বাংলাগল্প
-
হীরের গহনা
সুরজিৎ ব্যানার্জী অধ্যায় ১ – রাজবাড়ির প্রতিটি কোণে যেন আলো আর শব্দের উৎসব। বিশাল মুখার্জি প্রাসাদকে চারদিক থেকে সাজানো হয়েছে রঙিন আলোকমালায়, উঠোনে টাঙানো কাগজের লণ্ঠন থেকে শুরু করে বারান্দার শোভা বর্ধনকারী ঝাড়বাতি—সব মিলিয়ে যেন এক অভিজাত কল্পলোক। বিয়ের আগের রাত বলে উৎসবের রঙ আরও গাঢ়। অতিথিরা আসতে শুরু করেছে, কেউ দূর সম্পর্কের আত্মীয়, কেউ…
-
নিখোঁজ প্রতিমা
দেবাশিস সেন ১ ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। গ্রামের পূর্বদিকের পাহাড়ের মাথায় লালচে আভা ফুটে উঠেছে, আর ধানখেতের কুয়াশার ভেতর দিয়ে আস্তে আস্তে ভেসে আসছে পাখিদের ডাক। শত বছরের পুরোনো দুর্গামন্দিরে ভক্তরা ভিড় জমিয়েছে, আজকের সকাল যেন অন্য সব সকালের মতোই ভক্তিময় হওয়ার কথা ছিল। ঘণ্টা বাজছিল, ধূপকাঠির গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছিল, আর মন্দির…
-
জঙ্গলের ডাক
প্রকাশ মাহাতো ১ পুরুলিয়ার ঘন জঙ্গলের ভেতরে সকালের কুয়াশা তখনও পুরোপুরি কাটেনি, সূর্যের আলো গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে নেমে এসে ঝিলমিল ছায়া তৈরি করছিল মাটির ওপর। চারপাশে শুধু শাল, সেগুন আর মহুয়ার বন, যেখানে পাখির ডাক মিলেমিশে এক অদ্ভুত সুর তৈরি করছিল। গ্রামের শ্রমিকরা দল বেঁধে এসেছিল কাঠ কাটতে, হাতে কুড়াল, কাঁধে দড়ির বোঝা, কারও…
-
জোনাকির আলো
অমিত পাল রাতের অন্ধকার গ্রামটিকে পুরোপুরি আচ্ছন্ন করেছিল। চারপাশে নীরবতা, যেন পৃথিবীর সব শব্দ মুছে গেছে। পাতাগুলোর উপর হালকা শিশির জমে আছে, আর বাতাস নীরবভাবে গাছের পাতা দুলাচ্ছে। ছোট্ট গ্রামটির মাটির রাস্তাগুলো এখনো দিনের আলো থেকে দূর্যোগের মতো ফাঁকা। ঘরগুলো নিস্তেজ, জানালার পাশে কোনো আলো জ্বলছে না। তবে গ্রামের এক কোণে, নদীর ধারে, রূপসা একা…
-
হিমালয়ের গোপন ঝর্ণা
সব্যসাচী পাল সকাল হলে গ্রামের ছোট্ট হোটেলের দরজার বাইরে অর্ণব, মেহুল, ইশিতা, রাহুল ও মায়া একত্রিত হয়। প্রত্যেকের মুখে ভরপুর উদ্দীপনা, যেন পাহাড়ের কোল তাদের রোমাঞ্চের প্রতীক্ষায় রেখেছে। রাহুল ক্যামেরা হাতে খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে, পাহাড়ের চূড়ার ছবি কল্পনা করছে। মায়া তার ব্যাগ চেক করছে, ছোটখাটো জিনিসগুলো ঠিক মতো প্যাক করা আছে কি না। মেহুল…
-
কালো শাড়ির ভোর
চৈতালি ঘোষ কলকাতার এক আর্দ্র গ্রীষ্মের দুপুরে সায়ন্তনী মুখার্জী তার চেম্বারে বসে ছিল, ডেস্কে জমে থাকা কেস ফাইলের পাতাগুলো উল্টাচ্ছিলেন। জানলার বাইরে থেকে ভেসে আসছিল রাস্তার গরম ধুলো আর রিকশাওয়ালার ক্লান্ত গলার আওয়াজ। এদিনটা অন্য দিনের মতোই ছিল, যতক্ষণ না দরজায় ধীর, দ্বিধাগ্রস্ত কড়া নাড়ার শব্দ হয়। “ভেতরে আসুন,” বলতেই দরজার ফাঁক দিয়ে দেখা যায়,…
-
মহাকাশের ডাকিনী
সৌরভ নাগ ১ ভারতের প্রত্যন্ত এক ছোট্ট গ্রাম, চারদিকে বিস্তৃত ধানক্ষেত, দূরে দূরে তালগাছ আর মাঝখানে মাটির ঘরগুলির সারি। দিনের বেলা গ্রামটি শান্ত, মানুষজন তাদের ফসল ও গৃহস্থালির কাজে ব্যস্ত থাকে, আর সন্ধ্যা নামলেই যেন গ্রামটা ঢেকে যায় অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতায়। আকাশভরা তারার নীচে সারা গ্রাম যখন ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখনই ঘটল সেই অদ্ভুত ঘটনা।…
-
সময়ের সেতু
অনিত চক্রবর্তী এক অর্ণব সেনের চোখে তখন ঘুমের ছায়া নেই, কেবল জেগে আছে অদম্য স্বপ্নের আলো। ল্যাবরেটরির অন্ধকার ঘরখানায় টেবিলজোড়া ছড়ানো যন্ত্রপাতি, নীল আলোতে ঝলমল করা মনিটরের গ্রাফ, আর চারদিকে ছড়ানো অজস্র খসখসে কাগজ। কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে তার গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকর্মীদের কাছে পাগলামি ছাড়া কিছু নয়, কিন্তু অর্ণব বিশ্বাস করে—সময় কোনো স্থির জিনিস নয়, বরং…
-
আত্মার নদী
ইন্দ্রনীল নস্কর ১ প্রায় সন্ধ্যার আগমুহূর্তে অর্ণব সেন পৌঁছালো সেই অজপাড়া গাঁয়ে। শহরের চওড়া রাস্তা, আলো ঝলমলে বিলবোর্ড আর ব্যস্ত ট্রাফিকের ভিড় পেরিয়ে, ধীরে ধীরে যখন গ্রামের সরু কাঁচা পথে প্রবেশ করল, তখন মনে হলো যেন অন্য এক জগতে এসে পড়েছে। চারপাশে নিস্তব্ধতা, কেবল মাঝে মাঝে দূরে শোনা যাচ্ছে শিস দিয়ে হাওয়া বয়ে চলার শব্দ।…
-
পানবিবির আসর
প্রতীক দত্ত এক গ্রামের প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে এক প্রাচীন মন্দির, যার বয়স যেন সময়ের গণ্ডি ছুঁয়ে গেছে। চারপাশে বিশালাকার বটগাছ, শেকড় ঝুলে পড়েছে দেয়ালের উপর, যেন প্রকৃতি নিজেই মন্দিরটিকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। পাথরের দেওয়ালে শেওলার আস্তরণ, ফাটল থেকে জন্ম নিয়েছে ছোট ছোট গাছ, আর স্যাঁতসেঁতে গন্ধে মন্দিরের ভেতর সবসময়ই মনে হয় কারও উপস্থিতি রয়েছে। শীতের…
-
বেহুলার শাঁখ
অনিন্দ্য দে ১ গ্রামের রাত সবসময়ই শান্ত, বিশেষ করে শীতের শেষে ফাগুনের সন্ধ্যায় যখন চারপাশে পেঁচা ডাকে আর দূরে কোথাও শেয়ালের ডাক ভেসে আসে। সেদিনও তেমনই এক রাত। আকাশে চাঁদ নেই, শুধু অন্ধকারের চাদর মাটিকে ঢেকে রেখেছে। দূরে দূরে ক্ষেতজমির মাঝে জোনাকিরা আলো জ্বালাচ্ছিল ক্ষুদ্র প্রদীপের মতো। গ্রামের লোকেরা তখন গভীর নিদ্রায়, কেবল কয়েকজন কৃষক…
-
গঙ্গার ধারে গোরস্থান
অনিৰ্বাণ সেনগুপ্ত ১ কলকাতার গঙ্গার ধারে সন্ধ্যার পরই এক অদ্ভুত আবহ ছড়িয়ে পড়ে। দিনের ব্যস্ততা, মালবোঝাই বার্জের হর্ন, নৌকার ভিড় আর ঘাটের চেঁচামেচি—সব মিলিয়ে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত জায়গাটা থাকে কর্মচঞ্চল। কিন্তু সূর্য নামলেই চেনা ছবিটা ধীরে ধীরে বদলে যায়। ঘাটের ধারে বসে থাকা চায়ের দোকানদার আলো নিভিয়ে বাড়ি ফেরে, কাঁকড়া বা ছোট মাছ বিক্রির…












