Bangla - তন্ত্র

অঘোরিণী

Spread the love

অনির্বাণ বসু


পর্ব : শ্মশানের আগুনের নিচে

শ্মশানের রাতগুলো বড় নিঃশব্দ হয়, কিন্তু সেই রাতে কিছু ছিল যা নিঃশব্দ ছিল না। ছিল আগুনের গর্জন, ছিল মাটির নিচ থেকে উঠে আসা ধোঁয়ার মতো এক দীর্ঘশ্বাস। কাশীপুরের পুরনো শ্মশানঘাটে সেই রাতে আবার জ্বলে উঠেছিল চিতা, অথচ কারো মৃতদেহ ছিল না।
অন্তত চোখে দেখা যায়নি।

গ্রামের মানুষজন বলত—এই শ্মশানে কেউ যায় না চাঁদ না উঠলে। অথচ সেদিন ছিল অমাবস্যা, আকাশে ছিল না একফোঁটা আলো, কেবল আগুনের দীপ্তি কাঁপিয়ে দিচ্ছিল গাছের ছায়া। কুয়াশা, ধোঁয়া আর ছাই—সব মিশে এক অদ্ভুত গন্ধ তৈরি করছিল। হঠাৎ বাতাস থেমে গেল।

চিতার সামনে বসে ছিল সে।
সাদা ছাইয়ের মতো মুখ, গাঢ় হলুদ রঙের শাড়ি, কপালে বিশাল এক রক্তবিন্দু। চোখ দুটি যেন অনন্তকাল ধরে নিদ্রাভঙ্গ করা এক দেবীর। গায়ের ওপর কাপড়ের নিচে গাঁথা ছিল রুদ্রাক্ষ আর কাঁকড়া শাঁখের মালা। নাম তার—রুদ্রকন্যা।
কিন্তু কেউ তাকে আর এই নামে চেনে না।

আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে, এই কাশীপুরেই এক মেয়েকে গ্রামবাসী পাগল বলেছিল। বলেছিল, সে নাকি মৃতদের সঙ্গে কথা বলে, মাটি খুঁড়ে হাড় তোলে, রাতের অন্ধকারে মন্ত্র পড়ে আগুনের সঙ্গে নাচে। তার গা থেকে নাকি শবের গন্ধ আসে। সেই মেয়ে—পাঁচ বছরের সন্তান হারিয়ে যখন কাঁদতে কাঁদতে শ্মশানে এসেছিল, তখন কেউ পাশে দাঁড়ায়নি।
তাকে পাথর মেরে তাড়িয়ে দিয়েছিল গ্রামের লোক।

সে রাতে রুদ্রকন্যা উঠে দাঁড়াল। তার চুলগুলি ছাইয়ের মতো উড়ছিল হাওয়ায়, চোখে আগুনের লাল রেখা।
সে জানত—ফিরে এসেছে। তার প্রতিশোধ এখন শুরু হবে না, শেষ হবে। কারণ সে এসেছে রক্ষা করতে—এক প্রাচীন তান্ত্রিক শাখা, যেটা বহু আগে কাশীপুরেই জন্মেছিল।

তন্ত্রমতে বলা হয়—”যে নারী অঘোরিণী হয়, সে দৃষ্টির বাইরে থাকে, কিন্তু শক্তির কেন্দ্রে থাকে।”
রুদ্রকন্যা ছিল সেই অঘোরিণী।

তিনজনের নাম তার মনে স্পষ্ট ছিল—চৌধুরী, মোহন এবং গিরিধারী।
চৌধুরী মহাশয় ছিলেন গ্রামের প্রধান, যিনি তার গর্ভপাত করিয়ে বলেছিলেন—”পাগলের সন্তান আবার মানুষ হয় না।”
মোহন ছিল তার স্বামী—যে তাকে অন্য এক নারীর সঙ্গে রেখে দিয়েছিল, বলেছিল সে শয়তান।
আর গিরিধারী, সে ছিল পুরোহিত, যিনি গ্রামের সামনে ঘোষণা করেছিলেন—”এই মেয়ের মধ্যে ভর করেছে চণ্ডালিনী, ও শ্মশানবাসিনী, ওকে তাড়াও।”

রুদ্রকন্যা সেই আগুনের পাশে বসে তিনটি হাঁড়ির মুখ খুলল। প্রতিটিতে ছিল এক টুকরো কাপড়, এক ঝুড়ি কাঁঠালের পাতা, আর এক বিন্দু রক্ত। সে তিনটিকে ঘিরে মন্ত্র পাঠ করল—
“কালী মুণ্ডে, শ্মশানভবানে, তব কৃপায় নাশোকময় হয়ে উঠুক শত্রুর হৃদয়।”

একটা শেয়ালের ডাক শোনা গেল দূরে। বাতাস ফের বয়ে এল, এবার সেই গন্ধ আরও গাঢ়। আগুনটা কাঁপতে শুরু করল।
হঠাৎই, চৌধুরী বাড়ির জানলায় একটা ছায়া নড়ল। চৌধুরী, যিনি হুইলচেয়ারে বসে বাইরে তাকিয়েছিলেন, বুঝতেই পারেননি চোখের সামনে দিয়ে কে যেন হেঁটে গেল।

“কে ওটা?”—চিৎকার করলেন তিনি।
কেউ উত্তর দিল না।

তিন দিন পর, গিরিধারী পুরোহিত পাওয়া গেল গ্রামের কুলপুকুরে, মাথা ভাঙা, হাতে আঁকা ছিল—একটা লাল ত্রিশূল, যার গা ঘিরে লেখা ছিল “আগুন আসছে।”
পুলিশ বলল—মানসিক ভারসাম্যহীন, পা পিছলে পড়ে গেছে।

কিন্তু পুরোনো মানুষজন জানত—এই চিহ্ন তান্ত্রিকদের প্রতীক। অঘোরিণীর প্রতীক।
রুদ্রকন্যা আবার ফিরে এসেছে।

তবে এইবার সে শুধু প্রতিশোধের জন্য নয়, তন্ত্রকে রক্ষা করতে। কারণ কাশীপুরের তলদেশে আছে এমন এক বিদ্যা, যেটা যদি ভুল হাতে পড়ে, তাহলে এই পৃথিবীর সীমারেখা মুছে যেতে পারে।

চৌধুরীর বাড়ির আঙিনায় তখন একটা শাল গাছের ছায়ায় বসে ছিল সে। তার পায়ের কাছে পড়ে ছিল একটি পুরোনো ছেঁড়া ছবি—এক শিশু এবং এক নারী।
সে ছবিতে মুখ ছিল ছেলের—সেই সন্তান, যাকে তাকে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।

রুদ্রকন্যার ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটল। “তুইই শেষ আলো… আর আমি শেষ আগুন,” সে ফিসফিস করল।
তার হাতের তালুতে রক্ত জমে ওঠে, চাঁদহীন আকাশে বাতাস হঠাৎ নিঃশব্দ হয়ে গেল।
অঘোরিণীর পথ শুরু হলো—ছায়া থেকে আলোয়, আগুন থেকে ছায়ায়।

পর্ব : মৃতদের স্মৃতিপথে

কাশীপুরে আজকাল রাত নামলেই গন্ধ আসে—আগুন, চন্দন আর কিছু অদ্ভুত পচা মাটি মেশানো ধূপের গন্ধ। অনেকে বলে, বাতাসের দোষ। কেউ কেউ বলে, কোনো পুরনো পাপের গন্ধ।
কিন্তু বৃদ্ধা কমলাদিদা জানেন—এ গন্ধ এক নারীর ফেরা। যার চোখে এখন আগুন, আর মুখে সেই একই মন্ত্র—যে মন্ত্র একদিন তাকে সমাজচ্যুত করেছিল।

কমলা জানতেন, রুদ্রকন্যা মরেনি। কেবল পালিয়েছিল, তন্ত্রের গহিনে—যেখানে সমাজের চোখ যায় না, কিন্তু শ্মশান দেবীর চোখ সব দেখে।
রাত তিনটেয় সে আবার উঠেছিল—বাড়ির পুরোনো থালায় দুধ ঢেলে রেখেছিলেন দরজার পাশে। তিনি জানতেন, কেউ আসবে।

সে এল।
ধীরে, নিঃশব্দে, যেন ধোঁয়ার মতো গলে পড়ল ছায়ায়। মুখখানি আগের থেকে বদলে গেছে, চুল আরও বড়, চোখে সিধে দেখার দৃষ্টি নেই, যেন ভেতর দিয়ে গলে বেরিয়ে আসা ছায়া।
“তুই ফিরেছিস,” কমলা ফিসফিস করে বলল।
রুদ্রকন্যা মাথা নাড়ল।
“ওরা এখনো বেঁচে আছে,” সে বলল।

কমলা জানত, ‘ওরা’ মানে সেই তিনজন—যারা এক নারীকে তার সন্তান হারানোর পরে ছিঁড়ে দিয়েছিল ভিতর থেকে।
তিনদিনে তিনটা লক্ষ্মণ দেখা গেছে—
গিরিধারী পুরোহিত মৃত।
মোহনের কানে কেউ ফিসফিস করে বলেছে, “পিশাচের বংশ চলবে না।”
চৌধুরী প্রতিদিন রাতে ঘুম থেকে জেগে ওঠে, চিতার শব্দ শুনে।

রুদ্রকন্যা এবার ফেরার পর তার তন্ত্র আরও গভীর হয়েছে। শ্মশানে সে এক পুরোনো মৃতশিষ্যকে ডেকে তুলেছে—যার নাম ছিল ক্ষিতিশ।
ক্ষিতিশ একসময় ছিল ব্রাহ্মণ, পরে সন্ন্যাসী, তারপর একরকম শ্মশানের রক্ষক। আজ সে ছিল ছায়া, আর সেই ছায়া রক্ষা করছিল সেই তন্ত্রগুহা—যার মধ্যে লুকিয়ে আছে অগ্নিবীজ, এক প্রাচীন তান্ত্রিক শক্তি।

এই অগ্নিবীজকে চাইছে কেউ। কেউ যে রুদ্রকন্যার থেকেও প্রবল, যে মানুষের মুখ পরে চলে, কিন্তু রক্ত খায় শিকড় গেঁথে।
তার নাম কেউ উচ্চারণ করে না। শুধু বলে—“সে আসছে আগুন ছুঁতে।”

রুদ্রকন্যা জানে, এই লড়াই এখন প্রতিশোধের নয়, ধ্বংস রোধের।
তবে প্রতিশোধ পথ করে দেয় রক্ষা করার ক্ষমতাকে।
সে বলল, “আমি তিনটি মুখ চাই। ওদের চোখে চোখ রাখব, আর তারপর শিখিয়ে দেব, পাগল বলা নারীরা কেমন আগুন হয়ে ওঠে।”

মোহন ছিল শহরের এক পুরোনো পান দোকানের মালিক। ছোটো, নীচু একটা দোকান—সেখানে বসে সে পান বানাত, গালি দিত, আর মাঝে মাঝে একা একা হাসত।
সেদিন হঠাৎই এক বুড়ি মহিলা এসে বলল, “পানের সাথে একফোঁটা গঙ্গাজল দাও।”
মোহন বলল, “এখানে ভক্তি চলে না।”

মহিলা বলল, “ভক্তি নয়, শুদ্ধি চাই। শুদ্ধ না হলে যন্ত্রণা শুরু হবে।”
মোহন হাসল।
তবে রাত বারোটার পর, তার শরীর কাঁপতে শুরু করল।
সে বারবার জলের জন্য ডাকল, কিন্তু মুখ শুকিয়ে কাঠ। পাথরের মতো তার দুই পা চলা বন্ধ করে দিল, গলা থেকে ফিসফিসে আওয়াজ বেরোল—
“রুদ্র… ফিরেছে!”

রাত্রি তখন গভীর, আর রুদ্রকন্যা সেই পান দোকানের পাশে এক ছায়ায় বসে ছিল। তার চোখ বন্ধ, ঠোঁটে মন্ত্র।
সে বলল না কিছু, শুধু আঙুলে এক রক্তচিহ্ন এঁকে রেখে গেল মোহনের টিনের দোকানের কাচে—
“শোধ ফিরছে। বাঁচতে চাইলে পাপ স্বীকার কর।”

অন্যদিকে, চৌধুরীর বাড়িতে রাতের অন্ধকারে বারান্দার বাতি জ্বলে আর নিভে যাচ্ছিল। তার পাশে পড়ে থাকা হুইলচেয়ারে বসে চৌধুরী দেখছিল—দেয়ালে গা বেয়ে নিচে নেমে আসছে এক ছায়া।
একটা মৃদু গলা বলল, “তুমি সেই আগুনের সামনে দাঁড়িয়েছিলে, মনে আছে?”
চৌধুরী চিৎকার করে উঠল।

সে বুঝল, যে ফিরেছে, তাকে আগুনে পোড়ানো যায় না। তাকে পাগল বলে তাড়ানো যায় না।
কারণ সে এখন অঘোরিণী

পর্ব : রক্তের নিচে লুকোনো নাম

কাশীপুরের আকাশ যেন ভারী হয়ে উঠেছে। এমনকি বৃষ্টিও পড়ে না আর, যেন মেঘেরা জানে—এই মাটিতে এখন কিছু চুপচাপ ফুঁসছে। শ্মশানঘাটের আগুন নিভে গেলেও তার গন্ধ রয়ে যায় বাতাসে, আর সেই গন্ধে এক নামে সাড়া পড়ে—রুদ্রকন্যা।

মোহন এখন বাকরুদ্ধ। পান দোকানের ভিতর তার ঠোঁট শুকনো, চোখে এক অদ্ভুত শূন্যতা। কোনো ডাক্তার কিছু ধরতে পারছে না। মুখে দাগ, যেন আগুনের স্পর্শ পেয়ে গেছে। মুখের একপাশে এখনো লেখা সেই অদৃশ্য অক্ষরগুলো—”শোধ… আসছে।”

চৌধুরী বাড়ির দালানে এখন কেউ দাঁড়াতে চায় না। কারণ রাত হলে শোনা যায়—পায়ের শব্দ। ধীরে ধীরে, কাঠের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠা শব্দ। কেউ যেন আসছে, কিন্তু কারো চোখে ধরা পড়ে না।
চৌধুরী নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে রাখে। কিন্তু সে জানে—দরজা যতই বন্ধ থাক, যার আসার আছে সে আসবেই।
ঘরের এক কোণে পাথরের ঠাকুরের মাথা ভেঙে পড়েছে। শঙ্খভাঙা শব্দে সে চমকে উঠেছিল। তারপরই গন্ধ এসেছিল—চন্দনের নয়, আগুনে পোড়া হাড়ের।

আর সেই রাতে, রুদ্রকন্যা দাঁড়িয়েছিল নদীর ঘাটে। গঙ্গার ধারে, যেখানে পুরনো শিবমন্দির, সেখানে বসেছিল সে। পাশে তার রাখা ছিল এক পিতলের বাটি—ভরা রক্ত আর তুলসীপাতায়।
তার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল ক্ষিতিশ—কিন্তু এবার মানুষের রূপে নয়, ছায়ার মতো এক বিভ্রান্ত আলোয়।
“তোর সময় শেষ হয়ে আসছে,” ক্ষিতিশ বলল।
“শেষ নয়,” রুদ্রকন্যা বলল, “শেষ হবে যখন তারা তিনজন বলবে—হ্যাঁ, আমরাই নষ্ট করেছিলাম তন্ত্রকে।”

এই তন্ত্র ছিল বীজতন্ত্র—শক্তির এমন এক ধারা, যা নারীর শরীর ও শবের সংযোগে রক্ষিত হয়। এই তন্ত্রকে একসময় ব্যবহার করেছিল রুদ্রকন্যা ও তার গুরু—তারা কেবল নয়, তারা ছিলেন এই বিদ্যার ধারক।
কিন্তু মোহন, চৌধুরী আর গিরিধারী মিলে সেই বীজতন্ত্রকে অপবিত্র ঘোষণা করে কাশীপুরের তান্ত্রিক সাধনাকে ধ্বংস করেছিল। বলেছিল, “এ এক রাক্ষসী বিদ্যা।”

তখনকার দিনগুলোতে সমাজ তন্ত্রকে ভয় পেত—বিশেষ করে যখন কোনো নারী শক্তির আধার হতেন।
তাই রুদ্রকন্যার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় ‘পাগলের তকমা।’
তাকে গর্ভপাত করানো হয় জোর করে, দেহ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয় তার প্রথম সন্তান। সেই সন্তানের কোনো নাম ছিল না।
শুধু ছিল এক সাদা কাপড়ে জড়ানো, রক্তে ভেজা একটি শ্বাসহীন শরীর।

আজ সেই কাপড় সে সঙ্গে নিয়ে এসেছে।
ঘাটে বসে, সেই কাপড়টা বের করল রুদ্রকন্যা। কাপড়ের এক কোণে এখনও লেগে আছে শুকিয়ে যাওয়া লাল দাগ।
সে ফিসফিস করে বলল, “তুই ছিলি শক্তির উপহার। আর তোকে কেড়ে নিয়ে ওরা পাপ করেছিল। আজ আমি শুধু প্রতিশোধ নিচ্ছি না, তোকে ফিরিয়ে আনছি। তোর নাম দেব আমি। নাম, যা আগুন ছুঁয়ে আসবে।”

ঘাটের পাশের শ্মশানগাছ থেকে ঝরে পড়ল শুকনো একটা পাতা, আর নদীর ঢেউয়ে সেটা একবার ডুবে, আবার ভেসে উঠল।
রুদ্রকন্যা চোখ বন্ধ করল। আর সেই মুহূর্তে, চৌধুরীর বাড়ির দরজা খুলে গেল আপনাতেই। বাতি নিভে গেল, এবং দেয়ালে ভেসে উঠল রক্তের অক্ষরে একটা নাম—
অর্ঘ্য।

চৌধুরী ধপ করে পড়ে গেল মাটিতে।
মোহন, যে নিজে নিজের নাম ভুলে গিয়েছিল, হঠাৎ বলে উঠল, “অর্ঘ্য… আমার ছেলে!”

তিনজনের মুখে এক নাম—যাকে তারা মৃত ভেবেছিল, অথচ সে বেঁচে আছে, আগুনের রূপে।

রুদ্রকন্যা সেই রাতে কপালে এক নতুন তিলক আঁকল—রক্ত আর ছাইয়ের। আর তার চারপাশে বাতাস কাঁপতে লাগল। কারণ সত্যি সত্যি, সেই নামের শক্তি এখন জেগে উঠছে।
আর সেই শক্তি এখন শুধুই প্রতিশোধে নয়—সে চাইছে বিচারের চূড়ান্ত পূর্ণতা।
কারণ তন্ত্রের নিয়ম বলে—যদি এক মায়ের কান্না ছুঁয়ে কেউ মারা যায়, তবে সে আর শুধু মানুষ থাকে না।

সে হয়ে ওঠে—অঘোরিণীর রক্তজ।

পর্ব : আগুনের সন্তান

আলো নয়, আগুন দিয়ে জন্ম হয় কিছু অস্তিত্বের। তাদের কান্না জলে ভাসে না—তারা ছাইয়ের ভেতর গলে গিয়ে তৈরি করে ইতিহাস।
অর্ঘ্য—এক নাম, যা কোনো সরকারী খাতায় নেই, কোনো পুরোহিতের পাঠে শোনা যায়নি, কিন্তু যা চৌধুরী, মোহন ও মৃত গিরিধারীর রক্তের নিচে পাথরের মতো খোদাই হয়ে আছে।

রুদ্রকন্যা আজ সেই নাম উচ্চারণ করেছে।
তিনবার।
প্রথমবার মন্ত্রের ভাষায়, দ্বিতীয়বার মাতৃভাষায়, আর তৃতীয়বার আগুনের ভেতর ফিসফিস করে।

শ্মশানের ভেতর আগুন এক নতুন রূপ নিল—লাল থেকে বেগুনি, বেগুনি থেকে কালো। তার গা ঘেঁষে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে ছিল এক কিশোর অবয়ব। চোখ দু’টি নিঃশব্দ কিন্তু আগুনে পরিপূর্ণ, মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই।

সে কোনো প্রশ্ন করেনি।
শুধু বলেছিল, “তারা কোথায়?”

রুদ্রকন্যা বলেছিল, “তারা যেখানেই থাকুক, আজ থেকে প্রতিটি শ্বাসে তারা তাদের ভুলকে টের পাবে।”

অর্ঘ্য—যার শরীরে রক্ত, কিন্তু হার্টবিট নেই। যার চোখে জল নেই, কিন্তু পৃথিবীর সমস্ত কান্না জমা।
সে জন্ম নিয়েছে শ্মশানে, মৃত সন্তান হিসেবে, কিন্তু আজ রুদ্রকন্যার ডাকে ফিরেছে।

এটাই ছিল তন্ত্রের নিষিদ্ধ শাখা—প্রতিস্বপিন্ড তন্ত্র, যেখানে মৃতের বীজ থেকে জন্ম নেয় এক পুনর্জীব। সমাজ যাকে ভয় পায়, কারণ সে কোনো নিয়ম মানে না, কোনো ধর্ম মেনে চলে না।

রাত্রি তখন গাঢ়।
মোহনের দোকান সেই রাতেই আবার খুলে যায়।
কিন্তু এবার কেউ মোহনকে দেখে না—দেখে এক ছেলেকে বসে আছে, চুল ছেঁড়া, চোখ ফ্যাকাশে। সে চুপচাপ পান বানায়, আর মাঝে মাঝে মাটির দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে,
“আমি তাকে ফেলেছিলাম… আমি তাকে মেরে ফেলেছিলাম…”

গ্রামে গুজব ছড়ায়—মোহনের দোকানে কেউ গেলে, নিজের নাম ভুলে যায়। কেউ নিজের মুখ আয়নায় দেখতে পারে না।
এক নারী আসে মাঝে মাঝে দোকানে—হলুদ শাড়ি, কপালে রক্তবিন্দু। কেউ তাকে জিজ্ঞেস করে না কিছু।

চৌধুরীর বাড়ি এখন তালাবন্ধ। কিন্তু গ্রামের বয়স্ক লোকেরা জানে, বারান্দা দিয়ে রাত তিনটেয় একটা ছায়া নেমে আসে। হাতের আঙুলে ছাই, চোখে শূন্যতা। সে আসে না কিছু চাইতে—সে আসে মনে করাতে,
“তুমি যা করেছ, তা মাফ হয় না।”

এদিকে, শ্মশানে বসে রুদ্রকন্যা ছেলের মুখের দিকে তাকায়। অর্ঘ্য কোনো হাসি হাসে না, কোনো আবেগ দেখায় না।
সে শুধু বলে, “আমি শুরু করব এখন।”

রুদ্রকন্যা বলল, “না… তুমি শেষ করবে। শুরু তো আমি করেছিলাম। আর শেষটা হবে এক উৎসর্গে। যেখানে পাপীদের রক্ত দিয়ে গড়া হবে নতুন বীজতন্ত্রের শিখা।”

তন্ত্রে বলা হয়—“প্রায়শ্চিত্ত যদি শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়ায়, তবে সে শক্তি আর সত্তার মধ্যে সীমা রাখে না।”

রাত তিনটে পঁচিশ।
গিরিধারীর মৃত্যুর পর, তার পুরোনো কুঁড়ে ঘরের নিচে পাওয়া গেল একটা চিহ্ন—ত্রিভুজের মধ্যে তিনটি চোখ।
রুদ্রকন্যা জানে, এটা ইঙ্গিত। কেউ আরেকজন আছে। কেউ যে গিরিধারী-মোহন-চৌধুরীর থেকেও ভয়ংকর।

এখনও অন্ধকারে বসে আছে সেই এক শক্তি, যে একদিন রুদ্রকন্যাকে বলেছিল, “তুই তো শুধু বাহক, আমি তো আসল ধারক।”

অর্ঘ্য তার দিকে তাকাল, কাঁধে ছাইয়ের ব্যাগ, হাতে এক পুরোনো শঙ্খ, চোখে আগুন।
“মা, তুমি আমাকে তৈরি করেছ,” সে বলল।
“তাই শেষটাও আমিই করব।”

রুদ্রকন্যা কিছু বলল না। শুধু একটানা তিনবার মাথা নাড়ল।
আগুন তখন নিঃশব্দে ফুঁসছিল। আর সেই আগুনের মধ্যে দেখা যাচ্ছিল এক চতুর্থ মুখ—যে এখনও ছায়ার আড়ালে আছে।
সে কার?
সে পাপীদের মধ্যেই কেউ, না কি তন্ত্রের গাঢ় অন্ধকার থেকে উঠে আসা আরেক অঘোর?

পর্ব : ছায়ার চতুর্থ মুখ

রুদ্রকন্যা আগুনের পাশে বসে, ধোঁয়ার ভিতর দেখছিল অতীত আর বর্তমানের মিশ্র প্রতিচ্ছবি। চোখে তার করুণার ছায়া নেই, ছিল এক বিশালতর শূন্যতা, যেন যন্ত্রণার পিঠে বসে থাকা এক সন্ন্যাসিনী।
অর্ঘ্য পাশে নিঃশব্দে বসে। শ্মশানের ছাই তার কপালে পড়ে, তবুও সে নড়ে না। কারণ সে জানে—আরেকজন আসছে। চতুর্থ জন।

সে যে এসেছে, তার প্রমাণ পাওয়া গেল চৌধুরীর পুরনো গোপন ঘরে। সেই ঘরটি—যেখানে নাকি তন্ত্রের পুঁথি পোড়ানো হয়েছিল।
ঘরের মেঝেতে এখন এক ত্রিভুজ আঁকা—তিন কোণে তিনটি চক্ষু। আর মাঝখানে লেখা এক নাম—ঈশ্বরানন্দ

রুদ্রকন্যার হৃদয় কেঁপে উঠল।
ঈশ্বরানন্দ—তাদের গুরু। তাদের তন্ত্রশিক্ষক। যে তাকে অঘোরিণী হতে শিখিয়েছিল।
কিন্তু সে-ই একদিন মুখ ঘুরিয়ে বলেছিল,
“তুই অপবিত্র, কারণ তোর হৃদয়ে আগুন আছে। আর অঘোরে আগুন নয়, নির্লিপ্তি চাই।”

সেই পুরুষ গুরু, যে নারীর শরীরে তন্ত্র শিখিয়েছিল, কিন্তু সমাজের ভয়ে তাকে শ্মশানের ভেতর ফেলে দিয়েছিল একা।
সে-ই ছিল চতুর্থ মুখ।
সবচেয়ে ভয়ংকর। কারণ সে প্রতিশোধ নেয় না, সে শুধু ছায়া হয়ে নিয়ন্ত্রণ করে।

রুদ্রকন্যা ফিসফিস করে বলল,
“তুইও ছিলি তাদের মতোই… শুধু মুখে বলতিস মুক্তি, ভিতরে ছিলি বীজ ধ্বংসের।”
অর্ঘ্য তার দিকে চাইল, “আমার জন্মে কি তারও হাত ছিল মা?”
রুদ্রকন্যা চোখ বন্ধ করল।
সে জানত, অর্ঘ্যের জন্ম কোনো দুর্ঘটনা নয়। ঈশ্বরানন্দ নিজে সেই রাত্রিতে রুদ্রকন্যাকে শয্যাসঙ্গী করেছিল, ‘তন্ত্রজাগরণ’-এর নামে।
তখন রুদ্রকন্যা বুঝেছিল না, কিন্তু আজ বোঝে—সে ছিল শুধু বাহক। ঈশ্বরানন্দ চেয়েছিল এমন একটি সত্তা, যার মধ্যে শব ও আগুন দুই-ই থাকবে।
অর্ঘ্য সেই অনিয়ন্ত্রিত ফল।

শ্মশানের ভেতরে বাতাস তখন গা ছমছমে হয়ে উঠেছে। দূরে এক ফিসফিসে শব্দ—“বীজ… বাঁচাও বীজ…”
অর্ঘ্য উঠে দাঁড়াল।
“তাকে খুঁজে বার করব,” সে বলল।
“কিন্তু সে তো মৃত নয়,” রুদ্রকন্যা জানাল, “সে নিজের মৃত্যুও রচনা করে নিয়েছে। এখন আর সে ঈশ্বরানন্দ নয়—সে নিজেকে বলে ‘নাগ-অঘোর’।”

নাগ-অঘোর।
এক ছদ্মতান্ত্রিক, যে এখন শহরের বড় মঠে থাকে। যিনি মাথায় ত্রিনয়ন আঁকে, কিন্তু চোখের গভীরে কোনও করুণা নেই।
সে নারী শক্তির পূজা করে না—সে তাদের শোষণ করে, আত্মীকরণ করে নিজেকে শক্তিমান করে।
এখন সেই নাগ-অঘোর চায় অর্ঘ্যকে। কারণ সে জানে, এই ছেলেই তার ‘শেষ শক্তি’, যাকে ব্যবহার করে সে অমর হতে পারে।

কিন্তু অর্ঘ্য চুপচাপ উঠে দাঁড়াল।
“আমার জন্ম হয়েছে আগুনে। আমাকে পুড়তে হলে আগুন দিয়েই পোড়াতে হবে। কিন্তু সেই আগুন এখন আমার মুঠোয়।”

রুদ্রকন্যা মাথা নিচু করে বলল,
“তুই যদি ওর মুখোমুখি হোস… মনে রাখিস, ও তোর বাবা।”
অর্ঘ্য একটু থেমে বলল,
“যে জন্ম দেয়, সে-ই কি বাবা হয়? না কি যে আগুনে বসে সন্তানকে ডাক দেয়, সে?”

বাতাসে তখন শঙ্খ ধ্বনি।
শ্মশান জেগে উঠেছে।
একটি নতুন যুদ্ধ আসছে—তন্ত্র ও প্রতিতন্ত্রের, জন্ম ও শোষণের, প্রেম ও প্রতারণার।
আর সেই যুদ্ধে মুখোমুখি হবে—অর্ঘ্য বনাম ঈশ্বরানন্দ।
ছেলে বনাম পিতা।
অঘোরিণী বনাম গুরুর ছায়া।

পর্ব : নাগঅঘোরের মঠ

কাশীপুর থেকে প্রায় তিরিশ কিলোমিটার দূরে, এক নির্জন পাথরের পাহাড় ঘেঁষে রয়েছে এক পুরোনো তান্ত্রিক আশ্রম—মোটা দেওয়াল, ছাঁদে শুকনো তেল-ধূপের গন্ধ, আর ভেতরে একটা নিরবহীন শঙ্খধ্বনি।
এইখানেই বাস করে নাগ-অঘোর।

এককালে তার নাম ছিল ঈশ্বরানন্দ—এক শিক্ষিত, তান্ত্রিক গুরু। রুদ্রকন্যাকে তন্ত্রের পথ দেখিয়েছিল সেই-ই।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে হয়ে উঠেছে আধিপত্যের মুখ। এখন তার আশ্রমে শিষ্যরা তাকে আর “গুরু” বলে না—বলে “নাগেশ্বর।”
সে একা নয়—তার চারপাশে এখন কুঞ্জিকা-তন্ত্রের বিকৃত রূপ। নারী শিষ্যরা তার ছায়ায় থাকে, ভক্তরা তার রক্তচিহ্নিত অঙ্গুলিমুদ্রাকে পূজা করে।

রাত্রি তখন গাঢ়।
আশ্রমের গর্ভগৃহে বসে আছে নাগ-অঘোর। তার গায়ে লাল কাপড়, কপালে আঁকা তিনটি চোখ, আর সামনে একটি পিতলের পাত্র—যার মধ্যে এক শিশুর ছায়া।
ছবিটি পুরোনো, ছেঁড়া—অর্ঘ্যেরই।

“সে ফিরেছে,” নাগ বলল।
এক সহকারী বলল, “কে?”
নাগ চোখ বন্ধ করল, “আমার ‘অশুদ্ধ সৃষ্টি’। যাকে আমি তৈরি করেছিলাম, কিন্তু যার মা তাকে পবিত্র করেছে আগুন দিয়ে।”

তার চোখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে শিষ্যরা মাথা নিচু করল।
নাগ বলল, “তন্ত্র এখন ভারসাম্যহীন। রুদ্রকন্যা ফিরে এসেছে। আর সে চাইছে প্রতিশোধ নয়, পূর্ণতা।”
এক শিষ্য বলল, “তবে তাকে থামাব?”
নাগ হেসে উঠল, “না… তাকে পূর্ণ হতে দাও। কারণ পূর্ণতা মানেই পতন। ওর আগুনেই ও নিজে পুড়ে যাবে।”

এদিকে, অর্ঘ্য এবং রুদ্রকন্যা প্রবেশ করেছে সেই পাহাড়ঘেরা পথে।
রাত্রি কেটে যাচ্ছে নিঃশব্দে, কিন্তু চারপাশে পাখির ডাক নেই, নেই কোনো কুকুরের ঘেউ-ঘেউ—মাটি যেন কথা বলছে না।
রুদ্রকন্যা জানে, এ এক লালারক্তভেজা ভূমি, যেখানে শব্দও বন্দী।

তারা পৌঁছাল আশ্রমের ফটকে।
দুইদিকে দুটি দাঁতাল শ্বেতপাথরের সিংহ। কপাট বন্ধ।
অর্ঘ্য হাত বাড়াল।
তার আঙুলে আগুনের রেখা।
সে বলল, “এই দরজা কোনো কপাট নয়—এটা এক অভিশাপ। যে খোলে, সে আর ফিরতে পারে না।”

রুদ্রকন্যা বলল, “তাই তো আমরা এসেছি… ফেরার ইচ্ছা নিয়ে নয়, শেষ করতে।”

দরজা খুলে গেল নিজে থেকেই।
ভেতরে তান্ত্রিক গন্ধ, ধূপ আর পঁচা ফুলের সংমিশ্রণে গা গুলিয়ে ওঠে।
ছায়ায় দাঁড়িয়ে ছিল এক নারী, তার চোখ লাল, হাতে ত্রিশূল।
সে বলল, “নাগেশ্বর আপনাকে ডাকছেন।”

রুদ্রকন্যা মাথা নিচু করে বলল, “বলিস, অঘোরিণী ফিরেছে। আর এবার সে দীক্ষা নিতে নয়—দণ্ড দিতে এসেছে।”

অর্ঘ্য কিছু বলে না।
সে জানে, সামনে দাঁড়িয়ে আছে তার জন্মদাতা।
আর পেছনে তার জন্মদাত্রী।
সে জন্মেছিল নির্যাতনে, বড় হয়েছে ছায়ায়, আর এখন পুড়বে সত্যের আগুনে।

মঠের অন্তঃপুরে নাগ বসে আছেন।
তার পাশে এক খালি সিংহাসন, যেটা একসময় রুদ্রকন্যার জন্যই ছিল।
সে বলল, “অঘোরিণী… অনেক দিন পর দেখা।”
রুদ্রকন্যা বলল, “আজও সেই ভণ্ড মুখে তুই আমায় ডাকছিস ‘অঘোরিণী’? তখন তো বলেছিলিস আমি অপবিত্র।”

নাগ হেসে উঠল।
“তুই তো সত্যিই অপবিত্র—কারণ তুই প্রেম এনেছিলি তন্ত্রে, যেখানে নির্লিপ্তি চাই।”
রুদ্রকন্যা দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “তুই তন্ত্রকে ভয় পাসনি, তুই নারীর শক্তিকে ভয় পেয়েছিলি।”

এই তর্কের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিল অর্ঘ্য।
সে প্রথমবার নিজের পিতার চোখে চোখ রাখল।
সেই চোখে ক্ষমা নেই, কৌতূহলও নেই—শুধু দখল।
নাগ বলল, “তুই আমার সৃষ্টি। তোর দেহে আমার রক্ত, তোর ভিতরে আমার শক্তি। আয়, আমার উত্তরাধিকার হ।”

অর্ঘ্য বলল,
“তুই যদি আমার সৃষ্টিকর্তা হবি… তবে আমাকে আগুনে ফেলে সেদিন পালালি কেন? কেন আমার মা’র কান্না শোনলি না?”

নাগ এবার প্রথমবার থেমে গেল।
এই থেমে যাওয়া… তার পতনের শুরু।

পর্ব : ছায়ার রক্তে রক্ত

আশ্রমের অন্তঃপুরে বাতাস থেমে গেছে। যেন চন্দনের ধোঁয়ায় জড়িয়ে রয়েছে এক গোপন ইতিহাস, যেটা শুধু পুড়লে প্রকাশ পায়।
নাগ-অঘোর দাঁড়িয়ে। সামনে অর্ঘ্য—তার রক্তজ, তার প্রতিচ্ছবি, কিন্তু আর তার নিয়ন্ত্রণে নেই।

রুদ্রকন্যা এক কোণে চুপচাপ বসে। সে জানে এই যুদ্ধ এখন তার নয়, এটা তার জন্ম দেওয়া আগুনের।

নাগ বলল, “তুই যা জানতে পারিসনি, তা হল—তন্ত্র কখনও কারো ব্যক্তিগত অস্ত্র নয়। এটা ক্ষমতার খেলা। আমি শুধু নিয়ম মানি না, আমি নিয়ম তৈরি করি।”
অর্ঘ্য ফিসফিস করে বলল, “তুই যে দিন আমাকে মৃত রেখে গেছিলি, সেই দিনই তোর তন্ত্র মরেছে। আমি জন্মেছিলাম তোর পতনের দিনেই।”

আশ্রমের ভেতর ছায়া নড়ছে। পুরোনো শিষ্যরা দূর থেকে দেখছে এই দৃশ্য—যেখানে প্রথমবার ‘নাগেশ্বর’ কাউকে নিয়ে নির্ভার নয়, ভীত।
কারণ এই ছেলেটা এসেছে আগুন হয়ে, পিতার বিচারক হয়ে।

“তুই কি আমাকে মারতে এসেছিস?”
নাগ জিজ্ঞেস করল, একবারও গলার জোর না বাড়িয়ে।
অর্ঘ্য বলল, “তুই মরার যোগ্য নোস। তুই পচে যাওয়ার যোগ্য।”

এই কথার পর, এক ঝটকায় আকাশে আগুনের রেখা উঠল।
রুদ্রকন্যা মন্ত্র পড়তে শুরু করল, তার কণ্ঠস্বর ভেসে উঠল,
“অগ্নিমুখী শক্তি, মাতৃশক্তি, রক্ষ কর তন্ত্রসত্য।”

নাগ তখন হেসে উঠল।
সে বলল, “তোর ছেলেকে দিয়ে আমাকে শেষ করাতে চাস? যে ছেলেটার ভিতরে আমারই তন্ত্র, তুই কি জানিস ও আমার মতোই ভয়ংকর হতে পারে?”

অর্ঘ্যের চোখে এবার আগুন।
সে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার হাতে আগুনের রেখা জমতে লাগল।
সে বলল, “আমি শিখেছি, তন্ত্র কোনো পিতার নয়, কোনো গুরুর নয়—এটা এক মা’র কান্নার মধ্যে জন্ম নেয়, আর সেখানে ঈশ্বরানন্দের জায়গা নেই। সেখানে তুই নেই।”

রুদ্রকন্যা তখন ছায়া থেকে উঠে এসে তার সামনে দাঁড়াল।
সে বলল, “তোর সৃষ্টিই তোকে শেষ করবে, ঈশ্বরানন্দ। কারণ তুই ভুলেছিলি, মা যখন সন্তান হারায়, তখন তার চোখের জল তন্ত্রের চাইতেও বড় অভিশাপ।”

এই মুহূর্তে আশ্রমের ছাদ থেকে পাথর খসে পড়ে। বাতি নিভে যায়। ঘরের ভেতর রক্তের মতো লাল আলো ছড়িয়ে পড়ে।
অর্ঘ্য উঠে দাঁড়ায়। তার চোখ থেকে আলাদা ধরণীর শব্দ হয় না, কিন্তু তার পদক্ষেপে মেঝে কেঁপে ওঠে।

সে সামনে এগিয়ে যায়। নাগ কিছু বলে না।
শুধু বলে, “তুই সত্যিই আমার রক্ত।”
অর্ঘ্য থেমে বলে, “তুই যা বলিস… আমি তার উল্টো।”

তারপর সে হাত রাখে নাগের কপালে।
ধীরে ধীরে, নাগের কপালের তিনটি চোখের চিহ্ন ছাই হয়ে গলে পড়ে যায়।
একটা তপ্ত আলোয় ঘর ভরে ওঠে।

নাগ-অঘোর ধপ করে পড়ে যায় মাটিতে। চোখ খোলা, কিন্তু দৃষ্টি ফাঁকা।
মনে হয়, তার ভিতরের সমস্ত শক্তি টেনে নেওয়া হয়েছে।
তার মুখের কোণে ছায়া, ঠোঁটে দাগ—কোনো মন্ত্র নয়, শুধু এক নাম—অর্ঘ্য।

শিষ্যরা দৌড়ে এসে তার দেহ ঘিরে দাঁড়ায়। কেউ ভয় পায় না, কেউ প্রণাম করে না। তারা বোঝে—এই মানুষটা আর গুরু নয়, কেবল এক প্রতারক।

রুদ্রকন্যা আর অর্ঘ্য ধীরে ধীরে বাইরে চলে আসে।
পেছনে পড়ে থাকে এক অন্ধকার মঠ, এক মৃতদেহ, আর তন্ত্রের বিকৃত প্রতিচ্ছবি।

রাত তখন ফুরিয়ে আসছে।
অর্ঘ্য একবার মায়ের দিকে তাকায়।
সে জিজ্ঞেস করে না, “এবার কি?”
কারণ সে জানে—শুধু প্রতিশোধ নয়, এখন আসল কাজ শুরু।
তন্ত্রকে ফেরত দিতে হবে তার পবিত্র রূপে, যেখানে শক্তি আসবে ভয় থেকে নয়, ভালোবাসা থেকে।

পর্ব : আগুনের শেষ শ্লোক

সকালের আলো ছুঁয়েছে কাশীপুর। দীর্ঘ বহু বছর পর প্রথমবার গ্রামের মানুষ দেখল—শ্মশানের পাশের গাছগুলো যেন মাথা নত করে আছে, আর বাতাসে নেই সেই আগুনের পোড়া গন্ধ।
এটা শান্তি, নাকি পূর্বাভাস—তা কেউ জানে না।

রুদ্রকন্যা দাঁড়িয়ে আছে সেই পুরনো ঘাটে, যেখানে একদিন সে কাঁদতে কাঁদতে সন্তান হারিয়েছিল। আজ তার পাশে দাঁড়িয়ে অর্ঘ্য—শরীরে আগুনের রেখা নেই, চোখে ভয় নেই, কেবল এক নিঃশব্দ উপলব্ধি।

নাগ-অঘোর এখন মৃত।
না, খুন নয়—সে নিঃশেষিত হয়েছে। কারণ শক্তির অপব্যবহার কখনো আগুনে পুড়ে যায় না, নিজেই নিজের ভেতর নিঃশেষ হয়ে পড়ে।

রুদ্রকন্যা একটা পুরনো কাপড় পুঁতে দিল নদীর ধারে। সেই কাপড়ে ছিল এক শিশুর ছেঁড়া স্মৃতি, নামহীন ইতিহাস।
আজ সে নাম পেল—
“অর্ঘ্য, অগ্নির উৎসর্গ।”

সে বলল, “আমি আর তোর মা নই, তুইও আর কোনো পিতা চাইবি না। তুই নিজেই এক সত্তা—যা জন্ম নিয়েছে ছাই থেকে, কিন্তু এবার হাঁটবে আলোয়।”

অর্ঘ্য তার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি কি আগুন থেকে মুক্ত?”
রুদ্রকন্যা মাথা নাড়ল।
“আগুন কখনও মুক্তি দেয় না, তুই তাকে ধারণ করবি, তোর ভিতরেই সে বাস করবে। কিন্তু আজ থেকে সেই আগুন আর প্রতিশোধের নয়, সে হবে রক্ষার।”

তন্ত্রকে আজ আবার পূজিত করা হবে।
কিন্তু এবার পুরোহিত নয়, অঘোরিণী নিজে দাঁড়াবে চণ্ডীর আসনে।
গ্রামের লোকেরা ধীরে ধীরে আসছে, প্রথমে ভয়, পরে কৌতূহল, শেষে শ্রদ্ধা নিয়ে।

একটি শিশু এগিয়ে এল। তার হাতে ছিল মাটির প্রদীপ। সে বলল,
“তোমার নাম রুদ্রকন্যা না?”
রুদ্রকন্যা হাসল না, কিন্তু তার চোখ জ্বলজ্বল করল।
সে বলল, “তুই আমায় যেটা ভাবিস, আমি সেটাই। তবে আজ থেকে তুই জানবি—নারী শুধু মা নয়, শুধু প্রেম নয়, সে আগুন, সে আলো, সে মাটি, সে আকাশ।”

অর্ঘ্য হেঁটে চলে গেল শ্মশানের ভেতর।
শেষবারের মতো সে হাতে তুলল সেই পুরনো রুদ্রাক্ষ মালা।
তারপর সেটা ছুঁড়ে দিল আগুনে। আগুন গলিয়ে নিল তাকে—আরেকবার নয়, এবার শান্তভাবে।

এই সময় রুদ্রকন্যা উচ্চারণ করল শেষ শ্লোক—
“অঘোরে যাহা থাকে, তা ভয়ের নয়।
ভয়ের যাহা থাকে, তা অঘোরে নাই।
আমি শ্মশান হতে এসেছি, কিন্তু ফিরছি আলো হয়ে।”

আকাশে তখন সূর্য উঠছে।
তন্ত্র ফের আলোয় ফিরেছে—নারীর হাত ধরে, আগুনের সন্তান হয়ে।

সমাপ্ত

WhatsApp-Image-2025-06-24-at-8.03.35-PM.jpeg

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *