প্রেমের গল্প
-
অবেলার ফুল
সায়ন চক্রবর্তী রবিবারের বিকেলটা এই গ্রামে যেন আলাদা আলোয় ঝলমল করে, সূর্যটা নদীর পাড়ে গড়িয়ে যেতে যেতে এমন এক নরম রঙ ছড়িয়ে দেয় যে হাঁসফাঁস করা সপ্তাহের ধুলোও মুহূর্তে থিতিয়ে আসে, আর সেই সময়েই শুরু হয় স্কুলবাড়ির বারান্দায় গানের আসর; হেডস্যার নিজের হাতে টাঙানো লণ্ঠনের নিচে মাদুর পাতা, ধুলো ধূসর কলাপাতায় রাখা গরম চা, কাঁচের…
-
অফিসের পরে
সুলগ্না দেব এক অফিসের ব্যস্ত সময়টা যেন এক অদৃশ্য স্রোত, যেখানে প্রতিটি মানুষ ভেসে চলে তার নিজস্ব দায়-দায়িত্ব, টার্গেট আর ডেডলাইনের ভেতর দিয়ে। শহরের এক নামী বহুজাতিক কোম্পানির করিডর দিয়ে প্রতিদিনের মতো হাঁটছিলেন অরিত্র সেন—ত্রিশোর্ধ্ব বয়সী, ফরমাল শার্ট-প্যান্টে মোড়া এক নির্লিপ্ত মুখ, হাতে কফির কাপ আর চোখে চশমা। তার অভ্যাসই হলো কাজ ছাড়া অন্য কিছুতে…
-
অপরিচিতের কাছে আত্মসমর্পণ
সুতপা দাস ১ রাতের ট্রেনটা যেন এক অদ্ভুত ছায়াচ্ছন্ন সুরের মতো ছুটে চলছিল অন্ধকার গাছপালা আর ফাঁকা স্টেশনের পাশ দিয়ে। জানালার কাচে প্রতিফলিত হচ্ছিল ভেতরের ম্লান আলো, আর তার ভেতরেই বসে ছিল অদ্রিজ—এক হাতে বই, আরেক হাতে অচেতনভাবে কলম ঘোরাচ্ছিল। ভিড়ের বগি হলেও চারপাশে নিস্তব্ধতা নেমে এসেছিল, যাত্রীদের অনেকেই ঘুমিয়ে পড়েছে, কেউ কেউ চুপচাপ ফোনের…
-
চাঁদের আলোয় প্রতিশ্রুতি
চৈতালী বৰ্মন চাঁদের আলোয় ডুবে থাকা সেই গ্রামটির চারপাশে এক অদ্ভুত নীরবতা বিরাজ করছিল। দিনের কোলাহল ফুরিয়ে গেলে গ্রামের আকাশ যেন হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে যায়, কেবল দূরের পুকুরের ব্যাঙের ডাক আর মাঝেমধ্যে শেয়ালের হাঁক সেই নীরবতাকে খানিকটা ভেঙে দেয়। অরিন্দমের জীবনের প্রতিটি দিন কাটত একই ছন্দে—ভোরের আলোয় খেতের কাজে বেরিয়ে যাওয়া, দুপুরের রোদে ঘেমে-নেয়ে খড়ের…
-
শহরের কোলাহলে
রূপক বসু ১ সকালবেলা আটটা থেকে দশটার ভেতর শহরের মেট্রো স্টেশন যেন এক আলাদা যুদ্ধক্ষেত্র। অসংখ্য মানুষের ভিড়ে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি মানুষই ব্যস্ত, সবাই যেন নিজের নিজের জগতে ডুবে আছে। কেউ কানে হেডফোন গুঁজে গান শুনছে, কেউ হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজে ব্যস্ত, কেউ অফিসের জরুরি প্রেজেন্টেশন নিয়ে নোট ঘেঁটে যাচ্ছে, আবার কেউ বা হাতে ধরা বইয়ের পাতায়…
-
ভাগীরথীর তীরে ফরাসি প্রেম
তিথি বসু পর্ব ১ – আগমন ভাগীরথীর জলরাশি তখন সোনালি রোদে ঝিকমিক করছে। দূরে গঙ্গার বুকে ভেসে ওঠা এক বিশাল জাহাজ ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে চন্দননগরের ঘাটের দিকে। আঠারো শতকের মাঝামাঝি, ফরাসিদের বাণিজ্য উপনিবেশ তখন নবীন কিন্তু প্রভাবশালী হয়ে উঠছে। ঘাটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষ কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে আছে—তাদের কাছে বিদেশী জাহাজ মানেই নতুন…
-
নক্ষত্রবাড়ি
ইরা বন্দ্যোপাধ্যায় পর্ব ১ – প্রথম আলাপ কলকাতার শরৎকাল। পুজোর ভিড়, আলোয় মোড়া রাস্তা, প্রতিটি মোড়ে মোড়ে উলুধ্বনি আর ঢাকের তালে কেঁপে উঠছে শহর। অভ্রর মাথাটা অদ্ভুতভাবে ভারী লাগছিল। সে এক নামী বিজ্ঞাপন সংস্থার ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর। সারা বছর ধরে ক্লায়েন্টের চাপ, ডেডলাইনের ঝড়, কনসেপ্ট নিয়ে মিটিং আর টেনশনে ভরা রাতজাগা তার জীবনের রুটিন হয়ে উঠেছে।…
-
রোবট কবি
মৌমিতা রায় এক ড. অরিন্দম মুখার্জি ছিলেন কলকাতার এক প্রখ্যাত রোবোটিক্স বিজ্ঞানী। বয়স তাঁর মাঝ চল্লিশে হলেও, জীবনের সবটুকু সময় তিনি ল্যাবরেটরির দেয়াল আর অসংখ্য তার, সার্কিট, স্ক্রিনের মধ্যে ডুবে কাটিয়েছেন। বন্ধু-বান্ধব, সাহিত্য, সঙ্গীত—এসব থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছিলেন তিনি। যুক্তির খোলস আর যান্ত্রিক অনুশাসনের ভেতরেই তাঁর জীবন বন্দি হয়ে গিয়েছিল। ছোটবেলায় কবিতা লেখার একটা…
-
বৃষ্টিভেজা দুপুর
সুস্মিতা দে অধ্যায় ১: উত্তরবঙ্গের ছোট শহরটি যেন এক অদ্ভুত মায়ার পর্দায় মোড়া। পাহাড় থেকে নেমে আসা ধোঁয়াটে মেঘ, ঘন সবুজের ফাঁকে লুকিয়ে থাকা ছোট ছোট টিনের চালের ঘর, কোলাহলহীন রাস্তায় মাঝে মাঝে শোনা যায় সাইকেলের ঘণ্টা কিংবা দূরের ট্রেনের হুইসেল—সব মিলিয়ে শহরটিতে যেন একধরনের ধীরলয়ের সুর বেজে চলে। এই শহরেই সদ্য যোগ দিয়েছেন ডাঃ…
-
হারানো ডায়েরি
রুদ্রজিত ঘোষ অধ্যায় ১ : ডায়েরির গোপন পৃথিবী মায়ার দিন শুরু হয় খুব সাধারণভাবে—আলোর নরম ছায়ায় জানালার পর্দা দুলতে দুলতে তার ঘর ভরে ওঠে সকালের আলোয়। বাইরে পাখিদের ডাকে ভোরবেলার নিস্তব্ধতা ভেঙে যায়, অথচ মায়ার ভেতরটা সবসময় অন্যরকম ব্যস্ততায় ভরে থাকে। সবার চোখে সে হয়তো একেবারেই সাধারণ এক কিশোরী, কলেজে যাওয়া-আসা করে, বান্ধবীদের সঙ্গে গল্প…
-
বন্ধুত্ব থেকে প্রেম
সুদীপ্ত দাস আরিয়ান আর নন্দিতা দু’জনের বাড়ি একই মহল্লায়। জন্ম থেকে একই পরিবেশে বড় হওয়া, দু’জনের পরিবারও অনেকটা কাছাকাছি। মহল্লার সরু গলিতে প্রতিদিন বিকেলে খেলাধুলার আসর বসত—লাঠি খেলা, লুকোচুরি, বা ক্রিকেটের ম্যাচ। সেই মাঠে সবসময় একসঙ্গে দেখা যেত আরিয়ান আর নন্দিতাকে। স্কুলে ভর্তি হওয়ার পরও তাদের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা আরও বেড়ে যায়। প্রথম দিন যখন স্কুলে…
-
অসমাপ্ত ভালোবাসা
অৰ্ণা দে শীতল জানলার কাচে ভোরের শিশির জমেছে, আলো এসে পড়েছে থেরাপি রুমের কাঠের মেঝেতে। ড. মেঘলা দত্ত প্রতিদিনের মতো আজও ক্লিনিকের টেবিলে বসে, পেশেন্ট ফাইল ঘাঁটছেন। ঘড়িতে তখন সাড়ে ন’টা। নতুন রোগী আসার কথা সাড়ে দশটায়—রেফার করা হয়েছে একটি সরকারি আশ্রয় কেন্দ্র থেকে। “স্মৃতিভ্রষ্ট, আচরণ স্বাভাবিক, অস্থায়ী আবাসন হোমে রাখা হয়েছে,”—এইমাত্র এমন একটি রোগী…












