সামাজিক গল্প
-
কুয়াশার ভিতর সত্যি
সৌমেন পাল কুন্দিলপুর — ছোট্ট একটি গ্রাম, দক্ষিণ ২৪ পরগনার পেটের ভেতর সেঁধিয়ে থাকা, যেন চুপিচুপি বেঁচে থাকা এক টুকরো সময়। এখানে ভোর হয় ধানক্ষেতে পাখিদের ডাকে, আর বিকেল নামে কুঁচো মাছ ধরা ছেলেদের হৈচৈয়ে। ঝিলের ধারে প্রাচীন বটগাছটা আজও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে, যেমনটা ছিল পঁচিশ বছর আগে — যখন অভয়চরণ মণ্ডল প্রথম এই…
-
আধখানা গল্প
সমীর বসাক অধ্যায় ১: আধখানা কাগজ নিতাই হালদার কাঁথার চাদর মুড়ি দিয়ে উঠোনের এক কোণে বসে আছে। জানুয়ারির শেষভাগ, হালকা কুয়াশায় মাটির রাস্তা যেনো ধোঁয়াশা খায়। গ্রামের প্রান্তের যে বাউলপল্লীটা, সেখানে সকাল নামে গানের চেয়ে আগে হাঁসের ডাক আর হাঁড়ি ধোয়ার শব্দে। গাঁওয়ের নাম কেউ জিজ্ঞেস করলে, নিতাই মুখ নিচু করে বলে—”আমরা পল্লীর মানুষ, নাম…
-
নয়ন ঘোষাল নেই
অনিন্দ্য দাশগুপ্ত পর্ব ১: যে মানুষটি নিখোঁজ পুজোর ঠিক আগের বিকেল, আকাশে হালকা সোনালি রোদ। দক্ষিণ কলকাতার গড়িয়ার এক ফ্ল্যাটবাড়িতে চার তলায় হঠাৎ কোলাহল—”নয়নবাবু কোথায়? ফোন ধরছেন না!” ফ্ল্যাটের দারোয়ান রবীন, পাশের ফ্ল্যাটের মৌসুমীদির সঙ্গে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে উদ্বিগ্ন মুখে তাকিয়ে আছে। নয়ন ঘোষাল, ৬৮ বছর বয়স, অবসরপ্রাপ্ত রেলওয়ে কেরানি। প্রতিদিন সকালে বারান্দায় বসে চা…
-
ছাপাখানার গল্প
প্ৰভাত বিশ্বাস (১) হরিপদ বসু সকাল সকাল ছাপাখানার ভারী লোহার গেট খুলে ভেতরে ঢুকতেই যেন এক অন্য জগতে পা রাখেন, একটুখানি আলো ফাঁক দিয়ে ঢুকেই ধুলো ঝরা অক্ষর, লিনোটাইপ আর লেটার প্রেসের মৃদু গন্ধে জেগে ওঠে তার বুকের গভীরে লুকিয়ে থাকা স্মৃতি। এই প্রেসের প্রতিটি মেশিন, প্রতিটি খোপের কালি শুকনো দাগ, পুরনো কাঠের তাকের রং…
-
ঘূর্ণি নদীর গোপন কথা
দীপান্বিতা রায়চৌধুরী ১ ঘূর্ণি গ্রামটা যেন সত্যিই সময়ের বাইরে পড়ে আছে—পথের ধারে টালির ছাউনির বাড়িগুলো, পুকুরঘাটে সাদা শাড়ি পরা বধূর মুখে মেঘ জমা চোখ, আর সেই নদী, যাকে ঘূর্ণি বলে, সে যেন জলের বদলে গোপন ইতিহাস বইয়ে চলে যায়। ১৯৪৬ সালের অক্টোবর মাস, দেশভাগের আগুন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে, তবু এই গ্রামটায় একটা ভিন্ন নৈঃশব্দ্য। পাখির…
-
রুদ্র-তরুণ ও গণতন্ত্রের গপ্পো
অরুণাভ বন্দ্যোপাধ্যায় ভোটপেটি ভীতু বনে দিন বদলেছে। বদলেছে শহর, বদলেছে গান, বদলেছে মানুষের মন। কিন্তু রুদ্র বাউল আর তরুণ ধ্বনি—এই দুই সুরের সাধকের জীবন যেন থেমে পড়েছে এক গোধূলি রেখায়। তাদের গলায় সুর আছে, বুকে সাহস আছে, কিন্তু মঞ্চ নেই, শ্রোতা নেই, আর নেই সেই সময়ের মরমি চাহিদা। রুদ্র এখন থাকে গোপীবাগের একচালা বাড়ির ছাদে,…
-
লাল কার্ড
ইন্দ্রনীল দত্ত অধ্যায় ১: কলকাতার উপকণ্ঠে একটা জায়গা আছে যেখানে শহরের শব্দ পৌঁছায় না ঠিকভাবে, শুধু হঠাৎ হঠাৎ ফ্লাইওভারের গম্ভীর গর্জন এসে কানে বাজে। সেখানে রয়েছে একটা ছোট্ট বস্তি—মাটির ঘর, টিনের চাল, বালতিভর্তি বৃষ্টির জল, আর সরু অলিগলি। এই জায়গার নাম বস্তির লোকেরা ‘জিন্নাহ কলোনি’ বলে ডাকে, যদিও কারো আধিকারিক কাগজে সেই নামে কিছু নেই।…
-
জোনাকিদের মিছিল
রুমা মণ্ডল বাহাদুরপুর গ্রামের শেষ মাথায় যে পুরনো অশ্বত্থ গাছটা দাঁড়িয়ে আছে, তার নিচে প্রতিদিন বিকেলের পর থেকে একজন মেয়ে চুপচাপ বসে থাকে। নাম কেউ জানে না ঠিক, তবে গ্রামের লোকজন তাকে ‘পরী’ বলেই ডাকে। মেয়েটার চেহারায় এমন একরকম মায়া আছে, যেন অনেকগুলো বেদনার রঙে আঁকা হয়েছে তার মুখ, চোখ দুটো এত গভীর যে তাকালেই…
-
পুরনো সোয়েটার
নির্মলেন্দু বিশ্বাস শীতকালের শুরুটা কলকাতায় যতটা না কাঁপুনির, তার চেয়েও বেশি স্মৃতির। সকালবেলায় ঠান্ডা আলো, শাড়ি গায়ে জড়িয়ে বারান্দায় দাঁড়ানো মায়েরা, আর গরম চায়ের কাপ হাতে ভাঙা কাঁচের জানালা দিয়ে সূর্যের কুয়াশা-বাঁধা হাসি ঢুকে পড়ে ঘরে। এই শহরের অভিজাত বসতিপাড়ায় একটি তিনতলা বাড়ির প্রথম তলায় বসু পরিবার শীতের আগমনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। বসুদের ছেলে, আর্য, বয়স…
-
মায়ার দোকান
গৌরি রায় ছায়াপুর—পাহাড়ঘেরা সবুজ এক গ্রাম, যেখানে রেলগাড়ি আসে না, রাতের অন্ধকারে কুয়াশা গা ছমছম করে ছড়িয়ে পড়ে আর মানুষ অচেনাকে ভয় পেয়ে গল্প বানিয়ে নেয়। সেই গ্রামের এক প্রান্তে, পুরনো তালগাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছে একটা ছোট্ট কুঁড়েঘরের মতো কাঠের দোকান, নাম নেই, বোর্ড নেই, অথচ সবাই জানে—ওটাই “মায়ার দোকান”। গ্রামের লোকেরা তাকে “ডাইনীর দোকান”…
-
বহুরূপীর শেষ মুখোশ
শ্যামল রায় পর্ব ১: শেষ প্রদর্শনের আগে পূর্ব মেদিনীপুরের একটা ছোট্ট গ্রাম—ধনঞ্জয়চক। গাছপালা ঘেরা, ধুলো মাখা পথ, আর বিকেলের শেষে চায়ের দোকানে গমগমে আড্ডা। সেই গ্রামের শেষ প্রান্তে একটা টালির ঘর, চারপাশে জঙ্গল গজিয়ে উঠেছে, জানলার ধারে একটা কাঠের তাক। তাকের ওপর সারি সারি মুখোশ—রাবণের, হনুমানের, গরুড়ের, রাক্ষসের, বাঘের, মহিষাসুরের। এবং একটা মুখোশ—সাদামাটা, ফ্যাকাশে, যার…












