বাংলাগল্প
-
চামুণ্ডীর অভিশাপ
১ পশ্চিমবঙ্গের অন্তঃস্থলে, নদীর ঘাট ছুঁয়ে যাওয়া আঁকাবাঁকা কাঁচা রাস্তার শেষে দাঁড়িয়ে আছে রাজবাড়ি—এক প্রাচীন জমিদার বাড়ি, যার গাঢ় লাল ইঁটগুলো সময়ের আঘাতে ফেটে গেছে, দেয়ালের চুনকাম খসে পড়েছে, আর শ্যাওলা জমে অন্ধকার হয়ে উঠেছে প্রতিটি কোণ। এককালে এখানে আলো ঝলমলে উৎসব হতো, রথযাত্রার দিন প্রাসাদের প্রাঙ্গণে ভিড় জমত হাজার হাজার মানুষ, আর মহিষাসুরমর্দিনীর বিসর্জনকালে…
-
অগ্নিশিখা
সহেলী দেব অগ্নিশিখা দত্ত ছিলেন এক মফস্বল শহরের সাধারণ স্কুলশিক্ষিকা, কিন্তু তার ভেতরে ছিল অদ্ভুত এক দীপ্তি, যা বাইরের সাধারণ চোখে ধরা পড়ত না। শাড়ির আঁচল গুঁজে স্কুলে গিয়ে তিনি যেমন মাটির গন্ধে ভিজে থাকা খড়ের ছাউনিওয়ালা শ্রেণিকক্ষে মেয়েদের পড়াতেন, তেমনি দিনের শেষে ঘরে ফিরে নিজের বুকের ভেতর জমতে থাকা অস্থির স্বপ্নকে আঁকড়ে থাকতেন। ছোটবেলা…
-
আটচালার কান্না
প্রমিত চৌধুরী ১ শান্তিনগর গ্রামের প্রাচীন জমিদারবাড়িটি যেন এক ইতিহাসের দলিল, কিন্তু সেই ইতিহাস আজ ধ্বংসস্তূপের স্তূপে চাপা পড়ে আছে। লাল ইটের গা বেয়ে নেমে এসেছে লতাপাতা, জানালার কাঠের খাঁচাগুলো ভেঙে পড়েছে, আর দালানের ছাদের টালিগুলো অর্ধেক জায়গায় খসে গিয়ে আকাশের আলো ঢুকে পড়েছে ভেতরে। গ্রামবাসী দিনের আলোয় জমিদারবাড়ির পাশ দিয়ে গেলেও ভেতরে প্রবেশ করতে…
-
ডাকিনী কুন্ড
সুপ্ৰকাশ মুখার্জী ১ অন্ধকার নামার সঙ্গে সঙ্গেই গ্রামের অলিগলিতে নিস্তব্ধতা নেমে আসে। সন্ধের প্রার্থনা শেষ হলে কাকাদের আড্ডা থেমে যায়, খুদেরা দৌড়ঝাঁপ বন্ধ করে মায়েদের আঁচলের আড়ালে ঢুকে পড়ে। একমাত্র যিনি তখনও সক্রিয়, তিনি রাধিকা কাকিমা। বয়স আশির কাছাকাছি, মুখভর্তি কুঁচকানো ভাঁজ, মাথার চুল প্রায় সাদা, তবুও তার চোখদুটি এখনো অদ্ভুত উজ্জ্বল। গ্রামের বাচ্চারা যখন…
-
নিশির বাঁশি
১ শহরের একেবারে প্রান্তে, ব্যস্ততা ও জনবসতির বাইরে যেন পৃথিবীর ভিন্ন এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে সেই পুরনো শ্মশান। চারদিক ঘন গাছপালা দিয়ে ঢাকা, লতাগুল্মে জড়ানো ভাঙাচোরা ঘাট, অর্ধেক ডুবে থাকা শিলাস্তম্ভ আর শেওলা ধরা সিঁড়ি—সব মিলিয়ে জায়গাটি যেন সময়ের হাতে পরিত্যক্ত। দিনের আলোয়ও এখানে এক অদ্ভুত গা ছমছমে পরিবেশ বিরাজ করে, আর রাতের অন্ধকারে শ্মশান…
-
নিশির বাঁশি
১ শহরের একেবারে প্রান্তে, ব্যস্ততা ও জনবসতির বাইরে যেন পৃথিবীর ভিন্ন এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে সেই পুরনো শ্মশান। চারদিক ঘন গাছপালা দিয়ে ঢাকা, লতাগুল্মে জড়ানো ভাঙাচোরা ঘাট, অর্ধেক ডুবে থাকা শিলাস্তম্ভ আর শেওলা ধরা সিঁড়ি—সব মিলিয়ে জায়গাটি যেন সময়ের হাতে পরিত্যক্ত। দিনের আলোয়ও এখানে এক অদ্ভুত গা ছমছমে পরিবেশ বিরাজ করে, আর রাতের অন্ধকারে শ্মশান…
-
দেওয়ালের আঁকিবুকি
জয়ন্ত চক্রবর্তী অধ্যায় ১ – নতুন বাড়ি অর্পিতা নতুন ভাড়া বাড়িতে ওঠার দিনটি ছিল এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতির। শহরের রাস্তায় গাড়ি, মানুষ আর চেনা ভিড়ের মধ্যে থেকে বের হয়ে নতুন ঠিকানায় পৌঁছানো, মনে একধরনের অচেনা উত্তেজনা এবং অজ্ঞাত ভয়ের সংমিশ্রণ তৈরি করেছিল। বাড়ির বাইরে থেকে দেখলে মনে হতো, এটি যেন এক সাধারণ, পুরনো শহরের বাড়ি—সাদা…
-
ডাকঘরের প্রেতাত্মা
অধ্যায় ১ : পুরনো ডাকঘর অরিন্দম চক্রবর্তী শহুরে মানুষ। কলকাতার ভিড় আর ব্যস্ততার ভেতর বহু বছর চাকরি করে হঠাৎই একদিন ট্রান্সফারের চিঠি এসে যায় তার হাতে—পশ্চিমবঙ্গের এক অখ্যাত গ্রামে তাকে বদলি করা হয়েছে নতুন পোস্টমাস্টার হিসেবে। প্রথমে একটু মন খারাপ হয়েছিল, কেননা শহরের আরাম, বন্ধুদের আড্ডা, সিনেমা হল বা বইয়ের দোকান সব কিছুই ছেড়ে আসতে…
-
প্লাস্টিকের শহর
কৌস্তভ হালদার মেগাসিটি—এক আধুনিক নগরী, যেখানে একদিকে ঝকঝকে আকাশচুম্বী ভবন, অন্যদিকে দমবন্ধ করা বর্জ্যের পাহাড়। দিনের আলো ফোটার আগেই গাড়ির হর্ণ, ফ্যাক্টরির ধোঁয়া আর মানুষের ভিড়ে শহর জেগে ওঠে। কিন্তু সেই ভোরের সৌন্দর্য অনেক দিন আগেই হারিয়ে গেছে। সূর্যের আলো ধোঁয়া আর কুয়াশার মতো জমাট ধুলায় আটকে যায়, আকাশের নীল রঙ চাপা পড়ে থাকে ধূসর…
-
অপরাহ্নের ঘরবন্দি
সুদীপ্তা পাল ১ অফিসের ভেতর তখন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। সারাদিনের ব্যস্ততা, কিবোর্ডের শব্দ, টেলিফোনের রিং, সহকর্মীদের কথাবার্তার ভিড় মিলিয়ে সন্ধ্যা নামার সাথে সাথেই যেন হঠাৎ করেই স্তব্ধ হয়ে গেছে। ফ্লোরের আলো ঝলমল করছে ঠিকই, কিন্তু তার ভেতরে যেন কেবল শূন্যতার প্রতিধ্বনি। একে একে সবাই বাড়ির পথে পা বাড়িয়েছে, শুধু অরিন্দম আর রূপসা টেবিলে শেষ কিছু…
-
বাতাসের ফিসফিসানি
দেবাশিস রায় পুরোনো নদীর ঘাটটি এখন যেন সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া একটি জায়গা। দিনের বেলায়ও মানুষের পদচারণা খুবই কম, রাতে তা যেন আরও একাকী হয়ে ওঠে। গ্রীষ্মের তীব্র রোদ কিংবা বর্ষার ঝড়—সবকিছু মিলিয়ে ঘাটের কাঠের ডেক, ছেঁড়া দোলনা, এবং ভাঙা নৌকা-সবকিছুই অবহেলিত ও পরিত্যক্ত। নদীর ধারে ধুলো মিশ্রিত কাদামাটি, নরম বাতাসে পানি ধীরে ধীরে ধোঁয়া…
-
অশরীরীর পালকি
১ শান্তিপুর গ্রাম যেন একদিকে শান্ত, অন্যদিকে ভয়ঙ্কর রহস্যে মোড়া। গ্রামটি ছোট, কিন্তু চারদিকে বিস্তৃত ধানক্ষেত, ঘনবনের মাঝখানে পেঁচানো কাঁচা রাস্তা আর দিগন্তজোড়া নীরবতা যেন একে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। দিনের বেলায় এই গ্রাম প্রাণচঞ্চল—কৃষকের হালচাষ, বাচ্চাদের খেলা, মহিলাদের কুয়োয় ভিড় জমা, আর বিকেলের পর আড্ডায় মেতে ওঠা যুবকরা। কিন্তু রাত নামলেই অন্য ছবি। গ্রামের…












