ভূতের গল্প
-
কুয়াশার ঘড়ি
এক দার্জিলিঙের পথে ঋদ্বয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের গাড়ি উঠছিল ক্রমাগত সর্পিল খাড়া রাস্তায়, আর আকাশে তখন নেমে এসেছে এক চিলতে কুয়াশা, যেন পাহাড় নিজেই ধোঁয়ার কুয়াশায় শরীর ঢেকে ফেলেছে। হিমেল হাওয়া জানালার কাচে ধুলো জমিয়ে দিচ্ছিল, আর দূর থেকে পাইন গাছের ছায়া যেন কোন গোপন সংকেত দিচ্ছিল তাকে। লেখার কাজে বেরোনো ঋদ্বয়ের পরিকল্পনা ছিল দার্জিলিঙের মূল শহরের…
-
দেবী
প্রজ্ঞা সেনগুপ্ত এক সূর্য তখন পাহাড়ের আড়ালে গিয়ে অস্ত যাওয়ার প্রস্তুতিতে, আকাশে ছড়িয়ে পড়েছে কমলা রঙের ছায়া। গ্রামের শেষপ্রান্তের কাঁচা রাস্তাগুলো ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে আসছে। গরু-বাছুর ফিরেছে খুঁটির কাছে, ধোঁয়া উঠেছে রান্নার চুলায়। এমন সময় একটা ছায়ামূর্তি—কোনওমতে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে, কাপড় ছেঁড়া, হাঁটা কাঁপা কাঁপা। তার মুখটা ঢাকা, কিন্তু চোখের নিচে শুকিয়ে যাওয়া…
-
বটতলার প্রেতাত্মা
পল্লবী ঘোষ ১ কলকাতার সেই রাতটা অদ্ভুতভাবে চুপচাপ, যেন হাওয়ার মধ্যে গল্প লুকিয়ে আছে—আর সেই গল্প শুনতে পাওয়ার জন্যই তন্ময় সেদিন রাতে বন্ধুবান্ধবের আড্ডা শেষে একা হাঁটতে বেরিয়েছিল। কলেজ স্ট্রিটের চায়ের দোকান থেকে বেরিয়ে বন্ধুরা যে যার দিকে চলে গেল, কিন্তু তন্ময়ের মনে এক অদ্ভুত আকর্ষণ টানতে লাগল তাকে অচেনা এক গলির দিকে। রাত তখন…
-
কান্নার শব্দ, প্রেমের ছায়া
ঐন্দ্রিলা সরকার অধ্যায় ১: “ঘরটি কিন্তু অনেকদিন ধরে খালি…” কলকাতার উত্তর শহরের এক কোণে, পিচঢালা সরু গলির মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিল একটি দু’তলা পুরনো বাড়ি। একসময় হয়তো কারও ভালোবাসায় তৈরি এই বাড়ি আজ যেন শুধুই ইট-পাথরের কাঠামো। দোতলায় কালচে ধূসর রঙের জানালাগুলো দিনের আলোতেও অদ্ভুতভাবে বন্ধ থাকে, যেন ভেতরে কেউ শুয়ে আছে শতাব্দীর ঘুমে। অর্ঘ্য সেনগুপ্ত,…
-
ছায়ার সীমানা
মৈত্রেয়ী দত্ত শহরের ব্যস্ততম অংশটি চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল। দিনের উন্মুক্ত আলো অদৃশ্য হয়ে রাতের অন্ধকারে ঢেকে গিয়েছিল, আর সেই অন্ধকারে কেবল কিছু একটিই দৃশ্যমান ছিল—বাসস্ট্যান্ড। একে একে বাসগুলো চলে যাচ্ছে, কিন্তু তাতে কোনো কোলাহল নেই, যেন শহরের জীবন থেমে গিয়েছে। এই সন্ধ্যার মধ্যে এক তরুণী, সুহানা, দীর্ঘ সময় ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। সেদিন তার মন ভীষণ…
-
চামড়ার দস্তানা
অভিষেক দাশগুপ্ত ১: মেটিয়াবুরুজের গলিগুলো ভোরবেলা সবচেয়ে বেশি কথা বলে—হলুদ আলোয় ভিজে থাকা চায়ের দোকান, ঠেলাগাড়িতে করে পাঁউরুটি বয়ে নিয়ে চলা কিশোর, আর কুকুরের দল ঘুম থেকে উঠে একে অপরকে চেনার জন্য ঘেউ ঘেউ শুরু করে দেয়। সৌভিক ঘোষ, শহরের এক ক্ষুদ্র কুরিয়ার কর্মী, প্রতিদিন এই জীবনের মধ্যেই নিজেকে খুঁজে ফেরে। মাথায় হেলমেট, পিঠে বড়…
-
চরকালীর দানব
শুভ্রজিৎ দত্ত অধ্যায় ১: চরকালী গ্রামটি একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে আধুনিকতার ছোঁয়া তেমন পড়েনি। চারপাশে শুধু সবুজ ক্ষেত-খামার, নদী এবং পুরনো বাড়ি-ঘর। তবে গ্রামের সবচেয়ে রহস্যময় স্থান ছিল তার পুকুরটি। পুকুরটির পানি এমন স্বচ্ছ ছিল, যা মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করত, কিন্তু তার নিচে এক অদৃশ্য বিপদ lurked করত। স্থানীয়দের মধ্যে একটি গুজব প্রচলিত ছিল…
-
সন্ন্যাসিনীর কুটির
জয়ন্ত কুমার চক্রবর্তী অধ্যায় ১: আগমনী ছায়া অক্টোবরের শেষভাগ। পাহাড়ি হাওয়ার কাঁপন তখন নতুন করে জানান দিচ্ছিল আসন্ন শীতে পাহাড়ের নিঃসঙ্গতা কেমন হতে চলেছে। অনির্বাণ রায়, এক শহুরে গ্রাফিক ডিজাইনার, ছুটির ফাঁকে একা একাই বেরিয়েছিল উত্তরবঙ্গের দূরবর্তী একটি পাহাড়ি গ্রামে। লোকাল ট্রেনের স্টেশন থেকে তিন ঘণ্টা জিপে চড়েই যেতে হয় সেই গ্রামে, নাম দারগাঁও। এই…
-
রক্তের অলংকার
সিদ্ধাৰ্থ ঘোষাল এক দূর রাজস্থানের মরুপথ পেরিয়ে ড. সায়ন মিত্র সেই পরিত্যক্ত দুর্গে পৌঁছেছিলেন এক গ্রীষ্মসন্ধ্যায়, যখন সূর্যাস্তের আগুনে মিশে যাচ্ছিল বালি ও ইটের স্তম্ভ। চারপাশে ধ্বংসস্তূপের নীরবতা, কেবল মাঝে মাঝে বালুর ঝোড়ো বাতাসের শব্দ, আর পুরনো দরজার কঁকিয়ে ওঠা। এই দুর্গটি, লোকমুখে “রক্তবিন্দু মহল” নামে পরিচিত, মূলত ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পরিত্যক্ত হয়। স্থানীয় কাহিনি…
-
শূন্য নম্বর ঘর
শিলিগুড়ির পাহাড়ি রাস্তায় সন্ধ্যার অন্ধকার ধীরে ধীরে জমে উঠছিল, হালকা কুয়াশার পর্দা চেপে বসছিল বাতাসের গায়ে। গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে সায়ন চৌধুরী নিঃশব্দে পাহাড়ের বুক চিরে চলা রাস্তাগুলোর নিঃসঙ্গ সৌন্দর্য উপভোগ করছিল। সে বহুদিন ধরেই শহরের কোলাহল থেকে দূরে, একা কোথাও যাওয়ার কথা ভাবছিল—শেষমেশ এই পুরনো রিসর্টের খোঁজ পেয়ে বুকিং করে ফেলে। পাহাড়ের গা…
-
অরণ্যের অভিশাপ
রাজীব ঘোষ অধ্যায় ১ শীতের ভোর নেমেছে পাহাড়ি গ্রামে, কুয়াশার চাদরে ঢেকে আছে চারপাশের ঘন অরণ্য, পাথুরে পথ আর ছোট ছোট টিনের ছাউনি ঘেরা ঘরগুলো। স্কুলের খোলা উঠোনে শিশিরে ভিজে থাকা বেঞ্চগুলো যেন নিস্তব্ধতার চেয়ে বেশি কিছু বলছে না। এই সময়েই অমিতাভ মুখোপাধ্যায় ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে বেরিয়ে পড়ে গ্রামের প্রান্তের সেই পুরনো পাথরের রাস্তা…
-
নির্বাক দর্পণ
রূপক হালদার অধ্যায় ১ মুর্শিদাবাদের শেষপ্রান্তে, ভগ্নপ্রায় এক জমিদারবাড়ি — ‘নির্বাণ ভিলার’ — দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের শোকস্তব্ধ কঙ্কালের মতো। ছায়ায় ঢাকা তার প্রবেশপথ, দেয়ালজুড়ে শ্যাওলা আর বিস্মৃতির ছাপ। প্রত্নতত্ত্ববিদ অচিন্ত্য লাহা এই বাড়ির কথা প্রথম শোনেন পুরাতন নথিপত্র ঘাঁটতে গিয়ে—বর্ণনা ছিল সংক্ষিপ্ত: “রায়চৌধুরী রাজপরিবারের ধ্বংসপ্রাপ্ত ভিলা, অচেনা এক আয়নার রহস্য।” এতেই কৌতূহলের জন্ম। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের…












