Bangla
-
কেদারনাথের পথে
রাহুল দেব কলকাতার এক অফিসে প্রতিদিন আটটা থেকে আটটা কাজ করার রুটিনে বন্দি হয়ে গেছিলাম আমি—ঋষি সেন, বয়স তেইশ, সদ্য চাকরিতে ঢুকেছি। শহরের কোলাহল, ঘাম, ধুলো আর একঘেয়েমির মধ্যে হাঁসফাঁস করে কেবল একটা শব্দ মাথায় ঘুরছিল—‘পালিয়ে যাই।’ জুন মাসের এক রাতে, ঘরে বসে ইউটিউবে দেখে ফেললাম কেদারনাথ যাত্রার একটি ভিডিও। বরফে ঢাকা পাহাড়, মানুষের ভক্তি,…
-
রক্তচিহ্ন
প্রিয়াংশু অধিকারী ১ দার্জিলিঙের পাহাড়ি হাওয়া সেই সকালে একটু বেশিই কাঁপুনি ধরাচ্ছিল। সূর্য উঠলেও তার আলো ছিল ফিকে, যেন কোনো অজানা অন্ধকারের আঁচ লেগে আছে আলোতেও। ম্যাল রোডের একদম শেষপ্রান্তে ‘হোটেল শেরপা ভিউ’। নামটা শোনার পর মনে হয়, জানালা খুললেই দেখা যাবে কাঞ্চনজঙ্ঘা। আর দেখা যেতও। কিন্তু আজ, হোটেলের ঘর নম্বর ২০৭-এর জানালায় চুপি চুপি…
-
মুখোশের নবাব
অখিল চৌধুরী ১৮৫৭ সাল—ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম বৃহৎ সশস্ত্র বিদ্রোহ। দিল্লি, কানপুর, ঝাঁসি, মীরাট থেকে সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ছিল ধীরে ধীরে। আর এই সময়েই, কলকাতার মতো শহর, ব্রিটিশ ভারতের প্রশাসনিক হৃদয়, বাইরে থেকে যতটা স্থির, ভিতরে ততটাই অস্থির। ঠিক এই সময় কলকাতার অলিগলিতে দেখা যেতে লাগল এক রহস্যময় চরিত্র—একজন মুখোশপরা নবাব, যিনি প্রতিরাতে বারোটার…
-
সুধানী : এক নদীর আত্মকথা
সুমন দাস আমার জন্ম হয়েছিল এক নিঃশব্দ সকালে। পাহাড়ের বুক চিরে একটুখানি ঝরনা যখন নেমে আসছিল, তখন কেউ জানত না সেই জলধারা একদিন নদী হবে। না, আমি হিমালয়ের বিশাল বরফগলা স্রোত নই, আমি সুধানী — এক শান্ত, সরল, কিন্তু গভীর জীবনবোধে পরিপূর্ণ নদী। আমার জন্মস্থানটি ভারতের পূর্ব হিমালয়ের এক অজানা কোণে, যেখানে নীল পাহাড় আর…
-
গোয়েন্দা দাদু
মিত্রা বসু পাঁচ নম্বর পাড়া—উত্তর কলকাতার এক পুরনো গলি ঘেঁষে থাকা, রোদে পুড়ে যাওয়া লাল বাড়ির সারি। ভাঙাচোরা রাস্তায় বাচ্চারা ফুটবল খেলে, দুপুরবেলায় বুড়োরা চায়ের দোকানে তাস খেলেন, আর সন্ধ্যায় ঘরে ঘরে কাকের ডাকের মতো বকবকানি শুরু হয়। এমনই এক শান্ত পাড়ায় হঠাৎ একদিন শোরগোল পড়ে গেল। ৭৫ বছরের হরিহর দত্ত, যাকে সবাই স্নেহ করে…
-
রেডিওর ওপার থেকে
ঋদ্ধিমা বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতা শহরের উত্তর প্রান্তে, শ্যামবাজারের এক পুরনো বাগানবাড়ি। বাড়িটা প্রায় শতবর্ষ পুরনো, লালচে ইটের গাঁথুনি, লোহার রেলিং আর কাঠের বারান্দা। ঘরগুলো যেন চুপচাপ দাঁড়িয়ে সময়কে দেখছে—দিন যায়, রাত আসে, মানুষ বদলায়, কিন্তু বাড়ির দেয়ালের ফিসফিসানি একই থাকে। এই বাড়িতে সদ্য এসেছেন নীলয় সেন। বয়স পঁচিশের কাছাকাছি, পেশায় গ্রাফিক ডিজাইনার। শহরের কোলাহল থেকে দূরে…
-
অন্তরাল
উমেশ মাহাতো পুরুলিয়ার ঘন অরণ্যের কোলে এক নামহীন ছোট্ট গ্রাম। গ্রামটির নাম কেউ জানে না, তবে এলাকাবাসী সবাই এই গ্রামটিকে ‘অন্তরাল’ বলে ডাকে। প্রকৃতির কোলে গড়ে ওঠা এই গ্রামটির জীবনযাত্রা সাদাসিধে, নির্মল ও পরিপূর্ণ। প্রতিদিন সূর্যের প্রথম কিরণ পড়তেই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে গ্রামের মানুষ। মাটির ঘরগুলো ছাদে খড়ের চুয়াড়ি আর সামনে লতাপাতা ঝুলানো বারান্দা…
-
বইয়ের পাতায় প্রেম
শ্রেয়সী হাজরা পুরনো শহরের এক অলিন্দ গলির মোড়ে, যেখানে আধুনিকতার চমক-ঝলক কম, আর সময় যেন একটু ধীরে চলে, দাঁড়িয়ে আছে “অন্তরবাতি” নামের একটি পুরনো বইয়ের দোকান। দোকানটির কাঠের জানালা আর দরজা ছুঁয়ে গিয়েই মনে হয়, কেউ যেন ইতিহাসের পাতা উল্টাচ্ছে, যেখানে গাঁথা আছে নানা গল্প, অজানা স্মৃতি আর হারিয়ে যাওয়া কথার ঢেউ। দোকানটির ভিতরে ঢোকার…
-
চিরদিন বারাণসী
দেবজিত সাহা শহরের ব্যস্ততা আর অফিসের ধোঁয়াশার মধ্যে চারজন বন্ধু বহুদিন ধরেই ভাবছিলাম কোথাও একটু বেরিয়ে পড়া দরকার—যেখানে সময়ের গতি ধীর, যেখানে প্রতিটা সকাল নতুন, আর প্রতিটি সন্ধ্যা যেন এক অন্য অনুভব। বহু আলোচনার পরে ঠিক হল—বেনারস। না, কেউ আগে যায়নি। আমরা কেউই জানি না সেই গলির বাঁকগুলো, জানি না গঙ্গার ঘাটে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয়ের সেই…
-
স্মৃতির সরণি
আরিফ জামান অধ্যায় ১: ঢাকার পুরনো এলাকা – গেন্ডারিয়া। ততোধিক পুরনো এক তিনতলা বাড়ির দ্বিতীয় তলায় সাবিহা খাতুন একা থাকেন। সময়ের ছোপ ধরা দেয়ালের ওপর ঘড়ির কাঁটা যেন ক্লান্ত হয়ে থেমে যেতে চায় প্রতিনিয়ত। বিকেল হলেই খোলা জানালার ফাঁক দিয়ে সোনালি আলো এসে পড়তে থাকে তার কাঠের চেয়ারটায়, যেখানে তিনি বসে থাকেন প্রায় অনড় হয়ে,…
-
পাহাড়ের ডাকে
মৌমিতা সামন্ত কলকাতার কলেজপাড়ায় পড়াশোনা আর ব্যস্ত জীবনের মাঝে ঈশান, অর্পণ আর রিমঝিম—তিন বন্ধু—চুপিচুপি একটা স্বপ্ন বুনছিল অনেকদিন ধরে। বড় হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে জীবনটা কেমন যেন গা ছমছমে দৌড়ে পরিণত হয়েছে, যেখানে থেমে দাঁড়ানোর সময় নেই, নিজেকে চিনে নেওয়ার সময় নেই, কিংবা প্রকৃতির সঙ্গে একটুখানি নিঃশব্দে বসে থাকারও জায়গা নেই। কিন্তু এই তিনজন ছিল…
-
নীলপদ্ম
সৌভিক দাস বৃষ্টিভেজা এক সন্ধ্যা। কলকাতার উত্তর প্রান্তে পুরনো গলির একটায় দাঁড়িয়ে অনিরুদ্ধ ক্যামেরা হাতে ঘোরাঘুরি করছিল। পুরোনো বাড়ি, ভাঙা বারান্দা, জানালার কার্নিশে জমে থাকা শ্যাওলা—সবকিছুই যেন সময়ের স্তব্ধ দলিল হয়ে উঠেছে তার লেন্সে। কাকভেজা চুপচাপ শহরের মধ্যে সে খুঁজে বেড়াচ্ছিল একরাশ অতীত, যেটা তার ছবিগুলোর মাধ্যমে অদৃশ্য থেকে দৃশ্যমান হবে। ঠিক তখনই তার চোখে…












