসময়। অনেক খোঁজাখুঁজির পরে সেই কলেজের পুরনো বন্ধু অরিন্দমের খোঁজ পেল সে। অরিন্দমের চেহারায় বয়সের ছাপ পড়েছে, কিন্তু চোখে এখনও পুরনো আড্ডার সজীবতা আছে। সৌমিককে দেখে সে প্রথমে বিস্মিত, তারপর অভিমান মেশানো হাসি হেসে বলল, “শেষমেশ মনে পড়ল রিয়ার কথা?” সৌমিক নীরবে মাথা নিচু করে রইল। কোনো কথা বেরোল না মুখ দিয়ে। অরিন্দম কিছু না বলেই হাত ধরে নিয়ে গেল নিজের ফ্ল্যাটে। সেখানে অরিন্দমের আলমারির এক কোণে রাখা ছিল সেই লাল বাক্স—যা একদিন রিয়া অরিন্দমকে দিয়েছিল বলে, “যদি একদিন সৌমিক ফিরে আসে, দিও ওকে।” বাক্সের ওপরের কাগজের লেবেলে লেখা ছিল—“আমার অক্ষরের প্রেম”। সৌমিক বাক্স হাতে নিয়ে কাঁপতে লাগল। বুকের ভেতর যেন শত শত স্মৃতির ঝড় উঠল একসাথে।

ঘরের কোণে বসে সৌমিক একে একে সেই চিঠিগুলো বের করতে শুরু করল। প্রতিটি চিঠির কাগজে রিয়ার হাতের লেখা স্পষ্ট, কিন্তু সময়ের ছোঁয়ায় কালি কিছুটা ফিকে হয়ে গেছে। প্রথম চিঠিটা খুলতেই সে চুপ করে বসে পড়ল। লাইনগুলো পড়ে মনে হলো, রিয়ার কণ্ঠস্বর যেন কানের কাছে ভেসে আসছে—“তুমি দূরে থেকেও আমার জানালার ধারে বসে থাকো প্রতি রাতে, আমি সেটা অনুভব করি। কলকাতার বৃষ্টিতে যখন রাস্তা ভিজে যায়, তখন জানালার কাঁচে তোমার ছায়া দেখি আমি।” প্রতিটি চিঠি যেন এক এক টুকরো ছবি, যেখানে শহরের প্রতিটি দিন, প্রতিটি রাত, প্রতিটি ঋতু আঁকা আছে। সে পড়তে পড়তে কখন যে চোখের কোণে জল গড়িয়ে পড়ল, বুঝতেই পারল না। একসময় সে চিঠিগুলো বুকে জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বলল, “কেন লিখতে পারিনি রিয়া? কেন এই দূরত্ব তৈরি হল?” শহরের কোলাহল বাইরে থাকলেও ঘরের ভেতর তখন নিঃশব্দে গর্জন করছিল সেই না-পাওয়া দিনের স্মৃতি। প্রতিটি চিঠি খুলতে খুলতে সে যেন হারিয়ে যাচ্ছিল পুরনো দিনের সেই রোদ, সেই বৃষ্টি, সেই লেকের ধারের বিকেলে।

চিঠিগুলো শেষ করে সৌমিক সিদ্ধান্ত নিল—আর দেরি নয়। সে রিয়ার খোঁজ করবে, মুখোমুখি হবে। এতদিন যে কথা চিঠির অক্ষরে লিখতে পারেনি, সেই কথা সে রিয়ার চোখে চোখ রেখে বলবে। বিকেলের নরম রোদে অরিন্দমের ছাদে দাঁড়িয়ে দূরের শহরটার দিকে তাকাল সে। পাখিরা ডানা মেলছে নীড়ে ফেরার জন্য, আর সেই দৃশ্যের ভেতরেই সৌমিক নিজের ফেরার গল্প খুঁজতে লাগল। অরিন্দম তাকে রিয়ার নতুন ঠিকানা দিল, সাথে বলল, “রিয়া তো আজও একলা, বন্ধুরা চেয়েছিল সে নতুন করে জীবন শুরু করুক, কিন্তু সে পেরেছে কই? তোমার জন্যই তো সে এতদিন ধরে অপেক্ষা করে আছে।” এই কথাগুলো সৌমিকের বুকের ভেতর হিমেল বাতাসের মতো বয়ে গেল। সে ঠিক করল, কালই দেখা করবে রিয়ার সাথে। রাতের অন্ধকারে জানালার পাশে বসে সে চিঠির বাক্সটা খুলে রেখে চাঁদের দিকে তাকাল। শহরের বাতাসে তখন সেই চিঠির অক্ষরগুলো যেন ভেসে বেড়াচ্ছিল। সৌমিক বুঝল—এই চিঠিই তাকে ফিরিয়ে এনেছে, এই চিঠিই তাকে রিয়ার মুখোমুখি দাঁড় করাবে।

অধ্যায় ৭: মুখোমুখি

সকালের আলো যখন জানালার ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢুকল, তখন সৌমিক ঠিক করে ফেলল—আজই সেই দিন। শহরের ট্রামের ঘণ্টা, দূরের ট্রাফিকের কোলাহল, মাটির ভাঁড়ের চায়ের গন্ধ সবকিছু যেন তাকে সাহস জোগাচ্ছিল। অরিন্দমের দেওয়া ঠিকানা হাতে নিয়ে সে বেরিয়ে পড়ল। পাড়ার গলিগুলো এক সময়ের মতোই রয়েছে, শুধু দেয়ালের রং ফিকে হয়ে গেছে। জানালা থেকে দেখা যাচ্ছিল লাল শালু গাছের ডালে বসা কাকের ডাক। সৌমিকের বুকের ভিতর হঠাৎ কেঁপে উঠল। রিয়ার ফ্ল্যাটের সামনে এসে দাঁড়িয়ে সে একবার চোখ বন্ধ করল। কত বছর পর সে এই মুহূর্তের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেছে! দরজার বেল বাজাল সে। কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা। তারপর ধীরে ধীরে দরজা খুলল রিয়া। সময়ের ছাপ পড়েছে মুখে, কিন্তু সেই চোখের গভীরে আজও সেই চেনা আলোর ঝলক রয়েছে। দু’জনেই কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইল একে অপরের দিকে। যেন হাজারটা চিঠির অক্ষর এক মুহূর্তে জীবন্ত হয়ে উঠল। প্রথম কথা বলল সৌমিক, এক ফিসফিস করা স্বরে—“রিয়া…” আর রিয়া শুধু মৃদু কাঁপা গলায় বলল, “তুমি ফিরেছ?”

সেই মুহূর্তে ঘরের নিঃশব্দ বাতাসও যেন ভারী হয়ে উঠল। দু’জনেই জানত, এই নীরবতার ভেতরে কত কথা লুকিয়ে আছে। সৌমিক ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকল। চোখের কোণে জল লুকিয়ে রেখে রিয়া তাকে বসতে বলল জানালার পাশে রাখা চেয়ারে, যেখানে বসে সে কত রাত চিঠি লিখত, কত রাত অপেক্ষা করত। ঘরের কোণে রাখা লাল চিঠির বাক্সটা সৌমিকের চোখে পড়ল। সৌমিক বলল, “তোমার লেখা প্রতিটি চিঠি পড়েছি। অরিন্দম আমাকে তোমার কাছে নিয়ে এসেছে… আমি আসতে দেরি করে ফেলেছি, রিয়া।” রিয়া চুপ করে শুনল। তারপর খুব আস্তে বলল, “আমি জানি, তুমি ফিরবে। জানালার পাশে বসে রাতে যখন চাঁদের আলো এসে পড়ত, তখন মনে হতো তুমি আসছো, এই রাস্তায় হাঁটছো… আজ তুমি সত্যিই এসেছো।” চোখের জল এবার আর লুকিয়ে রাখতে পারল না সে। সৌমিক এগিয়ে এসে হাত ধরল রিয়ার। হাতের উষ্ণতায় হারিয়ে যাওয়া দশ বছর যেন এক মুহূর্তে মিলিয়ে গেল। চিঠির অক্ষরগুলো আজ আর অক্ষর নয়, জীবনের স্পন্দন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দু’জনে জানালার পাশে বসে কতক্ষণ গল্প করল কে জানে। কথা ফুরোয়নি, তবুও নীরবতার মধ্যে সব বলা হয়ে গেল। শহরের দূর থেকে ভেসে আসা ট্রামের ঘণ্টা, লেকের বাতাস, চায়ের দোকানের ভাঁড়ের ঠোকাঠুকি—সবকিছু মিলিয়ে যেন এক নতুন গান বেজে উঠল। সৌমিক বলল, “যদি তুমি চাও, এবার আর দূরে যাব না। চিঠির অক্ষর নয়, এবার আমি নিজে পাশে বসে তোমার গল্প শুনতে চাই, রিয়া।” রিয়া হেসে বলল, “চলো, আবার সেই লেকের ধারে হাঁটি। যেখানে শেষবার একসাথে বসেছিলাম।” দু’জনে বেরিয়ে পড়ল। লেকের ধারে বসে সূর্যাস্তের লাল আভা দেখতে দেখতে রিয়া বলল, “দেখছো? সূর্যাস্ত যেমন প্রতিদিন নতুন হয়, আমাদের গল্পও নতুন হলো আজ।” আর সৌমিক মৃদু হেসে বলল, “হ্যাঁ, চিঠির অন্তরালে লুকিয়ে থাকা প্রেম এবার মুখোমুখি হলো।” দূরের আকাশে সন্ধ্যা নেমে এল, কিন্তু দু’জনের মনের আলো জ্বলছিল সেই পুরনো চেনা ভালোবাসার দীপ্তিতে।

অধ্যায় ৮: শেষ চিঠি

লেকের ধারে বসে সূর্যাস্তের লাল আভায় যখন রিয়া আর সৌমিকের মুখ ভেসে উঠছিল, তখন চারপাশের বাতাসে যেন এক অদ্ভুত শান্তি ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই নিঃশব্দ সন্ধ্যায় দু’জনের চোখে চোখ পড়ে ছিল অনেকক্ষণ। কত না-কথা, কত অভিমান, কত অপেক্ষা আর কত স্বপ্ন—সব যেন সেই এক দৃষ্টিতে মিশে গেল। রিয়া খুব আস্তে বলল, “চিঠি লেখা বন্ধ করেছিলাম না কোনোদিন। কিন্তু জানো, শেষ চিঠিটা লিখেছি তোমার আসার আগের রাতে। ভেবেছিলাম, যদি তুমি ফিরে না আসো, তাহলে চিঠিটা লেকের জলে ভাসিয়ে দেব।” সৌমিক ধীরে রিয়ার হাত চেপে ধরল, তার কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল—“আমার জন্য লিখেছিলে, অথচ আমি লিখিনি রিয়া। সেই অপরাধ কখনও ভোলাতে পারব না।” রিয়া মৃদু হেসে বলল, “প্রেম চিঠির অক্ষরে নয়, মনে থাকে। আমি জানতাম তুমি আসবে। চিঠি লেখা বন্ধ করি নি, কারণ প্রতিটি চিঠির অক্ষরে আমি তোমার মুখ দেখতাম।” বাতাসে তখন লেকের জলে ঢেউ এর মত ছোট ছোট শব্দ উঠছিল, দূরে ভেসে আসছিল ট্রামের নিস্তব্ধ ঘণ্টা। দু’জনেই জানত—এই সন্ধ্যা, এই মুহূর্ত চিরদিন মনে থাকবে।

রাত্রি নেমে এলে তারা আবার ফিরল রিয়ার ঘরে। জানালার পাশে বসে রিয়া লাল বাক্সটা বের করে আনল। সেই বাক্স, যেখানে দশ বছর ধরে জমে ছিল তার প্রতিটি অক্ষরের ইতিহাস। সৌমিক একে একে সব চিঠি বের করে দেখল, আঙুল বুলিয়ে নিল প্রতিটি কাগজের ওপর। সেই চিঠিগুলোতে সময়ের ছাপ পড়েছে, কালি ফিকে হয়ে গেছে, কিন্তু প্রতিটি অক্ষর যেন আজও জীবন্ত। রিয়া শেষ চিঠিটা বের করে বলল, “দেখো, এটা সেই চিঠি যা কাল ভাসিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। তুমি আসায় সেটা আর করা হয়নি।” চিঠির খামে লেখা—“যদি আর না ফিরো…”। সৌমিক চিঠিটা পড়ে চোখ ভিজিয়ে ফেলল। চিঠির লাইনে লেখা ছিল—“যদি আর না ফিরো, জানবে, আমার প্রেম চিরকাল তোমার অন্তরালে রয়ে যাবে। আমি তোমার জানালার পাশে প্রতিটি রাতে বসে থাকব, প্রতিটি বৃষ্টিতে তোমার স্পর্শ খুঁজব।” সেই মুহূর্তে সৌমিকের মনে হলো, সে আর কোনোদিন এই শহর, এই ঘর, এই জানালার পাশে রিয়াকে একা ফেলে যেতে পারবে না। সেই রাতের বাতাসে চিঠির পাতা ওড়াতে ওড়াতে তারা দু’জনেই বুঝল—আজ চিঠির গল্প শেষ হলো, কিন্তু প্রেমের গল্প শুরু হলো এক নতুন অধ্যায়ে।

পরদিন সকালে তারা একসাথে লেকের ধারে গেল। সেই শেষ চিঠিটা হাতে নিয়ে রিয়া আর সৌমিক দাঁড়িয়ে রইল অনেকক্ষণ। তারপর দু’জনের সম্মতিতে চিঠিটা তারা লেকের জলে ভাসিয়ে দিল। কাগজের পাতায় ভিজে ভিজে লেখা গুলি মুছে যেতে যেতে লেকের জলে মিশে গেল, ঠিক যেমন তাদের অভিমান, অপেক্ষা আর সব না-পাওয়া মিশে গেল নতুন জীবনের প্রতিজ্ঞায়। শহরের বাতাসে তখন এক অজানা গান বেজে উঠল, যেন সেই চিঠির অক্ষরের মতো চিরন্তন হয়ে থাকল তাদের ভালোবাসা। আর তারা দু’জন একসাথে হাঁটতে হাঁটতে নতুন গল্পের পথে পা বাড়াল, যেখানে আর কোনো চিঠির দরকার হবে না—কারণ এবার থেকে প্রতিটি কথাই বলা হবে মুখোমুখি, প্রতিটি স্বপ্নই আঁকা হবে একসাথে। লেকের জলে শেষ চিঠির কাগজ ভেসে থাকতে থাকতে সূর্য উঠে আসছিল নতুন দিনের প্রতীক হয়ে।

1000030938.png

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *