বাংলাগল্প
-
পুতুলবাড়ির রহস্য
পুরোনো বনেদি বাড়ি শহরের একটি পুরোনি অঞ্চলেই অবস্থিত, যেখানে সময় যেন থেমে গেছে। বাড়ির প্রবেশদ্বারে পৌঁছালেই চোখে পড়ে সেই বিশাল, ত্রিমাত্রিক কাঠের দরজা, যা কালের সঙ্গে বিবর্ণ হয়ে ধূসর হয়ে উঠেছে। দরজার নক বেজে উঠলেই মনে হয় যেন অতীতের কোনো আভাস শোনাচ্ছে। বাইরে থেকে বাড়ি যতটা বড় মনে হয়, ভেতরে প্রবেশ করলে তার বিশালতা আরও…
-
কালীকূপের রহস্য
সন্দীপন বিশ্বাস অন্ধকারে মোড়া সেই গ্রামে দীপঙ্কর সেনের আগমন যেন এক অদ্ভুত পূর্বাভাসের মতো ছিল। কলকাতার ইতিহাসবিদ ও লেখক হিসেবে তার নাম ছড়িয়ে পড়েছিল, আর তাই গবেষণার তাগিদেই সে এই দূরবর্তী গ্রামে আসে। গ্রামের প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা কালী মন্দিরের পাশে কূপটির কথা সে অনেক আগে থেকেই শুনে এসেছে—লোকমুখে কিংবদন্তির মতো ছড়িয়ে থাকা গল্প যে, রাত…
-
মহালয়ার সুর
অমিয় মল্লিক ১ ভোরের ঠিক সেই মুহূর্তে, যখন আকাশের গাঢ় নীল ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে রঙ নেয় কমলা-সোনালি আভা, গ্রামের মানুষদের ঘুম যেন এক অদৃশ্য শক্তি ভেঙে দেয়। একে একে কুঁড়েঘরের দরজা খুলে যায়, উঠোনে আলো ফোটার আগেই গৃহস্থরা চমকে ওঠে—দূর থেকে ভেসে আসছে এক অদ্ভুত সুর, এক চণ্ডীপাঠের গম্ভীর ধ্বনি। মাটির ভেতর থেকে যেন…
-
অদম্য
নিবেদিতা বসু অনন্যার শৈশবটা অন্য সবার থেকে আলাদা ছিল। যেখানে বেশিরভাগ মেয়েরা পুতুল সাজাতে, রান্নাবান্না খেলতে কিংবা চকচকে চুলের ফিতেতে মেতে থাকে, সেখানে অনন্যার চোখ জ্বলে উঠত ব্যাট-বলের নাম শুনলেই। পাঁচ-ছয় বছর বয়স থেকেই তার খেলার সঙ্গী ছিল পাশের গলির ছেলেরা। তারা যখন ক্রিকেট খেলতে মাঠে নামত, অনন্যা কাঁধের ব্যাট ঝুলিয়ে দৌড়ে যেত। প্রথমে ছেলেরা…
-
চন্দ্রালোকের আড়ালে
দেবিকা দাশগুপ্ত ১ গ্রামের প্রাচীন মন্দিরটি যেন সময়ের বুক চিরে দাঁড়িয়ে আছে, শত বছরের নীরবতা আর শ্যাওলাধরা দেওয়ালে জমে থাকা ইতিহাস নিয়ে। চারপাশে কেবল বন আর পুরোনো বটগাছের ছায়া, গা ছমছমে নৈঃশব্দ্যকে আরও ঘনীভূত করে তুলেছে। পূর্ণিমার চাঁদ আকাশের মাঝে যেন এক অলৌকিক প্রদীপ, তার রুপালি আলোয় মন্দিরের ভাঙা ইট, পাথরের সিঁড়ি আর ভেতরের শিবলিঙ্গ…
-
লালরঙা কাকতাড়ুয়া
তানিয়া দে সকালবেলার রোদ যখন সবে ধানক্ষেতের মাথায় নরম সোনালি আলো ছড়িয়ে দিতে শুরু করেছে, তখনই গ্রামের মাঠে হাওয়া বইছিল এক অদ্ভুত প্রশান্তি নিয়ে। মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা লাল কাপড়ে মোড়া কাকতাড়ুয়াটা যেন চারদিকের দৃশ্যকে গম্ভীর দৃষ্টিতে দেখছিল—তার জীর্ণ মুখখানা, খড়ভর্তি বুক আর বাঁশের দেহে ঝোলানো লাল জামাটি বাতাসে দুলে উঠছিল। দূর থেকে দেখলে মনে…
-
দোতলার লাল আলো
অধ্যায় ১ — উত্তর কলকাতার পুরনো পাড়াগুলোর এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে—গলির ভেতর ঢুকলেই সময় যেন কয়েক দশক পিছিয়ে যায়। আধুনিক শহরের ব্যস্ততার বাইরে, এখানে এখনো ছিমছাম পুরনো দোতলা-তিনতলা বাড়ি, কার্নিশে শ্যাওলা জমে থাকা দেওয়াল, এবং ধুলো জমা বারান্দার খিলান। সেই রকমই এক সরু, বাঁকানো গলি—যেখানে দিনের বেলাতেও আলো ঠিকমতো ঢোকে না। গলির মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে আছে…
-
রহস্যময় অশরীরী কণ্ঠ
অর্জুন দে ১ গ্রামের প্রান্তে অবস্থিত খোশরুরাজ সরকারের পুরনো বাড়িটি বছরের পর বছর আগের সেই ভাঙাচোরা মেঝে আর ছাদের গাছের ফাঁকফোকর দিয়েই তার কাহিনী বলে চলে। আজও বাড়ির দেয়ালে সোনালী দিনের স্মৃতিগুলো উজ্জ্বল—তবে এখন যেন ম্লান হয়ে এসেছে সময়ের ধুলোয়। খোশরুরাজ, যে এককালে গ্রামের মঞ্চের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কণ্ঠশিল্পী ছিলেন, এখন নির্জনতার মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছেন।…
-
গ্লিচড সেলফি
তন্ময় সরকার এক শহরের আকাশে সেইদিন গোধূলির রঙ মিশে ছিল অদ্ভুত ভাবে—আধেক নীল, আধেক কমলা, আর মাঝে কোথাও কোথাও ছায়ার মতো ভাসছিল মেঘ। রাহুল সেন নিজের পুরনো কিন্তু প্রিয় ক্যামেরাটা টেবিলে রেখে জানলার ধারে এসে দাঁড়াল। সামনের রাস্তায় হালকা ভিড়, দোকানের আলো জ্বলে উঠছে একে একে, আর দূরে শিঙা বাজিয়ে একজন আইসক্রিমওয়ালা এগিয়ে যাচ্ছে। কাজের…
-
নীলতরঙ্গ
স্নিগ্ধা চক্রবর্তী এক ভোরের আলো ধীরে ধীরে রান্নাঘরের জানালা দিয়ে ঢুকে মীরার সিঁথির পাশে খসে পড়া চুলে লেগে যায়। চায়ের কাপে দুধ গরম হওয়ার শব্দ, প্রেসার কুকারের শিস, আর পাশের ঘর থেকে ভেসে আসা অরুণের গম্ভীর কাশি—সব মিলিয়ে ঘরটা যেন এক অদৃশ্য নিয়মে চলছে। অথচ এই শব্দের ভেতরে মীরার মনটা থাকে অন্য কোথাও। হাতের কাজ…
-
বেডরুমের বাইরে
কুশল রায় ১ শীতল বাতাসে ভেসে আসা ধোঁয়ার মতো কুয়াশার মধ্যে দার্জিলিং স্টেশনে ট্রেন থামতেই কাঁপতে কাঁপতে নামল অনির্বাণ ও মেহুলী। চারদিকে হালকা গুঞ্জন, মালবাহকদের হাঁকডাক, আর দূরে পাহাড়ে উঁকি দিয়ে থাকা বাড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে যেন একটা রঙহীন চিত্রকল্পে ঢুকে পড়েছে তারা। অনির্বাণের হাতে এক চামড়ার ট্রলি, অন্য হাতে মেহুলীর হাত। মেহুলী হালকা কমলা রঙের…
-
চন্দ্রাবতীর কুঠিবাড়ি
সমীর দাস ১ শহরের কোলাহল থেকে অনেক দূরে, নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে এক প্রাচীন কুঠিবাড়ি—জমকালো অতীতের ক্লান্ত ছায়া যেন তার শরীরজুড়ে বসে আছে। কাঁচা রাস্তা ধরে বহু চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ঈশান ও মিতালি প্রথম দিন বাড়িটায় পা রাখল। চারপাশে নির্জনতা, কেবল পাখির ডাক, আর মাঝেমধ্যে ঝোপের মধ্যে কী যেন সরসর শব্দ। দূরে ধীরে বয়ে চলেছে একটি…












