সামাজিক গল্প
-
চুক্তির শহর
রুদ্রনীল সেন পর্ব ১: শুরু কলকাতার ভোর সবসময় এক অদ্ভুত শব্দে ভরে থাকে—হর্ণের মৃদু চিৎকার, ট্রামের ঘড়ঘড়ানি, ভাপওঠা চায়ের দোকান থেকে উঠে আসা ধোঁয়া, আর দূর থেকে ভেসে আসা মাইকের আওয়াজ। অদ্রিজ বসু প্রতিদিনের মতো আজও ভোরে ঘুম ভাঙল এই শব্দের ভেতরেই। তবে আজকের সকালটা অন্যরকম। আজ সে আর চাকরিজীবী নয়—আজ থেকে সে উদ্যোক্তা। মাত্র…
-
অপরিচিতা মোহিনী
সৃজা দত্ত ১ কলকাতার গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই গোলাপি দরজাটার পেছনে একটা দুনিয়া লুকিয়ে আছে, যেটা বাইরের চোখে শুধু একটা বিউটি পার্লার, কিন্তু ভেতরে জমে আছে আত্মত্যাগ, লড়াই আর পুনর্জন্মের ইতিহাস। ‘মোহর’ নামের সেই পার্লারটা খুব বড় নয়—দুটো চেয়ার, একটা আয়না আর একটা স্টিমার মেশিন—তবু এই ছোট্ট ঘরটাই মোহিনী সেনের জীবনের মূলমঞ্চ। সকালে কাঁচের…
-
খেলাঘর
অর্ণা মুখার্জী ১ সায়নী বসু দক্ষিণ কলকাতার মফস্বলি এলাকায় দাঁড়িয়ে বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে ছিল একটি পরিত্যক্ত বাসস্ট্যান্ডের দিকে। নতুন প্রজেক্টের কাজে তাকে পাঠানো হয়েছিল এই অঞ্চলের একটি পুরনো জমি পরিদর্শনের জন্য, যেখানে একটা কমিউনিটি সেন্টার তৈরির পরিকল্পনা আছে। কিন্তু সেই জমির পাশেই পড়ে থাকা পুরনো বাসস্ট্যান্ডটি তার দৃষ্টি আটকে দেয়। নীল রং উঠে যাওয়া টিনের…
-
“অ আ ক খ”
১ নদীর পাড়ের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানটা দিনের শেষে যেন এক শান্তির আশ্রয় হয়ে উঠত আশেপাশের শ্রমজীবী মানুষদের জন্য। পাশ দিয়ে গঙ্গার একটি শাখানদী বয়ে গেছে, তার জল সবসময়ই মাটি ছুঁয়ে যায়, আর গ্রীষ্ম হোক বা শীত—সন্ধ্যার দিকে বাতাসে একধরনের স্নিগ্ধতা নেমে আসে। আব্দুল হালিম প্রায় তিরিশ বছর ধরে এই দোকান চালিয়ে আসছেন। বয়স পঞ্চাশ…
-
ঝুমরির গানের দল
দীপান্বিতা মাহাতো ১ পুরুলিয়ার বাঁশডাঙা গ্রামে ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়তেই পাখির ডাকে জেগে ওঠে পাহাড়-জঙ্গলের বুক চেরা গ্রামটা। মাটির বাড়ির চালের নিচে কুয়াশার কুয়াশা, আর তার মাঝখান দিয়ে হেঁটে চলে যায় একটা কিশোরী—ঝুমরি হাঁসদা। তার পরনে হালকা লাল পাড়ের ধবধবে সাদা শাড়ি, হাতে জলভরা কলসি, কিন্তু ঠোঁটে একটানা চলতে থাকা সুর—”গেলি চলে পাহাড়ি পথে, কাহার…
-
এক মুঠো চাল
সায়ন্তন বসু ১ ধনেখালির একচালা ছোট্ট প্রাইমারি স্কুলটার ক্লাসঘরে তখন দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে, সূর্যের আলো বেখেয়ালে মেঝেতে খেলছে, কিন্তু সুধাংশু বেরা বুঝতে পারছিলেন, আজকের শিক্ষার আলো যেন কেমন ম্লান। ক্লাসরুমে মাত্র ন’জন ছাত্র—হাজিরার খাতা বলছে তেইশজন আছে রোল কল-এ। যাদের এসেছে, তাদের চোখে ঘুম নেই, আছে কেমন এক শূন্যতা। ছোট ছোট ছেলেমেয়েগুলো মাথা নিচু করে…
-
ধুলো জমা স্মৃতি
মৈনাক ঘোষ অধ্যায় ১ ঈশানীর কাছে উত্তর কলকাতার সুবর্ণা দিদার বাড়ি মানে ছিল একটা নিঃশব্দ, ধুলো জমে যাওয়া সময়ের বাক্স। বহুদিনের পুরনো এই দোতলা বাড়ির ভেতরে ঢুকলেই একটা শীতল বাতাস শরীর বেয়ে নামে, যেটার উৎস জানে না কেউ। দালানে ফেলে রাখা কাঠের চেয়ার, দেয়ালে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া ছবি, আর সিঁড়ির কর্কশ কড়কড়ে শব্দ সব যেন…
-
চিঠির ভাঁজে সমাজ
সৌমিত্র চৌধুরী ১ শ্যামল সাঁতরা জীবনের অধিকাংশ সময়টাই কাটিয়েছেন চাঁদিপুরের ছোট্ট পোস্ট অফিসের কাঠের কাউন্টারের পেছনে দাঁড়িয়ে। প্রতিদিন সকাল নয়টার আগে তিনি পৌঁছে যেতেন, সেই পরিচিত ঘন্টা বাজিয়ে খোলার সঙ্কেত দিতেন, আর দুপুর পর্যন্ত চিঠি ছাঁটা, ডাকসেবকের ব্যাগ সাজানো, খামে ডাকটিকিট লাগানো, টাকা জমা নেওয়া আর বাকি সময়টুকু গ্রামের মানুষের সুখদুঃখের শ্রোতা হয়ে উঠতেন। অবসরের…
-
জলছবি শহর
সাম্য বন্দ্যোপাধ্যায় ১ রঞ্জনের সকালগুলো ছিল শব্দহীন কিন্তু জীবন্ত, এক টুকরো জলছবির মতো। ঘুম ভাঙতো কাদামাটির বাড়ির চালা দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা রোদের ছায়া গায়ে মেখে। দূরে মন্দার নদী তখনো ঘুমিয়ে, শুধু কচুরিপানার মাঝখানে গুটিকয়েক হাঁস দুলে বেড়ায়, আর বাতাসে ভেসে আসে মাছ ধরার জালের গন্ধ। মা তখন রান্নাঘরে চাল বেছে, পেছনে একটা লাঙল-ধোয়া পুকুরঘাট থেকে…
-
পুজোর পাঁচ দিন
কুহেলী ধর ১ বাড়ির বারান্দায় রোদ এসে পড়েছে। মেঘলা গামছা দিয়ে হাত মুছতে মুছতে দাঁড়িয়ে রইল জানলার ধারে। নীচে প্যান্ডেলের বাঁশ বেঁধে গাঁদার মালা ঝোলানো হচ্ছে, ঢাকিরা এসেছে, ঢাকের প্রতিটা আওয়াজে যেন বুকের ভিতর কেঁপে ওঠে। ঘরের ভেতরে চায়ের কাপ রাখা, তাতে ধোঁয়া উঠছে না — কারণ মেঘলা আর চা খায় না, কবে যে নিজের…
-
মাটির স্বপ্ন
দেবব্রত জানা অধ্যায় ১: শস্যখেতের ছায়ায় পুব দিক থেকে সূর্যের আলো যখন ধানক্ষেতের কাঁচা সবুজ পাতার উপর পড়ত, রঘুবর হালদারের মনেও আলো ঝরে পড়ত। প্রতিদিনের মতো আজও সে ভোর ছ’টার মধ্যে মাঠে পৌঁছে গিয়েছিল। কুয়াশা তখনো জমির উপর পাতলা চাদরের মতো বিছানো, আর নলকূপের জলে হাত-মুখ ধুয়ে রঘুবর দাঁড়িয়ে পড়ে নিজের জমির দিকে তাকিয়ে থাকল…
-
অরণ্যের ডায়েরি
অরিত্র বসু পর্ব ১: শহরের রোদের মতো নয় আমার নাম অরিত্র। কলকাতা শহরের বুক থেকে উঠে আসা, ইউনিভার্সিটির পড়া শেষ করে একটা ছোট বিজ্ঞাপন সংস্থায় কাজ করি। বেঁচে থাকি ক্যাফেতে, পাতালরেলে, রেড ওয়াইনের আলোছায়ায়। তবু, কখনো-কখনো একটা নির্জনতা আমাকে টানে, যেন নিজের ছায়াকেও চিনতে পারছি না এই ভিড়ে। তাই অফিসের এক মাসের ছুটি পেয়েই আমি…












